জাতিপুঞ্জের সমস্যা
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে লীগ অব নেশনস তথা জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা নানা দিক থেকে সমস্যায় জর্জরিত
ছিল। অর্থনীতি, রাষ্ট্র, রাজনীতি, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক পরিসর কিংবা সমরনীতি সব দিক থেকেই অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে তোপ
দাগার প্রবণতায় মনোযোগী ছিল এ সংগঠনটি। জার্মানি ও তার মিত্ররা এই নীতির অসারতা শুরু থেকেই বুঝতে
পেরেছিল। কিন্তু প্রথমে তারা দুর্বল থাকায় সরাসরি এর বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। পরে ধীরে
ধীরে তারা শক্তি সঞ্চয় করে বিরুদ্ধ অবস্থান নেয়। একের পর এক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে জাতিপুঞ্জকে একটি পঙ্গু সংগঠন
হিসেবে প্রমাণ করে তারা। ফলে অলীক শান্তির বাণী শুনিয়ে যে কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান মিত্রবাহিনী দাঁড় করিয়েছিল তা তাসের
ঘরের মত ভেঙে পড়ে। এতে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ আসন্ন হয় যা বুঝতে কারো বাকি থাকেনি।
ম্যাসন-ওভেরি বিতর্ক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ নিয়ে ম্যাসন ওভেরি বিতর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র। এক্ষেত্রে ১৯৮০ সালের দিকে ব্রিটিশ
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ওভেরি (জরপযধৎফ ঙাবৎু) ও টিমোথি ম্যাসনের (ঞরসড়ঃযু গধংড়হ) মধ্যে যে তর্ক হয় সেখানে
১৯৩৯ সালে যুদ্ধ লাগার নানা কারণ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে ম্যাসন মনে করে একটি কাঠামোগত আর্থিক
সংকটই হিটলারকে এই প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। তবে ওভ্যারি তার থিসিসে এ বিষয়ের বিরুদ্ধে
অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন যদিও জার্মানিতে আর্থিক সংকট চলছিল তা পোল্যান্ডে আক্রমণ চালানোর মত
ঘটনাকে সমর্থন দেয় না। এক্ষেত্রে ঘরে বাইরে একনায়কের দাপট প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টার জন্য তিনি জার্মানিতে গড়ে ওঠা
নাৎসি স্বৈরতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেন। সব মিলিয়ে তাঁদের গবেষণা ও বিতর্কিত অবস্থান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর
কারণগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
বেনিতো মুসোলিনি
উদারপন্থী শাসনের নামে পুরো ইতালিতে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ইতালির জন্য এমনি এক আপত্তিকর মুহূর্তে
এগিয়ে আসেন বেনিতো মুসোলিনি। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করতে গিয়ে জীবনের ঘানি টানতে ব্যর্থ মুসোলিনি চলে যান
সুইজারল্যান্ড। তারপর দেশে ফিরে তিনি গঠন করেন আধাসামরিক এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যার নাম ফ্যাসিস্ট পার্টি। এ
বাহিনী তাদের নেতা মুসোলিনির বক্তব্যকেই নীতি ও আদর্শ হিসেবে মেনে প্রাচীন ইতালির সম্ভ্রম পুনরুদ্ধারে ব্যাপৃত হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই মুসোলিনি একটি শক্তিশালী সামারিক দল গঠন করেন। ১৯২২ সালের দিকে হাজার হাজার ফ্যাসিস্ট
স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে রাজধানী রোমের পথে রওনা হন মুসোলিনি। তখনকার রাজা ভিক্টর ইমানুয়েলস বিদ্রোহ দমনের জন্য
সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেও তারা তার নির্দেশ মানেনি। এরপর ক্ষমতায় চলে আসেন ফ্যাসিস্ট পার্টির নেতা মুসোলিনি।
প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসলেও সময়ের আবর্তে তিনি এক প্রভাবশালী স্বৈরশাসক বনে যান। তার নেতৃত্বেই
ইতালি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির স্বপক্ষে যুদ্ধ করে। প্রথম দিকে জার্মানি একের পর এক অঞ্চল দখল করে নিলেও তিনি
নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তিনি চেষ্টা করেন নতুন করে ইতালির সেনাবাহিনীকে ঢেলে
সাজানো যায় কি না সে বিষয়ে।
রাইনল্যান্ডে সেনা সমাবেশ
অপমানজনক ভার্সাই চুক্তিকে ঘোষণা দিয়ে অস্বীকার করে থার্ড রাইখ তথা হিটলার নেতৃত্বাধীন নাৎসি সরকার। ১৯৩৬
সালের মার্চের ৭ তারিখে রাইনল্যান্ডে সেনা সমাবেশ করে জার্মানি। এখানকার স্ট্রেসা ফ্রন্ট তার ভূ-রাজনৈতিক
পরিপ্রেক্ষিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে ছিল। পশ্চিম জার্মানির ঠিক সে স্থানে জার্মান সৈন্যরা অবস্থান গ্রহণ করে
যা ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল। তখনকার ফ্রান্সে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দ্রæত এর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি।
রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের তাঁর জীবনীতে লিখে গেছেন এখানে সেনা সমাবেশ শুধু ভার্সাই চুক্তির লঙ্ঘনই না, পাশাপাশি
নতুন এক জার্মানির উত্থানবার্তা সবার কাছে জানান দেয়া।
ইতালির ইথিওপিয়া আক্রমণ
স্ট্রেসা সম্মেলন শেষ হলে ইতালি তার প্রভাববলয় বিস্তৃতির চেষ্টা চালায়। অ্যাংলো-জার্মান নেভাল এগ্রিমেন্ট ইতালির
শাসক বেনিতো মুসোলিনিকে আফ্রিকা অভিমুখে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃতির পথ দেখায়। এ পরিস্থিতিতে লীগ অব নেশনস
ইতালিকে একটি আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে দেশটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলে সবাইকে। ইতালি কোনো
নিষেধাজ্ঞার ধার না ধেরে আক্রমণ পরিচালনা করে একের পর এক ভূখÐ দখল করতে থাকে। তারপর ৭ মে ইথিওপিয়া,
ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়া দখল করে তিনটি দেশ একত্রিত করে ইতালিয়ান ইস্ট আফ্রিকা নামে একটি উপনিবেশ পত্তন করে।
এরপর ১৯৩৬ সালের ৩০ জুন সম্রাট হাইলে সেলাসি ইতালির কর্মকাÐের কঠোর সমালোচনা করে লীগ অব নেশনসে
একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে মুসোলিনি লীগ অব নেশনস থেকে তার দেশের সদস্যপদ প্রত্যাহারের কথা
সাফ জানিয়ে দিতে একটুও সময় নেননি। এর ফলে নতুন করে উত্তপ্ত হয় ইউরোপ।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ
নন্দিত শিল্পী পাবলো পিকাসো তার বিখ্যাত জার্মেনিকা চিত্রকর্মটি অঙ্কন করেন ১৯৩৭ সালের দিকে। এখানে নাৎসি
বাহিনীর নানা আক্রমণের দৃশ্য তুলির আঁচড়ে তুলে আনার একটি প্রচেষ্টা ছিল। তবে এ চিত্রকর্মটির থিম এতটাই বিচিত্র
সেখান থেকে সারবস্তু খুঁজে বের করা বেশ কষ্টকর। স্পেনের দুটি পক্ষের দ্ব›দ্ব থেকে গৃহযুদ্ধের উপক্রম হলে জাতীয়তাবাদী
সামরিক নেতা জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোকে অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনির পক্ষ থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়া
হয়। অন্যদিকে স্প্যানিশ রিপাবলিকের পক্ষে লড়তে থাকা পক্ষকে সমর্থন দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৩৬ থেকে শুরু
করে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এমনি নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে স্পেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ধীরে
ধীরে স্পেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ইতালি-জার্মান পক্ষে বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্ব›েদ্ব রূপ নেয়। এ ঘটনাও
তখনকার রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে প্রণোদিত করেছিল।
দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ
আগ্রাসী জাপানি রাজতন্ত্র চীনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়ার শাসনকাজে একজন পুতুল শাসককে বসায়।
এরপর ১৯৩৭ সালের দিকে মার্কোপলো সেতু দুর্ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় চীন জাপান যুদ্ধ শুরু হয়। জাপান চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে একের পর এক বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। ১৯৩৭ সালের ২২-২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাপান চীনের সাংহাই,
নানকিং, গুয়াংঝাউ ও বেজিংয়ের নানাস্থানে বোমাবর্ষণ করে। এসময়েই জাপানের রাজকীয় বাহিনী
অৎসু) নানকিংয়ের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছিলো। তারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার পাশাপাশি তাদের লালসার শিকার হয়
কয়েক লক্ষ নারী। এঘটনা এশিয়ার শান্তি বিনষ্ট করে।
আনস্কুলস
১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়ার বাহিনী জার্মানির একটি বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে নেয় যাকে আনস্কুলস (অহংপযষঁংং) নামে অভিহিত
করা হয়। প্যান জার্মানিজম মতবাদ জার্মান জাতিসত্তার অন্তর্গত বিভিন্ন মানুষকে একই ভৌগোলিক পরিসরে একটি স্বাধীন
রাজনৈতিক মানচিত্রের অধীনে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখায়। এ উপলক্ষেই হিটলারের নাৎসি বাহিনী কাজ শুরু করে। তারা সবার
আগে স্ট্রেসা ফ্রন্ট থেকে ১৯৩৫ এর দিকে যে অস্ট্রিয়া আত্মপ্রকাশ করে তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বসে। পাশাপাশি
তাদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রোম-বার্লিন সমঝোতা বৃদ্ধি করে। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে জার্মানি বাহিনী
অগ্রসর হয়ে অস্ট্রিয়ার বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরপর ধীরে ধীরে অস্ট্রিয়ার পক্ষের শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান
জানান দিতে বাধ্য হলে জার্মান-ইতালি ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়; যা আরেকটি যুদ্ধেরও প্রস্তুতিও বটে।
মিউনিখ চুক্তি
চেক প্রজাতন্ত্রের সীমান্তঘেঁষে অবস্থিত সুডেটারল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ জার্মান অঞ্চল। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে মিত্রবাহিনী এ
অঞ্চলকে জার্মানির থেকে কেড়ে নিয়ে নবগঠিত চেকো¯েøাভাকিয়া তথা বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রকে দান করে। জার্মান নেতা
হিটলার এটা মেনে নিতে না পেরে ১৯৩৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিনের সাথে একটি বৈঠকে
মিলিত হন। তিনি যেকোনো মূল্যে সুডেটার জার্মানির দখলে নেয়ার হুমকি দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফ্রান্স ও
সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তার পাশাপাশি চেকো¯েøাভাকিয়ারও একটি শক্তিশালী সেনাদল ছিল। তারা এগুলো কাজে
লাগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এ অবস্থায় ১৯৩৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর
স্বাক্ষর করা হয় মিউনিখ চুক্তি। ব্রিটিশ, ফ্রান্স ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারেননি হিটলার কতবড় দাবি জানাতে
পারেন। তখন চেকো¯েøাভাকিয়ার শান্তি নিশ্চিতকল্পে জার্মান বাহিনীর অবস্থান আরেকটি বিস্তৃত বিপদের ইঙ্গিত বয়ে আনে।
ধীরে ধীরে এ মিউনিখ চুক্তিই জার্মান সমরবাদকে আরো আগ্রাসী করে তোলে।
শ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা
জার্মানি সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তারা ১৯৩৯ সালে মিউনিখ চুক্তি ভঙ্গ করে প্রাগ আক্রমণ
করে। এসময় স্বাধীন শ্লোভাকিয়া রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে চেকোশ্লোভাকিয়ার বিলুপ্তি ঘটে। এক্ষেত্রে ওই অঞ্চল
নিয়ে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের রাজনীতি করার আর কিছুই থাকেনি। ফলে ধীরে ধীরে তারাও যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।
ইতালির আলবেনিয়া আক্রমণ
বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন ইতালি একের পর এক বিশ্বের নানা দেশে আক্রমণ করতে থাকে। তাদের ক্রমবর্ধমান
আগ্রাসী নীতির অংশ হিসেবে ১৯৩৯ সালের ২৫ মার্চ তিরানায় গিয়ে ইতালির বশ্যতা স্বীকার করার আহŸান জানিয়ে ব্যর্থ
হয় মুসোলিনি বাহিনী। তারপর ৭ এপ্রিল ১৯৩৯ আলবেনিয়া আক্রমণ করে ইতালির বাহিনী। মাত্র তিনদিনের লড়াইয়ে
আলবেনিয়ার পতন ঘটে।
খালখিন গলের যুদ্ধ
রাশিয়া ও জাপানের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে খালখিন গলের যুদ্ধ বাধে। এর আগে ১৯৩৮ সালে খাসান লেক অঞ্চলে
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জাপান রাশিয়া একদফা লড়াই হয়েছিল। কিন্তু এবারের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে যে লড়াই তা পূর্বের
সব ধরনের যুদ্ধের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। জর্জ ঝুকভের নেতৃত্বাধীন রুশ বাহিনী এগিয়ে যায় জাপানিদের প্রতিরোধ করতে।
এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলার পর ১৯৪৫ সালে সন্ধির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল এ যুদ্ধের।
ছিল। অর্থনীতি, রাষ্ট্র, রাজনীতি, নিরাপত্তা, কূটনৈতিক পরিসর কিংবা সমরনীতি সব দিক থেকেই অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে তোপ
দাগার প্রবণতায় মনোযোগী ছিল এ সংগঠনটি। জার্মানি ও তার মিত্ররা এই নীতির অসারতা শুরু থেকেই বুঝতে
পেরেছিল। কিন্তু প্রথমে তারা দুর্বল থাকায় সরাসরি এর বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। পরে ধীরে
ধীরে তারা শক্তি সঞ্চয় করে বিরুদ্ধ অবস্থান নেয়। একের পর এক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে জাতিপুঞ্জকে একটি পঙ্গু সংগঠন
হিসেবে প্রমাণ করে তারা। ফলে অলীক শান্তির বাণী শুনিয়ে যে কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান মিত্রবাহিনী দাঁড় করিয়েছিল তা তাসের
ঘরের মত ভেঙে পড়ে। এতে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ আসন্ন হয় যা বুঝতে কারো বাকি থাকেনি।
ম্যাসন-ওভেরি বিতর্ক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ নিয়ে ম্যাসন ওভেরি বিতর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র। এক্ষেত্রে ১৯৮০ সালের দিকে ব্রিটিশ
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ওভেরি (জরপযধৎফ ঙাবৎু) ও টিমোথি ম্যাসনের (ঞরসড়ঃযু গধংড়হ) মধ্যে যে তর্ক হয় সেখানে
১৯৩৯ সালে যুদ্ধ লাগার নানা কারণ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে ম্যাসন মনে করে একটি কাঠামোগত আর্থিক
সংকটই হিটলারকে এই প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। তবে ওভ্যারি তার থিসিসে এ বিষয়ের বিরুদ্ধে
অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন যদিও জার্মানিতে আর্থিক সংকট চলছিল তা পোল্যান্ডে আক্রমণ চালানোর মত
ঘটনাকে সমর্থন দেয় না। এক্ষেত্রে ঘরে বাইরে একনায়কের দাপট প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টার জন্য তিনি জার্মানিতে গড়ে ওঠা
নাৎসি স্বৈরতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেন। সব মিলিয়ে তাঁদের গবেষণা ও বিতর্কিত অবস্থান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর
কারণগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
বেনিতো মুসোলিনি
উদারপন্থী শাসনের নামে পুরো ইতালিতে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ইতালির জন্য এমনি এক আপত্তিকর মুহূর্তে
এগিয়ে আসেন বেনিতো মুসোলিনি। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করতে গিয়ে জীবনের ঘানি টানতে ব্যর্থ মুসোলিনি চলে যান
সুইজারল্যান্ড। তারপর দেশে ফিরে তিনি গঠন করেন আধাসামরিক এক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যার নাম ফ্যাসিস্ট পার্টি। এ
বাহিনী তাদের নেতা মুসোলিনির বক্তব্যকেই নীতি ও আদর্শ হিসেবে মেনে প্রাচীন ইতালির সম্ভ্রম পুনরুদ্ধারে ব্যাপৃত হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই মুসোলিনি একটি শক্তিশালী সামারিক দল গঠন করেন। ১৯২২ সালের দিকে হাজার হাজার ফ্যাসিস্ট
স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে রাজধানী রোমের পথে রওনা হন মুসোলিনি। তখনকার রাজা ভিক্টর ইমানুয়েলস বিদ্রোহ দমনের জন্য
সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেও তারা তার নির্দেশ মানেনি। এরপর ক্ষমতায় চলে আসেন ফ্যাসিস্ট পার্টির নেতা মুসোলিনি।
প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসলেও সময়ের আবর্তে তিনি এক প্রভাবশালী স্বৈরশাসক বনে যান। তার নেতৃত্বেই
ইতালি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির স্বপক্ষে যুদ্ধ করে। প্রথম দিকে জার্মানি একের পর এক অঞ্চল দখল করে নিলেও তিনি
নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তিনি চেষ্টা করেন নতুন করে ইতালির সেনাবাহিনীকে ঢেলে
সাজানো যায় কি না সে বিষয়ে।
রাইনল্যান্ডে সেনা সমাবেশ
অপমানজনক ভার্সাই চুক্তিকে ঘোষণা দিয়ে অস্বীকার করে থার্ড রাইখ তথা হিটলার নেতৃত্বাধীন নাৎসি সরকার। ১৯৩৬
সালের মার্চের ৭ তারিখে রাইনল্যান্ডে সেনা সমাবেশ করে জার্মানি। এখানকার স্ট্রেসা ফ্রন্ট তার ভূ-রাজনৈতিক
পরিপ্রেক্ষিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে ছিল। পশ্চিম জার্মানির ঠিক সে স্থানে জার্মান সৈন্যরা অবস্থান গ্রহণ করে
যা ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল। তখনকার ফ্রান্সে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দ্রæত এর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি।
রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের তাঁর জীবনীতে লিখে গেছেন এখানে সেনা সমাবেশ শুধু ভার্সাই চুক্তির লঙ্ঘনই না, পাশাপাশি
নতুন এক জার্মানির উত্থানবার্তা সবার কাছে জানান দেয়া।
ইতালির ইথিওপিয়া আক্রমণ
স্ট্রেসা সম্মেলন শেষ হলে ইতালি তার প্রভাববলয় বিস্তৃতির চেষ্টা চালায়। অ্যাংলো-জার্মান নেভাল এগ্রিমেন্ট ইতালির
শাসক বেনিতো মুসোলিনিকে আফ্রিকা অভিমুখে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃতির পথ দেখায়। এ পরিস্থিতিতে লীগ অব নেশনস
ইতালিকে একটি আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে দেশটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলে সবাইকে। ইতালি কোনো
নিষেধাজ্ঞার ধার না ধেরে আক্রমণ পরিচালনা করে একের পর এক ভূখÐ দখল করতে থাকে। তারপর ৭ মে ইথিওপিয়া,
ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়া দখল করে তিনটি দেশ একত্রিত করে ইতালিয়ান ইস্ট আফ্রিকা নামে একটি উপনিবেশ পত্তন করে।
এরপর ১৯৩৬ সালের ৩০ জুন সম্রাট হাইলে সেলাসি ইতালির কর্মকাÐের কঠোর সমালোচনা করে লীগ অব নেশনসে
একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে মুসোলিনি লীগ অব নেশনস থেকে তার দেশের সদস্যপদ প্রত্যাহারের কথা
সাফ জানিয়ে দিতে একটুও সময় নেননি। এর ফলে নতুন করে উত্তপ্ত হয় ইউরোপ।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ
নন্দিত শিল্পী পাবলো পিকাসো তার বিখ্যাত জার্মেনিকা চিত্রকর্মটি অঙ্কন করেন ১৯৩৭ সালের দিকে। এখানে নাৎসি
বাহিনীর নানা আক্রমণের দৃশ্য তুলির আঁচড়ে তুলে আনার একটি প্রচেষ্টা ছিল। তবে এ চিত্রকর্মটির থিম এতটাই বিচিত্র
সেখান থেকে সারবস্তু খুঁজে বের করা বেশ কষ্টকর। স্পেনের দুটি পক্ষের দ্ব›দ্ব থেকে গৃহযুদ্ধের উপক্রম হলে জাতীয়তাবাদী
সামরিক নেতা জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোকে অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনির পক্ষ থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়া
হয়। অন্যদিকে স্প্যানিশ রিপাবলিকের পক্ষে লড়তে থাকা পক্ষকে সমর্থন দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৩৬ থেকে শুরু
করে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এমনি নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে স্পেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ধীরে
ধীরে স্পেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ইতালি-জার্মান পক্ষে বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্ব›েদ্ব রূপ নেয়। এ ঘটনাও
তখনকার রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে প্রণোদিত করেছিল।
দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ
আগ্রাসী জাপানি রাজতন্ত্র চীনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়ার শাসনকাজে একজন পুতুল শাসককে বসায়।
এরপর ১৯৩৭ সালের দিকে মার্কোপলো সেতু দুর্ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় চীন জাপান যুদ্ধ শুরু হয়। জাপান চীনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে একের পর এক বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। ১৯৩৭ সালের ২২-২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাপান চীনের সাংহাই,
নানকিং, গুয়াংঝাউ ও বেজিংয়ের নানাস্থানে বোমাবর্ষণ করে। এসময়েই জাপানের রাজকীয় বাহিনী
অৎসু) নানকিংয়ের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছিলো। তারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার পাশাপাশি তাদের লালসার শিকার হয়
কয়েক লক্ষ নারী। এঘটনা এশিয়ার শান্তি বিনষ্ট করে।
আনস্কুলস
১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়ার বাহিনী জার্মানির একটি বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে নেয় যাকে আনস্কুলস (অহংপযষঁংং) নামে অভিহিত
করা হয়। প্যান জার্মানিজম মতবাদ জার্মান জাতিসত্তার অন্তর্গত বিভিন্ন মানুষকে একই ভৌগোলিক পরিসরে একটি স্বাধীন
রাজনৈতিক মানচিত্রের অধীনে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখায়। এ উপলক্ষেই হিটলারের নাৎসি বাহিনী কাজ শুরু করে। তারা সবার
আগে স্ট্রেসা ফ্রন্ট থেকে ১৯৩৫ এর দিকে যে অস্ট্রিয়া আত্মপ্রকাশ করে তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বসে। পাশাপাশি
তাদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রোম-বার্লিন সমঝোতা বৃদ্ধি করে। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে জার্মানি বাহিনী
অগ্রসর হয়ে অস্ট্রিয়ার বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরপর ধীরে ধীরে অস্ট্রিয়ার পক্ষের শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান
জানান দিতে বাধ্য হলে জার্মান-ইতালি ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়; যা আরেকটি যুদ্ধেরও প্রস্তুতিও বটে।
মিউনিখ চুক্তি
চেক প্রজাতন্ত্রের সীমান্তঘেঁষে অবস্থিত সুডেটারল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ জার্মান অঞ্চল। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে মিত্রবাহিনী এ
অঞ্চলকে জার্মানির থেকে কেড়ে নিয়ে নবগঠিত চেকো¯েøাভাকিয়া তথা বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রকে দান করে। জার্মান নেতা
হিটলার এটা মেনে নিতে না পেরে ১৯৩৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিনের সাথে একটি বৈঠকে
মিলিত হন। তিনি যেকোনো মূল্যে সুডেটার জার্মানির দখলে নেয়ার হুমকি দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফ্রান্স ও
সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তার পাশাপাশি চেকো¯েøাভাকিয়ারও একটি শক্তিশালী সেনাদল ছিল। তারা এগুলো কাজে
লাগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এ অবস্থায় ১৯৩৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর
স্বাক্ষর করা হয় মিউনিখ চুক্তি। ব্রিটিশ, ফ্রান্স ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারেননি হিটলার কতবড় দাবি জানাতে
পারেন। তখন চেকো¯েøাভাকিয়ার শান্তি নিশ্চিতকল্পে জার্মান বাহিনীর অবস্থান আরেকটি বিস্তৃত বিপদের ইঙ্গিত বয়ে আনে।
ধীরে ধীরে এ মিউনিখ চুক্তিই জার্মান সমরবাদকে আরো আগ্রাসী করে তোলে।
শ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা
জার্মানি সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তারা ১৯৩৯ সালে মিউনিখ চুক্তি ভঙ্গ করে প্রাগ আক্রমণ
করে। এসময় স্বাধীন শ্লোভাকিয়া রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে চেকোশ্লোভাকিয়ার বিলুপ্তি ঘটে। এক্ষেত্রে ওই অঞ্চল
নিয়ে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের রাজনীতি করার আর কিছুই থাকেনি। ফলে ধীরে ধীরে তারাও যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।
ইতালির আলবেনিয়া আক্রমণ
বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন ইতালি একের পর এক বিশ্বের নানা দেশে আক্রমণ করতে থাকে। তাদের ক্রমবর্ধমান
আগ্রাসী নীতির অংশ হিসেবে ১৯৩৯ সালের ২৫ মার্চ তিরানায় গিয়ে ইতালির বশ্যতা স্বীকার করার আহŸান জানিয়ে ব্যর্থ
হয় মুসোলিনি বাহিনী। তারপর ৭ এপ্রিল ১৯৩৯ আলবেনিয়া আক্রমণ করে ইতালির বাহিনী। মাত্র তিনদিনের লড়াইয়ে
আলবেনিয়ার পতন ঘটে।
খালখিন গলের যুদ্ধ
রাশিয়া ও জাপানের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে খালখিন গলের যুদ্ধ বাধে। এর আগে ১৯৩৮ সালে খাসান লেক অঞ্চলে
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জাপান রাশিয়া একদফা লড়াই হয়েছিল। কিন্তু এবারের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে যে লড়াই তা পূর্বের
সব ধরনের যুদ্ধের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। জর্জ ঝুকভের নেতৃত্বাধীন রুশ বাহিনী এগিয়ে যায় জাপানিদের প্রতিরোধ করতে।
এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলার পর ১৯৪৫ সালে সন্ধির মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল এ যুদ্ধের।