ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি
ইউরোপীয় শক্তি সমবায়
মেটারনিক ব্যবস্থা


ভূমিকা
ফরাসি বিপ্লব-উত্তর কালে আঠার শতকের শেষের দিকে এবং উনিশ শতকের প্রথম দিকে ফরাসি সম্রাট
নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদী নীতি সমগ্র ইউরোপ গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয়
শক্তিবর্গের সম্মিলিত প্রচেষ্টার নিকট শেষ পর্যন্তনেপোলিয়নের এর বিজয় বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং ১৮১৫ সালে
ওয়াটারলুর যুদ্ধে পরাজিত হলে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এ অবস্থায় ইউরোপে যে বিশৃংখল
পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তা থেকে উত্তরণ এবং শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য বিজয়ী মিত্র শক্তিবর্গ অস্ট্রিয়ার
রাজধানী ভিয়েনায় এক সম্মেলন আহŸান করেন। ইউরোপীয় এ সম্মেলন ভিয়েনা সম্মেলন নামে খ্যাত।
এ সম্মেলনে কেবল পোপ এবং তুরস্ক ছাড়া ইউরোপের সকল দেশের প্রতিনিধি যোগ দেয়। ভিয়েনা
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশসমূহ ইউরোপ পুনর্গঠনে কয়েকটি নীতি গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে এই
সকল নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যামে একটি রক্ষণশীল ইউরোপ গড়ে তোলা হয়। নব জাতীয়তাবাদী চেতনা
বিসর্জন দিয়ে তদস্থলে প্রতিষ্ঠা করা হয় পুরাতন আধিপত্যবাদী মতবাদ এবং কার্যকর করা হয় দুর্বলের
উপর সবলের নিয়ন্ত্রণ। তবে এ কথা সত্য যে, নেপোলিয়নের সময়ে যুদ্ধের যে বিভীষিকা ইউরোপের
মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের ফলে তা দূরীভূত হয়। ইউরোপে
কিছুদিনের জন্যে হলেও স্থিতি ও শান্তিপ্রতিষ্ঠিত হয়। ভিয়েনা সম্মেলনের গৃহীত নীতি সমূহ বাস্তবায়নের
লক্ষ্যে যে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে যাকে ইউরোপের শক্তি সমবায় নামে অভিহিত করা হয়। ইউরোপে
শান্তিপ্রতিষ্ঠার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান এই শক্তি সমবায়ের। তবে অনেকগুলো দেশ নিয়ে শক্তি
সমবায় গড়ে উঠলেও এর মূল চালিকাশক্তি ছিল অস্ট্রিয়ার প্রধান মন্ত্রী মেটারনিক। মেটারনিক নিজের
আদর্শ ও নীতি অনুসারে শক্তি সমবায় পরিচালনা করতেন। ইউরোপের শান্তিপ্রতিষ্ঠায় তাই শক্তি
সমবায় মেটারনিক নীতি নামে খ্যাতি লাভ করে।
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি সমূহ
বিজয়ী মিত্রবর্গের মধ্যে ভিয়েনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবর্গ ইউরোপ পুনর্গঠনের
জন্য ভবিষ্যতে ফ্রান্সের আক্রমণ হতে ইউরোপকে রক্ষার জন্য কয়েকটি নীতি গ্রহণ করেন। যদিও
ভিয়েনা সন্ধির শর্তগুলো বিভিন্ন শক্তির মধ্যে দর কষাকষি ও ক‚টনৈতিক চাপ ও কৌশলের মাধ্যমে শেষ
পর্যন্তসিদ্ধান্তগৃহীত হয়। তথাপি বলা যায় যে প্রধানত তিনটি নীতিকে সামনে রেখে ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ
সন্ধির শর্তগুলো স্থির করেন। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি গুলো
১। ন্যায্য অধিকার নীতি
২। ক্ষতিপূরণ নীতি এবং
৩। শক্তিসাম্য নীতি।

ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি সমূহের প্রয়োগ
১। ন্যায্য অধিকার নীতি
ফরাসি বিপ্লব পরবর্তীকালে বিশেষ করে নেপোলিয়নের সময় ইউরোপে বিশেষ কতগুলো পরিবর্তন
ঘটে। পরিবর্তনগুলো খুব দ্রæততার সঙ্গে এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ঘটনা হয়েছিল বলে ভিয়েনা
সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ মনে করেন। এ কারণে নেপোলিয়নের পরিবর্তনগুলো ন্যায্য অধিকার নীতির নামে
ভিয়েনা সম্মেলনে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে নেপোলিয়নের আবির্ভাবের
পূর্বে ইউরোপে যে সব রাজবংশের শাসন ছিল তা পুনপ্রতিষ্ঠিত করা হয় অর্থাৎ পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
করা হয়। ১৭৯২ সালে ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। কিন্তু ভিয়েনা সন্ধির মাধ্যমে
বুববোঁ রাজবংশকে পুনরায় ফ্রান্সের সিংহাসনে বসানো হয়। এবং নেপোলিয়ন রাজ্য জয়ের মাধ্যমে যে
অবৈধ সীমানা বৃদ্ধি করেছিলেন তা ফিরিয়ে দেয়া হয়। অর্থাং ফ্রান্সকে পুনরায় ১৭৯০ সালের পূর্ব
সীমানায় ফিরিয়ে আনা হয়।
ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য নীতির প্রয়োগের পর সন্ধি কর্তারা ন্যায্য অধিকার নীতির প্রয়োগ দ্বারা ইউরোপ
পুনর্গঠনে মন দেন। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী সন্ধি কর্তারা শক্তি সাম্য ও ক্ষতিপুরণ নীতিকে অগ্রাধিকার দেন
এবং তারপর তারা ন্যায্য অধিকার নীতিকে কাজে পরিণত করেন। ঐতিহাসিক গর্ডন ক্রেইগ ন্যায্য
অধিকার নীতি ব্যাখা করে বলেছেন যে, “প্রাক-নেপোলিয়ন যুগে যে সকল বংশানুক্রমিক রাজা ছিলেন,
তাঁরা যদি নেপোলিয়নের দ্বারা সিংহাসনচ্যুত হয়ে থাকেন তবে তাঁদের ন্যায্য অধিকার নীতি মেনে নিয়ে
তাদের রাজ্য সিংহাসন ফিরিেিয় দেওয়া হবে।” তবে এই নিয়ম সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। কোনো
কোনো ক্ষেত্রে শক্তিসাম্য নীতি ও ক্ষতিপূরণ নীতির কারণে ন্যায্য অধিকার নীতি বিসর্জন দেওয়া হয়।
অনেকের মতে ফরাসি মন্ত্রী ট্যালিরান্ডই ছিলেন ন্যায্য অধিকার নীতির উদ্ভাবক। রক্ষণশীল নীতির
ধারক ও বাহক মেটারনিক এই নীতি সমর্থন করেন। এই নীতি অনুসারে ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশ এবং
হল্যান্ডের অরেঞ্জ রাজবংশকে পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সার্দিনিয়া-পিডমন্ট স্যাভয় রাজবংশকে ফিরিয়ে
দেওয়া হয়। স্পেনের সিংহাসনে বুরবোঁ রাজবংশের আরেক শাখাকে পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়। একই ভাবে
দক্ষিণ ইতালির নেপলস সিসিলিতে বুরবোঁ বংশের অপর শাখাকে স্থাপন করা হয়।
নেপোলিয়নের জার্মানি দখলের পূর্বেজার্মানি ছিল ছোট বড় অনেকগুলি রাজ্যের সমষ্টি। নেপোলিয়ন
সেগুলোর পরিবর্তে মাত্র ৩৯টি রাজ্য গঠন করেন। ন্যায্য অধিকার নীতি মেনে নিলে জার্মানিকে পুনরায়
৩০০টি রাজ্যেই বিভক্ত করতে হত। কিন্তু সন্ধি কর্তারা স্থির করেন যে নেপোলিয়ন কর্তৃক সম্পূর্ন
জার্মানির পুনর্গঠনে জার্মানির এই রদ করার প্রয়োজন নেই। জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার
পরিকল্পনায় অস্ট্রিয়া ও প্রæশিয়ার আপত্তি ছিল। তবে শেষ পর্যন্তজার্মানিকে ৩৯টি রাজ্যে বিভক্ত করে
একটি শিথিল যুক্তরাষ্ট্র গঠন করা হয়। অস্ট্রিয়াকে এর সভাপতি করা হয়। জার্মানির মত ইতালিতেও
নেপোলিয়নের প্রবর্তিত ব্যবস্থা ভেঙ্গে রাজনৈতিক ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়। পোপ স্যাভয় বুরবোঁ
রাজবংশের অধিকার ইতালিতে পুনস্থাপন করা হয়। মোট কথা ভিয়েনা চুক্তিন দরুণ ফরাসি বিপ্লবের
ভাবধারা স্বাতন্ত্র উদার নীতি ও জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে পুরাতনের পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
২। ক্ষতিপূরণ নীতি
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতিসমূহের মধ্যে কঠোর ছিল ক্ষতিপুরণ নীতি। ক্ষতিপূরণ নীতির মাধ্যমে
ফ্রান্সকে চাপের মধ্যে রাখা হয়। ফ্রান্স বিজয়ী শক্তিবর্গকে যুদ্ধের দরুণ ৭০ কোটি ফ্রাঁ ক্ষতিপূরণ দিতে
বাধ্য হয়। নেপোলিয়ন যে সকল মূল্যবান ঐতিহাসিক সামগ্রী বিভিন্ন দেশ থেকে আনেন সেগুলোও
ফেরত দিতে বাধ্য হন। ফ্রান্স যাতে পুনরায় যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য বিজয়ী মিত্র পক্ষের
সেনা দল তিন বছরের জন্য ফরাসি ভূমিতে অবস্থান করবে বলে স্থির করা হয়। ক্ষতিপূরণ নীতি

অনুসারে নেপোলিয়নের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ মিত্র শক্তিবর্দের মধ্যে বন্টন করা হয়। ভূমি বন্টনে রাশিয়া
ও প্রæশিয়ার মধ্যে মত পার্থক্য থাকলেও শেষ পর্যন্তএর শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়।
ভূমিবন্টন নীতি অনুসারে গ্রান্ড ডাচি অব ওয়ারস নামে পোল্যান্ডের প্রায় ৩
/৪ অংশ নিয়ে নেপোলিয়ন যে
অঞ্চল গড়েন তার সবটা রাশিয়া পায়। এছাড়া রাশিয়া আরো পায় ফিনল্যান্ড ও তুরস্কের কাছ থেকে
বেসারাবিয়া। এতে করে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাব বেড়ে যায়। অস্ট্রিয়া বেলজিয়াম ছেড়ে দেয় এবং
ক্ষতিপূরণ হিসাবে ইতালির লম্বার্ডি ও ভেনেসিয়া প্রদেশ পায়। এছাড়া অস্ট্রিয়া টাইরাক, সালজবার্গ ও
ইল্লিরিয়া অঞ্চল পায়। আরো পায় পোল্যান্ডের অংশ যা পূর্বে অস্ট্রিয়ার অধিকারে ছিল।
প্রæশিয়া গোটা সাক্সনি দাবি করলেও ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার তীব্র বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত
প্রাশিয়া সাক্সনির প্রায় অর্ধেক এবং সুইডেনের কাছ থেকে পোমরানিয়া প্রদেশ পায়। এছাড়াও জার্মানির
ওয়েস্টফেলিয়ার কিছু অংশ প্রাশিয়াকে দেওয়া হয়। প্রাশিয়া রাইনল্যান্ডের উপর আধিপত্য পায়। বৃটিশ
প্রধানমন্ত্রী ক্যাসলরিগ চেয়েছিলেন যে, ভবিষ্যতে ফ্রান্স জার্মান আক্রমণ করতে চাইলে তাকে বাধা দেবার
জন্য শক্তিধর দেশ হিসাবে ও প্রæশিয়ার অবস্থান থাকা উচিৎ। ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য উভয় নীতির ফলে
ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত এলাকা পেয়ে প্রাশিয়ার আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়।
ইংল্যান্ড ক্ষতিপূরণ হিসাবে তার সাম্রাজ্যের স্বার্থে ইউরোপের বাইরে অবস্থান নেয়। ই্যংল্যান্ড পায়
শ্রীলংকা বা সিংহল, কেপ কলোনি, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, মালটা ও আইওনীয় দ্বীপপুঞ্জ। ফলে
ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ও নৌঘাঁটি বিস্তৃত হয়। সুইডেন ক্ষতিপূরণ হিসাবে নরওয়ে লাভ করে।
শক্তিসাম্য নীতি
ক্ষতিপূরণ নীতি ছাড়াও ভিয়েনার শান্তিসম্মেলনে শক্তিসাম্য নীতির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই
সম্মেলনের অধিকাংশ সিদ্ধান্তএই নীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। এমনকি বিভিন্ন বিজয়ী শক্তির মধ্যে ভূমি
বন্টনের সময়ও যাতে পরস্পরের মধ্যে শক্তিসাম্য বজায় থাকে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
কাজেই শক্তি চতুষ্টয়ের মধ্যে যাতে সমান ক্ষমতা থাকে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। প্যারিসের
দ্বিতীয় সন্ধির শর্তগুলো শক্তি সাম্যোর জন্য রচনা করা হয়। এজন্য ফ্রান্সকে ১৭৯০ সালের সীমানা মেনে
নিতে বাধ্য করা হয়। ফ্রান্স যাতে ভবিষ্যতে শক্তিশালী হয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোকে আক্রমন
করতে না পারে সেজন্য প্রতিবেশী দেশ সমূহকে শক্তিশালী করা হয়। প্রতিবেশী দেশগুলো শক্তিশালী
হবার ফলে ফ্রান্সের চারপাশে শক্তির প্রাচীর তৈরি হয়। ফ্রান্সের উত্তর পূর্বে লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামকে
হল্যান্ডের সাথে যুক্ত করা হয়। কারণ ভবিষ্যতে ফ্রান্স বেলজিয়াম দখলের চেষ্টা করলে হল্যান্ড যেন তা
ঠেকাতে পারে। ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তেরাইনল্যান্ড ও প্রæশিয়াকে দিয়ে দেওয়া হয় এবং জার্মানি একটি
শিথিল রাষ্ট্র জোট গঠন করে ফ্রান্সকে চেপে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ফ্রান্সের দক্ষিণ পূর্বে সুইজারল্যান্ডকে
ফ্রান্সের তিনটি জেলা/ক্যান্টন প্রদান করা হয়। সুইজারল্যান্ড মোট ২২টি ক্যান্টন সহ একটি স্বাধীন
দেশে পরিণত হয়। ফ্রান্স দক্ষিণ সীমান্তেসার্ভিনিয়ার সঙ্গে জেনোয়াকে সংযুক্ত করা হয়। এভাবে শক্তি
সাম্য নীতি প্রয়োগ করে ফরাসি সীমান্তেশক্তির বেষ্টনি রচনা করা হয়।
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি পর্যালোচনা
ভিয়েনা সম্মেলনের প্রাক্কালে “ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থার পুনর্গঠন ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থার
পুনর্জাগরণ” প্রভৃতি যে সব মুখরোচক বুলি বা আদর্শ প্রচার করা হয়েছিল বাস্তবে তা মোটেও পালন করা
হয়নি। আসলে বিজয়ী শক্তির উদ্দেশ্য ছিল আদর্শের আড়ালে পরাজিত শক্তি সমূহের রাজ্য গ্রাস করা
এবং পুরাতন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

এই নীতির মাধ্যমে পুরাতন রাজবংশগুলির প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে তাদের পুনরায় সিংহাসনে
বসান হয় এবং ফরাসি বিপ্লবজাত ভাবধারার প্রতি অবজ্ঞা জানানো হয়। ফলে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত
হতে গিয়ে ইউরোপ পুনরায় স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের আদর্শগুলি যথা জাতীয়তাবাদ,
উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং প্রগতিশীল ধ্যানধারণা ইউরোপকে একটি পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করেছিল।
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ন্যায্য অধিকার নীতি সেই পরিবর্তনের গতিকে স্তিমিত করে দেয়। ফলে
সম্মেলনের আদর্শগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে জুলাই বিপ্লব ও ফেব্রæয়ারি বিপ্লব ভিয়েনা
চুক্তির কাঠামোই ভেঙ্গে দেয়।
ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে ইউরোপে জাতীয়তাবাদের যে চেতনা জাগ্রত হয়েছিল ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত
নীতিগুলোর মাধ্যমে তা দমন করা হয়। জার্মানি ও ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ হতে না দিয়ে তাদেরকে
রাজনৈতিক ভাগে ভাগ করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে হত্যা করা হয়। জার্মানির উপর চাপিয়ে
দেওয়া হয় অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব। আর ইতালিতে স্থাপন করা হয় পুরানো রাজতন্ত্র। জার্মানিকে বিভক্ত করার
কারণে জার্মান জাতীয়তাবাদীগণ ভিয়েনা চুক্তিকে “প্রকান্ড প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত
করেন। জাতীয়তাবাদকে উপেক্ষা করার ফলে ভিয়েনা চুক্তি স্থায়ী হয়নি। ভিয়েনা চুক্তির মাধ্যমে
ইউরোপের নতুন যে মানচিত্র রচিত হয় অল্প দিনের মধ্যে সেটি ছেড়া কাগজে পরিণত হয়। কেননা
১৮৬১-৬৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইতালি ও ১৮৭১ সালে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
ভিয়েনা সম্মেলনের নেতারা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল । অষ্টাদশ শতাব্দীর মানসিকতা নিয়ে তাঁরা ইউরোপ
পুনর্গঠনে হাত দেন। তাই বিপ্লবের তরঙ্গে ভেসে আসা জাতীয়তাবাদীদের মহিমা বুঝতে সক্ষম হননি।
জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছার চেয়ে সামরিক সুবিধা ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ তাদের কাছে বড় ছিল। তাই
ডেভিড থমসন সঙ্গত মন্তব্য করেছেন “অষ্টাদশ শতকের মানসিকতায় গড়া ভিয়েনা সন্ধি এজন্য উনিশ
শতকের দ্রæতগামী ঐতিহাসিক অগ্রতিতে বাতিল হয়ে যায়”। তবে একথা সত্য যে, ভিয়েনা সম্মেলনে
গৃহীত নীতির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র উপেক্ষিত হলেও এই সন্ধির ফলে যুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ইউরোপে
৪০ বছরের মত সময় ধরে শান্তিও স্থিতি বজায় ছিল।
সারসংক্ষেপ
ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতি সম্পর্কে উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, নেপোলিয়ন
পরবর্তী সময়ে বিক্ষুব্ধ ইউরোপে শান্তিপ্রতিষ্ঠার লক্ষে ন্যায্য অধিকার নীতি, ক্ষতিপূরণ নীতি ও
শক্তিসাম্য নীতি গৃহীত হয়। কিন্তু নীতি প্রণেতাগণ সময়ের চাহিদা যেমন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং
প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ প্রভৃতি উপেক্ষা করে ইউরোপে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতি প্রতিষ্ঠা
করে ইউরোপের আধুনিকায়ণের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেন এবং ইতিহাসের গতিকে পিছনে ফিরিয়ে নেন।
এই সকল নীতি ইউরোপে ক্ষণস্থায়ী শান্তিপ্রতিষ্ঠা করতে পারলেও নবজাগরণ ঠেকাতে পারেনি।
জাতীয়তাবাদের জোরে জার্মানি ও ইতালি তাদের বিভক্ত ভুখন্ডগুলোকে একত্রিত করে তাদের উপর
আধিপত্যবাদের অবসান ঘটাতে পেরেছিল। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতির মাধ্যামে ইউরোপের সর্বত্র
পুরাতন রাজবংশকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সে সঙ্গে ফিরে আসে পুরাতন স্বৈরশাসন, অভিজাত শ্রেণী ও
যাজক স¤প্রদায়। কিন্তু গণতন্ত্র চর্চার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এগুলো দূরীভূত হয়ে যায়। এটা
অবশ্য বলা যায় যে নীতিসমূহ ব্যর্থ হলেও ইউরোপে শান্তিপ্রতিষ্ঠায় অল্প সময়ের জন্য হলেও ভিয়েনা
সন্ধি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১. ডবনংঃবৎ. ঈ. ক ঔযড় ঈড়হমৎবংং ড়ভ ঠরবহহধ, ১৮১৪-১৮১৫, ১৯১৯.
২. ঞযড়সংড়হ, উধারফ ঊঁৎড়ঢ়ব ঝরহপব ঘধঢ়ড়ষবড়হ
৩. চক্রবর্তী, প্রফুল্লকুমার ইউরোপের ইতিহাস, কলকাতা

পাঠোত্তর মূল্যায়ন
ক) সঠিক উত্তরে টিক () চিহ্ন দিন।
১। ওয়াটারলু যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?
ক. ১৮২০ সালে খ. ১৮১৭ সালে
গ.  ১৮১৫ সালে ঘ.১৮২৫ সালে
২। ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজিত সেনাপতির নাম কি?
ক. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট খ. মন্টেগোমারি ওয়াট
গ. ডিউক অব ওয়েলিংটন ঘ. ফিল্ড মার্শাল রোনেল
৩। ভিয়েনা সম্মেলন কোথায অনুষ্ঠিত হয়?
ক. সুইজারল্যান্ড খ. বেলজিয়াম
গ. ইংল্যান্ড ঘ. অস্ট্রিয়া
৪। ভিয়েনা সম্মেলনের পর সুইজারল্যান্ডে কতটি ক্যানটন ছিল?
ক. ২০টি খ. ২২টি
গ. ২৩টি ঘ. ২১ টি
৫। ভিয়েনা চুক্তির পর ফ্রান্সে কোন রাজবংশের শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়?
ক. অরেঞ্জ রাজবংশ খ.  বুরবোঁ রাজবংশ
গ. স্যাভয় রাজবংশ ঘ. টিউডর রাজবংশ
৬। জার্মান শিথিল ফেডারেশন এর উপর কোন দেশের আধিপত্য স্থাপিত হয়?
ক.  অস্ট্রিয়া খ. ফ্রান্স
গ. ইংল্যান্ড ঘ. বেলজিয়াম
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। ভিয়েনা সম্মেলন কেন অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
২। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত শক্তিসাম্য নীতি আলোচনা করুন।
৩। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ক্ষতিপূরণ নীতি আলোচনা করুন।
৪। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত ন্যায্য অধিকার নীতি পর্যালোচনা করুন।
৫। ভিয়েনা চুক্তি কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতিসমূহ আলোচনা করুন। নীতিগুলো কি যুক্তিযুক্ত ছিল?
২। ক্ষতিপুরণ নীতি কেন গৃহীত হয়েছিল? এই নীতির পিছনে কি প্রধান শক্তিসমূহের দুর্বল রাজ্য গ্রাস
করার দুরভিসন্ধি নিহিত ছিল?
৩। সংক্ষেপে ভূমি বন্টন নীতি আলোচনা করুন। এটি কতদুর শক্তিসাম্য নীতির প্রয়োজনীয়তা রক্ষা
করেছিল?
৪। ভিয়েনা সম্মেলনের মাধ্যমে ইউরোপে কি শান্তিপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? আপনার মতামতের সপক্ষে
যুক্তি দিন?
৫। ন্যায্য অধিকার নীতি ও ক্ষতিপূরণ নীতির মাধ্যমে ইউরোপে কি পরিবর্তন হয়েছিল?

FOR MORE CLICK HERE
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস মাদার্স পাবলিকেশন্স
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ১ম পর্ব
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস
আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাস মধ্যযুগ
ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস
মুঘল রাজবংশের ইতিহাস
সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
ভূগোল ও পরিবেশ পরিচিতি
অনার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রথম বর্ষ
পৌরনীতি ও সুশাসন
অর্থনীতি
অনার্স ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত
অনার্স দর্শন পরিচিতি প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]