আফ্রিকায় বর্ণবাদের পটভূমি

ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিকাশ লাভ করেছিল। অন্যদিকে ১৭ শতকের দিকে দাস প্রথা
বিস্তারের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তার লাভ করেছিল এই বর্ণবাদ। সেখানেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে আফ্রিকা থেকে
ধরে নিয়ে আসা মানুষগুলোকে দাস হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছিল। তারা ইউরোপের দাস ব্যবসায়ীদের কাছে ধরা
পড়ে^িছল। তারপর সেই মানুষগুলোকে পশুর মত জাহাজে বোঝাই করে নিয়ে আসা হতে থাকে ইউরোপের উপনিবেশ
রয়েছে এমন নানা দেশে। সেখানে তাদের বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করা হত। একটু খেয়াল করতে দেখা যায় এই
আফ্রিকায় বিশ্বের বেশিরভাগ কালো মানুষের বসবাস। আফ্রিকা আবিষ্কারের পরবর্তী এক দশকে তারা সেখানে তেমন
সুবিধা করতে পারেনি। তারা নানাভাবে আফ্রিকার মাত্র ১০ শতাংশ এলাকার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল।
তবে তারা সুযোগ বুঝে আফ্রিকার নানা স্থানে তাদের উপনিবেশ বিস্তার করতে থাকে। তারা সেখান থেকে সম্পদ পাচারের
পাশাপাশি কালো বর্ণের মানুষদের ধরে নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে বিক্রি করে দিতে থাকে। ১৭ শতকের দিকে সেখানে
তাদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর সম্পদ পাচারের পাশাপাশি অগণিত স্থানীয় অধিবাসীকে অপহরণের পর দাস হিসেবে বিক্রি
করে দিতে দেখা যায়।
উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে শ্বেতাঙ্গদের আনাগোণা লক্ষ করা যায় দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। তারা স্থানীয় বিভিন্ন
বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় আস্তে আস্তে আফ্রিকার উপর দখল নিরঙ্কুশ করতে থাকে। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল
থাকায় ১৯ শতকের একটা পর্যায়ে এসে আফ্রিকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমি উপনিবেশের গ্রাসে চলে যায়। প্রথম দিকে
পর্তুগিজরা আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। তারপর একে একে ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজরা সেখানে তাদের অবস্থান
নিশ্চিত করে। এরা সেখানে প্রথম দিকে নিজেদের খামার গড়ে তোলে। তারপর দাস ব্যবসা শুরু করেছিল। আফ্রিকার
বিভিন্ন দেশ থেকে কালো বর্ণের মানুষদের ধরে নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করত তারা। তবে এতে করে এই
অঞ্চলে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা লুটেরা এবং শত্রæ হিসেবে চিহ্নিত করে। শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে
আফ্রিকায় তাদের বসতি টিকিয়ে রাখাই শ্বেতাঙ্গদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের টিকে থাকার জন্য সেখানে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিকল্প ছিল না। তারা এই উদ্দেশ্যে দুটি
বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে। প্রথম দিকে তারা ইউরোপের নানা অঞ্চলের কারাগারে বন্দী দাগী আসামীদের আফ্রিকা
গমনের শর্তে মুক্তি দিতে শুরু করে। এই সব আসামীরা কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর আফ্রিকায় গিয়ে সেখানকার
কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েদের বিয়ে করে স্থানীভাবে বসবাস করতে থাকে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের প্রচুর
অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় নিয়ে আসা হয়। তারা সেখানে গিয়ে স্থানীয় ধনী কৃষ্ণাঙ্গদের বিয়ে করে
শ্বেতাঙ্গদের বংশ বিস্তার করে। এভাবে এক পর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার অনেকগুলো এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গদের পাশাপাশি
শ্বেতাঙ্গদের জনসংখ্যাও বেড়ে যায় বহুলাংশে।
আফ্রিকার মত এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় আমেরিকাতেও। সেখানে ইউরোপের নানা স্থান থেকে গিয়ে বসতি স্থাপন করে
শ্বেতাঙ্গরা। তারা সেখানকার জনসংখ্যা হিসেবে সংখ্যালঘু হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।
তাদের এই কাজ সহজ করে দেয় বর্ণবাদী নৃ-বিজ্ঞানীরা। তারা নরগোষ্ঠীর ধারণাকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর আরোপের
মধ্য দিয়ে শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। পাশাপাশি আরও নানাদিক থেকে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পাশাপাশি
কৃষ্ণাঙ্গদের হেয় করতে থাকে। বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে ধরে আনা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের উপর শ্বেতাঙ্গরা তাদের আধিপত্য
নিশ্চিত করে। তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিটি দিক থেকে নিগ্রহের শিকার হয়।
১৯১০ সালের ৩১ মে আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শক্তি নতুনভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। তারা সেখানে তাদের সুবিধামত
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে এদিন প্রথমবারের মত সফলতার মুখ দেখে। তারা এদিন কেপ কলোলি, নাটাল, ট্রান্সভাল ও
অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এই চারটি ব্রিটিশ উপনিবেশ মিলিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন। এখানে প্রথম গভর্নর
জেনারেল হিসেবে মনোনীত করা হয় ভাইকাউন্ট গøাডস্টেন। এই অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয় জেনারেল
বোথাকে। এরপর ১৯৬০ সালে তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে ১৯১০-৬০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ
অর্ধ-শতাব্দীর ইউনিয়নে থাকাকালে সেখানে বর্ণবাদ চরম রূপ লাভ করেছিল। এই জঘন্য বর্ণবাদ সেখানে গত শতকের
নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন শুরু থেকেই কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের জন্য দুটি আলাদা নীতি
অনুসরণ করে আসছিল। তারা এক্ষেত্রে পৃথকীকরণ ও সমন্বয়করণ নীতির প্রচলন ঘটিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত
সেখানে বর্ণবাদের প্রভাব অতটা প্রকট আকার ধারণ করতে পারেনি। তারা সেখানে নানা রকম সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছিল। সেখানকার একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী দল তথা আফ্রিকান ন্যাশনালিস্ট পার্টি
ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছিল। বিশেষ করে এই দলটি ক্ষমতায় এসে বর্ণবাদকে সরকারি
নীতিতে রূপ দেয়। তারা বর্ণবাদের সমর্থনে সাতটি আইন প্রণয়ন করেছিল। এই আইন সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার
হরণের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়।
আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালিন যে আইন পাস করেছিল সেখানে জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা
হয়েছিল। এই নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গাত্রবর্ণ ও গোত্র অনুযায়ী নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিশেষত নবজাতকের বর্ণ
এবং গোত্র অনুযায়ী নিবন্ধের এই ধারণায় তারা জন্মের পর থেকে নিগ্রহের শিকার হতে থাকে। এরপর ১৯৫০ সালের
দিকে পাস করা হয়েছিল আবাসভূমি পৃথকীকরণ আইন। এই বিশেষ আইনের মাধ্যমে সেখানে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের
আবাসভূমি পৃথক করা হয়েছিল। মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগের বিপরীতে শ্বেতাঙ্গ ছিল ৪ ভাগ। তার পরেও সেখানকার ভূমি
বণ্টনের বৈষম্যে তারা মাত্র ১৩ শতাংশ অনুর্বর ভূমির মালিকানা লাভ করেছিল। একইসঙ্গে প্রণয়ন করা হয়েছিল বিশেষ
ধরণের পাশ আইন। এ আইনের আওতায় দক্ষিণ আফ্রিকার বেশিরভাগ কৃষ্ণাঙ্গ নর-নারীকে পুলিশের সামনে বিশেষ পাশ
দেখিয়ে তবেই চলাচলের অধিকার দেয়া হত। অন্যদিকে বিশেষ নাগরিক আইনের মধ্যে দিয়ে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের
নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তার বাইরে পৃথক সুবিধা আইনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বৈষম্যমূলক
নানা সুবিধার প্রবর্তন করা হয় যা বঞ্চিত করতে থাকে কৃষ্ণাঙ্গদের। অন্যদিকে অনৈতিক আইনের মাধ্যমে সেখানকার
কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বিয়ে কিংবা সব ধরণের যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে একসময় বর্ণবৈষম্যে ভরা দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের যে আধিপত্য ছিল এখন কালোদের দাপটে তারাই হয়ে
পড়েছে কোণঠাসা। এক সময় কালোদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন করে আসা আফ্রিকা সমাজে সাদাদের কিছু মানুষ টের
পাচ্ছে বঞ্চনা কী, সহিংসতা কতটা ভয়াবহ। তাদের অনেকের ভবিষ্যৎও এখন হুমকির মুখে। বিবিসিতে প্রকাশিত একটি
প্রতিবেদনে কালোদের দ্বারা সাদাদের নির্যাতিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল কালোদের
কাছে কিভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে এক সময়ে ক্ষমতায় থাকা প্রতাপশালী সাদারা। রাজনীতি ও গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে
তাদের প্রভাব বেশি থাকলেও ঠিক অপর পিঠেই রয়েছে শ্বেতাঙ্গদের দারিদ্র্যের চিত্র। নানা দিক থেকে স্পষ্ট হয়েছে কিভাবে
তারা অবস্থানের দিক দিয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যিই শ্বেতাঙ্গদের কোনো ভবিষ্যৎ
উন্নয়নের সুযোগ আছে কি না।
তবে সাদাদের মধ্যে যারা ভালো অবস্থানে আছে কিংবা যারা দেশটির পরিস্থিতির সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে
পেরেছে তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কিন্তু আফ্রিকান ভাষাভাষী সাদাবর্ণের শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা মোটেও ভালো নয়। তাদের এ
দুর্দশার চিত্র কোনো পত্রপত্রিকায় সেভাবে দেখা যায় না কিংবা টেলিভিশনেও প্রচার হয় না। সবাই দক্ষিণ আফ্রিকার অতীত
ইতিহাস থেকেই সাদাদের এ নিগ্রহের সূচনা বলে মনে করছে। এক্ষেত্রে সবাই দায়ী করছে সাদাদের অতিরিক্ত
আধিপত্যবাদী মনোভাবকে। তাই ২০ বছর আগে দেশটিতে শ্বেতাঙ্গ কৃষকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। এখন তা অর্ধেকে
নেমে এসেছে। বস্তুত অতীতে বর্ণবাদ ব্যবস্থায় শ্বেতাঙ্গরা যেভাবে ফায়দা লুটেছে আজ ক্ষমতাসীন কালোদের দাপটে
তাদের ঠিক সেই অবস্থায় পড়তে হয়েছে।
তবে শুধু এই বর্ণবাদ নয় অন্য নানা ক্ষেত্রেও আফ্রিকার সংকটটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আফ্রিকা এখন প্রধান যে সমস্যাগুলোর
মুখোমুখি, তার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রগুলোর ব্যর্থ হয়ে যাওয়া, গণতন্ত্র হাতবদলের জটিল প্রক্রিয়া কিংবা জনসংখ্যার সমস্যার
পাশাপাশি বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগের প্রকোপ। এসব দেশের নারীরা একেকজন এখনো সাত-আটটি করে সন্তান ধারণ
করেন। তাই এসব দেশের জন্য কোটি কোটি ইউরো খরচ করেও স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন অনেক
পশ্চিমা গবেষক। তবে এ দেশগুলো ধীরে ধীরে এ অবস্থার দিকে পতিত হয়েছে বর্ণবাদের কারণেই। আফ্রিকার দেশগুলো
নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন এমন একজন যাকে ইউরোপের নব্য উদারতাবাদের ধারক মনে করা হয়। তিনি ফ্রান্সের
রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ সামিটে আফ্রিকার দেশগুলোতে ফ্রান্সের সহায়তা তহবিল
না থাকার সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেছিলেন। স্পষ্টতই বর্ণবাদের ঔপনিবেশিক যে মানসিকতা, তারই
এক প্রতিফলন ম্যাখোঁর এই বক্তব্য। এক সময়ের উপনিবেশ থেকে শোষণকারী ফ্রান্সের আধুনিক যুগে উত্তোরণের পর
উদারবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত ম্যাখোঁর এই বক্তব্যে এক অর্থে অতীতেরই প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে। তার এই বক্তব্য
থেকে অনেকে মনে করেন এখনকার বিশ্বেও বর্ণবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।