জাতীয়তাবাদের সজ্ঞা দিন। জাতীয়তাবাদের উপাদান আলোচনা করুন।
জাতীয়তাবাদের কেনো সীমাবদ্ধতা আছে কি? ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশসহ
জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করুন।


ভূমিকা
১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়েই ইউরোপে জাতীয়তাবাদ বিকাশ লাভ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্ব
যুদ্ধের পরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ায়
একাধিক জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম হয়। জাতীয়তাবাদকে আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির এক প্রধান ও মৌলিক
নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জাতীয়তাবাদ হল জাতি রাষ্ট্র গঠনের
চরম পরিণতি। জাতীয়তাবাদের আদর্শ বিশ্বের ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের মানুষকে মুক্তি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ
করেছে।
জাতীয়তাবাদ কি?
জাতীযতাবাদ হচ্ছে যে কোনো জাতিসত্তার মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি। ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, মানুষ
তার স্বদেশের জন্য, পারিবারিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার জন্য এবং ভৌগোলিক সীমানা প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট
হয়েছে। কিন্তু আটার শতকের শেষ দশকের পূর্বে তেমনটি প্রবলভাবে দেখা যায়নি। তবে আমেরিকার
বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লবের সময় প্রথম এটি শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে কার্যকর হয় এবং পরবর্তীকালে
উনিশ শতকে ইউরোপে জাতীয়তাবাদের যুগ বলা হয় (ঞযব ১৯ঃয পবহঃঁৎু যধং নববহ পধষষবফ ঃযব ধমব
ড়ভ হধঃরড়হধষরংস রহ ঊঁৎড়ঢ়ব)।
জাতীয়তাবাদের সজ্ঞা
জাতীয়তাবাদ বলতে সাধারণভাবে একই বংশোদ্ভুত জন সমাজের মধ্যে জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও
মানসিক ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ চেতনা ও মানসিক অনুভূতিকে বুঝায়। বাস্তবে জাতীয়তাবাদ একটি মানসিক
ধারণা যা বংশ, বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে বসবাসকারী জনসমাজের মাঝে পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন লেখক,
গবেষক, ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন সজ্ঞা প্রদান করেছেন।
(ক) রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ঐধুবং তার "ঊংংধুং ড়হ ঘধঃরড়হধষরংস" এ জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে
বলেন ঘধঃরড়হধষরংস ঈড়হংরংঃং ড়ভ সড়ফবৎহ বসড়ঃরড়হধষ ভঁংরড়হ ধহফ বীধমমবৎধঃরড়হ ড়ভ ঃড়ি াবৎু
পড়ষফ ঢ়যবহড়সবহধ ঘধঃরড়হধষরঃু ধহফ চধঃৎরঃরংস জাতীয়তাবাদ জাতীয়তা ও দেশপ্রেম এই দুইটি
আধুনিক অতি øায়ুবিক বিষয়ের এক আবেগময় ও অতিশয়োক্তিক সমন্বয়।
(খ) বিখ্যাত দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেন,“একটি ভৌগোলিক সীমায় সহঅবস্থান, এক রাজার শাসনে বাস এবং ভাষা ধর্ম-সাহিত্য প্রভৃতি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি। পরাধীন
হলে তার পরিবর্তে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আকাঙক্ষা এবং পরস্পরের মধ্যে সহানুভূতি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার
আকাঙক্ষা এবং পরস্পরের মধ্যে সহানুভূতি ও ঐক্যের মনোভাব।



(গ) ঙীভড়ৎফ অফাধহপবফ খবধৎহবৎং উরপঃরড়হধৎু-তে জাতীয়তাবাদ এর- সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে
“ঘধঃরড়হধষরংস রং ধ ংঃৎড়হম ভববষরহম ড়ভ ষড়াব ধহফ ঢ়ৎরফব রহ ড়হব'ং ড়হি পড়ঁহঃৎু”
(ঘ) অধ্যাপক লাস্কি বলেন “জাতীয়তাবাদ সাধারণত এক মানসিক ঐক্যবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টি, যে
ঐক্যবোধ কোনো জনসমাজকে অন্যান্য জনসমাজ হতে পার্থক্য করে।”
(ঙ) দেশাই (অ জ উবংধর) তাঁর জবপবহঃ ঞৎবহফং রহ ওহফরধহ ঘধঃরড়হধষরংস বইতে বলেছেন
"ঘধঃরড়হধষরংস রং ধ সড়াবসবহঃ ড়ভ াধৎরড়ঁং পষধংংবং ধহফ মৎড়ঁঢ়ং পড়সঢ়ৎরংরহম ধ হধঃরড়হ, ধঃঃবসঢ়ঃ ঃড় ৎবসড়াব ধষষ বপড়সড়সরপ, ঢ়ড়ষরঃরপধষ, ংড়পরধষ ধহফ পঁষঃঁৎধষ ড়নংঃধপষবং যিরপয রসঢ়বফব ঃযব ৎবধষরংধঃরড়হ ড়ভ ঃযবরৎ ধংঢ়রৎধঃরড়হং"
জাতীয়তাবাদের উপরোক্ত সংজ্ঞার আলোকে আমরা বলতে পারি যে, জাতীয়তাবাদ এক প্রকার মানসিক
ঐক্যানুভূতি যা পরস্পর একত্রিত হয়ে বসবাস করার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তবে জাতিসত্তার পরিপূর্ণ
বিকাশ ঘটার প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক। অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি (ভাষা, সাহিত্য, শিল্প) এবং
রাজনৈতিকভাবে মানুষ সামন্ত পরবর্তী অর্থাৎ পুঁজি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির স্তরে প্রবেশের সঙ্গে
জাতীয়তাবোধের তীব্রতা অনুভব করে। ফলে জাতিসত্তা এবং রাষ্ট্র পরিচয়ের তাগিদ এক সঙ্গে যেন
অনুভূত হয়। এ কারণেই জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক মতাদর্শ যার ভিত্তিতে আধুনিক যুগে পদাপর্ণের
সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে দেখা যায়।
জাতীয়তাবাদের উপাদান
জাতীয়তাবাদের বিকাশ একটা দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া। জাতীয়তাবাদ উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে যে সব
বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা হল জাতীয়তাবাদের উপাদান। জাতীয়তাবাদের উপাদানকে
মূলত দুইভাগে ভাগ করা যায়
(১) জাতীয়তাবাদের বাহ্যিক উপাদান ও
(২) ভাবগত উপাদান
(১) জাতীয়তাবাদের বাহ্যিক উপাদান
(ক) ভৌগোলিক সান্নিধ্যঃ একই ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বহুদিন ধরে বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ
বসবাস করতে থাকলে অধিবাসীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তাদেও মধ্যে আদান-প্রদান, লেনদেন
ও ভাবেরএক গভীর একাত্মবোধের সৃষ্টি হয়। একে স্বদেশিকতা বা স্বাদেশীকতাবোধও বলা যেতে
পারে; এইভাবে মাতৃভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ভক্তির সৃষ্টি হয়। আবার একই অঞ্চলে পাশাপাশি
বসবাসের ফলে নানা ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও আদান- প্রদান সহজতর হয়। তার ফলে অধিবাসীদের
মধ্যে ঐক্যবোধ জাগ্রত ও প্রতিষ্ঠিত হয়।
(খ) জাতিগোষ্ঠীগত বা বংশগত ঐক্যঃ কোনো জনসমষ্টি যখন বিশ্বাস করে যে, তাদের শিরা উপশিরায়
একই রক্ত প্রবাহিত এবং তাদের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অভিন্ন তখন তাদের মধ্যে স্বভাবতই অভিন্ন
জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি হয়। অভিন্ন জাতিগত বা বংশগত ঐক্য গভীরভাবে জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি
করে। প্রসঙ্গক্রমে হিটলারের সময়কার জার্মান জাতির জাতীয়তাবোধ এবং আর্যজাতি হিসেবে
তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি উল্লেখযোগ্য। তবে উগ্রজাতীয়বাদ স্বাভাবিক জাতীয়তাবাদেও পরিপন্থী।
কেননা, স্বাভাবিক জাতীয়তাবাদ অন্য জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও স্বাধীনতাকে সম্মান করে, কিন্তু উগ্র
জাতীয়তাবাদ চূড়ান্তভাবে অন্য জাতিসত্তার অধিকার ও তাদের জাতীয়তাবাদকে অবজ্ঞা করে। এর
ফলে বহুজাতিক রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী জাতিগোষ্ঠীর বিরোধ,
সংঘাত শেষ পর্যন্তযুদ্ধ বিগ্রহে রূপ নিতে পারে।
(গ) ভাষাগত ঐক্যঃ জাতীয়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানই হচ্ছে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। একই
ভাষাভাষী জনগণের মধ্যে ভাবের আদন-প্রদান সহজেই হয়। এতে স্বাভাবিক ভাবে একাত্মবোধের


সৃষ্টি হয়। ভাষাগত ঐক্যের ভিত্তিতে তাদের সাহিত্য কর্ম হয় একই ধরনের। সেজন্যই এক
ভাষাভাষীরা খুব সহজেই পরস্পরের একাত্ম হতে পারে। ভাষাগত ঐক্য জাতীয়তাবাদের অতীব
গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অর্থাৎ ভাষাই হল জাতির সাহিত্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ভাষাই ছড়িয়ে
ছিটিয়ে থাকা মধ্যযুগীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখন্ডে বসবাসরত একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে
প্রেরণা যুগিয়েছে, সেতু বন্ধন ঘটিয়েছে।
(ঘ) রাষ্ট্রনৈতিক ঐক্যঃ অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিকাশমান জনগোষ্ঠী আধুনিক যুগে অভিন্ন রাষ্ট্র
পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বোধ লাভ করলে একটি রাষ্ট্রনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় যার মূলে ছিল
জাতীয়তাবাদ। “অ হধঃরড়হধষরঃু রং ধ মৎড়ঁঢ় ড়ভ যিরপয ঃযব সবসনবৎং রিংয ঃড় ষরাব ঁহফবৎ ঃযব
ংধসব ষধংি ধহফ ভড়ৎস ড়ভ ংঃধঃব”
(ঙ) অর্থনৈতিক সমস্বার্থঃ অর্থনৈতিক সমস্বার্থ জনগণকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে জাতীয়তাবোধে
উদ্বুদ্ধ করতে পারে। অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে জনগণ বিপ্লবে সামিল হয়েছে এমন
উদাহরণ জাতীয়তাবাদেও ইতিহাসে অসংখ্য।
খ. জাতীয়তাবোধের ভাবগত উপাদানঃ বস্তুতপক্ষে জাতীয়তাবাদ গঠনের ক্ষেত্রে উল্লেখিত বস্তুগত
উপাদানই জাতিসত্তার মধ্যে মানসিকতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটায়। ফলে কেউ কেউ সেই
মানসিকতাকেই জাতীয়তার ভাবগত উপাদান বলে মনে করেন। তাদের দাবি হচ্ছে জাতীয়তাবাদ
গঠনে ভাবগত উপাদানই প্রধান। ফরাসি অধ্যাপক রেঁনা (জবহধহ) যেমন বলেছেন,“ জাতীয়তাবাদ
সম্পর্কে ধারণা মূলত ভাবগত (ঞযব রফবধ ড়ভ হধঃরড়হধষরঃু রং বংংবহঃরধষষু ংঢ়রৎরঃঁধষ রহ পযধৎধপঃবৎ)”
জনসমাজের মধ্যে মনোগত একাত্মবোধের অস্তিত্ব জাতীয়তাবাদের অপরিহার্য উপাদান। কোনো
জনসমষ্টি যখন বিশ্বাস করে যে, তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অভিন্ন, তারা সুখ-দুঃখ, আনন্দ বেদনা,
উত্থান-পতন, গৌরব-গদ্বানির সমান অংশীদার তখনই সেই জনসমষ্টির মধ্যে জাতীয়তাবোধ দৃঢ় হয়
এবং জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়। কোনো জনসমাজ যখন ভাবগত ঐক্যবোধের ভিত্তিতে একাত্ম হয় এবং
নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা সম্বন্ধে সচেতন হয় তখনই জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয়। সুতরাং জাতীয়তাবোধের
দুটি মূল বৈশিষ্ট্য বর্তমান
(১) নিজেদের মধ্যে গভীর ঐক্যবোধ, এবং
(২) দুনিয়ার অন্যান্য জনসমাজ থেকে স্বতন্ত্রবোধ
রোমের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ধর্মীয় সংঘর্ষ ও ফ্রান্সের সঙ্গে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ -এই দুটি ঘটনা ব্রিটিশদের মনে
তাদের স্বতন্ত্র জাতিত্ব সম্পর্কে ধারণার সৃষ্টি করে। আবার ফ্রান্সের উপর ইংল্যান্ডের কর্তৃত্ব কায়েমের
উদ্যোগ ফরাসিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। ইতালির দার্শনিক মেকিয়াভেলি (ঘ.
গধপযরধাবষষর ) ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালির অধিবাসীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রচার করেন।
মার্টিন লুথার (গধৎঃরহ খঁঃযবৎ) এর নেতৃত্বে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন (জবভড়ৎসধঃরড়হ গড়াবসবহঃ)
জাতীয় রাষ্ট্র ধারণা ও রাজার প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, হল্যান্ড
প্রভৃতি দেশ জাতীয় রাষ্ট্রহিসেবে প্রতিষ্ঠ লাভ করে।
ফরাসি বিপ্লব ও জাতীয়তাবাদ : রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জাতীয়তাবাদ হল জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের চরম
পরিণতি। অর্থাৎ প্রত্যেক জাতীয় জনসমাজের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থার ধারণাই হল জাতীয়তাবাদের
রাজনৈতিক আদর্শ। এই অর্থে পরিপূর্ণরূপে জাতীয়বাদ বিকশিত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে।
পোল্যান্ডের বিভক্তিকরণ (১৭৭২) এর ঘটনা থেকে আধুনিক অর্থে জাতীয়তাবাদের বিকাশের অধ্যায়ের
সূচনা ঘটে। নিরপরাধ এক জনসমাজের অধিকার অপহৃত হয় এবং আন্তর্জাতিক ন্যায় নীতির নিয়ম
অস্বীকৃত হয়। চরম রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার এবং দুর্বল জনসমাজের উপর নির্যাতন ও শোষণ পীড়ন
স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন জনসমাজকে সতর্ক ও সচেতন করে। এই ভাবে ইউরোপে জাতীয়


জনসমাজের অধিকার বিষয়ক মতবাদের উদ্ভব হয়। এ্যাক্টন (খড়ৎফ অপঃড়হ) মন্তব্য করেছেন ঃ “ঞযরং
সড়ংঃ ৎবাড়ষঁঃরড়হধৎু ধপঃ ড়ভ ঃযব ড়ষফ ধনংড়ষঁঃরংস ধধিশবহবফ ঃযব ঃযবড়ৎু ড়ভ হধঃরড়হধষরঃু রহ
ঊঁৎড়ঢ়ব” বার্নস (ইঁৎহং) এর মতানুসারে, আধুনিক অর্থে জাতীয়তাবাদ বলতে যা বোঝায় তা ফরাসি
বিপ্লব (১৯৮৯) এর মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর জাতীয়তাবাদের ধারণা
সুস্পষ্ট রুপ লাভ করে। ফরাসি বিপ্লবের সমসাময়িক দার্শনিকগণ জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা ও
সার্বভৌমত্বের বৈপ্লবিক তত্ত¡ প্রচার করেন। এর ফলে ফরাসিদের মধ্যে স্বদেশ প্রীতি বা জাতীয়তাবোধ
ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের গণতান্ত্রিক ধ্যাণ-ধারণা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ ক্রমশ
ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয়তাবাদীগণ আন্দোলনের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দেশের অধিবাসীদের
মধ্যে স্বতন্ত্র জাতীয় সত্ত¡ার সৃষ্টি হতে থাকে। মাৎসিনি (গধুুরহর) ইতালিতে জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রচার
করে ঐ আলোকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এইভাবে নবজাগরণের যুদ্ধে যে
জাতীয়তাবোধের সৃষ্টি হয় ফরাসি বিপ্লব প্রসূত গণতান্ত্রিক চেতণা এবং বৈপ্লবিক অধিকার ও স্বাধীনতা
বোধের ভিত্তিতে তা পরিণতি লাভ করে।
জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা
জাতীয়তাবাদের সমর্থন সূচক নানা রকম যুক্তি আছে। তবুও বিভিন্ন চিন্তাবিদ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে
সাধারণত নি¤œলিখিত যুক্তিসমূহের অবতারণা করেন।
(১) সভ্যতার সংকট
স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি গভীর অনুরাগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য
ইতিবাচক। কিন্তু তা যখন অন্য জাতিরও তেমন অনুভূতি, অনুরাগের সর্বজনীন অধিকার অস্বীকার করে
তা জাত্যাভিমানে রুপান্তরিত হয়। নিজেদের সকল বিষয়ে উন্নত ধারণা এবং অন্য জাতির সকল
কিছুকে হেয় জ্ঞান করার প্রকাশ জাতির মধ্যে দেখা দিতে পারে। এর ফলে জাতির মধ্যে এক অন্ধ
আবেগের সৃষ্টি হয়। একেই বলে উগ্র জাতীয়তাবাদ। এর ফলেই জাতির মনে নিজের সম্পর্কে
অতিমাত্রায় গর্ববোধ এবং অপর জাতির প্রতি অযথা, যুক্তিহীন ঘৃণা জন্মায় ।
(২) সাম্রাজ্যবাদের আশংকাঃ উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রবণতার তাড়নায় অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী জাতিগুলি
দুর্বল জাতিগুলিকে হেয় জ্ঞান করে পদানত করতে প্রয়াসী হয়। এই রকম জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রগুলি
ভাবতে শুরু করে যে পৃথিবীর অন্যান্য জাতির উপর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব কায়েম করার স্বাভাবিক অধিকার
তাদের আছে। জাতীয়তাবাদ তখন আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং এই শক্তি তখন নতুন নতুন সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কালক্রমে দুর্বল রাষ্ট্রসমূহ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত হয়। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে ইতালির ফ্যাসিবাদ এবং জার্মান নাৎসিবাদ এর জ্বলন্তউদাহরণ।
(৩) বিশ্বশান্তির বিরোধীঃ উগ্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে ক্ষতিকর। এই রকম
জাতীয়তাবাদ সর্বক্ষেত্রে স্বদেশ স্বজাতির মধ্যে উগ্র প্রচারণা ও উন্মাদনা প্রচার করে অন্য দেশ ও জাতির
বিরুদ্ধে যুদ্ধেও মানসিকতা গড়ে তোলে। ন্যায়-অন্যায় যুক্তি ও আলাপ-আলোচনাকে অস্বীকার করা হয়
এবং সর্বপ্রকার বিরোধ মীমাংসার জন্য যুদ্ধের পথ গ্রহণ করা হয়। এই যুক্তিবাদী প্রবণতা বিশ্বশান্তির
ঘোরতর শত্রæ। এ ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তিও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে পরিচালিত
হয়। এটি প্রকৃত জাতীয়বাদ নয়, বরং উগ্র হঠকারী ভাবধারা- যা জাতীয়তাবাদী চেতনার পরিপন্থী।
সারসংক্ষেপ
জাতীয়তাবাদ হল একটি ইতিহাস ঐতিহ্য নির্ভর রাজনৈতিক আদর্শ। কোনো জাতীয় জনসমাজের
মধ্যে বংশ, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ঐতিহ্য প্রভৃতি নানা কারণে গভীর একাত্মবোধের সৃষ্টি হয়। এই
একাত্মবোধের ভিত্তিতে সেই জাতীয় জনসমাজ নিজেদের সমস্বার্থ, সমঐতিহ্য, সমগৌরব ও গদ্বানির


অংশীদার বলে মনে করে। এই একাত্মবোধের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় জাতীয়তাবোধের। এই জনগোষ্ঠী
অন্যান্য জাতীয় জনসমাজ থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অনুভব করে। এর সঙ্গে স্বদেশ প্রেম বা স্বদেশের
প্রতি গভীর অনুরাগ যুক্ত হলে যে মানসিক অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা হল জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক
আদর্শ। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আত্মশাসনের আকাঙক্ষা জাতীয় জনসমাজকে জাতিতে পরিণত
করে। জাতীয়তাবাদের বিকাশের জন্য একাধারে জাতিসমূহের মধ্যে ভৌগোলিক সান্নিধ্য, জাতিগত
ঐক্য, ভাষাগত ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সমস্বার্থ থাকা আবশ্যক। ইউরোপেই প্রথম
জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয় মধ্যযুগের শেষ সময়ে, রেনেসাঁস পর্যায়ে। তবে তা পূর্নতা পায় ফরাসি বিপ্লব
কালে। ফরাসি বিপ্লব উত্তোরকালে বিশেষ করে নেপোলিয়নের যুগে ইউরোপের কিছু কিছু দেশে
জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটে। ইতালি এবং জার্মানি জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ দুটো দেশ যা
উপনিবেশবাদবিরোধী চেতনার জন্ম দেয়, দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যাপক অভ্যুদয় ঘটায় ।
বাংলাদেশ উš§ুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস - ২ পৃষ্ঠা-১০৭
পাঠোত্তর মূল্যায়ন
নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নত্তোর
(১) জাতীয়তাবদের বিকাশ একটি............
ক. ক্ষণস্থায়ী প্রক্রিয়া খ. অস্থায়ী প্রক্রিয়া
গ. তাংক্ষনিক প্রক্রিয়া ঘ.  দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া
(২) সমালোচকদের দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদ.................
ক.  সভ্যতার সংকট খ. অন্যায়ের উৎস
গ. বিশ্বশান্তিবিরোধী ঘ. সবগুলিই
(৩) ইউরোপে জাতীয়তাবাদ বিকাশ শুরু হয় -
ক. ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে খ. ফেব্রæয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে
গ. রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে ঘ. নেপোলিয়নের পতনের মাধ্যমে।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
(১) জাতীয়তাবাদ কি? ব্যাখ্যা করুন।
(২) জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলো ব্যাখ্যা করুন।
(৩) আপনি কীভাবে জাতীয়তাবাদকে মূল্যায়ন করবেন?
(৪) ইউরোপ জাতীয়তাবাদ উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করুন।
রচনামূলক প্রশ্ন
(১) ‘জাতীয়তাবাদের’ বিভিন্ন দিক আলোচনা করুন।
(২) জাতীয়তাবাদের সজ্ঞা দিন। জাতীয়তাবাদের উপাদান আলোচনা করুন।
(৩) জাতীয়তাবাদের কেনো সীমাবদ্ধতা আছে কি? ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশসহ
জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করুন।

FOR MORE CLICK HERE
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মাদার্স পাবলিকেশন্স
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ১ম পর্ব
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস
আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস
মুঘল রাজবংশের ইতিহাস
সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
ভূগোল ও পরিবেশ পরিচিতি
অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষ
পৌরনীতি ও সুশাসন
অর্থনীতি
অনার্স ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত
অনার্স দর্শন পরিচিতি প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]