নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন

নিহিলিজম ও নারোদনিক আন্দোলন : ১৯ শতকের রাশিয়ায় গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি গুপ্ত সংগঠনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল
নিহিলিজম এবং নারোনিক। এরা জার শাসনের অত্যাচার, শোষণ ও স্বৈরতান্ত্রিকতা থেকে দেশকে মুক্ত করার অগ্নিমন্ত্রে
দীক্ষিত হয়ে মাঠে নামে। তারা নানা দিক থেকে জার বিরোধী অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়। অনেক
নির্যাতিত মানুষ তাদের দলে গিয়ে যোগদান করে। তারা আর্থসামাজিক মুক্তির আশায় একের পর এক জার বিরোধী কর্মকাÐে
আত্মনিয়োগ করে। জার শাসনের চরম দমননীতির মুখে এ দুটি আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী চরিত্র নিলে পরিস্থিতি হয়ে যায় আরো
ভয়াবহ। তবে জারদের নিষ্ঠুর দমননীতির মুখে এ আন্দোলন ব্যর্থ হলেও মুক্তির সংগ্রামে তাদের প্রয়াস ও আত্মদান
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। নির্যাতিত রুশ জনগণ মুক্তির দিশারী হিসেবে গ্রহণ করে বলশেভিকদের।
অর্থনৈতিক সংকট : জারদের অপশাসনের মুখে রাশিয়ার অর্থনৈতিক দৈন্য চরমে ওঠে। বলশেভিক বিপ্লবের কারণ হিসেবে
তাই এ সংকটকে চিহ্নিত করা যেতেই পারে। জার ও অভিজাত শ্রেণির ভোগবিলাসী জীবন, অর্থনীতিতে পরিকল্পনার অভাব,
কৃষিক্ষেত্রে অনুর্বরতা, শিল্পক্ষেত্রে গতিহীন অবস্থান, শ্রমিকদের আন্দোলন ও অসহযোগিতামূলক আচরণ খাদের কিনারে এনে
দাঁড় করায় তখনকার রাশিয়াকে। রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমশ জনদলনের হাতিয়ার হিসেবে জনমনে সৃষ্টি করে ত্রাস ও প্রাণভীতি। মানুষ
উন্নয়নের স্বপ্নে নতুন করে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে। মানুষের কর্মহীন অবস্থার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি
অকার্যকর করে তোলে অর্থনীতিকে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শ্রমিক ও ভূমিদাসদের জীবনকে
করে তোলে দুর্বিষহ। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই রাশিয়ার মানুষ স্বাগত জানায় বলশেভিক বিপ্লবকে ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয় : জারের দুঃশাসন আর চরম দমন নীতির বিপরীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বিপর্যয়
ঘটে। যুদ্ধে জারের প্রতি জনগণের কোনো সমর্থন না থাকলেও সামরিক বিপর্যয়ের মুখে জার সরকার গ্রামের ভূমিহীন
কৃষকদেরকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করে। তাদের জন্য সামরিক-বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়।
নানা স্থানের যুদ্ধে রাশিয়ান বাহিনীর বিপর্যয়, সেনাবাহিনীতে অনিয়মিত সরবরাহ, খাদ্য ঘাটতি, কয়লার অভাবে নিষ্ক্রিয়
যোগাযোগ ব্যবস্থা রুশ সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যায়। সেনাবাহিনীর এবং দেশের এই দুরবস্থার জন্য সাধারণ মানুষ
জারকেই দায়ী করে। হাতে অর্থকড়ি না থাকলেও তখন অনেক মানুষের হাতে অস্ত্র চলে যায়। বিশ্বযুদ্ধে সফল না হলেও
তারা এসব অস্ত্র এবং অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণকে কাজে লাগায় জারের বিরুদ্ধেই। এ ধরনের অস্ত্রধারী যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত
সৈনিকরা যখন জারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করাকেই প্রধান কর্তব্য বলে মনে করে তখন সহজেই বিদায় ঘণ্টা বেজে
যায় জারতন্ত্রের। পক্ষান্তরে দেশের এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জনগণের পাশাপাশি তারাও লেনিনের নেতৃত্বে
বলশেভিক পার্টিকেই ত্রাণকর্তা জ্ঞান করে। তারা বলশেভিকদের একমাত্র মুক্তিদাতা হিসেবে বিবেচনা করেই লিপ্ত হয় জারবিরোধী বিপ্লবে।