তাসাউফ -এর সংজ্ঞা দিন। শরীআত ও তাসাউফের মধ্যে সম্পর্ক কী? আদর্শ জীবন গঠনে তাসাউফের ভূমিকা

তাসাউফ, আদর্শ জীবন, যিকর, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীরুতা, ¯্রষ্টার সান্নিধ্য।
সুন্দর পরিচ্ছন্ন, হিংসা বিদ্বেষমুক্ত, মানবকল্যাণধর্মী পরোপকারী জীবন-ই আদর্শ জীবন। ¯্রষ্টার সান্নিধ্যই
কেবল পারে মানুষকে মানবিক করতে। যার অন্তরে আছে ¯্রষ্টার ভয় ও ভালোবাসা, সেই কেবল পারে একটি
আদর্শ জীবন গড়তে। পারে মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে। তাসাউফ এমন একটি বিষয় যা মানুষকে করে
আল্লাহভীরু, সৎ, বিনয়ী ও আদর্শবান। সুতরাং আদর্শ জীবন গঠনে তাসাউফের ভ‚মিকা অনস্বীকার্য।
শরী‘আতের জ্ঞানের মতই তাসউফের জ্ঞান অর্জন করা অবশ্যক। ইসলামি জীবন ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য দিক হলো
তাসাউফ। মানবিক বিকাশ লাভ তাসাউফ অর্জনের মাধ্যমে সম্ভব। আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসেবে গড়ে উঠার জন্য
তাসাউফের জ্ঞান অর্জন এবং তাসাউফ ভিত্তিক জীবন গঠন অপরিহার্য।
মানুষের পরিশুদ্ধ অন্তর আল্লাহকে উপলব্ধি করতে পারে, আল্লাহকে হাযির-নাযির জানে। তাই তাসাউফ গুণে গুণান্বিত
মানুষ খারাপ ও মন্দ কাজ করতে পারে না।
তাসাউফ চর্চার মধ্য দিয়ে আত্মা পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহকে বুঝা ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উপযোগী হয়ে উঠে। প্রকৃত পক্ষে
অন্তরের পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহকে বুঝা যায় না। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন‘সাবধান দেহের মধ্যে গোশতের এমন একটা টুকরা রয়েছে, যা সুস্থ থাকলে সমস্ত দেহটা সুস্থ থাকে, আর তা দূষিত হয়ে
পড়লে সারা দেহটাই দুষিত হয়ে পড়ে। সাবধান তাহলো কলব (বুখারী ও মুসলিম)
সুতরাং তাসাউফের গুণ-অর্জন মানব জীবনের জন্য জরুরি। কল্যাণ লাভের মাধ্যম
তাসাউফের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করা যায়। অন্তর বা রূহের বিশুদ্ধতা অর্জন ছাড়া মানুষ দুনিয়া ও
আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারে না।
আল্লাহর নৈকট লাভের মাধ্যম
আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় পদ্ধতিতে ইবাদত পালনের জন্য তাসাউফের প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন- َ
“তোমরা এমনভাবে আল্লাহ্র ইবাদত করবে- যেন আল্লাহকে দেখতে পাও। আর যদি দেখতে না পাও তাহলে মনে করবে
তিনি তোমাকে দেখতে পান।” (বুখারী ও মুসলিম)
হাদিসের পরিভাষায় একে ইহসান বলা হয়। ইহসান মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। বস্তুত মানুষ আল্লাহ্কে
দেখছে কিংবা আল্লাহ মানুষকে দেখছেন। এমন উচ্চ মার্গের অনুভ‚তি নিয়ে কাজকর্ম ও ইবাদত-বন্দেগী সম্পাদন করলেই
তা সুন্দর থেকে আরো সুন্দরতম হতে পারে। সেটাই মানব জীবনে ইহকালীন-পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
ইহসান পর্যায় উপনীত হওয়ার জন্য মানুষকে অত্যন্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনা করতে হয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে ইলমে তাসাউফ এই ইহসানেরই অপর নাম।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম
নিজের মনকে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করার জন্য তাসাউফের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। শয়তানের চক্রান্ত এবং কূপ্রবৃত্তির
তাড়নায় মানুষের মন দুনিয়ার আকর্ষণের প্রতি ধাবিত হয়। আল্লাহর যিকর ও আল্লাহর মুহাব্বত প্রাপ্তির উপযুক্ত ব্যক্তির
অন্তর সদা জাগ্রত থাকে।
“জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই আত্মার প্রশান্তি।” (সূরা রা‘আদ-১৩:২৮)
আত্মশুদ্ধির উপায়
পার্থিব সকল অন্যায়, অসত্য ও আপত্তিকর কাজ থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রে তাসাউফ চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য তাসাউফের ভূমিকা অনেক বেশি। প্রকৃত জ্ঞানীরাই আল্লাহকে বেশি ভয় করে। আল্লাহ মহান
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই তাঁকে ভয় করে” (সূরা ফাতির-৩৫:২৮)
আত্মশুদ্ধির উপায় হিসেবে তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করা আবশ্যক। রাসূল (স) বলেনكِل
“প্রতিটি বিষয়েই পরিষ্কার করার যন্ত্র আছে। আর অন্তর পরিষ্কারের যন্ত্র হলো আল্লাহর যিকর। (কানযুল উম্মাল)
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, প্রেম-ভালোবাসা পাওয়ার উপযুক্ততা অর্জনের জন্য তাসাউফ চর্চার প্রযোজন রয়েছে।
মহামহিম আল্লাহ বলেনاتقو
“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, ভয় করার মত।” (সূরা আলে-ইমরান ৩:১০২)
তাসাউফের জ্ঞান একজন মানুষকে মর্যাদার উচ্চ আসনে সমাসীন করতে পারে। এর মধ্যমে মনুষের মন মানসিকতার
উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি মানুষকে সফলতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।
সারসংক্ষেপ
মানবিক গুণাবলি অর্জন ও পাশবিকতা বর্জনের জন্য তাসাউফ চর্চা প্রয়োজন। মানবিক গুণাবলি যেমন তাওবা,
তাওয়াক্কুল সবর (ধৈর্য), ইখলাস (নিষ্ঠা), যোহদ, শোকর (কৃতজ্ঞতা) নির্জনে ধ্যান-সাধনা ইত্যাদি আর পাশবিকতা
যেমন- লোভ, লালসা, রাগ, হিংসা ইত্যাদি। তাসাউফের জ্ঞান একজন মানুষকে মর্যাদার উচ্চ আসনে সমাসীন করতে
পারে। কেননা এর মাধ্যমে ব্যক্তির মন-মানসিকতার উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার মহত্ত¡ সম্পর্কে যে বাস্তব
জ্ঞান অর্জিত হয়, তা মানুষকে সৃষ্টির চরম লক্ষে পৌঁছে দেয়। ফলে তার জীবন সার্থক হয়। আমরা প্রকাশ্য গুনাহ ত্যাগ
করতে পারি শরিয়তের নিয়ম মেনে। কিন্তু অন্তরের গুনাহ যা দেখা যায় না, তা ত্যাগ করা যায়Ñ আল্লাহর স্মরণ,
আত্মদর্শন, আত্ম-সমালোচনা ও অন্তরের ধ্যানের মাধ্যমে। আর সে জন্য তাসাউফের চর্চা প্রয়োজন।
বহু নির্বাচনী প্রশ্ন
১. এমন একটি গোশতের টুকরা দেহে আছে, যা নষ্ট হলে পুরো দেহটাই নষ্ট হয়ে যায়। তা হলো-
(ক) কলব (খ) যকৃত
(গ) ফুসফুস (ঘ) সিনা
২. কলব পরিষ্কার হয় কীসের মাধ্যমে ?
(ক) অপারেশন করলে (খ) কালোজিরা খেলে
(গ) ঔষধ খেলে (ঘ) আল্লাহর স্মরণে
৩. হৃদয়ে প্রশান্তি আসে কী করলে ?
(ক) চিত্ত বিনোদনে (খ) হাসি-তামাশায়
(গ) আল্লাহ স্মরণে (ঘ) গান-বাজনায়
৪. “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ভয় করার মমো” এটি কার কথা ?
(ক) আল্লাহর (খ) রাসূল (স)-এর
(গ) হযরত আবু বকর (রা)-এর (ঘ) হযরত উমর (রা)-এর
নিচের উদ্দীপকটি পড়–ন এবং ৫ও ৬নং প্রশ্নের উত্তর দিন“তোমরা এমন অনুভ‚তি নিয়ে আল্লাহর ইবাদাত করবে- যেন আল্লাহকে দেখতে পাও।”
৫। কী চর্চার মাধ্যমে আত্মা পরিশুদ্ধ হয় ?
(ক) আত্মা (খ) শরীর
(গ) মাথা (ঘ) পা
৬। আত্মশুদ্ধির উপায় হলোর. সকল অন্যায় থেকে বিরত থাকা রর. আল্লাহর যিকর করা
ররর. আল্লাহকে ভয় করা
নিচের কোনটি সঠিক ?
(ক) র ও রর (খ) রর ও ররর
(গ) র ও ররর (ঘ) র, রর ও ররর
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক,
রফিক মিয়া একজন ক্ষেত মজুর। নামায-রোযার কথা ভাবার সময় তার খুব একটা হয় না। রাত দিন খাটাখাঁটুনিতে সময়
চলে যায়। সে মনে করে নামায পড়তে গেলে এক দিকে যেমন সময় নষ্ট হবে, অন্যদিকে নামায শিখতে গেলেও তা
সঠিক নিয়মে আদায় হবে না। কখনো কারো নিকট থেকে নামায শিক্ষার তালিম নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
একদিন একজন হক্কানি সূফি-দরবেশ তার ভুল শুধরে দিয়ে নামাযের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিলেন। কীভাবে নামায
সঠিকভাবে পড়তে হবে, তাও দেখিয়ে দিলেন। তার মনের অস্থিরতা প্রশমনের পরামর্শ দিলেন। এখন রফিক মিয়ার
মনে স্বস্তি বোধ হয়।
ক. তাসাউফ -এর সংজ্ঞা দিন। ১
খ. শরীআত ও তাসাউফের মধ্যে সম্পর্ক কী? বুঝিয়ে লিখুন। ২
গ. হক্কানি সূফি-দরবেশ কীভাবে রফিক মিয়ার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেছেন? ব্যাখ্যা করুন। ৩
ঘ. “ব্যক্তির বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের ক্ষেত্রে তাসাউফের জ্ঞানে পারদর্শী সূফির প্রয়োজন”
কথাটির যথার্থতা প্রমাণ করুন। ৪
উত্তরমালা: ১। ক ২। ঘ ৩। গ ৪। ক ৫। ক ৬। ঘ