সমাজিক উন্নয়নে সামাজিক নীতির গুরুত্ব

বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে সামাজিক নীতির গুরুত্ব
সামাজিক নীতি হলো সুপরিকল্পিত সামাজিক উন্নয়নের দিকনির্দেশক। আর্থ-সামাজিক দিক থেকে অনগ্রসর
বাংলাদেেেশর দ্রæত উন্নয়ন সাধন, মৌল-মানবিক প্রয়োজন পূরণের নিশ্চয়তা, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা হতে পরিত্রাণ লাভ
এবং সন্তোষজনক জীবনমানের নিশ্চয়তা জাতীয়ভাবে প্রত্যাশিত বিষয়। আর এসকল বিষয়ের কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণে
সামাজিক নীতির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সমাজ উন্নয়নে সামাজিক নীতির গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :
১. সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা : দারিদ্র্য, জনসংখ্যাস্ফীতি, বেকারত্ব, অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা, অপরাধ
ও সন্ত্রাস, কিশোর অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামী, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ, অর্থ
পাচার, মাদকাসক্তি, মাদকপাচারসহ নানাবিধ সমস্যা বাংলাদেশের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এসব সমস্যা
মোকাবিলায় প্রয়োজন সুচিন্তিত প্রতিকার ও প্রতিরোধ কার্যক্রম। আর এসকল ক্ষেত্রে সঠিক পথনির্দেশনা দিতে সামাজিক
নীতির গুরুত্ব অপরিসীম।
২. পরিকল্পিত সামাজিক পরিবর্তন আনয়ন : বাংলাদেশের সমাজ জীবনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সাধন এবং পরিবর্তিত
অবস্থার সাথে জনগণের সামঞ্জস্য বিধানে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মূলত সামাজিক নীতি এক্ষেত্রে এমন সব
দিকনির্দেশনা দেয়, যা সমাজের সকলের নিকট প্রত্যাশিত এবং যা সামাজিক গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করে। এক্ষেত্রে
সামাজিক নীতি সামাজিক মূল্যবোধ আদর্শ, প্রথা ও মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে
খাপ খাওয়াতে এবং পরিবর্তিত বিষয়কে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
৩. অবহেলিত ও বঞ্চিত শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ : বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে শিশু,
নারী, প্রবীণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধি, আদিবাসী, ভূমিহীন, বেকার যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠী অর্থনৈতিক,
সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর। এদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণে কল্যাণধর্মী কার্যক্রম
আবশ্যক। এক্ষেত্রে সামাজিক নীতি সুষ্ঠু কর্মপন্থা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসকল শ্রেণির ভাগ্যোন্নয়ন ও
স্বার্থসংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৪. সামাজিক উন্নয়ন : সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রথা ও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম যুগোপযোগী করা এবং তার
যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে সামাজিক নীতি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে
আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তুলে এগুলোর কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত
করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : বাংলাদেশের জনজীবনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার জন্য বিভিন্ন
সামাজিক বিপর্যয়কর অবস্থা যেমনÑ দুর্ঘটনা, অকালমৃত্যু, বার্ধক্য, চাকুরিচ্যুতি, বেকারত্ব, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ (বন্যা,
খরা, ঘুর্ণিঝড়, নদীভাঙ্গন, জলোচ্ছ¡াস) ইত্যাদি দায়ী। এসকল অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন
যথাযথ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। যথাযথ সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম প্রণয়নে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সামাজিক নীতি।
সুতরাং দেখা যায় বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
প্রণয়নে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
৬. সম্পদের যথাযথ ব্যবহার : সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে গঠনমূলক
সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে জনগণের প্রতিভা ও সামর্থ্যরে বিকাশ ঘটিয়ে
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং দেশজ বস্তুগত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জাতীয় উন্নয়নধারাকে ত্বরান্বিত
করতে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অপরিসীম।
৭. সমাজসেবা ব্যবস্থায় সমন্বয় সাধন : বাংলাদেশে মানবকল্যাণে নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারিভাবে পারিচালিত
সেবা কার্যক্রমের যথাযথ ব্যবহার ও মানোন্নয়নে প্রয়োজন যথাযথ সমন্বয় সাধন। এক্ষেত্রে কার্যকর সমন্বয় সাধনের জন্য
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সামাজিক নীতি যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে।
৮. সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ : অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কারণে প্রচলিত নানা কুপ্রথা, কুসংস্কার সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে
ব্যাহত করে। এক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রয়োগ ঘটিয়ে সামাজিক কুপ্রথা ও কুসংস্কার
দূরীকরণে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অপরিসীম।
৯. সম্পদের সুষম বন্টন : সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্পদের সুসম
বণ্টন একান্ত আবশ্যক। সম্পদের সুষম বন্টনের অভাবে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা ও অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়, যা সমাজ
উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। সুতরাং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীতা দূর করতে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত
করার ক্ষেত্রে সামাজিক নীতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
১০. সামাজিক সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা : সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন তথা সমাজের জনগণের মধ্যে গঠনমূলক ও
সৌহার্দপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সামাজিক নীতি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সমাজের সকলের মৌলিক
স্বাধীনতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিবর্তন সাধন এবং সম্পদ ও অধিকারের যথাযথ বন্টনে
সামাজিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সারসংক্ষেপ
আধুনিক যুগে সমাজ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো সামাজিক নীতি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সুষ্ঠু নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে
দেশের আর্থ-সামাজিক সমস্যার সমাধান ও সামগ্রিক উন্নয়নে প্রয়াসী। সামাজিক নীতি বঞ্চিতদের স্বার্থ সংরক্ষণ,
সমাজসেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নির্দেশক। সমাজের সার্বিক উন্নয়ন তথা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ সাধনে
সামাজিক নীতির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে সামাজিক নীতি যে সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে তা হলোÑ ১) সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা, ২) পরিকল্পিত সামাজিক পরিবর্তন আনয়ন, ৩) অবহেলিত ও
বঞ্চিত শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ, ৪) সামগ্রিক উন্নয়ন, ৫) সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ৮) কুসংস্কার দূরীকরণ, ৯)
সম্পদের সুসম বণ্টন এবং ১০) সামাজিক সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১০.৮
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন :
১। কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নির্দেশক কোনটি?
ক) সামাজিক নীতি খ) সামাজিক পরিকল্পনা
গ) সামাজিক কার্যক্রম ঘ) সামাজিক প্রতিষ্ঠান
২। কোনো দেশের জনগণ যে সকল বিষয় প্রত্যাশা করেÑ
র. মৌল-মানবিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা
রর. সন্তোষজনক জীবনমানের নিশ্চয়তা
ররর. সামাজিক সমস্যা হতে পরিত্রাণ লাভ
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) র ও রর খ) র ও ররর
গ) রর ও ররর ঘ) র, রর ও ররর