আব্দুল মালিকের পরিচয় সা¤্রাজ্য বিস্তার তাঁর শাসননীতি ও সংস্কার সম্পর্কে জানতে পারবেন।
মুখ্য শব্দ মারওয়ানী শাখা, আরাফাতের যুদ্ধ, ‘ময়ূর বাহিনী’, রাণী কাহিনা, নোকতা
সংযোজন, ফালস (তা¤্রমুদ্রা), মাওয়ালী, মুহাফিজখানা ও রাজেন্দ্র
আব্দুল মালিক ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের মারওয়ানী শাখার প্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান ইবনে হাকামের পুত্র। তিনি
ছিলেন খলীফা হযরত উসমান (রা.)-এর ও ১ম মুয়াবিয়ার চাচাতো ভাই। আব্দুল মালিক ২৩ হিজরীতে
মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তিনি লালিত পালিত হন।
ক্ষমতায় আরোহণ
ইয়াযিদের মৃত্যুর পর তার পুত্র ২য় মুয়াবিয়া দামেস্কের খিলাফত গ্রহণ করেন কিন্তু ৩ মাস শাসনের পরই মৃত্যুবরণ করেন।
তখন খিলাফতের দায়িত্ব বর্তায় তার ভাই খালিদ এর উপর। কিন্ত খালিদ বয়সে নাবালক ছিলেন। তাই তার স্থলে অভিজ্ঞ
ও বয়োজৈষ্ঠ্য মারওয়ান ইবনে হাকাম খিলাফত গ্রহণ করেন। তিনি এই শর্তে সিংহাসন অধিকার করেন যে, খালিদ প্রাপ্ত
বয়স্ক অবস্থায় পৌঁছলে খালিদের পক্ষে সিংহাসন ছেড়ে দিতে হবে। সুচতুর মারওয়ান সিংহাসনে বসেই খালিদের বিধবা
মাতাকে বিবাহ করেন এবং তিনি তাঁর চুক্তি ভঙ্গ করে তাঁর নিজ পুত্র আব্দুল মালিককে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত
করেন। এতে খালিদের মাতা ক্রোধান্বিত হয়ে মারওয়ানকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন।
অতঃপর ৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল মালিক দামেস্কের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর খিলাফতকালকে (৬৮৫-৭০৫)
মোটামুটি ৩টি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যথা-
ক্স বিদ্রোহ দমন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা
ক্স হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান ও;
ক্স শাসন ব্যবস্থার সংস্কার ও সুদৃঢ়করণ।
মুখতারের বিদ্রোহ দমন
মুখতার ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী যিনি ইমাম হুসাইনের হত্যার প্রতিশোধকল্পে অনুশোচনাকারীদের দলে যোগ
দেন। মুখতার ইরাক, পারস্য ও আরব ভূখÐে স্বীয় প্রভাব বিস্তার করেন। ইমাম হুসাইনের হত্যাকারী শীমারসহ ২৮৪
জনকে হত্যা করেন। এই অবস্থায় আব্দুল মালিক উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে মুখতারের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। টাইগ্রীস
নদীর তীরে জাবের যুদ্ধে উবায়দুল্লাহ নিহত হন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের প্রেরিত সেনাপতি মুহাল্লাব কর্তৃক মুখতার নিহত হন।
আমরের বিদ্রোহ দমন
আমর ইবনে সাঈদ ছিলেন মারওয়ানের চাচাতো ভাই যিনি ২য় মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর দামেস্কের খিলাফত এর দাবিদার
ছিলেন। মারওয়ানের মৃত্যুর পর খালিদ বিন-ইয়াযিদ কিংবা আমর ইবনে সাইদের পরিবর্তে যখন মারওয়ানের পুত্র আব্দুল
মালিক সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন আমর বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। কয়েকটি যুদ্ধে আব্দুল মালিক আমরকে পরাজিত
করেন কিন্তু ভবিষ্যতে সিংহাসন নিষ্কন্টক রাখার জন্য তিনি আমরকে রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান ও হত্যা করেন।
মুসাবের বিদ্রোহ দমন
মুসাব ছিলেন ইরাকের শাসনকর্তা যিনি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের অধীনস্থ ছিলেন। মুসহাব মুখতারকে হত্যা করেন।
আব্দুল মালিক মুসাবের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন। যুদ্ধে স্বীয় দুই পুত্রসহ মুসহাব নিহত হন। এর ফলে ইরাকে আব্দুল
মালিকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে হত্যা
আব্দুল মালিকের নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হেজাযের খলীফা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন।
আরাফাতের যুদ্ধে আব্দুল্লাহ পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে আব্দুল মালিকের একচ্ছত্র আধিপত্য সমগ্র মুসলিম সা¤্রাজ্যে
প্রতিষ্ঠিত হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর মৃত্যুর পর খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের পুরোপুরি পরিসমাপ্তি ঘটে।
খারিজী বিদ্রোহ দমন
ইতিমধ্যে কট্টরপন্থী খারিজীগণ শাবীব-ইব্নে-ইয়াযিদের নেতৃত্বে প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা কুফা, মসুল ও
ইরাকের অন্যান্য অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খারিজীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা
করেন। অবশেষে সিরিয়া বাহিনীর সাহায্যে তাদের দমন করা সম্ভব হয়।
জানবিলের বিপর্যয়
জানবিল ছিলেন খুজিস্তানের রাজা যিনি কাবুল হতে কান্দাহার পর্যন্ত স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করেন। এটি ছিল উমাইয়া
সা¤্রাজ্যের অখÐতার প্রতি হুমকিস্বরুপ। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ জানবিলের বিরুদ্ধে ‘ময়ূর বাহিনী’ নামক একটি সুসজ্জিত
সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন আল-আসাথ ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। অভিযানটি সফল হয় এবং হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
আসাথের বিদ্রোহ দমন
জানবিলের সাফল্য উদ্বুদ্ধ হয়ে আসাথ উমাইয়া খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ইরাক ও ইরানে বিদ্রোহ দেখা দেয়
এবং তা দমনের জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ স্বয়ং অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করেন। আব্দুর রহমান-বিন-মুহাম্মদ বিন-আলআসাথ ৭০৯ খ্রিস্টাব্দে সিজিস্তানে আশ্রয় নেন। তার ময়ূর বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়।
বার্বারদের দমন
উত্তর আফ্রিকা বিজেতা উকবা বিন নাফি ৬৮৩ খ্রি: বার্বার নেতা কুসায়ল কর্তৃক নিহত হলে এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়
এবং তা স্বাধীন হয়ে যায়। আব্দুল মালিক ৬৯৩ খ্রি: হৃতরাজ্য পুন:দখলের জন্য জুহাইরের নেতৃত্বে একটি অভিযান প্রেরণ
করেন। জুহাইর গ্রীক ও বার্বার বাহিনীকে পরাজিত ও কুসায়লকে হত্যা করেন। কিন্তু তিনি ক্ষুদ্র একটা সেনাবাহিনী রেখে,
অবশিষ্ট সেনাবাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। বার্বার ও রোমানদের অতর্কিত আক্রমণে সেনাপতি
জুহাইর পরাজিত ও নিহত হন। আব্দুল মালিক তাই ক্রুব্ধ হয়ে ৬৯৮ খ্রি: হাসান বিন নোমানের অধীনে এক বিশাল বাহিনী
প্রেরণ করেন। নোমান কার্থেজ ও বার্কা দখল করেন। এভাবে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত উমাইয়া আধিপত্য পুনঃস্থাপিত হয়।
কাহিনা বিপর্যয়
কাহিনা না¤œী এক অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন নারীর সংস্পর্শে বার্বারগণ উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এক
পর্যায়ে বার্বারগণ সেনাপতি নোমানকে পরাজিত করেন। খলীফা আব্দুল মালিক হাসান বিন নোমানের সাহায্যার্থে আরেকটি
সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধে বার্বার আফ্রিকান রাণী কাহিনা পরাজিত ও নিহত হয়। প্রায় ১২,০০০ বার্বার ইসলাম ধর্ম
গ্রহণ করেন।
আব্দুল মালিকের প্রশাসনিক সংস্কার
আব্দুল মালিকের যুগ ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি সোনালীযুগ। তিনি উমাইয়া শাসনের ভিত্তি
দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কারসমূহ হচ্ছে ঃ
ওপেন স্কুল ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র
ইউনিট সাত পৃষ্ঠা-২০৩
সরকারীভাবে অফিসে আরবী ভাষার প্রচলন
ইসলাম তার প্রাথমিক যুগে কেবলমাত্র আরব ভূখÐে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর পর খুলাফায়ে রাশিদীনের
যুগ অপেক্ষা উমাইয়া শাসনামলে ইসলাম তার নিজ ভূখÐে ছাড়িযে আরো বিস্তৃতি লাভ করে। পারস্য, আর্মেনীয়া, খুরাসান,
সিরিয়া ও মিসরে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়। এতে করে আরবী ভাষার সাথে আঞ্চলিক ভাষা যেমন- পারসিক,
সিরীয়, কপটিক ইত্যাদি ভাষা সরকারি ক্ষেত্রে গোলযোগ ও সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই আব্দুল মালিক এই ভাষা সমস্যার
সমাধান ও আরব সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সরকারী ক্ষেত্রে কেবল আরবী ভাষা প্রচলন করেন। সরকারী দলিল চিঠিপত্র
ইত্যাদিতে আরবী ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন।
আরবী বর্ণলিপির উন্নতি সাধন
আরবীকে রাষ্ট্রভাষার ঘোষণার পাশাপাশি তিনি এর উৎকর্ষ বিধানে আত্মনিয়োগ করেন। ইতোপূর্বে আরবী বর্ণমালায় কোন
স্বরচিহ্ন অর্থাৎ নুক্তা ছিল না। তাই অনারব মুসলিমগণ কর্তৃক তা পঠনে অসুবিধার সম্মুখীন হতো। ইরাকের গভর্ণর
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সহযোগিতায় আব্দুল মালিক আরবি বর্ণমালায় বা লিপিতে নুক্তা সংযোজন করেন। এতে কুরআন সহজে পাঠ করা সম্ভব হয়।
আরবী মুদ্রার প্রচলন
আব্দুল মালিকের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল আরবী মুদ্রার প্রচলন। এ লক্ষে তিনি রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় টাকশাল প্রতিষ্ঠা
করেন। রোমান, পারস্য, হিমারীয় ও বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রার পরিবর্তে তিনি আরবী অক্ষর যুক্ত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা),
দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা), ও ফাল্স্(তা¤্রমুদ্রা) প্রচলন করেন। এতে করে অর্থ জাল করার প্রবণতা দূরীভূত হয় এবং ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য একক মাধ্যমের সৃষ্টি হয়।
ডাক বিভাগের সংস্কার
আব্দুল মালিক কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে প্রাদেশিক সরকারের যোগাযোগ, পত্রাদি ও নির্দেশমালা আদান প্রদানের জন্য
ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। এই সকল ঘোড়ার গাড়ি প্রয়োজনে সৈন্যদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়। ডাক বিভাগের
কর্মচারীগণ স¤্রাটের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করতেন। প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর তারা ডাকের মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রেরণ করতেন।
রাজস্ব সংস্কার
খলীফা আব্দুল মালিকের সময়ে মাওয়ালী বা নও-মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুসলিম হয়ে তারা খারায বা
জিযিয়া কর হতে অব্যাহতি পেতেন এবং যাকাত ব্যতিত আর কোন কর রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হত না। অন্যদিকে
সেনাবাহিনীতে যোগদানে তারা রাষ্ট্রকর্তৃক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতেন। এতে করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব
ঘাটতি দেখা দেয়। খলীফা আব্দুল মালিকের নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মাওয়ালীদেরকে গ্রামে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন।
তাদের উপর পূর্বেকার মতন খারায ও জিযিয়া কর আরোপ করেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও অনুর্বর জমিকে উর্বর করে ফসল
ফলানো জন্য তিনি কৃষকদের ৩ বছর মেয়াদী ঋণ প্রদান করেন। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়।
স্থাপত্য শিল্প
খলীফা আব্দুল মালিক স্থাপত্য শিল্পেও বিশেষ কৃতিত্ব রেখে গেছেন। মহানবী (সা.) যে পাথর খÐের উপর দাড়িয়ে পবিত্র
মিরাজে গমন করেন তাকে কেন্দ্র করে এর উপর তিনি আট কোনাবিশিষ্ট “কুব্বাতুস সাখরা” নির্মাণ করেন। এটি উড়সব ড়ভ
ঃযব জড়পশ নামে পরিচিত। যার নির্মাণ ৬৯১ খ্রি: সম্পন্ন হয়। এরই পাশে তিনি ‘মসজিদ-উল- আকসা’ নামে একটি মসজিদ
নির্মাণ করেন। তিনি দজলা নদীর তীরে অবস্থিত ওয়াসিত নামক একটি শহর নির্মাণ করেন। দামেস্কে মুহাফিজখানা বা
সরকারী দলিল দস্তাবেযখানা (দিওয়ান-আল-রাসায়িল) নির্মাণ করেন।
মৃত্যু ও আল-ওয়ালিদের মনোনয়ণ
২০ বছর গৌরবপূর্ণ রাজত্বের পর ৭০৫ খ্রি: ৬২ বছর বয়সে আব্দুল মালিক মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর
জৈষ্ঠ্যপুত্র আল-ওয়ালিদকে তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে যান।
খলীফা আব্দুল মালিকের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও বর্বরতার অভিযোগ থাকলেও তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও নিষ্ঠাবান
শাসক। তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল ব্যাপক। তিনি উমাইয়া বংশের স্বার্থে নিষ্ঠুর হতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি
ছিলেন উমাইয়া বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। গৃহযুদ্ধ দমন করে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রকে একটি সুষ্ঠু প্রশাসনিক
ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর কৃতিত্বের জন্য ইতিহাসে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তিনি ছিলেন রাজেন্দ্র (ঋধঃযবৎ ড়ভ
ঃযব শরহমং) কারণ পরবর্তীতে তাঁর চারপুত্র উমাইয়া সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তাই তাঁকে ঋধঃযবৎ ড়ভ ঃযব শরহমং
বলা যথার্থ।
সারসংক্ষেপ:
আব্দুল মালিক ছিলেন উমাইয়া বংশের একজন শ্রেষ্ঠতম শাসক। ব্যাপক সামরিক দক্ষতা, কূটনীতি, রাষ্ট্রজ্ঞান ও
প্রশাসনিক যোগ্যতা তাকে উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ শাসকের মর্যাদা দিয়েছে। তার স্থাপত্য রুচিবোধ ছিল প্রশংসার
দাবিদার ও উল্লেখযোগ্য। তিনি উমাইয়া সা¤্রাজ্যকে অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও গৃহযুদ্ধ হতে নিরাপদ করে রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ
ঘটান। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার জন্য তিনি ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৭.৪
১. আব্দুল মালিক উমাইয়া খিলাফতের কোন শাখায় অন্তর্ভুক্ত ?
ক) হানাফীয়া খ) মারওয়ানী গ) হাশিমী ঘ) কুরাইশ
২. আব্দুল মালিক ‘উড়সব ড়ভ ঃযব জড়পশ’ নির্মাণ করেন কেন ?
ক) মেরাজ গমনের ঘটনাকে স্মরণীয় করার জন্য খ) জেরুজালেমকে পবিত্র স্থানে পরিণত করার জন্য
গ) মক্কা শরীফের মর্যাদা কমানোর জন্য ঘ) মদিনা মসজিদের মর্যাদা কমানোর জন্য
৩. আব্দুল মালিক -
র) আরবি মুদ্রা চালু করেন রর) কুরআন সংকলন করেন
ররর) আরবি বর্ণলিপির উন্নতি করেন
নিচের কোনটি সঠিক
ক) র, রর খ) রর, ররর গ) ররর ঘ) র, ররর
৪. ‘ক’ এর আরবীয়করণ নীতি ইসলামের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ‘ক’ নিচের কোনটিকে নির্দেশ করেন ?
ক) মুয়াবিয়া খ) আব্দুল মালিক গ) আল-ওয়ালিদ ঘ) হাজ্জাজ বিন ইউসুফ
রুবি তার ইতিহাস বই পড়ে জানতে পারলো যে ‘ী’ নামক খলীফা ছিল একটি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দৃঢ় হস্তে
বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি আরবী ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দান করেন। আরবী লিপির উৎকর্ষ সাধন, আরবি
মুদ্রার প্রচলন এবং ডাক বিভাগের সংষ্কার তাঁর শাসনামলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
ক) উমাইয়া খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ? ১
খ) খলীফা আব্দুল মালিককে রাজেন্দ্র বলা হয় কেন ? ২
গ) উদ্দীপকের ‘ী’ নামক খলীফার রাজ্যবিস্তার সম্পর্কে লিখুন। ৩
ঘ ) ‘ী’ নামক খলীফা উমাইয়া খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা উক্তিটি মূল্যায়ণ করুন। ৪
সংযোজন, ফালস (তা¤্রমুদ্রা), মাওয়ালী, মুহাফিজখানা ও রাজেন্দ্র
আব্দুল মালিক ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের মারওয়ানী শাখার প্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান ইবনে হাকামের পুত্র। তিনি
ছিলেন খলীফা হযরত উসমান (রা.)-এর ও ১ম মুয়াবিয়ার চাচাতো ভাই। আব্দুল মালিক ২৩ হিজরীতে
মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তিনি লালিত পালিত হন।
ক্ষমতায় আরোহণ
ইয়াযিদের মৃত্যুর পর তার পুত্র ২য় মুয়াবিয়া দামেস্কের খিলাফত গ্রহণ করেন কিন্তু ৩ মাস শাসনের পরই মৃত্যুবরণ করেন।
তখন খিলাফতের দায়িত্ব বর্তায় তার ভাই খালিদ এর উপর। কিন্ত খালিদ বয়সে নাবালক ছিলেন। তাই তার স্থলে অভিজ্ঞ
ও বয়োজৈষ্ঠ্য মারওয়ান ইবনে হাকাম খিলাফত গ্রহণ করেন। তিনি এই শর্তে সিংহাসন অধিকার করেন যে, খালিদ প্রাপ্ত
বয়স্ক অবস্থায় পৌঁছলে খালিদের পক্ষে সিংহাসন ছেড়ে দিতে হবে। সুচতুর মারওয়ান সিংহাসনে বসেই খালিদের বিধবা
মাতাকে বিবাহ করেন এবং তিনি তাঁর চুক্তি ভঙ্গ করে তাঁর নিজ পুত্র আব্দুল মালিককে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত
করেন। এতে খালিদের মাতা ক্রোধান্বিত হয়ে মারওয়ানকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন।
অতঃপর ৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল মালিক দামেস্কের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর খিলাফতকালকে (৬৮৫-৭০৫)
মোটামুটি ৩টি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যথা-
ক্স বিদ্রোহ দমন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা
ক্স হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান ও;
ক্স শাসন ব্যবস্থার সংস্কার ও সুদৃঢ়করণ।
মুখতারের বিদ্রোহ দমন
মুখতার ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী যিনি ইমাম হুসাইনের হত্যার প্রতিশোধকল্পে অনুশোচনাকারীদের দলে যোগ
দেন। মুখতার ইরাক, পারস্য ও আরব ভূখÐে স্বীয় প্রভাব বিস্তার করেন। ইমাম হুসাইনের হত্যাকারী শীমারসহ ২৮৪
জনকে হত্যা করেন। এই অবস্থায় আব্দুল মালিক উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে মুখতারের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। টাইগ্রীস
নদীর তীরে জাবের যুদ্ধে উবায়দুল্লাহ নিহত হন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের প্রেরিত সেনাপতি মুহাল্লাব কর্তৃক মুখতার নিহত হন।
আমরের বিদ্রোহ দমন
আমর ইবনে সাঈদ ছিলেন মারওয়ানের চাচাতো ভাই যিনি ২য় মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর দামেস্কের খিলাফত এর দাবিদার
ছিলেন। মারওয়ানের মৃত্যুর পর খালিদ বিন-ইয়াযিদ কিংবা আমর ইবনে সাইদের পরিবর্তে যখন মারওয়ানের পুত্র আব্দুল
মালিক সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন আমর বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। কয়েকটি যুদ্ধে আব্দুল মালিক আমরকে পরাজিত
করেন কিন্তু ভবিষ্যতে সিংহাসন নিষ্কন্টক রাখার জন্য তিনি আমরকে রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান ও হত্যা করেন।
মুসাবের বিদ্রোহ দমন
মুসাব ছিলেন ইরাকের শাসনকর্তা যিনি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের অধীনস্থ ছিলেন। মুসহাব মুখতারকে হত্যা করেন।
আব্দুল মালিক মুসাবের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন। যুদ্ধে স্বীয় দুই পুত্রসহ মুসহাব নিহত হন। এর ফলে ইরাকে আব্দুল
মালিকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরকে হত্যা
আব্দুল মালিকের নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হেজাযের খলীফা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন।
আরাফাতের যুদ্ধে আব্দুল্লাহ পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে আব্দুল মালিকের একচ্ছত্র আধিপত্য সমগ্র মুসলিম সা¤্রাজ্যে
প্রতিষ্ঠিত হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর মৃত্যুর পর খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের পুরোপুরি পরিসমাপ্তি ঘটে।
খারিজী বিদ্রোহ দমন
ইতিমধ্যে কট্টরপন্থী খারিজীগণ শাবীব-ইব্নে-ইয়াযিদের নেতৃত্বে প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা কুফা, মসুল ও
ইরাকের অন্যান্য অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খারিজীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা
করেন। অবশেষে সিরিয়া বাহিনীর সাহায্যে তাদের দমন করা সম্ভব হয়।
জানবিলের বিপর্যয়
জানবিল ছিলেন খুজিস্তানের রাজা যিনি কাবুল হতে কান্দাহার পর্যন্ত স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করেন। এটি ছিল উমাইয়া
সা¤্রাজ্যের অখÐতার প্রতি হুমকিস্বরুপ। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ জানবিলের বিরুদ্ধে ‘ময়ূর বাহিনী’ নামক একটি সুসজ্জিত
সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন আল-আসাথ ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। অভিযানটি সফল হয় এবং হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
আসাথের বিদ্রোহ দমন
জানবিলের সাফল্য উদ্বুদ্ধ হয়ে আসাথ উমাইয়া খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ইরাক ও ইরানে বিদ্রোহ দেখা দেয়
এবং তা দমনের জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফ স্বয়ং অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করেন। আব্দুর রহমান-বিন-মুহাম্মদ বিন-আলআসাথ ৭০৯ খ্রিস্টাব্দে সিজিস্তানে আশ্রয় নেন। তার ময়ূর বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়।
বার্বারদের দমন
উত্তর আফ্রিকা বিজেতা উকবা বিন নাফি ৬৮৩ খ্রি: বার্বার নেতা কুসায়ল কর্তৃক নিহত হলে এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়
এবং তা স্বাধীন হয়ে যায়। আব্দুল মালিক ৬৯৩ খ্রি: হৃতরাজ্য পুন:দখলের জন্য জুহাইরের নেতৃত্বে একটি অভিযান প্রেরণ
করেন। জুহাইর গ্রীক ও বার্বার বাহিনীকে পরাজিত ও কুসায়লকে হত্যা করেন। কিন্তু তিনি ক্ষুদ্র একটা সেনাবাহিনী রেখে,
অবশিষ্ট সেনাবাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন। বার্বার ও রোমানদের অতর্কিত আক্রমণে সেনাপতি
জুহাইর পরাজিত ও নিহত হন। আব্দুল মালিক তাই ক্রুব্ধ হয়ে ৬৯৮ খ্রি: হাসান বিন নোমানের অধীনে এক বিশাল বাহিনী
প্রেরণ করেন। নোমান কার্থেজ ও বার্কা দখল করেন। এভাবে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত উমাইয়া আধিপত্য পুনঃস্থাপিত হয়।
কাহিনা বিপর্যয়
কাহিনা না¤œী এক অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন নারীর সংস্পর্শে বার্বারগণ উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এক
পর্যায়ে বার্বারগণ সেনাপতি নোমানকে পরাজিত করেন। খলীফা আব্দুল মালিক হাসান বিন নোমানের সাহায্যার্থে আরেকটি
সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধে বার্বার আফ্রিকান রাণী কাহিনা পরাজিত ও নিহত হয়। প্রায় ১২,০০০ বার্বার ইসলাম ধর্ম
গ্রহণ করেন।
আব্দুল মালিকের প্রশাসনিক সংস্কার
আব্দুল মালিকের যুগ ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি সোনালীযুগ। তিনি উমাইয়া শাসনের ভিত্তি
দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করেন। তার উল্লেখযোগ্য সংস্কারসমূহ হচ্ছে ঃ
ওপেন স্কুল ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র
ইউনিট সাত পৃষ্ঠা-২০৩
সরকারীভাবে অফিসে আরবী ভাষার প্রচলন
ইসলাম তার প্রাথমিক যুগে কেবলমাত্র আরব ভূখÐে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রাসূল (সা.) এর মৃত্যুর পর খুলাফায়ে রাশিদীনের
যুগ অপেক্ষা উমাইয়া শাসনামলে ইসলাম তার নিজ ভূখÐে ছাড়িযে আরো বিস্তৃতি লাভ করে। পারস্য, আর্মেনীয়া, খুরাসান,
সিরিয়া ও মিসরে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়। এতে করে আরবী ভাষার সাথে আঞ্চলিক ভাষা যেমন- পারসিক,
সিরীয়, কপটিক ইত্যাদি ভাষা সরকারি ক্ষেত্রে গোলযোগ ও সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই আব্দুল মালিক এই ভাষা সমস্যার
সমাধান ও আরব সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সরকারী ক্ষেত্রে কেবল আরবী ভাষা প্রচলন করেন। সরকারী দলিল চিঠিপত্র
ইত্যাদিতে আরবী ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন।
আরবী বর্ণলিপির উন্নতি সাধন
আরবীকে রাষ্ট্রভাষার ঘোষণার পাশাপাশি তিনি এর উৎকর্ষ বিধানে আত্মনিয়োগ করেন। ইতোপূর্বে আরবী বর্ণমালায় কোন
স্বরচিহ্ন অর্থাৎ নুক্তা ছিল না। তাই অনারব মুসলিমগণ কর্তৃক তা পঠনে অসুবিধার সম্মুখীন হতো। ইরাকের গভর্ণর
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সহযোগিতায় আব্দুল মালিক আরবি বর্ণমালায় বা লিপিতে নুক্তা সংযোজন করেন। এতে কুরআন সহজে পাঠ করা সম্ভব হয়।
আরবী মুদ্রার প্রচলন
আব্দুল মালিকের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল আরবী মুদ্রার প্রচলন। এ লক্ষে তিনি রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় টাকশাল প্রতিষ্ঠা
করেন। রোমান, পারস্য, হিমারীয় ও বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রার পরিবর্তে তিনি আরবী অক্ষর যুক্ত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা),
দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা), ও ফাল্স্(তা¤্রমুদ্রা) প্রচলন করেন। এতে করে অর্থ জাল করার প্রবণতা দূরীভূত হয় এবং ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য একক মাধ্যমের সৃষ্টি হয়।
ডাক বিভাগের সংস্কার
আব্দুল মালিক কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে প্রাদেশিক সরকারের যোগাযোগ, পত্রাদি ও নির্দেশমালা আদান প্রদানের জন্য
ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। এই সকল ঘোড়ার গাড়ি প্রয়োজনে সৈন্যদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়। ডাক বিভাগের
কর্মচারীগণ স¤্রাটের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করতেন। প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর তারা ডাকের মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রেরণ করতেন।
রাজস্ব সংস্কার
খলীফা আব্দুল মালিকের সময়ে মাওয়ালী বা নও-মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুসলিম হয়ে তারা খারায বা
জিযিয়া কর হতে অব্যাহতি পেতেন এবং যাকাত ব্যতিত আর কোন কর রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হত না। অন্যদিকে
সেনাবাহিনীতে যোগদানে তারা রাষ্ট্রকর্তৃক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতেন। এতে করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব
ঘাটতি দেখা দেয়। খলীফা আব্দুল মালিকের নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মাওয়ালীদেরকে গ্রামে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন।
তাদের উপর পূর্বেকার মতন খারায ও জিযিয়া কর আরোপ করেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও অনুর্বর জমিকে উর্বর করে ফসল
ফলানো জন্য তিনি কৃষকদের ৩ বছর মেয়াদী ঋণ প্রদান করেন। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়।
স্থাপত্য শিল্প
খলীফা আব্দুল মালিক স্থাপত্য শিল্পেও বিশেষ কৃতিত্ব রেখে গেছেন। মহানবী (সা.) যে পাথর খÐের উপর দাড়িয়ে পবিত্র
মিরাজে গমন করেন তাকে কেন্দ্র করে এর উপর তিনি আট কোনাবিশিষ্ট “কুব্বাতুস সাখরা” নির্মাণ করেন। এটি উড়সব ড়ভ
ঃযব জড়পশ নামে পরিচিত। যার নির্মাণ ৬৯১ খ্রি: সম্পন্ন হয়। এরই পাশে তিনি ‘মসজিদ-উল- আকসা’ নামে একটি মসজিদ
নির্মাণ করেন। তিনি দজলা নদীর তীরে অবস্থিত ওয়াসিত নামক একটি শহর নির্মাণ করেন। দামেস্কে মুহাফিজখানা বা
সরকারী দলিল দস্তাবেযখানা (দিওয়ান-আল-রাসায়িল) নির্মাণ করেন।
মৃত্যু ও আল-ওয়ালিদের মনোনয়ণ
২০ বছর গৌরবপূর্ণ রাজত্বের পর ৭০৫ খ্রি: ৬২ বছর বয়সে আব্দুল মালিক মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর
জৈষ্ঠ্যপুত্র আল-ওয়ালিদকে তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে যান।
খলীফা আব্দুল মালিকের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও বর্বরতার অভিযোগ থাকলেও তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও নিষ্ঠাবান
শাসক। তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল ব্যাপক। তিনি উমাইয়া বংশের স্বার্থে নিষ্ঠুর হতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি
ছিলেন উমাইয়া বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। গৃহযুদ্ধ দমন করে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রকে একটি সুষ্ঠু প্রশাসনিক
ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর কৃতিত্বের জন্য ইতিহাসে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তিনি ছিলেন রাজেন্দ্র (ঋধঃযবৎ ড়ভ
ঃযব শরহমং) কারণ পরবর্তীতে তাঁর চারপুত্র উমাইয়া সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তাই তাঁকে ঋধঃযবৎ ড়ভ ঃযব শরহমং
বলা যথার্থ।
সারসংক্ষেপ:
আব্দুল মালিক ছিলেন উমাইয়া বংশের একজন শ্রেষ্ঠতম শাসক। ব্যাপক সামরিক দক্ষতা, কূটনীতি, রাষ্ট্রজ্ঞান ও
প্রশাসনিক যোগ্যতা তাকে উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ শাসকের মর্যাদা দিয়েছে। তার স্থাপত্য রুচিবোধ ছিল প্রশংসার
দাবিদার ও উল্লেখযোগ্য। তিনি উমাইয়া সা¤্রাজ্যকে অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও গৃহযুদ্ধ হতে নিরাপদ করে রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ
ঘটান। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার জন্য তিনি ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৭.৪
১. আব্দুল মালিক উমাইয়া খিলাফতের কোন শাখায় অন্তর্ভুক্ত ?
ক) হানাফীয়া খ) মারওয়ানী গ) হাশিমী ঘ) কুরাইশ
২. আব্দুল মালিক ‘উড়সব ড়ভ ঃযব জড়পশ’ নির্মাণ করেন কেন ?
ক) মেরাজ গমনের ঘটনাকে স্মরণীয় করার জন্য খ) জেরুজালেমকে পবিত্র স্থানে পরিণত করার জন্য
গ) মক্কা শরীফের মর্যাদা কমানোর জন্য ঘ) মদিনা মসজিদের মর্যাদা কমানোর জন্য
৩. আব্দুল মালিক -
র) আরবি মুদ্রা চালু করেন রর) কুরআন সংকলন করেন
ররর) আরবি বর্ণলিপির উন্নতি করেন
নিচের কোনটি সঠিক
ক) র, রর খ) রর, ররর গ) ররর ঘ) র, ররর
৪. ‘ক’ এর আরবীয়করণ নীতি ইসলামের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ‘ক’ নিচের কোনটিকে নির্দেশ করেন ?
ক) মুয়াবিয়া খ) আব্দুল মালিক গ) আল-ওয়ালিদ ঘ) হাজ্জাজ বিন ইউসুফ
রুবি তার ইতিহাস বই পড়ে জানতে পারলো যে ‘ী’ নামক খলীফা ছিল একটি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দৃঢ় হস্তে
বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি আরবী ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দান করেন। আরবী লিপির উৎকর্ষ সাধন, আরবি
মুদ্রার প্রচলন এবং ডাক বিভাগের সংষ্কার তাঁর শাসনামলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
ক) উমাইয়া খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে ? ১
খ) খলীফা আব্দুল মালিককে রাজেন্দ্র বলা হয় কেন ? ২
গ) উদ্দীপকের ‘ী’ নামক খলীফার রাজ্যবিস্তার সম্পর্কে লিখুন। ৩
ঘ ) ‘ী’ নামক খলীফা উমাইয়া খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা উক্তিটি মূল্যায়ণ করুন। ৪