১। পিউরিটানবাদ বলতে কি বুঝায়?
ধর্ম সংস্কার আন্দোলন
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ধর্মীয় ফলাফল ব্যাখ্যা করুন।
গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ

ইউরোপের ইতিহাসে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের এক সুদ‚র প্রসারী ফলাফল পরিলক্ষিত হয়। ধর্ম
ছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিস্তৃত হয় যা ইউরোপীয়
সমাজকে আধুনিক চিন্তা-চেতনায় গড়তে পথ সৃষ্টি করে এবং মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে
উত্তরণের ক্ষেত্রে এক বিশাল ভ‚মিকা রাখে।
ধর্মীয় ফলাফল
সংস্কার আন্দোলন খ্রিস্টান চার্চে বিভক্তি আনয়ন করে এবং এর সর্বজনীনতাকে প্রত্যাখান
করে। খ্রিস্টান জগতের এক বৃহৎ অংশ পোপের আনুগত্য থেকে বের হয়ে আসে এবং অন্যদল
রোমের চার্চের প্রতি অনুগতশীল থাকে। যারা ক্যাথলিক চার্চের প্রতি অনুগতশীল ছিলেন
তাদের বলা হতো ‘রোমান ক্যাথলিক’। যারা প্রবিত্র রোমান সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে নতুন
চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের বলা হয় প্রোটেস্টান্ট এবং এরা প্রোটেস্টান্ট চার্চের অনুগামী হয়ে
উঠে। জার্মানি, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন প্রতিবাদী ধর্ম গ্রহণ করে এবং ফ্রান্স,
পর্তুগাল, স্পেন, ইটালি, আয়ারল্যান্ড রোমের ক্যাথলিক ধর্মের প্রতি অনুগতশীল থাকে।
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের পথ সূচিত হয়।
প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মস্বীকৃত হবার ফলে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য ও ক্যাথলিক ঐক্যের আদর্শ বিনষ্ট
হয়ে পড়ে। এতদিন পর্যন্ত সমগ্র খ্রিস্টান স¤প্রদায় ‘একই পোপ একই ধর্মানুষ্ঠানের’ অধীনে
ছিল। প্রোটেস্টান্ট ধর্মের বিস্তার এবং প্রভাবে পোপতন্ত্রের একক প্রাধান্য নষ্ট হয়। ক্যাথলিক
চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইউরোপের প্রত্যেক দেশের রাজারা তাদের নিজস্ব দেশীয় চার্চ প্রতিষ্ঠা
করে যার উপর রাষ্ট্র তথা রাজার পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায়।
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পর খ্রিস্ট ধর্ম অধিকতরও উদার ও যুক্তিবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে
উঠে। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট উভয় গ্রæপই যুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাদানের মাধ্যমে তাদের
ধর্মের মূলনীতি ও তত্ত¡কে বিশ্লেষণ করতে এগিয়ে আসে। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের নেতারা
মনেপ্রাণে মুক্তির বাণী এবং মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তারা সহিষ্ণুতা, মুক্তবুদ্ধির

চিন্তা নীতি জ্ঞান বিবেক এবং আদর্শভিত্তিক চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে উঠে। যাজক স¤প্রদায়
এরপর থেকে কোনো কিছুকেই গ্রহণযোগ্য হিসেবে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হতোনা এবং উভয়
ধর্মমতই নিজ নিজ ধর্মের নৈতিক ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে উৎসাহী হয়ে উঠে। ক্যাথলিক ধর্মমতে
বিশ্বাসী লোকেরা যেমন তাদের ত্রট্টটি- বিচ্যুতি সংশোধন করার প্রয়োজন অনুভব করে তেমনি
প্রোটেস্টান্টরাও কোনরূপ অযৌক্তিক দাবি মানতে কাউকে বাধ্য করে নি। এভাবে সংস্কার
আন্দোলনের সূদুরপ্রসারী প্রভাবের ফলে রোমান ক্যাথলিক চার্চে বিভিন্ন স্মরণীয় পরিবর্তন ও
সংস্কার সাধিত হয়। এই সময় যেসব নৈতিক চেতনাবোধসম্পন্ন ভাবধারার উদ্ভব হয়েছিল
তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ‘পিউরিটানবাদ’। ‘অন্ধত্বের মুক্তি’ ছিল এদের মূলমন্ত্র। কিছু
সুনির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসন দ্বারা এই মতবাদ পরিচালিত হয়।
মধ্যযুগে ধর্ম বিষয়ে কোনো স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত মতামত পোষণ করা সম্ভবপর ছিল না।
কিন্তু প্রোটেস্টান্ট ধর্মের যুক্তিবাদিতা, উদারতা, নির্ভীকতা, পরম সহিষ্ণুতা এবং ধর্ম বিষয়ে
স্বাধীন চিন্তার সুযোগ এনে দিয়েছিলো। যাজকের অনুগ্রহ ছাড়াও যে ঈশ্বরের রাজ্যে পৌঁছানো
সম্ভব এটি সকলের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে। ধর্মীয় স্বাধীন চিন্তার সুযোগের মাধ্যমই
পরধর্মসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হয়।
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ইউরোপে আরো একটি ধর্মসংস্কার আন্দোলনের
সূচনা হয়। ইতিহাসে এই আন্দোলন প্রতিসংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। ধর্মসংস্কার
আন্দোলনের বিস্তার ও গতিরোধের লক্ষ্যে এবং ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে যে সকল অনাচার ও
দুর্নীতি প্রবেশ করেছিল তা দ‚র করাই ছিল প্রতিসংস্কার আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য।
২। রাজনৈতিক ফলাফল
ধর্মের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সংস্কার আন্দোলন এক সুদূরপ্রসারী ফলাফল
আনে। ধর্মসংস্কার আন্দোলন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধিকার তথা পোপতন্ত্রের ক্ষমতাকে
দুর্বল করে এবং ইউরোপে রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পথ সুগম করে। খ্রিস্টান অধ্যুষিত
দেশসমূহ নিয়ে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য গঠিত হলেও এর একচেটিয়া আধিপত্যের ব্যাপারে
বিভক্তি ইউরোপের ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙ্গে দেয় এবং জনগণের মধ্যে দ্রæত
জাতীয়তাবোধ ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টি করে। এমন এক সময় ছিল যখন পোপেরা সহজেই
রাজাদের সকল ব্যাপারেই হস্তক্ষেপ করতে পারতেন এবং তাদের হস্তক্ষেপ রাজার ক্ষমতাকে
বহুলাংশে দুর্বল করেছিল। কিন্তুু সংস্কার আন্দোলন রাজাকে যাজকদের হাত থেকে মুক্ত করে
তার অবস্থানকে সুসংহত করে তুলতে সহায়তা করে। রাজা ক্রমশ রাষ্ট্র এবং চার্চের উপর
একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পোপের ঐশ্বরিক ক্ষমতা (উরারহব জরমযঃং ড়ভ চড়ঢ়ব) এর
স্থলে রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতা (উরারহব জরমযঃং ড়ভ করহম) প্রতিষ্ঠিত হয়। লুথার ঘোষণা দেন
পোপ নয় খ্রিস্টিয় অনুশাসন বা রীতিনীতিতে বিশ্বাসী গোষ্ঠী দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।
ক্যালভিন মনে করতেন রাষ্ট্রই ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ এবং সর্বোপরি ঈশ্বরের
বাণীকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যাদান করার ক্ষেত্রে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে।
অনেকে মনে করেন আধুনিক গণতন্ত্র ষোড়শ শতাব্দীর ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফসল।
উগ্রপন্থী প্রোটেস্টান্টবাদীরা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে দাড়াঁয়। এর ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে

স্বৈরাচার-বিরোধী মনোভাব ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। রাজারা ক্রমশ নিজ নিজ দেশের
ধর্মানুষ্ঠানের উপর প্রাধান্য স্থাপন করতে থাকে যা আগে পোপের নিয়ন্ত্রনাধীনে ছিলো। এভাবে
প্রোটেস্টান্ট আন্দোলন গণতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব স্বরূপ মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার চিন্তা চেতনার
বিকাশ লাভ করতে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা বা সেক্যুলারিজম-এর প্রভাবে ষোড়শ শতাব্দীতে
চার্চ-এর কর অরোপের বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। রাজার ক্ষমতা দ্রæত বাড়তে থাকে।
রাষ্ট্র সব রকমের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা সর্বোপরি রাষ্ট্র শাসন সংক্রান্ত
সকল নীতিমালা প্রণয়নে অধিকার অর্জন করে।
৩। অর্থনৈতিক প্রভাব
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব অর্থনৈতিক জীবনেও পরিলক্ষিত হয়। চার্চের অধীনস্থ বিশাল
সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে চলে আসে এবং জনগণের উন্নয়ন ও প্রয়োজনের নিমিত্তে ব্যবহৃত হতে
থাকে। জনসাধারণ যাজক শ্রেণীর শোষণের হাত থেকে রেহাই পায়। ক্যাথলিক ধর্মমতে যে
কোনো রকমের পুঁজি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ছিল। তবে ষোড়শ শতাব্দীতে এই ধারণা পরিবর্তিত
হতে থাকে এবং পুঁিজবাদী ধারণার বিকাশ ঘটতে থাকে। ব্যাংকার, বণিক, কারখানার মালিক
স¤প্রদায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাদের কাছে সুদ গ্রহণ পাপ হিসেবে বিবেচিত হতো
না। ধর্মসংস্কারকগণ সকলেই পুঁজিবাদী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। লুথার একটি নির্দিষ্ট হারে
সুদ গ্রহণের পরিবর্তে ‘সুদ ক্রয়ের’ কথা বলেন। ক্রেডিট ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন সুপারিশ
করা হয়। ক্যালভিনের মতে অর্থ স্থবির নয়। অর্থ আরো অধিক অর্থ আনয়ন করে। এর জন্য
প্রয়োজন সঠিক বিনিয়োগের। তিনি মত ব্যক্ত করেন যে সুদ এর বিনিময়ে যে ঋন পাওয়া
যাবে, যা অন্যায় নীতি মেনে না চললে বা তা যদি অন্যের ক্ষতি না করে তবে তা অনৈতিক
হবে না। এভাবে ক্যালভিনের বক্তব্য বাজার অর্থনীতির বা পুঁজিবাদী চিন্তা চেতনার প্রাথমিক
ধারণাকে উৎসাহিত করেছিল। পরবর্তীকালে হুগো গ্রসিয়াস এবং ক্লডিয়াস সুদ ব্যবস্থাকে
সলোমাস আধুনিক ব্যবস্থার জন্য বাস্তবসম্মত বলে অভিহিত করেন।
এভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে ক্রম উত্থিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী
অধিকতর লভ্যাংশ বা লাভের প্রতি উৎসাহিত হয়ে উঠে এবং ক্রমশ দ্রæত প্রভাব বিস্তার করতে
থাকে, তারা সংস্কারকদের সমর্থন করতে থাকে। যেখানেই প্রোটেস্টান্ট ধর্মমত প্রচারিত
হয়েছিল সেখানেই ব্যবসায়ী স¤প্রদায় ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।
৪। ধর্মসংস্কার আন্দোলন : সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাব
সমাজ জীবনেও ধর্মসংস্কার আন্দোলন সুদ‚রপ্রসারী ফলাফল রাখতে সক্ষম হয়। ধর্মসংস্কার
আন্দোলনের ফলে সমাজ জীবনে ধর্মীয় প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বাইবেলের বহুল প্রচার ও
নীতিমূহের ব্যাপক প্রচারের ফলে সৎ ও সংযত জীবনের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়। ধর্মীয়
জ্ঞানবৃদ্ধির ফলে ন্যায়পরায়ণতা বৃদ্ধি এবং পোপের অনৈতিকতা ও শোষণনীতির অবসান ঘটে।
ধর্মসংস্কার আন্দোলনের এই নৈতিক উৎকর্ষের যুগে পিউরিটানবাদের উদ্ভব হয়। কঠোর নিয়ম
নির্দিষ্ট কিছু নৈতিক অনুশাসন-এর উপর ভিত্তি করে এই মতবাদ গড়ে উঠে। পিউরিটানবাদের
মূল লক্ষই ছিল নৈতিক চরিত্রের উন্নতি সাধন। এটি ব- াসফেমি আইন, বুলফাইট নৃত্য এবং

ধর্মবিরুদ্ধ কিছু বই নিষিদ্ধ করে। তবে সাবাথ্ (পবিত্র রবিবার) পালনের সুযোগ দেয়া হয়।
ক্যাথলিক লুথার এবং এ্যাংলিকানদের মধ্যে পিউরিটানবাদ দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে।
ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষত ক্যাথলিক এবং প্রোটেষ্টান্ট
উভয় বলয়েই যাদুবিদ্যার প্রভাব কমতে থাকে। যাদু বিদ্যা চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতকে প্রভাব
বিস্তার করেছিল। এছাড়াও ইনকুইজিশনের মাধ্যমে যে চরম শাস্তির বিধান করা হয়েছিল তা
কমিয়ে আনা হয় এবং মানবিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষত ইতালি ও ফ্রান্সে এর
নিষ্ঠুরতা কমতে থাকে।
সংস্কার আন্দোলন ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে শিক্ষা প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম
হয়। লুথার এবং ক্যালভিন ছাড়াও এই সময়ের ধর্মীয় নেতারা শিক্ষার উপর খুবই গুরুত্ব
দিয়েছিলেন। ক্যালভিন জেনেভাকে গুরুত্বপূর্ন শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন। স্কটল্যান্ডে
জননক্স ‘প্রতিটি প্যারিতে একটি পাঠশালা, প্রতিটি মফস্বল শহরে একটি স্কুল এবং প্রতিটি বড়
শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলেন।’ এ ছাড়া নারীদের সামাজিক শিক্ষার পথ
উন্মুক্ত করন। খ্রিস্ট ধর্ম নারীকে বাইবেল পড়ার অনুমতি দেয়। পুরুষ এবং নারী উভয়ই
প্রাথমিক স্কুলে যাবার অনুমতি পায়। এর ফলে নারী ও পুরুষের মধ্যে শিক্ষার বাড়তে থাকে
এবং পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও দ্রæত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠে।
৫। ধর্মসংস্কার আন্দোলন : শিল্প ও সাংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রভাব
বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে প্রোটেষ্টান্ট আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলন হলেও বিজ্ঞান, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও
জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় নানাবিধ প্রভাব রাখে। প্রচলিত বিশ্বাস এবং ধর্মব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান
করে জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে সুদুর প্রসারী ভ‚মিকা রাখে। ভৌগোলিক আবিষ্কার, আধুনিক
যন্ত্রপাতির ব্যবহার, সবকিছু সংজ্ঞায়িত করারও সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এই সময়ের
মানবতাবাদী বা হিউম্যানিটিস্ট দার্শনিকেরা ক্লাসিকেল বা প্রাচীন গ্রিসের জ্ঞানবিজ্ঞানের উপর
নতুন উৎসাহ সৃষ্টির মাধ্যমে জ্ঞানের জগতকে বৃদ্ধি করার কথা বলেন।
বৈজ্ঞানিক তত্তে¡র উদ্ভাবের ফলে দর্শনের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন সুচিত হয়েছিল। মাইকেল ডি
মনটেইন, জিওরভানো ব্রæনো জাগতিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বলেন। আরোহ যুক্তি বিদ্যা এবং
পরীক্ষামূলক পদ্ধতির পক্ষে স্যার ফ্রান্সিস বেকন কথা বলেন।
প্রোটেস্টান্ট ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সবচাইতে বড় প্রভাব পড়েছিলো শিক্ষার দ্রæত বিস্তারের
ক্ষেত্রে। লুথার সকল শহর, গ্রাম ও শহরতলীতে অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপর জোর
দেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে পাঠানোর তাগিদের ফলে
বৃদ্ধি পায়। ধর্মতত্ত¡ীয় বিষয় ছাড়াও ইতিহাস, ভ‚গোল, নৈতিকতা, আধুনিক ভাষা শিক্ষা গুরুত্ব
পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, নৌবিদ্যা, আইন, সৃষ্টিতত্ত¡ সম্পর্কে জ্ঞানচর্চা
হতো। সাহিত্যের ক্ষেত্রে স্পেনের লুডো, ভিকো, এরিস্টো, মাইকেল ডি কার্ভেন্টিস, লোপা
ডিভেগা, ইতালির মনটেইন, হল্যান্ডের ডনডেল, জার্মানির এন্ড্রুজ গ্রিফস, ইংল্যান্ডের এডমন্ড
স্পেনসার, শেক্সপিয়ার, মিলটন এরা নতুন যুগের সূচনা করেন। শিল্পকলার ক্ষেত্রে পুরানো
‘গথিক’ রীতিনীতির পরিবর্তে বারুক স্থাপত্য শৈলীর নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এছাড়া

ইতিহাস রচনা ও লেখায় সাহিত্যের ঢংয়ে বা রীতিতে ইতিহাস লেখার যে ধারা ছিল তা বাদ
দিয়ে নতুন আধুনিক তথ্য বা উপাত্তের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সঠিকভাবে ইতিহাস
লেখার প্রচলন শুরু হয়।
এভাবে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়।
সারসংক্ষেপ
মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের ক্ষেত্রে প্রোটেস্টান্ট প্রভাবিত ধর্মসংস্কার আন্দোলন এক
গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। পোপের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভবের
ফলে জাতীয়তাবাদ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার উম্মেষ ঘটে। এছাড়া সংস্কার আন্দোলনের নেতারা
ব্যবসা, বাণিজ্য ও পুঁজি বিনিয়োগকে উৎসাহ দিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।
সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ফলে শিক্ষায় ব্যাপক বিস্তার ঘটে, সাহিত্য, শিল্পকলার ক্ষেত্রে নতুন
প্রেরণা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। এভাবে শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রে সংস্কার নয় বরং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক যুগের উত্তরণকে নিশ্চিত করেছিল এই
ধর্মসংস্কার আন্দোলন।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন
নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সময় সুনির্দিষ্ট নৈতিক চেতনাবোধ সম্পন্ন যে ভাবধারার উদ্ভব হয় তার
নাম
ক) পিউরিটানবাদ খ) স্কলাসটিকবাদ
গ) এ্যাংলিকানবাদ ঘ) ফ্রান্সিসকানবাদ
২। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ইউরোপে আরো একটি সংস্কার আন্দোলন সূচিত হয়
তা হলো -
ক) আধ্যাত্বিকবাদী আন্দোলন খ) জাগতিক মুক্তি আন্দোলন
গ) প্রতিসংস্কার আন্দোলন ঘ) মানবাধিকার আন্দোলন
৩। পোপের একক আধিপত্য হ্রাস পেয়ে সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কোন শ্রেণীর ক্ষমতা
দ্রæত বৃদ্ধি পেতে থাকে?
ক) জমিদার শ্রেণীর খ) রাজার
গ) প্রজার ঘ) মধ্যবিত্ত স¤প্রদায়ের
৪। ষোড়শ শতাব্দীতে যে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সূচিত হয় তার নাম --
ক) সামন্তবাদ খ) দাসতন্ত্র
গ) সমাজতন্ত্র ঘ) পুঁজিবাদ
৫। ক্যালভিন কোন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন?
ক) মিলান খ) জেনেভা
গ) লন্ডন ঘ) প্যারিস
৬। কোপার্নিকাস তত্তে¡র মূলসূত্র কি ছিল?
ক) সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুর্ণন করে খ) বুধ সৌরজগতের কেন্দ্রস্থলে
গ) শুক্র সৌরজগতের কেন্দ্র স্থলে ঘ) পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুর্ণন করে।
৭। আরোহ যুক্তিবদ্যিার প্রবর্তন কে করছিলেন?
ক) জিওরভানো ব্রæনো খ) মাইকেল ডি মনটেইন
গ) ডেসকার্টিজ ঘ) স্যার ফ্রান্সিস বেকন
৮। প্রোটেস্টান্ট ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সময স্থাপত্য রীতির ক্ষেত্রে কোন নতুন রীতি বা কৌশলের
উদ্ভব হয়েছিল?
ক) বারুক খ) গথিক
গ) মোঘল ঘ) গ্রিক
উত্তর : ১। (ক), ২। (গ), ৩। (ক), ৪। (ঘ), ৫। (খ), ৬। (ঘ), ৭। (ঘ), ৮। (ক)।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। পিউরিটানবাদ বলতে কি বুঝায়? এর মূলতত্ত¡সমূহ ব্যাখ্যা করুন।
২। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল সে সম্পর্কে লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্ন
১। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ধর্মীয় ফলাফল ব্যাখ্যা করুন। পোপতন্ত্রের একক আধিপত্য বিনাশ হয়ে
রাষ্ট্র কিভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে তা বর্ণনা দিন।
২। ধর্মসংস্কার আন্দোলন কীভাবে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছিল তা বর্ণনা করুন।
৩। ধর্মসংস্কার আন্দোলন কীভাবে নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটায় তা বর্ণনা করুন।
৪। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করুন।

FOR MORE CLICK HERE
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মাদার্স পাবলিকেশন্স
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ১ম পর্ব
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস
আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস
মুঘল রাজবংশের ইতিহাস
সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
ভূগোল ও পরিবেশ পরিচিতি
অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষ
পৌরনীতি ও সুশাসন
অর্থনীতি
অনার্স ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত
অনার্স দর্শন পরিচিতি প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]