স্যার উইলিয়াম কেরী, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ এবং সংবাদপত্র প্রকাশে কেরীর অবদান

সতের শতক থেকেই বাংলায় খ্রিস্টান মিশনারিরা সীমিতভাবে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে
মিশনারিদের তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে উইলিয়াম কেরীর নেতৃত্বে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি
সোসাইটির আগমনের মধ্যদিয়ে প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ প্রচারিত হতে থাকে।
উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪ খ্রি.) ছিলেন একজন ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি। তাঁকে আধুনিক যুগের খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের জনক
(ভধঃযবৎ ড়ভ সড়ফবৎহ সরংংরড়হং) বলা হয়। তিনি ছিলেন ডেনমার্কের অধিবাসী। জসুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড নামের
দুই বন্ধুকে নিয়ে উইলিয়াম কেরী ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে আসেন। তিনি হুগলি জেলার সিরামপুরে একটি মিশন প্রতিষ্ঠা
করে ধর্মপ্রচারের যাত্রা শুরু করেছিলেন। সিরামপুর মিশন কালক্রমে খ্রিস্টধর্ম বিকাশ ও নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক
কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই মিশনের উদ্যোগে উইলিয়াম কেরীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়
স্কুল। এর কারিকুলামে যুক্ত করা হয়েছিল আধুনিক বিজ্ঞান, ভূগোল এবং ইতিহাস। সিরামপুর মিশনের উদ্যোগে স্কুলগুলোর
জন্য বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। পুস্তক মুদ্রণের জন্য এই মিশনে স্থাপন করা হয়
ছাপাখানা। কেরী জার্মানি থেকে মুদ্রণযন্ত্র ক্রয় করে এনেছিলেন। উইলিয়াম কেরী ও তাঁর বন্ধুরা ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা
টেক্সটবুক সোসাইটি স্থাপন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য এখান থেকে পুস্তক ছাপা হতো। উইলিয়াম কেরীর
নেতৃত্বে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সিরামপুরে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে খ্রিস্টান ও অ-খ্রিস্টান সকল শিক্ষার্থীকেই শিল্পকলা,
বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত¡ পড়ানো হতো। এই মিশন পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডারিক ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে একটি
চার্টার অনুমোদন করেন।
পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ছাড়াও সিরামপুর মিশন বাংলা ভাষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এরমধ্যে ছিল অভিধান
প্রণয়ন ও ব্যকরণ গ্রন্থ রচনা। এছাড়াও উইলিয়াম কেরী বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন। এ ব্যাপারে
মিশনারীদের সাহায্য করেছিলেন রামরাম বসু। তিনি নিজে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না করলেও মিশনারীদের নানাভাবে সহায়তা
করেন। বাইবেল অনুবাদে তাঁর প্রত্যক্ষ সহায়তা ছিল। রামরাম বসু খ্রিস্টধর্মসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। এই মিশন থেকে
‘দিগদর্শন’ ও ‘সমাচার দর্পণ’ নামে দুটি সাময়িকীও প্রকাশ করা হয়। এভাবেই এদেশে বাংলা সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়।
‘দি ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি ইংরেজি পত্রিকাও প্রকাশিত হয় সিরামপুর মিশন থেকে। এটিই ছিল ‘দি স্টেটসম্যান’
পত্রিকার আদি রূপ। উদ্ভিদচর্চা এবং কৃষি উন্নয়নেও উইলিয়াম কেরী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। উদ্ভিদ উন্নয়ন ও
গবেষণার জন্য তিনি হাওড়ার কাছে শিবপুরে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন বা উাদ্ভিদ উদ্যান তৈরি করেছিলেন। তিনি
পৃথিবীর নানা দেশ থেকে উদ্ভিদ বীজ এনে এখানে বপন করেন। কেরীর এই প্রচেষ্টার ফল ছিল উত্তরকালে প্রতিষ্ঠিত ‘এগ্রিহর্টিকালচার সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’। হিন্দু ধর্মের ভেতর কোনো কোনো ক্ষেত্রে অমানবিক আচরণ ছিল। যেমন সতীদাহ
প্রথা বা কালাপানি (সমুদ্র) পাড়ি দেয়ায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এসবের বিরুদ্ধে কেরী জনমত তৈরি করতে এবং সরকারের
দৃষ্টি আকর্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
উনিশ শতককে বাংলায় নানা ধরনের সংস্কার চলছিল। এই সকল সংস্কারের মধ্যদিয়েই বাংলার মানুষ শিক্ষা ও চিন্তায়
নিজেদের যুক্ত করে। আর এই সংস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল খ্রিস্টান মিশনারি স্যার উইলিয়াম কেরীর মাধ্যমে। তিনি
তাঁর সিরামপুর মিশনকে ঘিরে আধুনিক শিক্ষার যাত্রা শুরু করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় গঠিত হয় স্কুল টেক্সট বুক বোর্ড,
ছাপাখানা প্রভৃতি। তাঁর মিশন থেকে প্রকাশিত হয় সংবাদপত্র। তিনি কৃষি উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছিলেন। তাছাড়া হিন্দু
সমাজে প্রচলিত অমানবিক সতিদাহ প্রথা বন্ধের জন্যও তিনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন।
১। উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪ খ্রি.) কে ছিলেন?
ক) ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি খ) যোদ্ধা গ) খেলোয়াড় ঘ) কবি
২। ‘দি ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ নামে ইংরেজি পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় কোথা থেকে?
ক) সিরামপুর মিশন খ) ভাগলপুর মিশন গ) রামপুর মিশন ঘ) সৈয়দপুর মিশন
৩। নিচের কোনটি সঠিক?
র. উইলিয়াম কেরী ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে আসেন
রর. ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা টেক্সটবুক সোসাইটি স্থাপিত হয়
ররর. কৃষি উন্নয়নেও উইলিয়াম কেরী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন
ক) র ও রর খ) র ও ররর গ) রর ও ররর ঘ) র, রর ও ররর