রবার্ট ক্লাইভ
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে রবার্ট ক্লাইভের স্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ বয়সে মাদ্রাজে (বর্তমান
চেন্নাই) ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকুরী গ্রহণ করে স্বীয় কর্ম প্রচেষ্টার দ্বারা উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। বস্তুত তাঁর অসাধারণ সাহস, সংকল্প ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফলেই এদেশে
বাণিজ্যরত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শেষ পর্যন্ত শাসকের মর্যাদা লাভ করে।
১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে শাসন সংস্কার
বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানির হাতে ক্ষমতা চলে আসে। ধীরে ধীরে কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে বিশৃংখলা ও দুর্নীতি
চরমে উঠে। এ অবস্থায় ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ পুনরায় লর্ড ক্লাইভকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করে দ্বিতীয়বার বাংলায় প্রেরণ করে।
(১৭৬৫-৬৭ খ্রি.)। কাজেই এদেশে এসে তাঁর প্রধান কাজ হলো ‘আভ্যন্তরীণ সংস্কার’ সাধন করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি
কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
প্রথমত: তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের পক্ষে সকল প্রকার উপহার বা উৎকোচ গ্রহণ একেবারে নিষিদ্ধ করেন।
দ্বিতীয়ত: তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের অধিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেন। পাশাপাশি কোম্পানির
ক্ষতিগ্রস্থ অল্প বেতনভোগী কর্মচারীদের লবণ, সুপারী এবং তামাকের একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্য একটি ‘বাণিজ্য সমিতি’
গঠন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে পর্যায় অনুযায়ী ভাগ করে দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়।
একচেটিয়া ব্যবসায়ের ফলে নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণেরও দুঃখ দুর্দশা
বাড়ে। অবশেষে এ বাণিজ্য সমিতির কাজকর্ম পছন্দ না হওয়ায় ‘কোর্ট অব ডাইরেকটরস্’ ক্লাইভকে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ
দেন।
তৃতীয়ত: পলাশীর যুদ্ধের পর হতে সৈন্যদের শান্তির সময়েও দ্বিগুণ ভাতা দেয়া হতো। সেনা-বিভাগের খরচ কমানোর
উদ্দেশ্যে লর্ড ক্লাইভ এ ভাতা বন্ধ করে দিলে সেনাবিদ্রোহ দেখা দেয়। তবে তা তিনি কঠোর হাতে দমন করেন। এতে তিনি
বহুল প্রশংসিত হন।
ইংরেজ ক্ষমতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে
দ্বিতীয় কর্ণাটক যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর উপমহাদেশে ইংরেজ শক্তি
এক বিশেষ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। এ দুর্দিনে ক্লাইভ
আর্কট দখল করে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজের সম্মান রক্ষা করেন। (১৭৫৯
খ্রি.) ইংরেজের এ বিজয় উপমহাদেশে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথ
নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভের ক‚টনীতির জন্যই পলাশীর প্রান্তরে
ইংরেজ পতাকা উত্তোলন সম্ভব হয়েছিল। এ বিজয় ইংরেজ শাসনের
ভিত্তিকে সুনিশ্চিতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে বাংলার এ
অর্থ-সম্পদ ও জনবল চিরশত্রæ ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় যা
বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারে ইংরেজদের সহায়ক হয়েছিল। লর্ড ক্লাইভের দিওয়ানি লাভ
১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে এলাহাবাদ চুক্তি স্বাক্ষর করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানি লাভ করে দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করে। মধ্যবর্তী রাজ্য হিসেবে কোম্পানি ও মারাঠাদের
মধ্যে অযোধ্যা রাজ্যকে প্রতিষ্ঠা করে ক্লাইভ ইংরেজ বিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে
তোলেন। উপরন্তু ভাতা প্রদান করে সম্রাট ও নবাবকে নিয়ন্ত্রণে আনার ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক হতে এককক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে। লর্ড ক্লাইভ উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা পেলেও বাংলায় জালিয়াতি
এবং উৎকোচ গ্রহণের অপরাধে স্বদেশবাসী তাঁর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বহু অভিযোগ উত্থাপন করেন। অবশেষে পার্লামেন্টে
নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ইংল্যান্ডবাসীর ধিক্কারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে স্বগৃহে ক্লাইভ আত্মহত্যা করেন।
কৃতিত্ব
রবার্ট ক্লাইভের চারিত্রিক দোষ থাকা সত্বেও উপমহাদেশে ইংরেজ শক্তির গোড়াপত্তনে তাঁর অবদান অস্বীকার করা যায় না।
কোম্পানির অধীনে সামান্য কেরানী হিসেবে ক্লাইভ এদেশে তাঁর কর্ম জীবন শুরু করলেও নিজ মেধা ও প্রতিভাবলে লর্ড
উপাধীতে ভ‚ষিত হন এবং বাংলার গর্ভনরের পদটি লাভ করেন। তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের
সংকটময় মুহূর্তে আর্কট অভিযান করে তাঁদের রক্ষা করেন। তাঁর ক‚টনৈতিক বুদ্ধির ফলে পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য
ডুবে যায়। ফলে, এদেশে বনিকের মানদÐ রাজদন্ডে পরিণত হয়। দ্বিতীয়বার গভর্নর হিসেবে তিনি সামরিক ও বে-সামরিক
ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করে কোম্পানির আভ্যন্তরীণ অব্যবস্থা ও দুর্নীতি দূর করেন। কিন্তু শাসনকাজে তাঁর দূরদর্শিতা না
থাকার ফলে তাঁরই প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন এদেশের জন্য চরম দুর্ভোগ ও মৃত্যু ডেকে আনে। নবাব ও সম্রাটের সঙ্গে
বন্ধুত্বমূলক মৈত্রী স্থাপন তাঁর ক‚টনৈতিক জ্ঞানের অন্যতম পরিচায়ক।
চরিত্র
রবার্ট ক্লাইভ একজন সাহসী, স্থিরবুদ্ধি, দৃঢ় ও কর্মকুশল সম্পন্ন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তা সত্তে¡ও তিনি অত্যন্ত
অর্থলোলুপ ছিলেন এবং নিজ ও স্বদেশের স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সততাবোধ, বিচারবোধ ও নীতিবোধ ছিল না।
যেমন ঃ নবাবের নিকট থেকে উৎকোচ গ্রহণ, উমিচাঁদের সাথে জাল-সন্ধি স্বাক্ষর, দস্তক ব্যবহারে বাংলার সম্পদ অপহরণ
এবং জনসাধারণের উপর অত্যাচার-উৎপীড়ন প্রভৃতি কাজগুলো তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক এঁকে দিয়েছে। এ প্রসংগে পার্সিভাল
স্পিয়ার বলেন, “অরণ্যের পশু-পক্ষীর চোরাই শিকারীকে অরণ্যের প্রাণী সম্পদের রক্ষক করা হয়।” জনস্টন বলেন,
“উপঢৌকন গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের সামনে স্বয়ং ক্লাইভের সম্মানিত দৃষ্টান্ত আছে।”এ সকল দোষ-ত্রæটি থাকা সত্বেও এ
কথা স্বীকার করতে হয় রবার্ট ক্লাইভই উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন করেছিলেন। তাই উপমহাদেশের
ইতিহাসে রবার্ট ক্লাইভের নাম স্মরণীয় হয়ে আছে।
উপমহাদেশের ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে লর্ড ক্লাইভের নাম অবিস্মরণীয়। কেননা প্রথম
পর্যায়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে কোম্পানিকে রক্ষা করেন; দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি বাংলা জয় করেন। তৃতীয় পর্যায়ে তিনি নবাব ও
সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন এবং ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
ক্লাইভের কৃতিত্বের মূলে তাঁর তেজস্বীতা, সাহসিকতা, ক‚টবুদ্ধিতা, কর্মকুশলতা বিশেষভাবে কাজ করেছিল। কিন্তু তা
সত্বেও তিনি সম্মান পান নি তাঁর নিজ দেশে। কারণ তিনি ছিলেন অতিশয় অর্থলোলুপ, নীতিবোধ বিবর্জিত এক মানুষ।
শাসন কাজেও তাঁর দূরদর্শিতা দেখা যায় না।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) রবার্ট ক্লাইভ খ) কার্টিয়ার গ) ওয়াটসন ঘ) কর্নওয়ালিস
২। কত খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ দ্বিতীয় বার বাংলায় আসেন?
ক) ১৭৬৪ খ) ১৭৬৫ গ) ১৭৬৬ ঘ) ১৭৬৭
৩। “অরণ্যের পশু পক্ষীর চোরাই শিকারীকে অরণ্যের প্রাণী সম্পদের রক্ষক করা হয়।” উক্তিটি করেন কে?
ক) পার্সিভাল স্পিয়ার খ) জনস্টন গ) কর্নওয়ালিস ঘ) হোস্টিংস
উদ্দীপকটি পড়ে ৪ ও ৫ নং প্রশ্নের উত্তর দিন।
পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে শান্তির সময়েও সৈন্যদের দ্বিগুণ ভাতা দেয়া হতো। সেনা বিভাগের খরচ কমানোর জন্য
সৈন্যদের এ ভাতা বন্ধ করে দিলে সেনা বিদ্রোহ দেখা দেয়।
৪। উদ্দীপকের সেনা বিদ্রোহ দমন করেন কে?
ক) কার্টিয়ার খ) মনরো গ) ক্লাইড ঘ) ওয়াটসন
৫। উক্ত নেতার কুট কৌশলের কারণেইÑ
র. পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ পতাকা উত্তোলন সম্ভব হয়
রর. ইংরেজ শাসনের ভিত্তি সুনিশ্চিত হয়
ররর. কোম্পানী বাংলা বিহার উড়িষ্যার দিউয়ানী লাভ করে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) র ও রর খ) র ও ররর গ) রর ও ররর ঘ) র, রর ও ররর
চেন্নাই) ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকুরী গ্রহণ করে স্বীয় কর্ম প্রচেষ্টার দ্বারা উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। বস্তুত তাঁর অসাধারণ সাহস, সংকল্প ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফলেই এদেশে
বাণিজ্যরত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শেষ পর্যন্ত শাসকের মর্যাদা লাভ করে।
১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে শাসন সংস্কার
বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানির হাতে ক্ষমতা চলে আসে। ধীরে ধীরে কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে বিশৃংখলা ও দুর্নীতি
চরমে উঠে। এ অবস্থায় ইংল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ পুনরায় লর্ড ক্লাইভকে পূর্ণ ক্ষমতা দান করে দ্বিতীয়বার বাংলায় প্রেরণ করে।
(১৭৬৫-৬৭ খ্রি.)। কাজেই এদেশে এসে তাঁর প্রধান কাজ হলো ‘আভ্যন্তরীণ সংস্কার’ সাধন করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি
কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
প্রথমত: তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের পক্ষে সকল প্রকার উপহার বা উৎকোচ গ্রহণ একেবারে নিষিদ্ধ করেন।
দ্বিতীয়ত: তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ের অধিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেন। পাশাপাশি কোম্পানির
ক্ষতিগ্রস্থ অল্প বেতনভোগী কর্মচারীদের লবণ, সুপারী এবং তামাকের একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্য একটি ‘বাণিজ্য সমিতি’
গঠন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে পর্যায় অনুযায়ী ভাগ করে দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়।
একচেটিয়া ব্যবসায়ের ফলে নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণেরও দুঃখ দুর্দশা
বাড়ে। অবশেষে এ বাণিজ্য সমিতির কাজকর্ম পছন্দ না হওয়ায় ‘কোর্ট অব ডাইরেকটরস্’ ক্লাইভকে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ
দেন।
তৃতীয়ত: পলাশীর যুদ্ধের পর হতে সৈন্যদের শান্তির সময়েও দ্বিগুণ ভাতা দেয়া হতো। সেনা-বিভাগের খরচ কমানোর
উদ্দেশ্যে লর্ড ক্লাইভ এ ভাতা বন্ধ করে দিলে সেনাবিদ্রোহ দেখা দেয়। তবে তা তিনি কঠোর হাতে দমন করেন। এতে তিনি
বহুল প্রশংসিত হন।
ইংরেজ ক্ষমতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে
দ্বিতীয় কর্ণাটক যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর উপমহাদেশে ইংরেজ শক্তি
এক বিশেষ দুর্যোগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। এ দুর্দিনে ক্লাইভ
আর্কট দখল করে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজের সম্মান রক্ষা করেন। (১৭৫৯
খ্রি.) ইংরেজের এ বিজয় উপমহাদেশে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথ
নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভের ক‚টনীতির জন্যই পলাশীর প্রান্তরে
ইংরেজ পতাকা উত্তোলন সম্ভব হয়েছিল। এ বিজয় ইংরেজ শাসনের
ভিত্তিকে সুনিশ্চিতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে বাংলার এ
অর্থ-সম্পদ ও জনবল চিরশত্রæ ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় যা
বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারে ইংরেজদের সহায়ক হয়েছিল। লর্ড ক্লাইভের দিওয়ানি লাভ
১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে এলাহাবাদ চুক্তি স্বাক্ষর করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানি লাভ করে দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করে। মধ্যবর্তী রাজ্য হিসেবে কোম্পানি ও মারাঠাদের
মধ্যে অযোধ্যা রাজ্যকে প্রতিষ্ঠা করে ক্লাইভ ইংরেজ বিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে
তোলেন। উপরন্তু ভাতা প্রদান করে সম্রাট ও নবাবকে নিয়ন্ত্রণে আনার ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক হতে এককক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে। লর্ড ক্লাইভ উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা পেলেও বাংলায় জালিয়াতি
এবং উৎকোচ গ্রহণের অপরাধে স্বদেশবাসী তাঁর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বহু অভিযোগ উত্থাপন করেন। অবশেষে পার্লামেন্টে
নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ইংল্যান্ডবাসীর ধিক্কারে অতিষ্ঠ হয়ে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে স্বগৃহে ক্লাইভ আত্মহত্যা করেন।
কৃতিত্ব
রবার্ট ক্লাইভের চারিত্রিক দোষ থাকা সত্বেও উপমহাদেশে ইংরেজ শক্তির গোড়াপত্তনে তাঁর অবদান অস্বীকার করা যায় না।
কোম্পানির অধীনে সামান্য কেরানী হিসেবে ক্লাইভ এদেশে তাঁর কর্ম জীবন শুরু করলেও নিজ মেধা ও প্রতিভাবলে লর্ড
উপাধীতে ভ‚ষিত হন এবং বাংলার গর্ভনরের পদটি লাভ করেন। তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের
সংকটময় মুহূর্তে আর্কট অভিযান করে তাঁদের রক্ষা করেন। তাঁর ক‚টনৈতিক বুদ্ধির ফলে পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য
ডুবে যায়। ফলে, এদেশে বনিকের মানদÐ রাজদন্ডে পরিণত হয়। দ্বিতীয়বার গভর্নর হিসেবে তিনি সামরিক ও বে-সামরিক
ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করে কোম্পানির আভ্যন্তরীণ অব্যবস্থা ও দুর্নীতি দূর করেন। কিন্তু শাসনকাজে তাঁর দূরদর্শিতা না
থাকার ফলে তাঁরই প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন এদেশের জন্য চরম দুর্ভোগ ও মৃত্যু ডেকে আনে। নবাব ও সম্রাটের সঙ্গে
বন্ধুত্বমূলক মৈত্রী স্থাপন তাঁর ক‚টনৈতিক জ্ঞানের অন্যতম পরিচায়ক।
চরিত্র
রবার্ট ক্লাইভ একজন সাহসী, স্থিরবুদ্ধি, দৃঢ় ও কর্মকুশল সম্পন্ন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তা সত্তে¡ও তিনি অত্যন্ত
অর্থলোলুপ ছিলেন এবং নিজ ও স্বদেশের স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সততাবোধ, বিচারবোধ ও নীতিবোধ ছিল না।
যেমন ঃ নবাবের নিকট থেকে উৎকোচ গ্রহণ, উমিচাঁদের সাথে জাল-সন্ধি স্বাক্ষর, দস্তক ব্যবহারে বাংলার সম্পদ অপহরণ
এবং জনসাধারণের উপর অত্যাচার-উৎপীড়ন প্রভৃতি কাজগুলো তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক এঁকে দিয়েছে। এ প্রসংগে পার্সিভাল
স্পিয়ার বলেন, “অরণ্যের পশু-পক্ষীর চোরাই শিকারীকে অরণ্যের প্রাণী সম্পদের রক্ষক করা হয়।” জনস্টন বলেন,
“উপঢৌকন গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের সামনে স্বয়ং ক্লাইভের সম্মানিত দৃষ্টান্ত আছে।”এ সকল দোষ-ত্রæটি থাকা সত্বেও এ
কথা স্বীকার করতে হয় রবার্ট ক্লাইভই উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন করেছিলেন। তাই উপমহাদেশের
ইতিহাসে রবার্ট ক্লাইভের নাম স্মরণীয় হয়ে আছে।
উপমহাদেশের ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে লর্ড ক্লাইভের নাম অবিস্মরণীয়। কেননা প্রথম
পর্যায়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে কোম্পানিকে রক্ষা করেন; দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি বাংলা জয় করেন। তৃতীয় পর্যায়ে তিনি নবাব ও
সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন এবং ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
ক্লাইভের কৃতিত্বের মূলে তাঁর তেজস্বীতা, সাহসিকতা, ক‚টবুদ্ধিতা, কর্মকুশলতা বিশেষভাবে কাজ করেছিল। কিন্তু তা
সত্বেও তিনি সম্মান পান নি তাঁর নিজ দেশে। কারণ তিনি ছিলেন অতিশয় অর্থলোলুপ, নীতিবোধ বিবর্জিত এক মানুষ।
শাসন কাজেও তাঁর দূরদর্শিতা দেখা যায় না।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) রবার্ট ক্লাইভ খ) কার্টিয়ার গ) ওয়াটসন ঘ) কর্নওয়ালিস
২। কত খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ দ্বিতীয় বার বাংলায় আসেন?
ক) ১৭৬৪ খ) ১৭৬৫ গ) ১৭৬৬ ঘ) ১৭৬৭
৩। “অরণ্যের পশু পক্ষীর চোরাই শিকারীকে অরণ্যের প্রাণী সম্পদের রক্ষক করা হয়।” উক্তিটি করেন কে?
ক) পার্সিভাল স্পিয়ার খ) জনস্টন গ) কর্নওয়ালিস ঘ) হোস্টিংস
উদ্দীপকটি পড়ে ৪ ও ৫ নং প্রশ্নের উত্তর দিন।
পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে শান্তির সময়েও সৈন্যদের দ্বিগুণ ভাতা দেয়া হতো। সেনা বিভাগের খরচ কমানোর জন্য
সৈন্যদের এ ভাতা বন্ধ করে দিলে সেনা বিদ্রোহ দেখা দেয়।
৪। উদ্দীপকের সেনা বিদ্রোহ দমন করেন কে?
ক) কার্টিয়ার খ) মনরো গ) ক্লাইড ঘ) ওয়াটসন
৫। উক্ত নেতার কুট কৌশলের কারণেইÑ
র. পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ পতাকা উত্তোলন সম্ভব হয়
রর. ইংরেজ শাসনের ভিত্তি সুনিশ্চিত হয়
ররর. কোম্পানী বাংলা বিহার উড়িষ্যার দিউয়ানী লাভ করে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) র ও রর খ) র ও ররর গ) রর ও ররর ঘ) র, রর ও ররর