সাম্রাজ্যবাদের যুগে রাশিয়া

১৯ শতকে রুশ সাম্রাজ্যের বিশাল ভূখÐে ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস। মধ্য এশিয়া থেকে
সাইবেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূভাগের অধিবাসীরা যেমন ছিল মোঙ্গলীয় জাতির। তেমনি তাদের বেশিরভাগই বৌদ্ধ ও
ইসলাম ধর্মের অনুসারী বলে জানা যায়। দক্ষিণে ক্রিমিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিশাল ভূখÐে ছিল তাতার জাতির আবাস। এরা
ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও মুখ্যত রুশ জনগোষ্ঠী ছিল শ্লাভ জাতির অন্তর্ভুক্ত। ধর্মের দিক থেকে শ্লাভদের সিংহভাগ গ্রিক চার্চের
অনুসারী। পক্ষান্তরে লিথুনিয়া ও ইউক্রেন অঞ্চলে পোলিশদের আবাসস্থল। আদি নিবাস পোল্যান্ড হলেও এরা রুশদের
সমগোত্রীয় এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুগত ছিল। তাদের সাথে বাল্টিক অঞ্চলের প্রোটেস্ট্যান্টদের সম্পর্ক তেমন ভালো
ছিল না।
সামাজিক স্তরবিন্যাস বিচার করতে গেলে ১৯ শতকের রাশিয়ায় দুটি শ্রেণির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়; অভিজাত শ্রেণি এবং
ভূমিদাস। রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার অধিকারী এবং সমুদয় সম্পদের মালিক অভিজাত শ্রেণি ভোগ করত বেশিরভাগ সুযোগসুবিধা। এদিকে ভূমিদাস নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠন করা হয় বিশেষ সংস্থা ‘মির’। দাসদের বসবাস করতে হতো বহুমুখী
বিধিনিষেধ এবং প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। বস্তুত রাশিয়ায় ভূমিদাসরা ছিল জামিদার তথা মালিকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি
যেখানে শাসন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব জার নিয়ন্ত্রণ করতেন নিজ ক্ষমতাবলে। প্রদেশের শাসন
পরিচালনার জন্য একজন গভর্নর এবং একটি কাউন্সিল থাকলেও জারের স্বৈরতন্ত্র ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন।
প্রাদেশিক শাসক নিয়োগ করতেন স্বয়ং জার এবং প্রতিটি স্থানীয় প্রশাসনের পদে বসতো অভিজাত পরিবারের সদস্যরাই।
জারের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে ছিল প্রোটিরিয়ান গার্ড বা জারের পুলিশ বাহিনী যারা যে কোনো বিদ্রোহ দমনের জন্য সব
সময় প্রস্তুত থাকত।
ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ছিল অনেক বেশি অত্যাচারিত। সরাসরি জলপথ সংলগ্ন
উত্তর মহাসাগর বাদ দিলে বিশাল ভৌগোলিক সীমানায় রাশিয়া একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। উত্তর মহাসাগরের জলপথ প্রায়
সারা বছর বরফাচ্ছাদিত থাকায় নৌ চলাচলের অযোগ্য। তাই পরিস্থিতির দায় অনেকটা মেনে নিয়েই ১৮ শতকের
মাঝামাঝি থেকে রাশিয়ার নেতৃত্ব দুটি জলপথ কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। তারা এক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রাধান্য বিস্তারের
উদ্দেশ্যে প্রথমে কৃষ্ণসাগর থেকে দার্দানালিস প্রণালির ভেতর দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের চেষ্টা করে। তবে দার্দানেলিস
প্রণালি তুরস্কের দখলে থাকায় সেদিক দিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের কোনো সুযোগ রাশিয়ার ছিল না। অন্যদিকে মধ্য এশিয়া
অঞ্চল দখল করে ইরানের ভেতর দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করার চেষ্টা চালায় তারা। এতে করে ভারত মহাসাগরের
সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ ছিল। দক্ষিণে সাগর পথে যে কোনো মূল্যে অগ্রসর হয়ে রাশিয়া তাদের জন্য
বাণিজ্য পথ তৈরির চেষ্টা চালায়। ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকগণ তাদের এ প্রয়াসকে ‘উষ্ণ
পানির নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উসমানীয় তুর্কি সাম্রাজ্যের উপর রাশিয়ার জোরপূর্বক এ দখল নীতিই সৃষ্টি করে
উনিশ শতকের কুখ্যাত ‘প্রাচ্য সমস্যা’। এসময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার পাশাপাশি ও আন্তর্জাতিক
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য জার প্রথম ও দ্বিতীয় আলেকজান্ডার এবং জার প্রথম নিকোলাসের শাসনামল মূল্যায়ন করাটা জরুরি।