দ্বৈতশাসন ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর
পূর্ববর্তী পাঠে আপনারা জেনেছেন ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা এলাহাবাদ চুক্তি বলে দিউয়ানি লাভ করে। এ
সময় লর্ড ক্লাইভ বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন এবং এদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক নতুন দ্বৈত শাসন
নীতি প্রর্বতন করেন। দিউয়ানি এবং নিযামত-এই দ্বিবিধ শাসন কার্যের দায়-দায়িত্বের ভাগাভাগিকে দ্বৈত শাসন বলে। এই
ব্যবস্থা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ও দেশ রক্ষার ভার থাকে কোম্পানির হাতে; আর নিযামত বা বিচার ও প্রশাসন বিভাগের
দায়িত্ব থাকে নবাবের উপর। কোম্পানির সরাসরি দিউয়ানির দায়িত্ব গ্রহণে বেশকিছু অসুবিধা ছিল। সরাসরি দিউয়ানি
শাসনের জন্য কোম্পানির যে অর্থ ও লোক বল প্রয়োজন তা তাদের ছিল না। উপরন্তু এদেশীয় ভাষা, আইন কানুন সম্পর্কে
কোম্পানির কর্মচারীদের জ্ঞান না থাকায় রাজস্ব শাসন সরাসরি গ্রহণ করা ছিল কোম্পানির জন্য বিপদজনক। তা ছাড়া
কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব গ্রহণ করলে বাংলায় বাণিজ্যরত অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সাথে সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য।
কেননা, বাণিজ্যিক শুল্ক আদায় ছিল দিউয়ানির অন্তর্গত। অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো দেশীয় সরকারকে শুল্ক দিতে
রাজী থাকলেও ইংরেজদের শুল্ক দিতে রাজী ছিল না। অতএব ক্লাইভ বুদ্ধি করে দিউয়ানির সমস্ত শাসনভার দেন নবাবের
উপর এবং কোম্পানির কাছে রাখেন শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত¡াবধানের ক্ষমতা। কোম্পানি ইচ্ছামত রাজস্ব সংগ্রহ করে সম্রাট ও
নবাবের ভাতা এবং শাসনকার্যের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রেখে উদ্বৃত্ত অর্থ নিজেরা গ্রহণ করতো। এ ব্যবস্থার ফলে
দায়দায়িত্ব ছাড়াই প্রকৃত ক্ষমতা থাকে কোম্পানির হাতে। তাই অন্যভাবে, অতি সহজেই বলা যেতে পারে যে, নবাব
পেলেন ক্ষমতাহীন-দায়-দায়িত্ব আর কোম্পানি লাভ করলো দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
এতকাল ধরে বাংলার নবাবগণ ছিলেন একাধারে নাযিম ও দিউয়ান। নাযিম হিসেবে তাঁরা শাসন, বিচার ও প্রতিরক্ষার কাজ
চালাতেন। আর দিউয়ান হিসেবে তাঁরা রাজস্ব সংগ্রহ করে ব্যয় করতেন। কিন্তু দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় নবাবের ক্ষমতা কমিয়ে
তাঁর উপর অনেক দায়িত্ব দেয়া হয়; অথচ অর্থ ও ক্ষমতা ছাড়া দায়িত্ব অর্থহীন। অধিকন্তু, রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে ফৌজদারী
ও দিউয়ানি বিচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে প্রকৃত কর্তৃত্ব কোম্পানির হাতেই
থেকে যায়। নবাব অনেক দায়িত্ব বহন করে শুধু বৃত্তিভোগী হিসেবে রয়ে গেলেন।
নবাব নাবালক হওয়ার অজুহাতে ক্লাইভ তাঁর অভিভাবক হিসেবে রাজস্ব বিশারদ সৈয়দ মুহম্মদ রেজা খানকে নিযুক্ত করে
নায়েব নাজিম উপাধি দান করেন এবং তাঁর উপর বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেন। অন্যদিকে বিহারের
রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় রাজা সেতাব রায়কে। তাঁরা ছিলেন কোম্পানির প্রতিনিধি দিউয়ান। তাঁদের উপাধি দেয়া
হয় নায়েব দিউয়ান। কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার্থে তাঁরা রাজস্ব আদায় করতেন এবং কোম্পানির আদেশ মেনে চলতেন।
অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁদের উপর নজর রাখার জন্য মুর্শিদাবাদ দরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি অবস্থান
করতেন। ফলে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় জটিলতার সৃষ্টি হয়। কারণ আদায়কৃত রাজস্ব থেকে শাসনকার্যের সকল ব্যায়
মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ রেজা খানকে কোম্পানির হাতে তুলে দিতে হতো; অথচ রাজস্ব বৃদ্ধির হার বাড়ানো বা কমানোর
ক্ষমতা থেকে যেতো কোম্পানির হাতে। ফলে রেজা খানকে এমনি এক উদ্ভুত অবস্থা মোকাবেলা করতে হয় এবং
জনসাধারণও এক অমানুষিক দুঃখ-দুর্দশার শিকারে পরিণত হয়। এরই ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খ্রি.) বাংলায় এক
ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।
ফলাফল
লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত-শাসন ব্যবস্থায় সুফলের পরিবর্তে কুফলই দেখা যায় বেশি। দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার কুফল বাংলার
শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয় এবং বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থায় এক চরম দুর্যোগ শুরু হয়।
প্রথমত: এ ব্যবস্থায় নবাবের দেশ শাসনের দায়িত্ব ছিল বটে; কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষমতা ছিল না। অন্যদিকে, কোম্পানির
ক্ষমতা ছিল বটে; কিন্তু কোনো দায়িত্ব ছিল না। কর্তৃত্বের এরূপ বিভাগ বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে না। ফলে দেশে
আইন শৃঙ্খলায় অবহেলার দরুন ডাকাতরা গ্রাম-বাংলায় লুঠ-পাট চালাতে থাকে। নবাব ও কোম্পানি কোনো পক্ষই এদের
শায়েস্তা করার চেষ্টা করেন নি। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হতে থাকে।
দ্বিতীয়ত: দ্বৈত-শাসনের ফলে বাণিজ্য কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে অবনতি ঘটে। বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলে বহু বিদেশি
ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি এদেশের পণ্য কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু কোম্পানির নতুন বাণিজ্য নীতির ফলে এদেশের ব্যবসা ক্ষেত্রে
ইংরেজদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশীয় ও অন্যান্য বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে মার খান এবং দেশের
রপ্তানি আয় সর্ব নি¤œ পর্যায়ে নেমে যায়। কেননা ব্রিটিশ সরকার ইংলন্ডে কমদামী মুর্শিদাবাদী রেশম আমদানি বন্ধ করে দেয়
ইংল্যান্ডের বেশি দামী রেশম শিল্পকে বাঁচাতে। ফলে এদেশীয় কারিগররা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
তৃতীয়ত: দ্বৈত শাসন-প্রবর্তনের ফলে, বাংলায় ‘আমিলদারী’-প্রথার উদ্ভব হয়। রেজা খান বিভিন্ন জেলার আমিলদের সঙ্গে
চুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ছেড়ে দিতেন। যেহেতু আমিলদের চাকুরীর মেয়াদ ছিল স্বল্প মেয়াদী
সেহেতু তাঁরা যেভাবেই হউক রাজস্ব বেশি করে আদায় করতো। কারণ জেলার যে জমিদার যত বেশি রাজস্ব দিতে পারতো
আমিলরা তাঁদেরকেই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিত। এতে করে জমিদাররা ইজারাদারে পরিণত হয়। ফলে বাংলার
জনজীবন আমিলদারী ব্যবস্থায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
চতুর্থত: কোম্পানির কর্মচারী গোমস্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও অত্যাচারের ফলে দেশের সম্পদ কমতে থাকে এবং
পর্যায়ক্রমে ইংল্যান্ডে পাচার হতে থাকে; অথচ রাজস্বের হার প্রতিবছর বাড়তে থাকে। দেখা যায় যে পূর্ণিয়া জেলার
বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র চার লক্ষ টাকা ছিল, সেখানে তা বেড়ে গিয়ে পঁচিশ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। এমনিভাবে
দিনাজপুর জেলার রাজস্ব বার লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে গিয়ে সত্তর লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। সম্পদের অতিরিক্ত এই রাজস্ব
সংগ্রহ করতে রেজা খানের উপর চাপ আসে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ করতে রেজা খানকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
ফলে অনেক পরগনা হতে রায়তরা আমিলদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অন্য জায়গায় পালিয়ে যায় বা পেশা
পরিবর্তন করে।
পঞ্চমত: দিউয়ানি ও দ্বৈত শাসনের চ‚ড়ান্ত পরিণাম ছিল বাংলায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের’ ধ্বংসলীলা (১৭৭০ খ্রি. ১১৭৬
বঙ্গাব্দ)। একদিকে দ্বৈত শাসনের দায়িত্বহীনতার ফলে বাংলার জনজীবনে অরাজকতা নেমে আসে, অন্যদিকে অবাধ লুণ্ঠন
ও যথেচ্ছভাবে রাজস্ব আদায়ের ফলে গ্রাম্যজীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তদুপরি পরপর দু’বছর অনাবৃষ্টি ও খরার ফলে ১১৭৬
বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এক প্রচÐ দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেয়। টাকায় একমণ হতে চাউলের মূল্য বাড়তে
বাড়তে টাকায় তিন সেরে এসে দাঁড়ালো। খোলাবাজারের খাদ্যশস্য বেশি লাভের আশায় কোম্পানির কর্মচারীরা মজুদ করা
শুরু করে। ফলে খাদ্যের অভাবে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। দলে দলে লোক খাদ্যের আশায়
কলকাতা, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসে। এই সময়েও খাজনা মওকুফ করা হয় নি।
ইংল্যান্ডের কৃষ্ণ মড়কের মতো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল ভয়ঙ্কর সর্বনাশা। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হয়। এই দুর্ভিক্ষে
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলো ছিল নদীয়া, রাজশাহী, বীরভ‚ম, বর্ধমান, যশোহর, মালদহ, পূর্ণিয়া ও চব্বিশ
পরগণা। বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে বিশেষ ফসলহানি না হওয়ায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ তেমন একটা
ছিল না। তাছাড়া ‘নাজাই’ প্রথার প্রকোপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কৃষকেরা ভিটে মাটি ছেড়ে পালায়। ‘নাজাই’
প্রথার অর্থ ছিল, কোনো একজন রাজস্ব বাকী ফেললে সেই গ্রামের অন্য কৃষকদের সেই রাজস্ব দিতে হতো। মন্বন্তরের ফলে
বহু কৃষক মারা পড়ায় তাদের বকেয়া রাজস্বের দায়িত্ব জীবিত কৃষকদের উপর বর্তায়। এই দায়িত্ব বইতে না পেরে বহু
কৃষক জমির স্বত্ব ছেড়ে পাইকে পরিণত হয়। সামগ্রিকভাবে কৃষির অবনতি ও অনাবৃষ্টির ফলে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ
১১৭৬ বঙ্গাব্দে দেশে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের চিহ্ন বাংলায় প্রায়
বিশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।
দুর্ভিক্ষের এক পরোক্ষ ফল দিউয়ানি শাসনের অবসান ঘটে। কোম্পানির রাজস্বের আয়-কমে যায়। বাণিজ্যেরও মন্দা দেখা
দেয়। তাই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার জন্য ও বাংলার কৃষি শিল্পকে রক্ষার জন্য বিলাতের পরিচালক সভা দ্বৈত শাসন লোপ
করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ওয়ারেন হেস্টিংসকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, এখন থেকে কোম্পানি যেন বাংলার রাজস্ব ও শাসনের
প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ক্লাইভের এই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় একটি ভাল দিক ছিল এই যে, এটা মোগল শাসন ব্যবস্থাকে অটটু রাখে। প্রথমে
কোম্পানির কর্মচারীরা রাজস্ব ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে নি। অন্তত ক্লাইভ যতদিন কোলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামের
গভর্নর ছিলেন ততদিন রেজা খান কৃতিত্বের সাথে মুগলী প্রথায় শাসনকার্য পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৭৬৭
খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে গেলে তাঁর দ্বৈত ব্যবস্থায় ফাটল ধরে।
পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর ইংরেজ বেনিয়ারা এদেশে আধিপত্য বিস্তারের যে প্রয়াস শুরু করেছিল, তাদের দিউয়ানি ও
দ্বৈত-শাসন লাভের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা লাভ করে। লর্ড ক্লাইভ এদেশে এক অভিনব শাসন ব্যবস্থা চালু করেন যার মূল
উদ্দেশ্যই ছিল কোম্পানিকে শক্তিশালী করে সম্রাট ও নবাবকে ক্ষমতাহীন করে তোলা। এতে দিউয়ানি ও দেশরক্ষার
ব্যবস্থা থাকে কোম্পানির হাতে এবং বিচার ও শাসনভার থাকে নবাবের হাতে। এরই নাম দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা। এ
ব্যবস্থায় কোম্পানি পেলো দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর নবাব পেলো ক্ষমতাহীন দায়িত্ব।
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা এদেশের জন্য কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বয়ে এনেছে বেশি। ক্ষমতা পেয়েই কোম্পানির কর্মচারীরা
দেশের মানুষের উপর রাজস্বের জন্য নানাভাবে অত্যাচার ও উৎপীড়ন করতে থাকে। কিন্তু নবাবের হাতে কোনো ক্ষমতা
না থাকায় এর বিচার সম্ভব হয় নি। ফলে দেশের ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পের দারুন ক্ষতি হয়। সামগ্রিকভাবে কৃষির
অবনতি, উপরন্তু অনাবৃষ্টির ফলে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬ সনে) দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা
ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। অবশেষে এর কুফলের প্রেক্ষিতে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। কত খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু হয়?
ক) ১৭৫৭ খ) ১৭৬৫ গ) ১৭৬৭ ঘ) ১৭৭০
২। বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয় কাকে?
ক) রেজা খাঁন খ) সেতাব রায় গ) নজমুদ্দৌলা ঘ) রামনারায়ণ
৩। কত খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়?
ক) ১৭৭০ খ) ১৭৭১ গ) ১৭৭২ ঘ) ১৭৭৩
৪। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলায় কত লোক মারা যায়?
ক) এক ষষ্ঠাংশ খ) এক পঞ্চমাংশ গ) এক চতুর্থাংশ ঘ) এক তৃতীয়াংশ
৫। কত খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে যান।
ক) ১৭৭৫ খ) ১৭৭৬ গ) ১৭৭৭ ঘ) ১৭৭৮
সৃজনশীল প্রশ্ন
জুলির নানা ব্রিটিশদের রাজকর্মচারী ছিলেন। মায়ের কাছে জুলি ব্রিটিশ শাসনের গল্প শুনছিল। মা বললেনÑ তখন বাংলা
১১৭৬ সাল। লর্ড ক্লাইভের দ্বৈত শাসনে মানুষ জর্জরিত। কোম্পানির হাতে দায়িত্বহীন ক্ষমতা। রাজস্বের পরিমাণ অনেক
বাড়িয়ে দেয়া হলো। উপরিউক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরপর দুই বছর মাঠে কোনো ফসল ফলে নি। না খেয়ে মারা
যায় বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ। যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরকে পরিশোধ করতে হলো মৃত মানুষের খাজনা। ফলে উজাড়
হয়ে যায় গ্রাম-বাংলার জনপদ। মায়ের চোখ-ঝাপসা হয়ে আসে। জুলি মাকে থামিয়ে দেয়।
ক. কত খ্রিস্টাব্দে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হয়? ১
খ. নাজাই প্রথা কী? ২
গ. উদ্দীপকের জুলির মায়ের গল্পের সাথে পাঠ্য পুস্তকের সে দুর্ভিক্ষের সাদৃশ্য আছে তা বর্ণনা করুন। ৩
ঘ. “দ্বৈত শাসন বাংলার অর্থনীতির মেরুদÐ ভেঙ্গে দিয়েছিল”Ñ বিশ্লেষণ করুন। ৪
সময় লর্ড ক্লাইভ বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন এবং এদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক নতুন দ্বৈত শাসন
নীতি প্রর্বতন করেন। দিউয়ানি এবং নিযামত-এই দ্বিবিধ শাসন কার্যের দায়-দায়িত্বের ভাগাভাগিকে দ্বৈত শাসন বলে। এই
ব্যবস্থা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ও দেশ রক্ষার ভার থাকে কোম্পানির হাতে; আর নিযামত বা বিচার ও প্রশাসন বিভাগের
দায়িত্ব থাকে নবাবের উপর। কোম্পানির সরাসরি দিউয়ানির দায়িত্ব গ্রহণে বেশকিছু অসুবিধা ছিল। সরাসরি দিউয়ানি
শাসনের জন্য কোম্পানির যে অর্থ ও লোক বল প্রয়োজন তা তাদের ছিল না। উপরন্তু এদেশীয় ভাষা, আইন কানুন সম্পর্কে
কোম্পানির কর্মচারীদের জ্ঞান না থাকায় রাজস্ব শাসন সরাসরি গ্রহণ করা ছিল কোম্পানির জন্য বিপদজনক। তা ছাড়া
কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব গ্রহণ করলে বাংলায় বাণিজ্যরত অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সাথে সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য।
কেননা, বাণিজ্যিক শুল্ক আদায় ছিল দিউয়ানির অন্তর্গত। অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো দেশীয় সরকারকে শুল্ক দিতে
রাজী থাকলেও ইংরেজদের শুল্ক দিতে রাজী ছিল না। অতএব ক্লাইভ বুদ্ধি করে দিউয়ানির সমস্ত শাসনভার দেন নবাবের
উপর এবং কোম্পানির কাছে রাখেন শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত¡াবধানের ক্ষমতা। কোম্পানি ইচ্ছামত রাজস্ব সংগ্রহ করে সম্রাট ও
নবাবের ভাতা এবং শাসনকার্যের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রেখে উদ্বৃত্ত অর্থ নিজেরা গ্রহণ করতো। এ ব্যবস্থার ফলে
দায়দায়িত্ব ছাড়াই প্রকৃত ক্ষমতা থাকে কোম্পানির হাতে। তাই অন্যভাবে, অতি সহজেই বলা যেতে পারে যে, নবাব
পেলেন ক্ষমতাহীন-দায়-দায়িত্ব আর কোম্পানি লাভ করলো দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
এতকাল ধরে বাংলার নবাবগণ ছিলেন একাধারে নাযিম ও দিউয়ান। নাযিম হিসেবে তাঁরা শাসন, বিচার ও প্রতিরক্ষার কাজ
চালাতেন। আর দিউয়ান হিসেবে তাঁরা রাজস্ব সংগ্রহ করে ব্যয় করতেন। কিন্তু দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় নবাবের ক্ষমতা কমিয়ে
তাঁর উপর অনেক দায়িত্ব দেয়া হয়; অথচ অর্থ ও ক্ষমতা ছাড়া দায়িত্ব অর্থহীন। অধিকন্তু, রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে ফৌজদারী
ও দিউয়ানি বিচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে প্রকৃত কর্তৃত্ব কোম্পানির হাতেই
থেকে যায়। নবাব অনেক দায়িত্ব বহন করে শুধু বৃত্তিভোগী হিসেবে রয়ে গেলেন।
নবাব নাবালক হওয়ার অজুহাতে ক্লাইভ তাঁর অভিভাবক হিসেবে রাজস্ব বিশারদ সৈয়দ মুহম্মদ রেজা খানকে নিযুক্ত করে
নায়েব নাজিম উপাধি দান করেন এবং তাঁর উপর বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেন। অন্যদিকে বিহারের
রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় রাজা সেতাব রায়কে। তাঁরা ছিলেন কোম্পানির প্রতিনিধি দিউয়ান। তাঁদের উপাধি দেয়া
হয় নায়েব দিউয়ান। কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার্থে তাঁরা রাজস্ব আদায় করতেন এবং কোম্পানির আদেশ মেনে চলতেন।
অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁদের উপর নজর রাখার জন্য মুর্শিদাবাদ দরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি অবস্থান
করতেন। ফলে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় জটিলতার সৃষ্টি হয়। কারণ আদায়কৃত রাজস্ব থেকে শাসনকার্যের সকল ব্যায়
মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ রেজা খানকে কোম্পানির হাতে তুলে দিতে হতো; অথচ রাজস্ব বৃদ্ধির হার বাড়ানো বা কমানোর
ক্ষমতা থেকে যেতো কোম্পানির হাতে। ফলে রেজা খানকে এমনি এক উদ্ভুত অবস্থা মোকাবেলা করতে হয় এবং
জনসাধারণও এক অমানুষিক দুঃখ-দুর্দশার শিকারে পরিণত হয়। এরই ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খ্রি.) বাংলায় এক
ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।
ফলাফল
লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত-শাসন ব্যবস্থায় সুফলের পরিবর্তে কুফলই দেখা যায় বেশি। দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার কুফল বাংলার
শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয় এবং বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থায় এক চরম দুর্যোগ শুরু হয়।
প্রথমত: এ ব্যবস্থায় নবাবের দেশ শাসনের দায়িত্ব ছিল বটে; কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষমতা ছিল না। অন্যদিকে, কোম্পানির
ক্ষমতা ছিল বটে; কিন্তু কোনো দায়িত্ব ছিল না। কর্তৃত্বের এরূপ বিভাগ বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে না। ফলে দেশে
আইন শৃঙ্খলায় অবহেলার দরুন ডাকাতরা গ্রাম-বাংলায় লুঠ-পাট চালাতে থাকে। নবাব ও কোম্পানি কোনো পক্ষই এদের
শায়েস্তা করার চেষ্টা করেন নি। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হতে থাকে।
দ্বিতীয়ত: দ্বৈত-শাসনের ফলে বাণিজ্য কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে অবনতি ঘটে। বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলে বহু বিদেশি
ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি এদেশের পণ্য কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু কোম্পানির নতুন বাণিজ্য নীতির ফলে এদেশের ব্যবসা ক্ষেত্রে
ইংরেজদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশীয় ও অন্যান্য বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে মার খান এবং দেশের
রপ্তানি আয় সর্ব নি¤œ পর্যায়ে নেমে যায়। কেননা ব্রিটিশ সরকার ইংলন্ডে কমদামী মুর্শিদাবাদী রেশম আমদানি বন্ধ করে দেয়
ইংল্যান্ডের বেশি দামী রেশম শিল্পকে বাঁচাতে। ফলে এদেশীয় কারিগররা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
তৃতীয়ত: দ্বৈত শাসন-প্রবর্তনের ফলে, বাংলায় ‘আমিলদারী’-প্রথার উদ্ভব হয়। রেজা খান বিভিন্ন জেলার আমিলদের সঙ্গে
চুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ছেড়ে দিতেন। যেহেতু আমিলদের চাকুরীর মেয়াদ ছিল স্বল্প মেয়াদী
সেহেতু তাঁরা যেভাবেই হউক রাজস্ব বেশি করে আদায় করতো। কারণ জেলার যে জমিদার যত বেশি রাজস্ব দিতে পারতো
আমিলরা তাঁদেরকেই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিত। এতে করে জমিদাররা ইজারাদারে পরিণত হয়। ফলে বাংলার
জনজীবন আমিলদারী ব্যবস্থায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
চতুর্থত: কোম্পানির কর্মচারী গোমস্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও অত্যাচারের ফলে দেশের সম্পদ কমতে থাকে এবং
পর্যায়ক্রমে ইংল্যান্ডে পাচার হতে থাকে; অথচ রাজস্বের হার প্রতিবছর বাড়তে থাকে। দেখা যায় যে পূর্ণিয়া জেলার
বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র চার লক্ষ টাকা ছিল, সেখানে তা বেড়ে গিয়ে পঁচিশ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। এমনিভাবে
দিনাজপুর জেলার রাজস্ব বার লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে গিয়ে সত্তর লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। সম্পদের অতিরিক্ত এই রাজস্ব
সংগ্রহ করতে রেজা খানের উপর চাপ আসে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ করতে রেজা খানকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
ফলে অনেক পরগনা হতে রায়তরা আমিলদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অন্য জায়গায় পালিয়ে যায় বা পেশা
পরিবর্তন করে।
পঞ্চমত: দিউয়ানি ও দ্বৈত শাসনের চ‚ড়ান্ত পরিণাম ছিল বাংলায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের’ ধ্বংসলীলা (১৭৭০ খ্রি. ১১৭৬
বঙ্গাব্দ)। একদিকে দ্বৈত শাসনের দায়িত্বহীনতার ফলে বাংলার জনজীবনে অরাজকতা নেমে আসে, অন্যদিকে অবাধ লুণ্ঠন
ও যথেচ্ছভাবে রাজস্ব আদায়ের ফলে গ্রাম্যজীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তদুপরি পরপর দু’বছর অনাবৃষ্টি ও খরার ফলে ১১৭৬
বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এক প্রচÐ দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেয়। টাকায় একমণ হতে চাউলের মূল্য বাড়তে
বাড়তে টাকায় তিন সেরে এসে দাঁড়ালো। খোলাবাজারের খাদ্যশস্য বেশি লাভের আশায় কোম্পানির কর্মচারীরা মজুদ করা
শুরু করে। ফলে খাদ্যের অভাবে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। দলে দলে লোক খাদ্যের আশায়
কলকাতা, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসে। এই সময়েও খাজনা মওকুফ করা হয় নি।
ইংল্যান্ডের কৃষ্ণ মড়কের মতো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল ভয়ঙ্কর সর্বনাশা। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হয়। এই দুর্ভিক্ষে
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলো ছিল নদীয়া, রাজশাহী, বীরভ‚ম, বর্ধমান, যশোহর, মালদহ, পূর্ণিয়া ও চব্বিশ
পরগণা। বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে বিশেষ ফসলহানি না হওয়ায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ তেমন একটা
ছিল না। তাছাড়া ‘নাজাই’ প্রথার প্রকোপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কৃষকেরা ভিটে মাটি ছেড়ে পালায়। ‘নাজাই’
প্রথার অর্থ ছিল, কোনো একজন রাজস্ব বাকী ফেললে সেই গ্রামের অন্য কৃষকদের সেই রাজস্ব দিতে হতো। মন্বন্তরের ফলে
বহু কৃষক মারা পড়ায় তাদের বকেয়া রাজস্বের দায়িত্ব জীবিত কৃষকদের উপর বর্তায়। এই দায়িত্ব বইতে না পেরে বহু
কৃষক জমির স্বত্ব ছেড়ে পাইকে পরিণত হয়। সামগ্রিকভাবে কৃষির অবনতি ও অনাবৃষ্টির ফলে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ
১১৭৬ বঙ্গাব্দে দেশে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের চিহ্ন বাংলায় প্রায়
বিশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।
দুর্ভিক্ষের এক পরোক্ষ ফল দিউয়ানি শাসনের অবসান ঘটে। কোম্পানির রাজস্বের আয়-কমে যায়। বাণিজ্যেরও মন্দা দেখা
দেয়। তাই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার জন্য ও বাংলার কৃষি শিল্পকে রক্ষার জন্য বিলাতের পরিচালক সভা দ্বৈত শাসন লোপ
করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ওয়ারেন হেস্টিংসকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, এখন থেকে কোম্পানি যেন বাংলার রাজস্ব ও শাসনের
প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ক্লাইভের এই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় একটি ভাল দিক ছিল এই যে, এটা মোগল শাসন ব্যবস্থাকে অটটু রাখে। প্রথমে
কোম্পানির কর্মচারীরা রাজস্ব ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে নি। অন্তত ক্লাইভ যতদিন কোলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামের
গভর্নর ছিলেন ততদিন রেজা খান কৃতিত্বের সাথে মুগলী প্রথায় শাসনকার্য পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৭৬৭
খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে গেলে তাঁর দ্বৈত ব্যবস্থায় ফাটল ধরে।
পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর ইংরেজ বেনিয়ারা এদেশে আধিপত্য বিস্তারের যে প্রয়াস শুরু করেছিল, তাদের দিউয়ানি ও
দ্বৈত-শাসন লাভের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা লাভ করে। লর্ড ক্লাইভ এদেশে এক অভিনব শাসন ব্যবস্থা চালু করেন যার মূল
উদ্দেশ্যই ছিল কোম্পানিকে শক্তিশালী করে সম্রাট ও নবাবকে ক্ষমতাহীন করে তোলা। এতে দিউয়ানি ও দেশরক্ষার
ব্যবস্থা থাকে কোম্পানির হাতে এবং বিচার ও শাসনভার থাকে নবাবের হাতে। এরই নাম দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা। এ
ব্যবস্থায় কোম্পানি পেলো দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর নবাব পেলো ক্ষমতাহীন দায়িত্ব।
দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা এদেশের জন্য কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বয়ে এনেছে বেশি। ক্ষমতা পেয়েই কোম্পানির কর্মচারীরা
দেশের মানুষের উপর রাজস্বের জন্য নানাভাবে অত্যাচার ও উৎপীড়ন করতে থাকে। কিন্তু নবাবের হাতে কোনো ক্ষমতা
না থাকায় এর বিচার সম্ভব হয় নি। ফলে দেশের ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পের দারুন ক্ষতি হয়। সামগ্রিকভাবে কৃষির
অবনতি, উপরন্তু অনাবৃষ্টির ফলে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১১৭৬ সনে) দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা
ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। অবশেষে এর কুফলের প্রেক্ষিতে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। কত খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু হয়?
ক) ১৭৫৭ খ) ১৭৬৫ গ) ১৭৬৭ ঘ) ১৭৭০
২। বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয় কাকে?
ক) রেজা খাঁন খ) সেতাব রায় গ) নজমুদ্দৌলা ঘ) রামনারায়ণ
৩। কত খ্রিস্টাব্দে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়?
ক) ১৭৭০ খ) ১৭৭১ গ) ১৭৭২ ঘ) ১৭৭৩
৪। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলায় কত লোক মারা যায়?
ক) এক ষষ্ঠাংশ খ) এক পঞ্চমাংশ গ) এক চতুর্থাংশ ঘ) এক তৃতীয়াংশ
৫। কত খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে যান।
ক) ১৭৭৫ খ) ১৭৭৬ গ) ১৭৭৭ ঘ) ১৭৭৮
সৃজনশীল প্রশ্ন
জুলির নানা ব্রিটিশদের রাজকর্মচারী ছিলেন। মায়ের কাছে জুলি ব্রিটিশ শাসনের গল্প শুনছিল। মা বললেনÑ তখন বাংলা
১১৭৬ সাল। লর্ড ক্লাইভের দ্বৈত শাসনে মানুষ জর্জরিত। কোম্পানির হাতে দায়িত্বহীন ক্ষমতা। রাজস্বের পরিমাণ অনেক
বাড়িয়ে দেয়া হলো। উপরিউক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরপর দুই বছর মাঠে কোনো ফসল ফলে নি। না খেয়ে মারা
যায় বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ। যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরকে পরিশোধ করতে হলো মৃত মানুষের খাজনা। ফলে উজাড়
হয়ে যায় গ্রাম-বাংলার জনপদ। মায়ের চোখ-ঝাপসা হয়ে আসে। জুলি মাকে থামিয়ে দেয়।
ক. কত খ্রিস্টাব্দে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হয়? ১
খ. নাজাই প্রথা কী? ২
গ. উদ্দীপকের জুলির মায়ের গল্পের সাথে পাঠ্য পুস্তকের সে দুর্ভিক্ষের সাদৃশ্য আছে তা বর্ণনা করুন। ৩
ঘ. “দ্বৈত শাসন বাংলার অর্থনীতির মেরুদÐ ভেঙ্গে দিয়েছিল”Ñ বিশ্লেষণ করুন। ৪