সংস্কৃতি কাকে বলে? বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঞ্চলসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।


সাংস্কৃতি কাকে বলে এবং সংস্কৃতির সংজ্ঞা:
সাধারণভাবে সংস্কৃতি বলতে সমাজবদ্ধ মানুষের সামগ্রিক কর্মকান্ড, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ,
বিশ্বাস, আদর্শ, সামাজিক মূল্যবোধ, আইন-কানুন, সামাজিক সংগঠন, প্রযুক্তিক জ্ঞান, ভাষা, বাস্তব
সম্পদ ইত্যাদির সমষ্টিগত রূপকে বোঝায় যা মানুষের জীবনযাপন প্রণালীর সাথে প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে জড়িত। টেইলর (ঞধুষড়ৎ, ১৯৫০) ও ক্রোয়েবার (কৎড়বনবৎ, ১৯৪৮) সংস্কৃতির অনুরূপ
সংজ্ঞা প্রদান করেন। তবে সংস্কৃতি যা মানুষের ‘অর্জিত আচরণ' (অপয়ঁরৎবফ ইবযধারড়ঁৎ) সে সম্পর্কে
বর্তমানে প্রায় সবাই একমত পোষণ করেন। এই অর্জিত আচরণ শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং
বংশানুক্রমে বিভিন্ন বাহনের মাধ্যমে পরিবাহিত হয় এ ব্যাপারে অধিকাংশ নৃতত্ত¡বিদগণই বর্তমানে
একমত।
সাংস্কৃতিক অঞ্চলিকরণের ভিত্তি:
সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রলক্ষণের (ঞৎধরঃং) সমষ্টিগত প্রকাশের ভিত্তিতে একটি গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীসমূহকে চিহ্নিত
করা সম্ভব। কোন গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীসমূহের সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণসমূহ ভ‚-পৃষ্ঠকে প্রভাবিত করে, যার ফলে
বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সাংস্কৃতিক ভ‚-দৃশ্য তৈরী হয়। কাজেই সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রলক্ষণের ভিত্তিতে
সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভবপর। সাংস্কৃতিক অঞ্চল নিরূপণে অনুরূপ সাংস্কৃতিক
বৈশিষ্ট্য বা প্রলক্ষণের অধিকারী মানব গোষ্ঠীর পারিসরিক বিন্যাস অনুযায়ী পৃথিবীকে সংস্কৃতিগতভাবে
প্রধান কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়। তবে সাংস্কৃতিক অঞ্চলিকরণের জন্য সীমানা নির্ধারণ একটি
জটিল সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। কারণ, সাংস্কৃতিক অঞ্চল কখনও বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় না।
প্রত্যেকটি সংস্কৃতি তার প্রতিবেশী সংস্কৃতির সাথে সূ²ভাবে মিশে যায়। ফলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক
অঞ্চলের একটি রেখা দ্বারা চিহ্নিত করা হলেও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সীমানা একটি পরিবর্তনশীল
(ঞৎধহংরঃরড়হধষ) অঞ্চল হিসেবে গণ্য হয়।
বিভিন্ন লেখক পৃথিবীকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক জগতে বিভক্ত করেছেন। এদের মধ্যে আছেন নৃতত্ত¡বিদ,
ইতিহাসবিদ এবং সমাজবিদ ও ভ‚বিদ। কিন্তু এঁরা সবাই তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সাংস্কৃতিক জগৎ
নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং সাংস্কৃতিক ভ‚গোলে ঐ সকল সাংস্কৃতিক জগৎ বেশী অর্থপূর্ণ হয়নি।
আধুনিককালে বেশ কয়েকজন ভ‚গোলবিদ পৃথিবীকে সাংস্কৃতিক জগতে বিভক্তিকরণের চেষ্টা করেছেন।
তাঁরা সবাই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি নির্ণায়ক প্রয়োগ করে সাংস্কৃতিক জগৎ রচনা
করেছেন। পু´খানুপু´খভাবে পরীক্ষা করলে তাঁদের পরিকল্পে (ঝপযবসব) বেশ প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়,
কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোন মৌলিক অনৈক্য নেই। বস্ততপক্ষে, ঐ সকল পরিকল্পে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক
জগতের সীমারেখা সম্পর্কে এক সাধারণ মতৈক্য দেখা যায়। একাধিক সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণ বিভিন্ন
স্থানের বৈষম্য (উরভভবৎবহঃরধষ) গুরুত্ব সহকারে নির্ণায়করূপে প্রয়োগ করে নিæে সাংস্কৃতিক জগতের
অঞ্চলিকরণ করা হয়েছে। রশিদ (১৯৮২) নি¤œরূপ বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঞ্চল বিভাজন করেছেন:
(১) ইসলামী, (২) ইউরোপীয়, ৩) দক্ষিণ এশীয়, (৪) চীনা, (৫) দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়, (৬) আফ্রিকান,
(৭) ল্যাটিন আমেরিকান, (৮) অ্যাংলো আমেরিকান, (৯) অস্ট্রেলীয়, (১০) সোভিয়েত, (১১) জাপানী
এবং (১২) প্রশান্ত মহাসাগরীয়।
ইসলামী জগৎ : এই সাংস্কৃতিক জগৎ উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা হতে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেকে এই
অঞ্চলকে আরব জগৎ বা মরু জগৎ নামেও আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু তাতে এই অঞ্চলের অধিবাসীর
প্রকৃত সত্তা প্রকাশ পায় না। এই অঞ্চলের মধ্যে পৃথিবীর তিনটি ধর্ম জন্ম নেয়, কিন্তু বর্তমানে ইসলাম
এখানে সর্বাপেক্ষা প্রতিপত্তিশালী ধর্ম। ইসলাম ধর্ম একটি সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনধারা রচনা করে এবং
সেজন্য এ অঞ্চলে ভাষা ও বর্ণগোষ্ঠীর বিভিন্নতা থাকা সত্তে¡ও ইসলাম ধর্মের ব্যাপ্তিশীল প্রভাব এখানকার
সকল দেশে অনুভ‚ত হয়। অবশ্য এটা ঠিক যে, ইসলামী জগতের বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য দেখা
যায় এবং মরু অঞ্চলের পৃথকীকৃত ও বিচ্ছিন্ন মানব গোষ্ঠীসমূহ অনেক ক্ষেত্রে উপ-সংস্কৃতি সৃষ্টি
করেছে। এরূপ কয়েকটি অঞ্চল হচ্ছে যে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার “মাগরেব,” পশ্চিম এশিয়ার
তথাকথিত “মধ্যপ্রাচ্য”, উত্তর আফ্রিকার আরব ও নিগ্রো সংমিশ্রণ এলাকা এবং আরবীভাষী নয় এমন
দেশসমূহ, যেমন তুরস্ক ও ইরান (চিত্র ২.৮.১)।
আধুনিককালে ইসলামী সাংস্কৃতিক জগতে গ্রামীণ দারিদ্র্য, রক্ষণশীল ঐতিহ্যবাদিতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ ও
অস্থিতিশীলতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু একথাও স্মরণযোগ্য যে এই অঞ্চলে পৃথিবীর দৃ'টি
প্রাচীন সভ্যতা জন্ম নিয়েছিল এবং বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামী সাংস্কৃতিক জগতে তেল সম্পদ
আবিষ্কারের পর সেখানে সমৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণের সূচনা হয়। এই জগতের মধ্যে প্রচুর অসমতা ও
বৈসাদৃশ্য থাকলেও ইসলাম ধর্ম তাদের মাঝে একতাবোধ আনতে প্রধান শক্তির কাজ করে।
ইউরোপীয় জগৎ : পশ্চিম ইউরোপীয় দেশসমূহ নিয়ে এই সাংস্কৃতিক জগৎ গঠন করা হয়েছে। আয়তনে
ক্ষুদ্র হ'লেও এই জগৎ বেশ জনবহুল। ইউরোপে আধুনিককালের বহু বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ঘটেছে যা
বর্তমান পৃথিবীকে প্রভাবিত করেছে এবং এই সাংস্কৃতিক জগৎ অনেক ক্ষেত্রেই মানবজাতির অগ্রগতিতে
নেতৃত্ব দান করেছে (চিত্র ২.৮.১)। ইউরোপীয় জগতের অভ্যন্তরে অনেক প্রাকৃতিক বৈশাদৃশ্য দেখা
যায়, যেমন, ভ‚-মধ্যসাগরীয় উষ্ণ উপক‚ল থেকে শীত প্রধান স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা উত্তর সাগরের নি¤œ
উপক‚ল থেকে বরফাবৃত আল্পস পর্বত। ভাষার দিক দিয়েও এই অঞ্চলে কোন সমরূপতা নেই। কিন্তু সে
সকল বৈশিষ্ট্য এই জগতে সুষ্পষ্ট সমরূপতা এনে দিয়েছে সেগুলি হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রগতি, গণতান্ত্রিক
ঐতিহ্য, উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা, উন্নত ও ব্যাপক পরিবহন ব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং নগরায়ন।
দক্ষিণ এশীয় জগৎ : দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশ একটি অন্যতম জনাকীর্ণ সাংস্কৃতিক জগৎ। পৃথিবীর
প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বাস করে। এই অঞ্চল অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার উৎসস্থল এবং
বহুকাল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর এখানে চারটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয় : বাংলাদেশ, ভারত,
পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাচীনকালে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি হয়, পরবর্তীকালে
ইসলাম ধর্ম এখানে প্রবেশ করার পর নতুন সাংস্কৃতিক উপাদানের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ এশিয়ায়
রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ভাষা-ভিত্তিক কোন সমরূপতা নেই; এই জগতে এক ডজনের অধিক ভাষার
ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, ভারতে হিন্দু, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলাম এবং শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা
সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং চারটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামো বিভিন্নতর। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ঔপনিবেশিক
ইতিহাস, জনসংখ্যা জীবনধারা, খাদ্য সমস্যা এবং উন্নয়নকামী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গোটা অঞ্চলে
একতাবোধ সৃষ্টি করতে সহায়তা করেছে এবং এর ফলস্বরূপ দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশকে একটি স্বতন্ত্র
সাংস্কৃতিক জগৎরূপে বিবেচনা করা যায়।
চীনা জগৎ : চীন একটি জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জগৎ। পৃথিবীর প্রায় একচতুর্থাংশ জনসংখ্যার আবাসভ‚মি বর্তমান চীন এক প্রাচীন সভ্যতার আধুনিক সংস্করণ। চীনা সভ্যতা
উত্তর চিনের হোয়াংহো উপত্যকায় সূচিত হয় এবং প্রায় দুই হাজার বছর বা তারও পূর্বে চীনা সভ্যতা
একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গঠন করে। এই সাংস্কৃতিক সত্তা অবিচ্ছিন্নভাবে বর্তমানকাল পর্যন্ত
প্রসারিত হয়েছে এবং এর স্বকীয়তা চীনকে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জগৎরূপে চিহ্নিত করেছে। (চিত্র
২.৮.১)। চীনের প্রাকৃতিক পরিবেশ তার স্বতন্ত্র সভ্যতা গড়তে সাহায্য করেছে। পর্বত, মরুভ‚মি এবং
অগম্য পথ চীনের প্রাচীন সভ্যতাকে পরিপার্শ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। বৈদেশিক আক্রমনকে চীনা
জনগণ অতীতে হয় প্রতিহত করেছে অথবা বিশেষিত করছে। ইতিহাসের সকল সময় চীনা জাতি
নিজেকে একটি উন্নত ও স্বতন্ত্র জাতিরূপে গণ্য করেছে এবং এই একতাবোধ চীনা সাংস্কৃতিক জগতের
অন্যতম নির্ণায়ক। ভাষা ও বর্ণগোষ্ঠীর একরূপতা চীনা জগতে আরও অধিক সামঞ্জস্য এনে দিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জগৎ : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চীন অথবা এশিয়ার ন্যায় একটি সুžষ্টভাবে নির্ধারিত
সাংস্কৃতিক জগৎ নয়। বলাবাহুল্য যে এ অঞ্চলে প্রচুর ভাষা ও জাতিভিত্তিক বৈচিত্র্য দেখা যায়। তাছাড়া
এখানে অতীতে একাধিক ঔপনিবেশিক শক্তি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। এশিয়ার মূল ভ‚-খন্ডের
কয়েকটি দেশ বার্মা, থাইল্যান্ড, লাওস, কাম্পুচিয়া, ভিয়েৎনাম ও মালয়েশিয়া) এবং সংলগ্ন দ্বীপমালা
(ইন্দোনেশীয়, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন) দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সাংস্কৃতিক জগতের অন্তর্ভুক্ত (চিত্র ২.৮.১)।
এখানকার জনসাধারনের অধিকাংশ চীনা বংশগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়
ভারতীয় হিন্দু প্রভাবের চিহ্নও দেখা যায়। অপরদিকে ইসলাম ধর্ম এ অঞ্চলে প্রবেশের পর মুসলিম
সংস্কৃতি সেখানে প্রসার লাভ করে। বর্তমানে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও ভাষার বৈসাদৃশ্য সত্তে¡ও দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় জীবনধারার সমরূপতা দেখা যায়। উন্নয়নকামী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তিতে এবং বিশ্বের
পরাশক্তিসমূহের প্রতিদ্বন্দি¡তার ভ‚মিরূপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি স্বকীয় জগতে পরিণত হয়েছে।
আফ্রিকার জগৎ : আফ্রিকা মহাদেশে সাহারা মরুভ‚মির দক্ষিণাংশ কৃষ্ণকায় নিগ্রোদের আবাসভ‚মি। এই
অঞ্চলটি আফ্রিকান সাংস্কৃতিক জগৎ নামে পরিতি। এ জগতের উত্তরে ইসলামী জগৎ অবস্থিত, কিন্তু এ
দুই জগতের সীমারেখা প্রকৃতপক্ষে একটি পরিবর্তনশীল (ঞৎধহংরঃরড়হধষ) অঞ্চল(চিত্র ২.৮.১)।
আফ্রিকান সাংস্কৃতিক জগতের শতাধিক ভাষাগোষ্ঠী এবং প্রাচীন সর্বপ্রাণবাদী (অহরসরংঃরপ) ধর্ম বিশ্বাস
এই আঞ্চলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইসলাম ও খৃীষ্ট ধর্মের পাশাপাশি প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসসমূহ এখনও
প্রচলিত আছে। বর্ণগোষ্ঠীর একরূপতা ব্যতীত আফ্রিকান জগৎ নির্ধারণে আরও কয়েকটি নির্ণায়ক উল্লেখ
করা যায়, যেমন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, প্রাচীন পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন, জাতি ও উপজাতি ভিত্তিক
সমাজ-ব্যবস্থা (ঞৎরনধষ ঝড়পরবঃু) এবং সাধারণ দারিদ্র্য। এছাড়া বহু যুগ ধরে এ অঞ্চল ইউরোপীয়
ঔপনিবেশিকদের দ্বারা শোষিত হওয়ায় বর্তমান যুগে আফ্রিকানদের মধ্যে এক শক্তিশালী
জাতীয়তাবোধের উম্মেষ ঘটছে এবং এই চেতনা আফ্রিকান সাংস্কৃতিক জগতে স্বকীয়তা দান করেছে।
ল্যাটিন আমেরিকান জগৎ : মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহের সমষ্টিতে ল্যাটিন আমেরিকান
সাংস্কৃতিক জগৎ গঠিত হয়েছে। প্রাচীন আমেরিন্ডীয় সংস্কৃতি ধ্বংস করে স্পেন ও পর্তৃগালের সংস্কৃতি
এখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং সে কারণে এই সংস্কৃতিকে “ল্যাটিন” সংস্কৃতি নামে অভিহিত করা
হয়। ব্রাজিলে ব্যবহৃত পর্তুগীজ ভাষা ব্যতীত ল্যাটিন আমেরিকার অণ্যত্র প্রায় সকল স্থানে স্প্যানীশ
ভাষা প্রচলিত (চিত্র ২.৮.১)। আধুনিককালে ল্যাটিন আমেরিকান জগতে স্পেন ও পর্তুগাল থেকে
আনীত ভ‚মিব্যবস্থা, জমির মালিকানা, কর ব্যবস্থা, স্থাপত্য শিল্প, নগর পরিকল্পনা, সঙ্গীত ইত্যাদির
দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এ সকল বৈশিষ্ট্য ল্যাটিন আমেরিকাকে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জগতে পরিণত
করেছে। অবশ্য এ অঞ্চলে কিছু কিছু বৈসাদৃশ্যও দেখা যায়, যেমন, ক্যারিবীয়ান অঞ্চলে ব্রিটিশ ও
ফরাসী প্রভাব এবং দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ ও আমাজন অঞ্চলের আদিবাসী আমেরিন্ডীয় সংস্কৃতির
উদ্বর্তন (ঝঁৎারাধষ)।
অ্যাংলো-আমেরিকান জগৎ : যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সমষ্টিতে অ্যাংলো-আমেরিকান সাংস্কৃতিক জগৎ সৃষ্টি
হয়েছে। প্রধানত ব্রিটেন এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আগত জনসাধারণের বংশধারা এই
অঞ্চলে বসবাস করে। অবশ্য এ অঞ্চলে ব্রিটেন ও ইংরেজী ভাষার প্রাধান্য প্রতিফলিত হওয়ায় এ
জগৎকে অ্যাংলো আমেরিকান নামকরণ করা হয়েছে (চিত্র ২.৮.১)। এই জগৎ পৃথিবীর অন্যতম
শিল্পায়িত ও নগরায়িত অঞ্চল এবং সর্বোৎকৃষ্ট প্রাযুক্তিক উন্নয়ন এখানকার চরম বৈশিষ্ট্য। ইউরোপীয়
বংশোদ্ভূত হলেও এই জগতের মানুষ একটি স্বীকয় সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে এবং আটলান্টিকের অপর
পাড়ে অবস্থিত ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয়দের তুলনায় অ্যাংলো-আমেরিকানরা এক ভিন্ন প্রাবাহে
জীবনধারা রচনা করেছে। প্রকৃতপক্ষে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বহু জাতিগত (চষঁৎধষ) সংস্কৃতি।
কানাডায়, ব্রিটেন ও ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও আফ্রিকার সংস্কৃতির সংমিশ্রণে এক
স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আত্মপ্রকাশ করেছে। নি:সন্দেহে এই সাংস্কৃতিক বহু জাতিত্ব (ঈঁষঃঁৎধষ
চষঁৎধষরংস) কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাংলো-আমেরিকান জগতের অন্যতম পরিচায়ক ও বৈশিষ্ট্য।
অষ্ট্রেলীয় জগৎ : ব্রিটিশ উপনিবেশরূপে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রথম পরিচিতি হলেও এ দু'টি দেশ
সময়ের ব্যবধানে এক নিজস্ব সাংস্কৃতিক জগৎ রচনা করেছে। ব্রিটেন থেকে দূরত্ব ও ভৌগোলিক
বিচ্ছিন্নতা খুব সম্ভবত এই স্বকীয়তা অর্জনে সহায়তা করেছে। অস্ট্রেলীয় জগতের অধিবাসীরা
ইউরোপীয় বংশোদ্ভুত এবং সেখানকার অর্থনীতি মূলত পাশ্চাত্য, কিন্তু জনবহুল শিল্পায়িত ইউরোপের
নমুনা অস্ট্রেলীয় জগতে দেখা যায় না। সেখানে প্রশস্ত নগরী, বিস্তীর্ণ কৃষিভ‚মি, বড় বড় পশুখামার,
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনুৎপাদী মরুভ‚মি ইত্যাদি এক বিশেষ জগৎ সৃষ্টি করেছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায়
অস্ট্রেলীয় জগতে নগরায়ন অতি দ্রæতহারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ লোক শহরে
বাস করে। বর্ণগোষ্ঠী, ভাষা (ইংরেজী) ও ধর্মীয় সমরূপতা অস্ট্রেলীয় সাংস্কৃতিক জগতের উল্লেখযোগ্য
বৈশিষ্ট্য।
সোভিয়েত জগৎ : রাশিয়া এবং তার পশ্চিমে অবস্থিত পূর্ব ইউরোপীয় কম্যুউনিস্ট দেশসমূহ সোভিয়েত
সাংস্কৃতিক জগতের অন্তর্ভুক্ত (চিত্র ২.৮.১)। এই জগতের মূল নির্ণায়ক আধূনালুপ্ত কম্যুউনিষ্ট
রাজনৈতিক ব্যবস্থার ঐতিহ্য এবং গোটা অঞ্চলে রুশ আধিপত্য ও প্রভাব। বিংশ শতাব্দীর ঘটনাবলী
সোভিয়েট জগতের স্বকীয়তা দানে সাহায্য করেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কম্যুউনিস্ট বিপ্লবের
মাধ্যমে সামন্তবাদী রুশ সমাজ পরিবর্তিত হয়ে সোভিয়েট ইউনিয়ন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও
শিল্পায়িত রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং ক্রমশ কম্যুউনিস্ট সম্প্রসারণের ফলে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলি
সোভিয়েত আধিপত্যের পরিসীমার অন্তর্ভুক্ত হয়। সোভিয়েত জগতের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,
পরিকল্পিত বা নির্দেশিত সাংস্কৃতিক ধারা এবং কম্যুউনিস্ট নীতিতে গঠিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ঐতিহ্য।
জাপানী জগৎ : একটি ছোট্ট দেশ তার কতিপয় অনুপম গুণাগুণের জন্য একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জগৎ
রচনা করতে সক্ষম হয়েছে। জাপান আজ অন্যতম প্রধান শিল্পায়িত দেশ এবং প্রাচ্যে অবস্থিত হয়েও
জাপান পাশ্চাত্য উন্নত দেশসমূহের সমকক্ষ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে অতি স্বল্প সময়ে
জাপান তার কঠিন পরিশ্রমের দ্বারা যে প্রায় অলৌকিক পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, যা বিশ্বের
সবাইকে বিস্মিত করেছে। এক শতাব্দীরও কম সময়ে জাতীয় চরিত্র রূপান্তর, দ্রæত শিল্পায়ন এবং
বর্তমান পৃথিবীতে তার অর্থনৈতিক প্রভাবের জন্য জাপান একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক জগতের অধিকারী
হয়েছে। শিল্পায়ন ঐতিহ্যবাদী প্রাচীন সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভুলে যায়নি, বরং নতুন ও পুরাতনের এক অপূর্ব
সংমিশ্রণ জাপানী জীবনধারায় ফুটে উঠেছে যা যথার্থই জাপানী এবং অন্য সকল সংস্কৃতি হ'তে ভিন্ন (চিত্র
২.৮.১)।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় জগৎ : এশিয়ার পূর্বে এবং আমেরিকার পশ্চিমে অবস্থিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ
নিয়ে এই জগৎ নির্ণয় করা হয়েছে। অবশ্য এক বিশেষ ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক অবস্থান ব্যতীত অপর
কোন শক্তিশালী নির্ণায়ক দ্বারা এই জগতের সীমা নিরূপণ সম্ভব নয়। এই জগতের মধ্যে তিন ধরনের
মানবগোষ্ঠী বাস করে : পাপুয়া-নিউগিনি থেকে ফিজি পর্যন্ত মেলানেশীয়; তার উত্তরে ও ফিলিপাইনের
পূর্বে মাইক্রোনেশীয়; এবং মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে পলিনেশীয় সম্প্রদায়। এ সকল সম্প্রদায়ের প্রাকৃতিক
ও সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় জগতের কোন সমরূপী বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা বেশ
কঠিন। তবু ঐ জগতের ঐতিহাসিক ধারা, সমুদ্র-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং স্বকীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে
প্রশান্ত মহাসাগরীয় সাংস্কৃতিক জগতের অস্তিত্ব স্বীকৃতির দাবী রাখে (চিত্র ২.৮.১)।
সর্বশেষে, উল্লেখ করা প্রয়োজন যে চিত্র জগতের যে পরিকল্পনা উপরে দেওয়া হয়েছে, তার সীমা
নির্ধারণের প্রসঙ্গে মতানৈক্য থাকতে পারে। কিন্তু তার ফলে এই পরিকল্পের যথার্থতা বা গুরুত্ব কমে যায়
না, কারণ উপরোক্ত বারটি জগৎ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আপেক্ষিক
অবস্থান এবং আধুনিক বা সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইত্যাদি নির্ণায়ক দ্বারা গঠন করা হয়েছে।
পাঠসংক্ষেপ:
মানুষের সামগ্রিক কর্মকান্ড, ধ্যান-ধারনা, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, আদর্শ, সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদির
সমষ্টিগত রূপকে সংস্কৃতি বলা হয়। সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রলক্ষণের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সীমানা
নির্ধারণ করা হয়। আধুনিক কালে বেশ কয়েকজন ভ‚গোলবিদ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক
ইত্যাদি নির্ণায়ক প্রয়োগ করে পৃথিবীকে কতিপয় সাংস্কৃতিক জগতে বিভক্ত করেছেন। তাঁদের নির্ণায়ক
পরিকল্পে মৌলিক অনৈক্য নেই। ইসলামী, ইউরোপীয়, দক্ষিণ এশীয়, চীনা, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়, ইত্যাদি
উল্লেখযোগ্য বিশ্ব-সাংস্কৃতিক অঞ্চলসমূহ।
নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন:
১. শূন্যস্থান পূরণ করুন:
১.১. অর্জিত আচরণ ----- মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং বংশানুক্রমে বিভিন্ন বাহনের মাধ্যমে পরিবাহিত
হয়।
১.২. ----- জগৎ এই সাংস্কৃতিক জগৎ উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা হতে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত।
১.৩. রাশিয়া এবং তার পশ্চিমে অবস্থিত পূর্ব ইউরোপীয় কম্যুউনিস্ট দেশসমূহ ---- সাংস্কৃতিক
জগতের অন্তর্ভুক্ত।
১.৪. ---- মহাসাগরীয় জগৎ এশিয়ার পূর্বে এবং আমেরিকার পশ্চিমে অবস্থিত ।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১. সংস্কৃতিক জগৎ বলতে কি বুঝায়? সাংস্কৃতিক জগতের ভিত্তিসমূহ কি?
২. সাংস্কৃতিক জগৎ ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করুন।
৩. বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঞ্চল নির্দেশ করুন।
৪. বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঞ্চলসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১. সংস্কৃতি কাকে বলে? বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঞ্চলসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।

FOR MORE CLICK HERE
বাংলা রচনা সমূহ
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য
English Essay All
English Grammar All
English Literature All
সাধারণ জ্ঞান বাংলাদেশ বিষয়াবলী
সাধারণ জ্ঞান আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী
ভূগোল (বাংলাদেশ ও বিশ্ব), পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
বি সি এস প্রস্তুতি: কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি
বি সি এস প্রস্তুতি: নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সু-শাসন
বি সি এস প্রস্তুতি: সাধারণবিজ্ঞান
বাংলা ভাষার ব্যাকরণ
বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়
ভাবসম্প্রসারণ

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]