ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের কারণসমূহ আলোচনা করুন


পটভ‚মি
মধ্যযুগের ইউরোপে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না। সমগ্র ইউরোপ ছিল পবিত্র রোমান
সাম্রাজ্যের অধীনে। এই রোমান সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো খ্রিস্টান ধর্মের আদর্শের উপর ভিত্তি
করে। সাম্রাজ্যের প্রশাসন, আইন - কানুন, রীতি - নীতি, করপ্রথা ইত্যাদি সবই ছিল খ্রিস্টান
ধর্ম ভিত্তিক। এই সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো দুটি শক্তির দ্বারা। একটি হলো রাজনৈতিক,
অপরটি ধর্মনৈতিক। রাজনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন সম্রাট এবং ধর্মনৈতিকভাবে
সাম্রাজ্যে ধর্মের প্রধান ছিলেন পোপ। পোপের অধীনস্থ যাজক, বিশপ এবং অন্যান্য ধর্মগুরুরা
ধর্মের ব্যাখ্যা করতেন। বলা বাহুল্য যে, তখন দেশের আইন ছিল পুরোপুরি ধর্ম নির্ভর। রাজার
অধীনে ছিল আঞ্চলিক প্রতিনিধি বা জমিদারগণ। এরাই ছিলেন স্ব স্ব এলাকার শাসনকর্তা, কর
সংগ্রাহক এবং সম্রাটের আদেশ প্রয়োগকারী। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ছিল
সামন্তবাদী। এই সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে প্রত্যেক এলাকায় সামন্ত জমিদারগণ
অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাদের ছিল নিজস্ব দুর্গ, সেনাবাহিনী, এমনকি প্রশাসন পর্যন্ত।
মধ্যযুগের ইউরোপের সামন্ত আর্থ-সামাজিক কাঠামোর কোন অঞ্চলের কিম্বা জাতি সত্তার
বিকাশ সম্ভব ছিল না। পঞ্চদশ শতকে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের পটভ‚মিতে মানুষের সামগ্রিক
দৃষ্টিভঙ্গীতে পরিবর্তন আসার সাঙ্গে সাঙ্গে আঞ্চলিক ও বিভিন্ন জাতিসত্ত¡া মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
উপরন্তু ইউরোপের সামন্ত আর্থ-সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে আসার পটভ‚মিতে কেন্দ্রীয়
শক্তির পক্ষে সমগ্র অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইতিহাসের এই
প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক শক্তি প্রায় স্বাধীন হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠা করে
জাতীয় বা আঞ্চলিক রাষ্ট্র। ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট উদ্ভব ও বিকাশের পেছনে কিছু কারণ
বিদ্যমান ছিল। এই কারণসমূহ নিæে প্রদত্ত হলোঃ
(ক) সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোর অবক্ষয়
সমগ্র মধ্যযুগে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে ছিল সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোর উপর
ভিত্তি করে। এই সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোর উদ্ভব ও বিকাশ শুরু হয়েছিল পঞ্চম
শতকে। পরবর্তী প্রায় হাজার বছর এই কাঠামো অটুট থাকে। চতুর্দশ শতকের শেষদিক থেকে
এই সামন্ত কাঠামো ক্রমাগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। পঞ্চদশ শতকে সামন্ত প্রথা সমগ্র
ইউরোপকে এককেন্দ্রীক শাসনে রাখতে ব্যর্থ হতে থাকে। সামন্ত অর্থনীতি নির্ভর কেন্দ্রীয় শক্তি

দুর্বল হয়ে পড়লে বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক জমিদারগণ স্ব স্ব অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
করে অনেকটা স্বাধীন হয়ে যায়। তাই বলা যায় যে সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামোর
অবক্ষয় ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্র বিকাশের পথ প্রশস্ত করে।
(খ) পোপ ও সম্রাটের মধ্যে দ্ব›দ্ব
মধ্যযুগের ইউরোপে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য পরিচালনা করতো দুটি প্রতিষ্ঠান। সম্রাট এবং
পোপ। সম্রাট ছিলেন সাম্রাজ্যের প্রধান প্রশাসক এবং পোপ ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের ধর্মীয়
প্রধান। দেশ পরিচালনা, কর সংগ্রহ এবং নিজেদের সুযোগ - সুবিধার ব্যাপারে এই দুই
প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। চতুর্দশ শতকে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার প্রশ্নে
মতভেদ দেখা দেয়। ধর্মের প্রধান হিসেবে পোপ নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি
করেন। অপরদিকে সম্রাট নিজেও দাবি করেন যে তিনি খোদ ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে
সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। পঞ্চদশ শতকে এসে সামন্ত অর্থনীতির পতনের মুখে এই সংঘাত
তীব্র আকার ধারণ করে। পোপ এবং সম্রাটের মধ্যকার এই মতবিরোধ ও সংঘাত ইউরোপে
জাতীয় রাষ্ট্র বিকাশের পথকে সুগম করে।
(গ) আঞ্চলিক রাজা ও সামন্ত নেতাদের শক্তি সঞ্চয়
চতুর্দশ শতকের শেষদিক থেকে ইউরোপে সামন্ত অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে
ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক জমিদার ও সামন্ত রাজাগণ অনেকটা স্বাধীনভাবে শক্তি
সঞ্চয় করতে থাকে। এই সময়ে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার
কারণে আঞ্চলিক রাজা ও জমিদারদের এই অবাধ শক্তি সঞ্চয়ে কোনো প্রকার বাধা দিতে
পারেনি। এই আঞ্চলিক সামন্ত রাজাদের শক্তি সঞ্চয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নিজস্ব
সামরিক বাহিনী গঠন, সামরিক দুর্গ গড়ে তোলা এবং অস্ত্রপাতি সংগ্রহ করা প্রভৃতি। এই
পরিস্থিতিতে পোপ যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে আঞ্চলিক রাজাদের পদচ্যুত করার পদক্ষেপ গ্রহণ
করে তখন এরা সশস্ত্রভাবে পোপকে মোকাবিলা করে। ফলে স্বাভাবিকভাবে জাতীয় রাষ্ট্র
গঠনের গতি ত্বরান্বিত হয়।
(ঘ) মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ
ইউরোপে জাতীয় - রাষ্ট্র উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এক গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন
করে। এই শ্রেণীর বিকাশ শুরু হয় পঞ্চদশ শতকে। সমাজের চাকুরীজীবী, বিভিন্ন পেশায়
নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, সামন্ত অর্থনীতির বাইরে নতুন স্বাধীন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিতরা
হলো ঐ সময়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সামন্তবাদী প্রথায় অভিজাত শ্রেণীর প্রাধান্য শেষ হয়ে
যাওয়ার সাথে সাথে এই শ্রেণী রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এই শ্রেণী
ছিল শিক্ষা, চিন্তা ও মননে সমাজের অগ্রণী অংশ। সামন্ত অভিজাত প্রাধ্যন্য রোমান সাম্রাজ্যে
এই শ্রেণীর কোনো সুযোগ - সুবিধা বা সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। নতুন আর্থ-সামাজিক
কাঠামোতে এবং জাতীয় রাষ্ট্রে এই শ্রেণীর ছিল অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা। শ্রেণীগত স্বার্থে এবং
আরও বিকশিত হওয়ার লক্ষ্যে এই শ্রেণী জাতীয় রাষ্ট্রের সমর্থক ও ধারক এবং বাহক হয়ে
দাঁড়ায়। বস্তুত এই মধ্য শ্রেণীর বিকাশ ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্রের বিকাশ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত
করেছিল।

(ঙ) জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস
ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও
জাতিসত্তার ভেতরে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ইউরোপে
বিভিন্ন জাতির বা আঞ্চলিক মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা বিকাশের কোনো পথ ছিল না। অথচ বিভিন্ন
জাতির ছিল নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা এবং লোকজ সংস্কৃতি। প্রত্যেক জাতির জীবনাচরণে
ছিল নিজস্ব বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। পোপ এবং সম্রাটের অধিপত্য প্রতিরোধে এই আঞ্চলিক জাতিসত্তার
বৈশিষ্ট্য সমূহ তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিল। বস্তুত সম্রাট ও পোপের শাসন শোষণের
বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার ভেতরে এবং আঞ্চলিক মানুষের মধ্যে একটা ঐক্যবোধ
গড়ে উঠেছিল। এই জাতীয় ঐক্যবোধ জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে বাস্তবে
রূপায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান ভ‚মিকা পালন করেছিল।
ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে ছিল স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি
অঞ্চলসমূহ। এই সকল অঞ্চলের রাজশক্তি চতুর্দশ শতকের মধ্যেই পোপ ও রোমান সম্রাটের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। এই সময় ইতালি
ও জার্মানি অনেকগুলি ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তবে রেনেসাঁসর প্রভাবে পঞ্চদশ শতক থেকে
ইউরোপে জাতীয়তাবোধের প্রাথমিক দানাবন্ধন শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া ইউরোপে আধুনিক
জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে, আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করে।

পাঠোত্তর মূল্যায়ন
(ক) নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন
১। মধ্যযুগে ইউরোপের আইন ছিল
(ক) ধর্মভিত্তিক (খ) জাতিভিত্তিক
(গ) রাষ্ট্র ভিত্তিক (ঘ) আন্তর্জাতিক।
২। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ছিল
(ক) গোত্রীয় (খ) সামন্তবাদী
(গ) পুঁজিবাদী (ঘ) সমাজবাদী।
৩। রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল
(ক) বুদ্ধিজীবী প্রাধান্য (খ) ভ‚মিদাস প্রাধান্য
(গ) সামরিক বাহিনী প্রাধান্য (ঘ) সামন্ত অভিজাত প্রাধান্য
উত্তর : ১। (ক), ২। (খ), ৩। (ঘ)।
(খ) রচনা মূলক প্রশ্ন
১। ইউরোপে জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের কারণসমূহ আলোচনা করুন
২। জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা ব্যাখ্যা করুন

FOR MORE CLICK HERE
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মাদার্স পাবলিকেশন্স
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ১ম পর্ব
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস
আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস
মুঘল রাজবংশের ইতিহাস
সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
ভূগোল ও পরিবেশ পরিচিতি
অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষ
পৌরনীতি ও সুশাসন
অর্থনীতি
অনার্স ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত
অনার্স দর্শন পরিচিতি প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]