বাংলাদেশে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অন্তরায়সমূহ ব্যাখ্যা কর

কোনো দেশের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ নির্ভর করে সে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অনুকূল নয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর জনবহুল দেশগুলোর
মধ্যে অন্যতম। খানা ব্যয় জরিপ ঐওঊঝ-২০১০ এর তথ্যানুযায়ী, দেশের শতকরা ৩১.৫ ভাগ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে
বাস করে। ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণের পক্ষে মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মৌলিক
মানবিক চাহিদা পূরণ না হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একটি মাত্র বিশেষ কারণ দায়ী নয়। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক মানবিকচাহিদা পূরণ না হওয়ার পথে প্রদান অন্তরায় হলো দারিদ্র্য। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক
সমীক্ষাÑ২০১৫ এর তথ্যানুযায়ী, এ দেশের শতকরা ৩১.৫ ভাগ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং জনগণের
মাথাপিছু আয় মাত্র ১,৭৫২ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, গউএ চৎড়মৎবংং রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ২৪.৮০%লোক
দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ক্রিয়াশীল থেকে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬.৩৭ কোটি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%, জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০৩৫ জন। ফলে
প্রতিবছর ২৪ লাখ জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনধারণের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা
বৃদ্ধি না পাওয়ায় মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কারণ মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৪০ ভাগ আসে কৃষিখাত থেকে। পরিসংখ্যান
ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতের অবদান ছিল ১৫.৯৬ শতাংশ। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের উপর
মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের কৃষিব্যবস্থা এখনো অনেকটা প্রাচীন ও অবৈজ্ঞানিক।
অনুন্নত কৃষিব্যবস্থার কারণে উৎপাদন সামান্য। ফলে কৃষির উপর নির্ভরশীল এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের অন্ন-বস্ত্র-
বাসস্থানসহ মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো ঠিকমতো পূরণ হয় না।
বাংলাদেশে মৌলিক চাহিদা পূরণের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ¡াস, ঘূর্ণিঝড়, বৃষ্টি, নদীরভাঙন ইত্যাদি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়; যা বাংলাদেশের সামগ্রিক মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণকে
বিশেষভাবে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে পরিবেশের বিপর্যয়
অব্যাহত রয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার
প্রভাবে মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের উপকরণাদির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের অভাবে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বর্তমানে মোট জনশক্তির ৩০% বেকার, যার
মধ্যে ৪০% শিক্তিত বেকার। বর্তমান বাংলাদেশে সর্বমোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। বেকারত্বের এই পরিস্থিতি
মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের পথে বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ত্রæটিপূর্ণ গঠন কাঠামোর ফলে
নির্ভরশীল জনসংখ্যার হার অধিক। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার ২০১০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিবছর ২৭ লক্ষ মানুষ
শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অথচ কাজ পাচ্ছে মাত্র ১ লক্ষ ৮৯ হাজার মানুষ।
সম্পদের অসম বণ্টনও মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের পথে বিরাট অন্তরায়। দেশে মোট সম্পদের ৯০% রয়েছে মাত্র
১০% লোকের হাতে। এই ১০ ভাগ লোক ভোগ-বিলাসের জীবন অতিবাহিত করলেও বাকি ৯০ ভাগ লোক ন্যূনতম
জীবনমান অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা বিরাজমান। অনগ্রসর শিল্প এ দেশের মানুষের
মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে অন্যতম অন্তরায়।
বাংলাদেশ প্রায় সব ব্যাপারেই বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা তাকে স্বাবলম্বী হতে
বিভিন্নভাবে বাধা প্রদান করছে, যা মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। দেশের আর্থ-
সামাজিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বাংলাদেশে সরকারের অস্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক
অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায় না। এ পরিস্থিতি মৌলিক মানবিক চাহিদা
পূরণের পথে অন্যতম অন্তরায়। স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য অস্বাভাবিক
হারে বেড়ে চলছে। কিন্তু সে হারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। তাছাড়া দেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি চলছে। মুদ্রাস্ফীতির
কারণে দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সে কারণে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে
পড়েছে। চোরাচালান, মজুদদারি প্রভৃতির প্রভাবেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। দ্রব্যমূল্য ও জীবনাযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি
জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো ব্যাপক পরিকল্পনা এখনো গৃহীত হয়নি।
যৎসামান্য যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সততার অভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। সুষ্ঠু নীতি ও পরিকল্পনার
অভাবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জনসাধারণের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশে নির্ভরশীল নাগরিকদের জন্য ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও প্রতিবন্ধী হলো
সমাজের নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অভাব ও সীমাবদ্ধতার ফলে বিভিন্ন দুর্যোগে-দুর্দিনে জনগণের
মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা থাকে না। এছাড়া স্বাভাবিক অবস্থায় সমাজের নি¤œ, দুস্থ ও অসহায় শ্রেণি
সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে মৌলিক চাহিদা পূরণের যথাযথ মান অর্জনের সক্ষম হয় না। বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
এদেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের উল্লেখযোগ্য বাধা হচ্ছে অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। রাস্তাঘাট এবং উন্নত
যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে দেশের ঘাটতি অঞ্চলে খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি সামগ্রী দ্রæত পৌঁছানো যায় না। এ কারণে অনেকে
শিক্ষা এবং চিকিৎসা সুবিধা লাভেও বঞ্চিত হয়।
যে কোনো দেশের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি। অথচ বাংলাদেশে বিভিন্ন
কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবৃদ্ধির হার কম। ফলে মৌলিক চাহিদা পূরণে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলাদেশে
অপরিকল্পিতভাবে নগরের সম্প্রসারণ হচ্ছে। পাশাপাশি নগরজীবনের চাকচিক্য মানুষকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করছে।
বাড়ছে শহুরে জনসংখ্যা, পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের চাহিদা। কিন্তু সেই সাথে বাড়ছে না আয়, যার প্রভাব মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা।
উপর্যুক্ত প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক কাঠামো ও ভূমিকার পরিবর্তন, অনুৎপাদনশীল খাতে জাতীয়
বিনিয়োগ, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, বাণিজ্য ঘাটতি, দক্ষ জনশক্তির অভাব, সম্পদের স্বল্পতা প্রভৃতি অবস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ দেশের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় সন্তোষজনক না। দেশের
সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থাও উন্নয়ন উপযোগী নয়। কৃষি এবং শিল্প উন্নয়নও প্রত্যাশিত নয়। আর্থ-
সামাজিক বঞ্চনা এবং কর্মসংস্থানের অভাব মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-১.৫
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন:
১। সমাজের এক বিরাট অংশ খাদ্য চাহিদা পূরণে অক্ষম হবার কারণ হলোÑ
র. খাদ্যশস্য ঘাটতি রর. সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা না থাকা
ররর. দরিদ্র শ্রেণির ক্রয় ক্ষমতা না থাকা
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) র ও রর খ) র ও ররর
গ) রর ও ররর ঘ) র, রর ও ররর
২। মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ অত্যাবশ্যকÑ
ক) মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য খ) মানুষের উন্নয়নের জন্য
গ) মানুষের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধির জন্য ঘ) মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য