লক্ষ্নৌ চুক্তির পটভূমি চুক্তির ধারাগুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং

মুখ্য শব্দ হিন্দু-মুসলিম, মর্লি-মিন্টো সংস্কার, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা,স্বায়ত্বশাসন ও স্বরাজ
১৯১৬ সালের ল²ৌ চুক্তি ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার
প্রণীত বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালে রদ হলে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা দেখা দেয় এবং ব্রিটিশ বিরোধী
মানসিকতা প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪) সময় ব্রিটিশরা ভারতীয়দের সাহায্য কামনা
করলে দৃশ্যপট পালটে যায়। এ পরিবর্তিত অবস্থায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন দেখা যায়।
ফলে হিন্দু- মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের পথ প্রশস্ত হয়। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ই উভয়
দলের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিয়ে সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। উভয় দল পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে একটি
সমঝোতায় পৌছে যা ইতিহাসে ল²ৌ চুক্তি নামে পরিচিত।
ল²ৌ চুক্তির পটভূমি : ল²ৌ চুক্তির পটভূমি তৈরিতে একক কোন ঘটনা ভূমিকা রাখেনি। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঘটনা।
মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের সীমাবদ্ধতা
ল²ৌ চুক্তির পটভূমি তৈরির ক্ষেত্রে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন বেশ খানিকটা ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।
১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের মাধ্যমে কংগ্রেসের চরমপন্থীদের দমন এবং মুসলমানদের সন্তুষ্ট করার জন্য
পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ভারতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা মুসলমানদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা
করে। মুসলমানরা তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেও কিছুদিনের মধ্যে এই আইনের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি
করে। ফলে ১৯১০ সালের পর থেকে ভারতের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় একে অন্যের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে
থাকে। এ সময় থেকে হিন্দু ও মুসলমান নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে উভয় সম্প্রদায়ের প্রতি বন্ধুত্বমূলক মনোভাব
প্রকাশ করতে থাকে। একইসঙ্গে তারা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রয়োজনিয়তা তুলে ধরেন।
এলাহাবাদ বৈঠক
১৯১০ সালে মুসলিম লীগের নাগপুর অধিবেশনের পর ১৯১১ সালের জানুয়ারিতে এলাহাবাদে হিন্দু ও মুসলমানদের একটি
যৌথ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ৬০ জন হিন্দু ও ৪০ জন মুসলিম নেতা অংশ গ্রহণ করেন। হিন্দুদের মধ্যে
সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মদন মোহন মারাভিয়া, মতিলাল নেহেরু, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে এবং মুসলমানদের মধ্যে নবাব
ভিকার-উল-মূলক,আগা খান,ইব্রাহিম, রহিমৎউল্লাহ, সৈয়দ মোহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনটি হিন্দু-মুসলমান
ঐক্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পূর্ব বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দের ভূমিকা
বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ
বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার হন। ১৯১৩ সালের এপ্রিলে ঢাকার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে
এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ সরকারের মুসলমান স্বার্থবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হিন্দুমুসলমান ঐক্যবদ্ধ হলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শক্তিশালী হবে। তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য মুসলিম লীগের সদস্য হয়েও কংগ্রেসে যোগ দেন।
মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
কিছু সংখ্যক মুসলিম কবি, লেখক ও সাহিত্যিক তাদের সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে
তোলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন শিবলি, আকবর, ও ইকবাল। এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আবুল
কালাম আজাদের উর্দু ভাষায় প্রকাশিত আল হেলাল , জাফর আলী খানের সম্পাদনায় জামিনদার, ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত
মোহাম্মদ আলীর কমরেড এবং উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হামদর্দ পত্রিকা।
ব্রিটিশ সরকারের দমন নীতি
ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হওয়ায় মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দমননীতিও মুসলমানদেরকে ক্ষেপিয়ে
তুলেছিল। ১৯১৫ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের আল হেলাল, মাওলানা মোহাম্মদ আলীর কমরেড পত্রিকা
সরকার বন্ধ করে দেয়। ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্যে মাওলানা মোহাম্মাদ আলী, তার ভাই মাওলানা শওকাত আলী, মাওলানা
জাফর আলী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে অন্তরীণ রাখা হয়। এ সব কারণে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাথে
মুসলমানদের সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে।
লক্ষে¥ৗ অধিবেশন
হিন্দু ও মুসলিমদের যৌথ সংস্কার পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়নের জন্য ১৯১৬ সালে কলকাতার উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি
নিয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা। ল²ৌ অধিবেশনের প্রাক্কালে এ কমিটি যৌথভাবে একটি সংস্কার প্রস্তাবের খসড়া
প্রণয়ন করে। ১৯১৬ সালের ২৯ ও ৩১ ডিসেম্বরে ল²ৌতে যথাক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত
হয়। এই উভয় সম্মেলনে হিন্দু ও মুসলিম যৌথ সংস্কার প্রস্তাবনা গৃহীত হয় যা ইতিহাসে লক্ষে¥ৗ চুক্তি নামে পরিচিত।
লক্ষে¥ৗ চুক্তির ধারাগুলো নি¤œরুপ
এই চুক্তির প্রধান প্রধান ধারাগুলো নি¤œরুপ:
১. ভারতে স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস একযোগে আন্দোলন করবে।
২. কোন সম্প্রদায়ের তিন-চতুর্থাংশ সদস্য বিরোধিতা করলে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন বিল পাস করা যাবে না।
৩. কেন্দ্রিয় আইন সভার সদস্য সংখ্যা হবে ১৫০ জনের মধ্যে ১২০ জন হবেন নির্বাচিত এবং ৩০ জন হবেন মনোনীত।
৪. নির্বাচিত সদস্যদের এক তৃতীয়াংশ মুসলিম এবং তারা মুসলিম ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হবেন।
৫. গভর্ণর জেনারেলের শাসন পরিষদের অর্ধেক সদস্য ভারতীয় হবেন।
৬. সামরিক বাহিনীতে অধিক সংখ্যক ভারতীয়কে নিযুক্ত করতে হবে।
লক্ষে¥ৗ চুক্তির গুরুত্ব ও তাৎপর্য
ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে লক্ষে¥ৗ চুক্তির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীমক. কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঐক্য প্রতিষ্ঠা: এতোদিন পর্যন্ত হিন্দু- মুসলিম একে অন্যের প্রতিদ্ব›দ্বী শক্তি হিসেবে কাজ
করলেও এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপিত হয়। এ চুক্তিটি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের
রাজনৈতিক ঐক্যের দলিল। হিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র কওে সৃষ্ট হিন্দু মুসলিম
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর লক্ষে¥ৗ চুক্তি উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে।
খ. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ: ল²ৌ চুক্তি ভারতের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের যেমন ঐক্য সৃষ্টি
করেছে তেমনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেছে। তারা যৌথভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাদের
রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের দাবি জানায়। ফলে ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনে কিছু রদবদলসহ
সরকার ল²ৌ চুক্তি অনেকটাই মেনে নেয়। এতদসত্তে¡ও কোন সম্প্রদায়ই ব্রিটিশ সরকারের এই উদ্যোগে খুশি হতে
পারেনি। তারা স্বরাজ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।
গ. স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগের স্বীকৃতি লাভ: চুক্তির ফলে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক সত্তা অর্থাৎ
মুসলিম লীগ কংগ্রেসের প্রকাশ্য স্বীকৃতি অর্জন করে। এ চুক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনাধিকার অনুমোদন লাভ
করে। এটিকে কেউ কেউ মুসলমানদের জন্য অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের জন্যে এটার প্রয়োজন ছিল।
ঘ. অসম্প্রদায়িক রাজনীতির শুভসূচনা: এতাদিন পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি চরম সাম্প্রদায়িক পরিবেশ
বিরাজ করছিল। এ চুক্তির মাধ্যমে অসম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা হয়। দীর্ঘদিনের রেষারেষির পর এই প্রথম উভয়
সম্প্রদায় কাছাকাছি আসার সুযোগ লাভ করল।
সমালোচনা: কোন কিছুই সমালোচনার উর্ধে নয়। লক্ষে¥ৗ চুক্তি রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে সমালোচনার ঝড়
তুলেছিল। এ কে ফজলুল হক, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, তিলক,ও মুহম্মাদ আলী জিন্নাহ এ চুক্তিকে স্বাগত জানান। কিন্তু
মহাত্মা গান্ধী লক্ষে¥ৗ চুক্তি যে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রতীক এ দাবীকে উড়িয়ে দেন। তিনি এটাকে শিক্ষিত ও ধনী হিন্দুমুসলমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে একধরণের বোঝাপড়া বলে অভিহিত করেন। এভাবে লক্ষে¥ৗ চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত
থাকলেও এ চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯০৫ সালের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু- মুসলমান সর্ম্পকের মধ্যে
অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, এ চুক্তির মাধ্যমে উপমহাদেশের রাজনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসে। এ হিন্দু মুসলিম
রাজনৈতিক ঐক্য ভারতের জাতীয় আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
লক্ষে¥ৗ চুক্তি ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯১১
সালের বঙ্গভঙ্গ রদের পর হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক চরম আকার ধারণ করেছিল। এ চুক্তির মাধ্যমে হিন্দু- মুসলিম সম্পর্কের
মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। ১৯১৬ সালে লক্ষে¥ৗ সম্মেলনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কর্তৃক গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব ‘লক্ষে¥ৗ চুক্তি’ নামে পরিচিত।
১. লক্ষে¥ৗ চুক্তি কত সালে স্বাক্ষরিত হয়?
ক. ১৯২৬ খ. ১৯১৬ গ. ১৮১৬ গ. ১৯৩৬
২. লক্ষে¥ৗ চুক্তির বিপক্ষে ছিলেন
ক. মহাত্মা গান্ধী খ. সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী গ. তিলক গ.মুহম্মদ আলী জিন্নআহ
৩. চুক্তি অনুসারে কেন্দ্রিয় আইন সভায় মুসলিম সদস্য সংখ্যা কত?
ক. ৫০ জন খ. ৪০ জন গ. ১২০ জন গ. ৩০ জন
ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব তিমুরে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী দুটি বিবদমান গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিল। ব্রিটিশরাও তাদের
‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতির আলোকে উভয় দলের মধ্যে তিক্ততা টিকিয়ে রাখতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু বিবদমান সম্প্রদায়
দুটি ব্রিটিশ চাল বুঝতে পেরে, তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা করে এবং নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই
চুক্তির ফলে একদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয় অন্যদিকে সংঘাতে লিপ্ত সম্প্রদায় দুটির মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
(ক) লক্ষে¥ৗ চুক্তি কী? ১
(খ) লক্ষে¥ৗ চুক্তির প্রধান উদ্যোক্তাদের নাম লিখুন? ২
(গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরের ধারণার আলোকে লক্ষে¥ৗ চুক্তির প্রধান শর্তগুলো লিখুন?। ৩
(ঘ) ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে লক্ষে¥ৗ চুক্তির গুরুত্ব বিশ্লেষণ করুন। ৪