হিন্দু বিধবা বিবাহ আন্দোলন

ভারতীয় উপমহাদেশে সংগঠিত সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হিন্দু বিধবা বিবাহ আন্দোলন। সমকালীন
প্রেক্ষাপটে দেখা যায় হিন্দুসমাজ ছিল নানাবিধ কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর পÐিত ব্রাক্ষণদের দৌরাত্ম্যের লীলাভূমি।
নারী জাতি ছিল অসহায় ও নির্যাতিত। রাজা রামমোহন রায়ের যুগান্তকারী সমাজসংস্কারের ফলে সতীদাহ প্রথা হিন্দুসমাজ
থেকে উচ্ছেদ হলেও বিধবা নারীরা এক নিদারুন অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করতো। সমাজ তাদেরকে এক পৃথক চোখে
দেখতো।
তখনকার উচ্চ শ্রেণির ব্রাক্ষণরাও বহুবিবাহে অভ্যস্ত ছিল এবং কন্যাদায়গ্রস্ত পিতারা কুলীন ব্রাক্ষণদের হাতে কন্যা স¤প্রদান
করে ধন্য হতো। অনেক হিন্দুসমাজে কুল বা বংশ রক্ষার জন্য ব্রাক্ষণদের মাঝে অল্প বয়সী কিশোরীদের বিয়ে দেওয়া
হতো। কিন্তু পতি মৃত্যুবরণ করার ফলে অল্পবয়সী বিধবারা অমানবিকভাবে পূর্ণজীবন অতিবাহিত করত। তখন কোনো
বিধবা পূণর্বিবাহ করলে এই দম্পতিদের সন্তান সমাজে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পেত না। এমনকি উত্তরাধিকার হতেও বঞ্চিত
হতো। এরই প্রেক্ষাপটে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের অধিকার বঞ্চিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের কুসংস্কার
আচ্ছন্নতা থেকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার দূরীকরণে সমাজসংস্কারের কাজে ব্রতী হন।
তিনি বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নে কয়েক হাজার লোকের স্বাক্ষরসহ সরকারের নিকট আবেদন করেন। তাঁর অক্লান্ত
প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই বিধবাবিবাহ আইন প্রণীত হয়। বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগারকে
সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন লর্ড ডালহৌসি।
বিধবা বিবাহ আইন পাস হবার পর এই আইন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজে বাস্তবায়ন করেন। বিদ্যাসাগর ১৮৭০ সালের
১১ই আগস্ট স্বীয়পুত্র নারায়নচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে এক বিধবার সাথে বিয়ে দিয়ে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
৪.১০.৩ নারীশিক্ষা আন্দোলন
নারীরা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই নিগৃহীত ও নিষ্পেষিত হয়ে আসছিল। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল দিক
থেকেই তারা ছিল বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মানবমনে চিন্তাধারার যে পরিবর্তন ঘটে তার
বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সারা বিশ্বে নারী জাগরণের সূচনা ঘটে। ১৭৮৯ সালের অক্টোবর মাসের এক স্মারকলিপিতে নারীসমাজ
উল্লেখ করে, নারীর শ্রমের ও কাজের অধিকারের জন্য ও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে নিয়োগের জন্য সরকারকে সচেষ্ট
হতে হবে। ১৭৯৩ সালে ঘোষিত “মানুষের অধিকার” সংক্রান্ত কনভেনশনে প্রথমে নারীর অধিকার সংক্রান্ত কোনো কথা
না থাকলেও পরবর্তিতে ফরাসি নারীদের আন্দোলনের মুখে ১৭ নং ধারায় নারীর অধিকার সংযোজন করা হয়। এসব
অধিকারের অন্যতম হলো শিক্ষার অধিকার। শিক্ষিত নারী দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। নারী শিক্ষিত
হলে দেশ ও জাতি শিক্ষিত হবে। তাইতো নেপোলিয়ান বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি
তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” নারীশিক্ষায় অবদান রেখে আমাদের সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে