তৃতীয় আব্দুর রহমানের পরিচয়, তাঁর অভ্যন্তরীণ নীতি ও বিদ্রোহ দমনের বৈদেশিক নীতি এবং খ্রিস্টান ও ফাতিমিদের সাথে সংঘর্ষের
মুখ্য শব্দ স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা, বোবাস্ট্রের পতন, খলিফা ও আমীর-উলমুমিনীন উপাধি গ্রহণ, কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যাল ও আল-যাহ্রা প্রাসাদ
পিতামহ আবদুল্লাহ্র মৃত্যুর পর আব্দুর রহমান আল-নাসির ৯১২ সালে ২২ বছর বয়সে স্পেনের সিংহাসন
লাভ করেন। স্পেনের ইতিহাসে তিনি তৃতীয় আব্দুর রহমান নামে পরিচিত। তিনি যখন সিংহাসন লাভ করেন
তখন স্পেনে যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ ও বিশৃংখলার কারণে কোন নিরাপত্তা ছিলনা। তিনি প্রায় ৪৯ বছর শাসনকালে (৯১২-৬১)
স্বীয় প্রতিভাবলে সর্বপ্রকার বিশৃংখলা দূর করে স্পেনকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যান। এজন্য তাঁকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের
ত্রাণকর্তা () বলা হয়। ) বলেন,
তৃতীয় আব্দুর রহমানের নীতি : সিংহাসন লাভ করার পর তিনি কতগুলো নতুন নীতি গ্রহণ করেন। যেমন: বিদ্রোহীদের
বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আরব আভিজাত্য খর্ব করার জন্য বিদেশীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, বিদ্রোহী নেতা ও
সর্দারদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা এবং উত্তর ও দক্ষিণের সীমান্ত সংরক্ষণ।
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন : তিনি হাজ্জাজ বংশের মুহম্মদ ও তার ভাতিজা আহমদ বিন মাসলামাহকে পরাজিত করে
সেভিল ও কারমোনায় কর্ডোভার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গোয়াদালকুইভার নদীর তীরে টোলক্স দুর্গে বোবাস্ট্রের
অধিপতি উমর বিন হাফ্সুনকে পরাজিত করে দুর্গটি দখল করেন। ৯১৭ সালে উমর বিন হাফ্সুনের মৃত্যু হয়। এরপর
কিছুকাল বোবাস্ট্র তাঁর পুত্রদের অধীনে থাকলেও ৯২৮ সালে পুরোপুরিভাবে এর পতন ঘটে। তিনি তুদমির, মেরিদা,
বেজা, জায়েন ও এল্ভিরার বিশৃংখলা দূর করে শান্তি স্থাপন করেন। টলেডোর বনু কাসী, বার্বার, নও-মুসলিম ও স্পেনীয়রা
তাঁর অধীনতা অস্বীকার করলে টলেডো অবরোধ করা হয় এবং দীর্ঘদিন অবরোধের পর টলেডো তাঁর অধীনে আসে।
খ্রিস্টানদের সাথে সংঘর্ষ : ৯১৪ সালে লিওনের রাজা দ্বিতীয় ওরডোনা মেরিদা আক্রমণ করলে আব্দুর রহমান তাঁকে
পরাস্ত করেন। পরাজিত হয়ে তিনি নাভারের রাজা সাঞ্চোর সাথে মিলিত হয়ে মুসলিম রাজ্যে আক্রমণ চালালে ৯২০ সালে
তিনি তাঁদেরকেও পরাজিত করেন। ৯২৪ সালে সাঞ্চোর রাজধানী পাম্পলোনা তাঁর অধিকারে আসে। ৯২৫ সালে
ওরডোনার মৃত্যুর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় রামিরো লিওনের সিংহাসন লাভ করেন। সারাগোসার মুসলিম গভর্নরের সাথে তিনি
ষড়যন্ত্র করে আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলে তিনি বিদ্রোহী গভর্নরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। ৯৫০ সালে
দ্বিতীয় রামিরোর পুত্র তৃতীয় ওরডোনা মুসলিমদের দ্বারা অক্রান্ত হয়ে তৃতীয় আব্দুর রহমানের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
৯৬০ সালে সাঞ্চো খলিফার সাথে মিত্রতা স্থাপন করে লিওনের রাজা চতুর্থ ওরডোনাকে পরাস্ত করেন এবং খলিফার প্রতি
আনুগত্য স্বীকার করে লিওন ও নাভারেতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে লিওন ও নাভারে তাঁর করদ-রাজ্যে পরিণত হয়।
ফাতিমিদের সাথে সংঘর্ষ : ফাতিমি খলিফা উবায়দুল্লাহ্ আল-মাহ্দী উমর বিন হাফ্সুনের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে স্পেন
আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। উবায়দুল্লাহ্ আল-মাহ্দী স্পেনে ফাতিমি মতবাদ প্রচারের লক্ষ্যে একদল দক্ষ গুপ্তচর ও
প্রচারক প্রেরণ করেন। তৃতীয় আব্দুর রহমান এ অবস্থা মোকাবিলায় ৯৩১ সালে সিউটা দখল করেন এবং উত্তর আফ্রিকার
নেতৃস্থানীয় বার্বার জানাতা গোত্র, শিয়া ইদ্রিসীয় এবং ইবাদিয়া খারিজি নেতাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে ফাতিমিদের
প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। ৯৫২ সালে ফাতিমি খলিফা আল-মুইয স্পেনের উমাইয়া মিত্রদের উত্তর আফ্রিকা হতে বিতাড়িত
করেন। ৯৫৫ সালে তৃতীয় আব্দুর রহমানের আলেকজান্দ্রিয়াগামী একটি বাণিজ্য জাহাজ আল-মুইযের মাহ্দীয়াগামী একটি
সিসিলিয় জাহাজকে বিধ্বস্ত করে। আল-মুইযও সিসিলির শাসনকর্তা হাসান বিন আলীর মাধ্যমে স্পেনের উপকূল আক্রমণ
করেন, আলমেরিয়া বিধ্বস্ত করেন এবং অনেক স্পেনীয় জাহাজ দখল করেন । প্রত্যুত্তরে খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানও
গালিব ও আহম্মদ বিন ইয়ালার মাধ্যমে আফ্রিকার উপকূলে দুবার অভিযান চালান।
বৈদেশিক নীতি : তিনি একজন অমায়িক, ন্যায়পরায়ন, প্রজাহিতৈষী, ন¤্র ও উদার শাসক ছিলেন বলে তাঁর খ্যাতি দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কনস্টানটিনোপোল, জার্মান, ইতালি ও ফ্রান্সের নরপতিগণ তাঁর দরবারে দূত প্রেরণ করে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিলেন।
সেনাবাহিনী পুনর্গঠন : তিনি বার্বার, ¯øাভ, আরব ও খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করেন। সেনাবাহিনীতে প্রায়
দেড় লক্ষ নিয়মিত ও অসংখ্য অনিয়মিত সৈন্য ছিল। তাঁর সেনাবাহিনী তৎকালীন জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল।
‘খলিফা’ উপাধি গ্রহণ : তাঁর আগে স্পেনের শাসকগণ আমীর ও সুলতান উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ৯২৯ সালে
তিনি ‘খলিফা’ ও ‘আমীর-উল-মুমিনীন’ উপাধি গ্রহণ করেন। একদিকে বাগদাদের ক্ষয়িষ্ণু সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফত এবং
অন্যদিকে মিসরের প্রতিদ্ধ›িদ্ব শিয়া ফাতিমি খিলাফতের প্রাধান্য তাঁর ‘খলিফা’ উপাধি গ্রহণের মূল কারণ। তাছাড়া শাসক
হিসেবেও তিনি সমসাময়িক মুসলিম শাসকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং খলিফা হবার সব গুণাবলী তাঁর মধ্যে ছিল।
কৃষি : তাঁর সময় কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর দাম কম ছিল। সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি ছিলনা।
ইবনে হাওকল বলেন যে, ফলমূল এত সস্তায় বিক্রয় হত যে মনে হত কোন মূল্যই নেই। উন্নতমানের শস্য উৎপাদনের
জন্য কৃষি ও উদ্যানবিদ্যায় নতুন নতুন কৌশল আনয়ন করা হয়। ফলে তাঁর সময় উন্নত চাষাবাদ ও উচ্চ ফলনমূলক বাগান
গড়ে ওঠে। অনুর্বর, অসমতল ও পাহাড়ী ভূমিকে চাষের আওতায় আনা হয়। কৃষি কাজের জন্য পাথরের মধ্য দিয়ে খাল
কেটে সেচের ব্যবস্থা করা হয়। খাদ্য সামগ্রীর প্রাচুর্য ও স্বল্প মূল্যের কারণে মুসলিম স্পেনের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটিতে
যেখানে শুধু কর্ডোভার লোকসংখ্যাই ছিল ১০ লক্ষের বেশি।
শিল্প : কৃষির উন্নতির ফলে স্পেনে শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। কারণ শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয় কাঁচামালের যা আসে কৃষি
থেকে। স্পেনের বিভিন্ন শহরে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। কর্ডোভা, সেভিল ও অন্যান্য শহরে সিল্ক, সুতা, পশম, চামড়া ও
ধাতব এর অসংখ্য শিল্প গড়ে ওঠে। একটি মাত্র প্রদেশেই ৩ হাজার গ্রাম গুটি পোকার লালন-পালনের ব্যবসার সাথে
সম্পৃক্ত ছিল। শুধু কর্ডোভাতেই ১৩ হাজার তাঁতী ছিল। তরবারী, বর্ম, প্রদীপ ও লোহার দরজা তৈরির ক্ষেত্রে স্পেনের
ধাতব শিল্পীদের বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। ইউরোপের বাজারে কর্ডোভার চামড়াজাত পণ্যও সমান ভাবে খ্যাতি লাভ
করেছিল। উন্নতমানের কার্পেট ও নক্শীকরা কাপড়ের সমাদর ছিল পৃথিবীর সর্বত্র।
ব্যবসা-বাণিজ্য : স্পেনের ব্যবসা-বাণিজ্য দামেস্ক ও বাগদাদ থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ছিল। দামেস্ক ও বাগদাদের
ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশিরভাগ উট-বাহিত ছিল। কিন্তু কর্ডোভার ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশিরভাগ পরিচালিত হত বাণিজ্যিক
জাহাজের মাধ্যমে। ১ হাজারেরও বেশি বাণিজ্য জাহাজের মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালিত হত। বাণিজ্য পণ্য বিক্রয়ের জন্য
বিভিন্ন জায়গায় এজেন্সি গড়ে তোলা হত। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির ফলে বার্ষিক রাজস্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি : তৃতীয় আব্দুর রহমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এ সময়
উন্নয়ন সাধিত হয়। তাঁর সময় দর্শনে ইবনে মার্সারাহ, ইতিহাসে ইবনে আল-আহ্মার ও ইবনে আল-কুতিয়া,
জোতির্বিদ্যায় আহমদ বিন নসর ও মাসলামাহ বিন আল-কাসিম, চিকিৎসাবিদ্যায় আরিব বিন সাইদ ও ইয়াহিয়া বিন
ইসহাক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি কর্ডোভা মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেন।
স্থাপত্য শিল্প : তাঁর সময় কর্ডোভায় অসংখ্য মসজিদ, প্রাসাদ, গৃহ ও হাম্মামখানা ছিল। এ সময় বিশ্বে কর্ডোভার স্থান ছিল
বাগদাদ ও কনস্টানটিনোপোলের পরই। আল-যাহ্রা প্রসাদ ছিল তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কর্ম। তাঁর উপপতœী
আল-যাহ্রার নামে এর নামকরণ করা হয়। এছাড়া তিনি কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্য বর্ধন করেন।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের শাসনকাল স্পেনের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তাঁকে ভারতের আকবর, আরবের খলিফা হযরত
উমর ফারুক (রা.) এবং বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদের সাথে তুলনা করা হয়। তিনি শুধু স্পেনের উমাইয়া
শাসকদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন।
সারসংক্ষেপ:
তৃতীয় আব্দুর রহমানের শাসনকাল স্পেনের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তাঁকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা
হয়। তিনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে স্পেনে মুসলিম শাসন সুসংহত করেন।। তাঁর সেনাবাহিনী তৎকালীন
জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল। তিনি ‘খলিফা’ ও ‘আমীর-উল-মুমিনীন’ উপাধি গ্রহণ করেন। কৃষি, শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যে স্পেন ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধি লাভ করে তাঁর সময়ে। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্পে এসময় কর্ডোভার খ্যাতি ছিল
বিশ্বজোড়া। তিনি কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আল-যাহ্রা প্রাসাদ তাঁর একটি অসামান্য নির্মাণ-কর্ম।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৯.৯
১. কাকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা?
(ক) প্রথম আব্দুর রহমান-কে (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান-কে
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান-কে (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম-কে
২. কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন কে?
(ক) প্রথম আব্দুর রহমান (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম
৩. আল-যাহ্রা প্রসাদ কে নির্মাণ করেন?
(ক) প্রথম হিশাম (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম
সৃজনশীল প্রশ্ন:
স¤্রাট আকবরের শাসনকাল ভারতের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তিনি শুধু মুঘল শাসকদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বিশ্বের
শ্রেষ্ঠ রাজাদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন। তিনি বিভিন্ন দিক দিয়ে রাষ্ট্রের বৈষয়িক উন্নতি সাধন করেন।
ক. কাকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা হয়? ১
খ. তৃতীয় আব্দুর রহমানের সাথে খ্রিস্টানদের সংঘর্ষ আলোচনা করুন। ২
গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত স¤্রাট আকবরের মত স্পেনের কোন শাসক উমাইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন? ব্যাখ্যা করুন। ৩
ঘ. তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় স্পেনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির বিবরণ দিন। ৪
পিতামহ আবদুল্লাহ্র মৃত্যুর পর আব্দুর রহমান আল-নাসির ৯১২ সালে ২২ বছর বয়সে স্পেনের সিংহাসন
লাভ করেন। স্পেনের ইতিহাসে তিনি তৃতীয় আব্দুর রহমান নামে পরিচিত। তিনি যখন সিংহাসন লাভ করেন
তখন স্পেনে যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ ও বিশৃংখলার কারণে কোন নিরাপত্তা ছিলনা। তিনি প্রায় ৪৯ বছর শাসনকালে (৯১২-৬১)
স্বীয় প্রতিভাবলে সর্বপ্রকার বিশৃংখলা দূর করে স্পেনকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যান। এজন্য তাঁকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের
ত্রাণকর্তা () বলা হয়। ) বলেন,
তৃতীয় আব্দুর রহমানের নীতি : সিংহাসন লাভ করার পর তিনি কতগুলো নতুন নীতি গ্রহণ করেন। যেমন: বিদ্রোহীদের
বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, আরব আভিজাত্য খর্ব করার জন্য বিদেশীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ, বিদ্রোহী নেতা ও
সর্দারদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা এবং উত্তর ও দক্ষিণের সীমান্ত সংরক্ষণ।
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন : তিনি হাজ্জাজ বংশের মুহম্মদ ও তার ভাতিজা আহমদ বিন মাসলামাহকে পরাজিত করে
সেভিল ও কারমোনায় কর্ডোভার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গোয়াদালকুইভার নদীর তীরে টোলক্স দুর্গে বোবাস্ট্রের
অধিপতি উমর বিন হাফ্সুনকে পরাজিত করে দুর্গটি দখল করেন। ৯১৭ সালে উমর বিন হাফ্সুনের মৃত্যু হয়। এরপর
কিছুকাল বোবাস্ট্র তাঁর পুত্রদের অধীনে থাকলেও ৯২৮ সালে পুরোপুরিভাবে এর পতন ঘটে। তিনি তুদমির, মেরিদা,
বেজা, জায়েন ও এল্ভিরার বিশৃংখলা দূর করে শান্তি স্থাপন করেন। টলেডোর বনু কাসী, বার্বার, নও-মুসলিম ও স্পেনীয়রা
তাঁর অধীনতা অস্বীকার করলে টলেডো অবরোধ করা হয় এবং দীর্ঘদিন অবরোধের পর টলেডো তাঁর অধীনে আসে।
খ্রিস্টানদের সাথে সংঘর্ষ : ৯১৪ সালে লিওনের রাজা দ্বিতীয় ওরডোনা মেরিদা আক্রমণ করলে আব্দুর রহমান তাঁকে
পরাস্ত করেন। পরাজিত হয়ে তিনি নাভারের রাজা সাঞ্চোর সাথে মিলিত হয়ে মুসলিম রাজ্যে আক্রমণ চালালে ৯২০ সালে
তিনি তাঁদেরকেও পরাজিত করেন। ৯২৪ সালে সাঞ্চোর রাজধানী পাম্পলোনা তাঁর অধিকারে আসে। ৯২৫ সালে
ওরডোনার মৃত্যুর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় রামিরো লিওনের সিংহাসন লাভ করেন। সারাগোসার মুসলিম গভর্নরের সাথে তিনি
ষড়যন্ত্র করে আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করলে তিনি বিদ্রোহী গভর্নরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। ৯৫০ সালে
দ্বিতীয় রামিরোর পুত্র তৃতীয় ওরডোনা মুসলিমদের দ্বারা অক্রান্ত হয়ে তৃতীয় আব্দুর রহমানের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।
৯৬০ সালে সাঞ্চো খলিফার সাথে মিত্রতা স্থাপন করে লিওনের রাজা চতুর্থ ওরডোনাকে পরাস্ত করেন এবং খলিফার প্রতি
আনুগত্য স্বীকার করে লিওন ও নাভারেতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে লিওন ও নাভারে তাঁর করদ-রাজ্যে পরিণত হয়।
ফাতিমিদের সাথে সংঘর্ষ : ফাতিমি খলিফা উবায়দুল্লাহ্ আল-মাহ্দী উমর বিন হাফ্সুনের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে স্পেন
আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। উবায়দুল্লাহ্ আল-মাহ্দী স্পেনে ফাতিমি মতবাদ প্রচারের লক্ষ্যে একদল দক্ষ গুপ্তচর ও
প্রচারক প্রেরণ করেন। তৃতীয় আব্দুর রহমান এ অবস্থা মোকাবিলায় ৯৩১ সালে সিউটা দখল করেন এবং উত্তর আফ্রিকার
নেতৃস্থানীয় বার্বার জানাতা গোত্র, শিয়া ইদ্রিসীয় এবং ইবাদিয়া খারিজি নেতাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে ফাতিমিদের
প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। ৯৫২ সালে ফাতিমি খলিফা আল-মুইয স্পেনের উমাইয়া মিত্রদের উত্তর আফ্রিকা হতে বিতাড়িত
করেন। ৯৫৫ সালে তৃতীয় আব্দুর রহমানের আলেকজান্দ্রিয়াগামী একটি বাণিজ্য জাহাজ আল-মুইযের মাহ্দীয়াগামী একটি
সিসিলিয় জাহাজকে বিধ্বস্ত করে। আল-মুইযও সিসিলির শাসনকর্তা হাসান বিন আলীর মাধ্যমে স্পেনের উপকূল আক্রমণ
করেন, আলমেরিয়া বিধ্বস্ত করেন এবং অনেক স্পেনীয় জাহাজ দখল করেন । প্রত্যুত্তরে খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানও
গালিব ও আহম্মদ বিন ইয়ালার মাধ্যমে আফ্রিকার উপকূলে দুবার অভিযান চালান।
বৈদেশিক নীতি : তিনি একজন অমায়িক, ন্যায়পরায়ন, প্রজাহিতৈষী, ন¤্র ও উদার শাসক ছিলেন বলে তাঁর খ্যাতি দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কনস্টানটিনোপোল, জার্মান, ইতালি ও ফ্রান্সের নরপতিগণ তাঁর দরবারে দূত প্রেরণ করে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিলেন।
সেনাবাহিনী পুনর্গঠন : তিনি বার্বার, ¯øাভ, আরব ও খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করেন। সেনাবাহিনীতে প্রায়
দেড় লক্ষ নিয়মিত ও অসংখ্য অনিয়মিত সৈন্য ছিল। তাঁর সেনাবাহিনী তৎকালীন জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল।
‘খলিফা’ উপাধি গ্রহণ : তাঁর আগে স্পেনের শাসকগণ আমীর ও সুলতান উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ৯২৯ সালে
তিনি ‘খলিফা’ ও ‘আমীর-উল-মুমিনীন’ উপাধি গ্রহণ করেন। একদিকে বাগদাদের ক্ষয়িষ্ণু সুন্নি আব্বাসীয় খিলাফত এবং
অন্যদিকে মিসরের প্রতিদ্ধ›িদ্ব শিয়া ফাতিমি খিলাফতের প্রাধান্য তাঁর ‘খলিফা’ উপাধি গ্রহণের মূল কারণ। তাছাড়া শাসক
হিসেবেও তিনি সমসাময়িক মুসলিম শাসকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং খলিফা হবার সব গুণাবলী তাঁর মধ্যে ছিল।
কৃষি : তাঁর সময় কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর দাম কম ছিল। সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি ছিলনা।
ইবনে হাওকল বলেন যে, ফলমূল এত সস্তায় বিক্রয় হত যে মনে হত কোন মূল্যই নেই। উন্নতমানের শস্য উৎপাদনের
জন্য কৃষি ও উদ্যানবিদ্যায় নতুন নতুন কৌশল আনয়ন করা হয়। ফলে তাঁর সময় উন্নত চাষাবাদ ও উচ্চ ফলনমূলক বাগান
গড়ে ওঠে। অনুর্বর, অসমতল ও পাহাড়ী ভূমিকে চাষের আওতায় আনা হয়। কৃষি কাজের জন্য পাথরের মধ্য দিয়ে খাল
কেটে সেচের ব্যবস্থা করা হয়। খাদ্য সামগ্রীর প্রাচুর্য ও স্বল্প মূল্যের কারণে মুসলিম স্পেনের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটিতে
যেখানে শুধু কর্ডোভার লোকসংখ্যাই ছিল ১০ লক্ষের বেশি।
শিল্প : কৃষির উন্নতির ফলে স্পেনে শিল্পেরও বিকাশ ঘটে। কারণ শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয় কাঁচামালের যা আসে কৃষি
থেকে। স্পেনের বিভিন্ন শহরে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। কর্ডোভা, সেভিল ও অন্যান্য শহরে সিল্ক, সুতা, পশম, চামড়া ও
ধাতব এর অসংখ্য শিল্প গড়ে ওঠে। একটি মাত্র প্রদেশেই ৩ হাজার গ্রাম গুটি পোকার লালন-পালনের ব্যবসার সাথে
সম্পৃক্ত ছিল। শুধু কর্ডোভাতেই ১৩ হাজার তাঁতী ছিল। তরবারী, বর্ম, প্রদীপ ও লোহার দরজা তৈরির ক্ষেত্রে স্পেনের
ধাতব শিল্পীদের বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। ইউরোপের বাজারে কর্ডোভার চামড়াজাত পণ্যও সমান ভাবে খ্যাতি লাভ
করেছিল। উন্নতমানের কার্পেট ও নক্শীকরা কাপড়ের সমাদর ছিল পৃথিবীর সর্বত্র।
ব্যবসা-বাণিজ্য : স্পেনের ব্যবসা-বাণিজ্য দামেস্ক ও বাগদাদ থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ছিল। দামেস্ক ও বাগদাদের
ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশিরভাগ উট-বাহিত ছিল। কিন্তু কর্ডোভার ব্যবসা-বাণিজ্যের বেশিরভাগ পরিচালিত হত বাণিজ্যিক
জাহাজের মাধ্যমে। ১ হাজারেরও বেশি বাণিজ্য জাহাজের মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালিত হত। বাণিজ্য পণ্য বিক্রয়ের জন্য
বিভিন্ন জায়গায় এজেন্সি গড়ে তোলা হত। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির ফলে বার্ষিক রাজস্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি : তৃতীয় আব্দুর রহমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এ সময়
উন্নয়ন সাধিত হয়। তাঁর সময় দর্শনে ইবনে মার্সারাহ, ইতিহাসে ইবনে আল-আহ্মার ও ইবনে আল-কুতিয়া,
জোতির্বিদ্যায় আহমদ বিন নসর ও মাসলামাহ বিন আল-কাসিম, চিকিৎসাবিদ্যায় আরিব বিন সাইদ ও ইয়াহিয়া বিন
ইসহাক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি কর্ডোভা মাদ্রাসাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেন।
স্থাপত্য শিল্প : তাঁর সময় কর্ডোভায় অসংখ্য মসজিদ, প্রাসাদ, গৃহ ও হাম্মামখানা ছিল। এ সময় বিশ্বে কর্ডোভার স্থান ছিল
বাগদাদ ও কনস্টানটিনোপোলের পরই। আল-যাহ্রা প্রসাদ ছিল তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কর্ম। তাঁর উপপতœী
আল-যাহ্রার নামে এর নামকরণ করা হয়। এছাড়া তিনি কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্য বর্ধন করেন।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের শাসনকাল স্পেনের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তাঁকে ভারতের আকবর, আরবের খলিফা হযরত
উমর ফারুক (রা.) এবং বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদের সাথে তুলনা করা হয়। তিনি শুধু স্পেনের উমাইয়া
শাসকদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন।
সারসংক্ষেপ:
তৃতীয় আব্দুর রহমানের শাসনকাল স্পেনের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তাঁকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা
হয়। তিনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে স্পেনে মুসলিম শাসন সুসংহত করেন।। তাঁর সেনাবাহিনী তৎকালীন
জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল। তিনি ‘খলিফা’ ও ‘আমীর-উল-মুমিনীন’ উপাধি গ্রহণ করেন। কৃষি, শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যে স্পেন ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধি লাভ করে তাঁর সময়ে। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও স্থাপত্য শিল্পে এসময় কর্ডোভার খ্যাতি ছিল
বিশ্বজোড়া। তিনি কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আল-যাহ্রা প্রাসাদ তাঁর একটি অসামান্য নির্মাণ-কর্ম।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৯.৯
১. কাকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা?
(ক) প্রথম আব্দুর রহমান-কে (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান-কে
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান-কে (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম-কে
২. কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন কে?
(ক) প্রথম আব্দুর রহমান (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম
৩. আল-যাহ্রা প্রসাদ কে নির্মাণ করেন?
(ক) প্রথম হিশাম (খ) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান
(গ) তৃতীয় আব্দুর রহমান (ঘ) দ্বিতীয় আল-হাকাম
সৃজনশীল প্রশ্ন:
স¤্রাট আকবরের শাসনকাল ভারতের ইতিহাসে অতি গৌরবের। তিনি শুধু মুঘল শাসকদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বিশ্বের
শ্রেষ্ঠ রাজাদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন। তিনি বিভিন্ন দিক দিয়ে রাষ্ট্রের বৈষয়িক উন্নতি সাধন করেন।
ক. কাকে স্পেনের মুসলিম সা¤্রাজ্যের ত্রাণকর্তা বলা হয়? ১
খ. তৃতীয় আব্দুর রহমানের সাথে খ্রিস্টানদের সংঘর্ষ আলোচনা করুন। ২
গ. উদ্দীপকে উল্লিখিত স¤্রাট আকবরের মত স্পেনের কোন শাসক উমাইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন? ব্যাখ্যা করুন। ৩
ঘ. তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় স্পেনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির বিবরণ দিন। ৪