এরিস্টটলের মতে বিপ্লব কি? কেন বিপ্লবের উৎপত্তি হয়?

পূর্বের পাঠ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, এরিস্টটলের সমসাময়িক গ্রীক নগর রাষ্ট্রসমূহে
প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করতো। ঘন ঘন সরকার ও সংবিধান পরিবর্তন,
সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনকে অস্থির করে তুলেছিল। বলাবাহুল্য, এ অবস্থা এরিস্টটলের মত
একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে বিষয়টি সম্পর্কেভাবিয়ে তুলেছিল। এরিস্টটল গভীর ভাবে তাঁর
অভিজ্ঞানবাদী পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ পূর্বক বিষয়টি নিয়ে গবেষণা
করেন এবং সিদ্ধান্তেউপনীত হন। তিনি প্রায় ১৫৮টি দেশের সংবিধান সংগ্রহ করেছিলেন
এবং সেগুলো নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। এ ভাবেই তিনি তাঁর বিপ্লবতত্ত¡দাঁড় করেছিলেন।
এ তত্তে¡তিনি বিপ্লবের কারণ এবং তা নিরসনের উপায় সম্পর্কেবিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
আধুনিক যুগে বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি সমাজের আমূল পরিবর্তন। যেমন ফরাসী বিপ্লব, রুশ
বিপ্লব ইত্যাদি। এরিস্টটল কিন্তুবিপ্লব বলতে এর আধুনিক অর্থবোঝান নি। তাঁর কাছে
বিপ্লবের অর্থছিল ভিন্ন। এরিস্টটল ‘বিপ্লব' শব্দটি ব্যাপক ও সাধারণ অর্থেব্যবহার করেছেন।
সরকার পরিবর্তন, সংবিধান পরিবর্তন, শাসক শ্রেণীর পরিবর্তনকে তিনি বিপ্লব অর্থেব্যবহার
করেছেন। তাই তাঁর কাছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উপরোক্ত পরিবতর্নই ছিল বিপ্লব। বিপ্লব
কেন হয়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এরিস্টটল বিপ্লবের কারণগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে
ভাগ করেছেন। যেমন সাধারণ কারণ ও বিশেষ কারণ।
সাধারণ কারণ: বিপ্লবের সাধারণ কারণকে এরিস্টটল মনস্তাত্তি¡ক, মুনাফা ও সম্মান এবং
প্রাথমিক অবস্থান এ ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
মনস্তাত্তি¡ক উদ্দেশ্য: এরিস্টটল মনে করতেন যেকোন ধরনের সংবিধানে ন্যায়বিচার সম্পর্কিত
ধারণাটি সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত। তবে অর্থও এর প্রয়োগ সর্বত্র সমান নয়। এ রূপ পরিস্থিতিতে
অর্থাৎ ন্যায়বিচারের ধারণা ও বাস্তবে এর প্রয়োগের মধ্যে যে তফাৎ থাকে বস্তুত তাই
নাগরিকদের মধ্যে মনস্তাত্তি¡কভাবে বিপ্লবের বীজ হিসাবে কাজ করে থাকে। পলিটিকস্পুস্তকের
পঞ্চম অধ্যায়ে এরিস্টটল বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। ন্যায়বিচার থেকে যারা বঞ্চিত
তারা মনে করেন যে, সমাজে অসাম্য বিরাজ করছে। অতত্রব সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য তারা প্রবৃত্ত
হন। তারা বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। সুতরাং ন্যায়বিচারের নামে এবং অসাম্যই বিপ্লবের প্রধান
কারণ। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষমতায় নাই এমন ব্যক্তিরা মনে করেন যে, ক্ষমতাসীনরা যোগ্যতায়
তাদের চাইতে হীন। সুতরাং তারা ক্ষমতা লাভের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। যখন
ধনিকতন্ত্রথাকে তখন গণতন্ত্রীরা সাধারণত এরূপ মনে করার জন্যই বিপ্লবী হয়ে ওঠেন।
আবার বিপরীতভাবে ধনিকতন্ত্রীরা মনে করেন যে, জ্ঞানে, গুণে, সম্পদে তারা অন্যান্যদের
চেয়ে উন্নত কিন্তুঅধিকার ভোগ করেছেন অন্যান্যদের মত। এই মনোবৃত্তির বশবর্তীহয়ে
তারা মর্যাদা পাওয়ার জন্য বিপ্লবী হয়ে ওঠেন।
● সম্মান ও মুনাফা: রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে মুনাফা ও সম্মান লাভের বাসনা ওতপ্রোতভাবে
জড়িত থাকে। তাই কখনও কেউ কেউ মুনাফা ও সম্মান লাভের প্রত্যাশায় পরিবর্তন
আনতে চান। আবার বিপরীত ভাবে মুনাফা ও সম্মানহানিকে রোধ করার নিমিত্তেও মানুষ বিপ্লবী হয়ে উঠতে পারে। বিপ্লবের আধুনিক অর্থ এবং এরিষ্টটলের কাছে বিপ্লবের অর্থ এক নয় ন্যায়বিচার সম্পর্কিত ধারণা মনস্তাত্তি¡ভাবে মানুষকে বিপ্লবী করে তোলে
● প্রাথমিক অবস্থান: প্রাথমিক অবস্থান অনেক সময় বিপ্লবের সাধারণ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঔদ্ধত্য, ভয়, ঘৃণা, রাষ্ট্রের কোন অংশের অ-আনুপাতিক বৃদ্ধি, অবহেলা, নির্বাচনী ষড়যন্ত্র,
জনমতকে উপেক্ষা করা, রাষ্ট্রের বিভিন্নউপাদানের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা প্রভৃতি কারণে
বিপ্লব ঘটতে পারে। বিপ্লবের বিশেষ কারণ বলতে এরিস্টটল বিশেষ সংবিধান বা সরকার
ব্যবস্থায় যে কারণে বিপ্লব সংঘটিত হতে পারে তাকে বুঝাতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে
এরিস্টটল গভীরভাবে চিন্তা করে নি¤েœাক্ত উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন শাসন ক্ষমতা যখন
গণতন্ত্রীদের হাতে থাকে তখন তাদের জনপ্রিয় নেতারা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। এ অবস্থায়
তারা ধনীদের উপর আক্রমনাত্মক মনোভাব পোষণ করেন। ফলে ধনীরা তাদের বিরুদ্ধে
সংগঠিত হয়ে বিপ্লবী তৎপরতায় লিপ্ত হন। সাধারণত এ ব্যবস্থায় ‘গণবক্তারা' বার বার
কথামালার মাধ্যমে ধনীদের উপর আক্রমণ চালান। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রধানত
দুটি কারণে বিপ্লব ঘটে থাকে, যেমন-রাজপরিবারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ¡ও বিরোধ এবং
রাজাদের স্বেচ্ছাচার। নির্বিচার স্বেচ্ছাচারের প্রতিবাদে জনগণ রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে
উঠে স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে চান। অভিজাততন্ত্রেএক পর্যায়ে অভিজাততন্ত্রীরা
আরও বিত্তের লোভে জনগণকে শোষণ করে। ফলে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাছাড়া
সম্পদ ও পদ ভাগাভাগি নিয়েও অভিজাত শাসকদের মধ্যে অর্ন্তকলহ অনেক সময় বিপ্লবে
রূপ নিয়ে থাকে। পলিটি ধরনের শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্রও ধনিকতন্ত্রের ভারসাম্য সম্পর্কিত
কিছুদুর্বল দিকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। এ ভারসাম্যের হেরফের হলেই বিপ্লব ঘটে যায়।
তবে এরিস্টটলের মতে অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে এই ব্যবস্থাটি অপেক্ষাকৃত স্থায়ী
(ঝঃধনষব)।এভাবে এরিস্টটল বিজ্ঞানসম্মতভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বিপ্লবের ব্যাখ্যা
প্রদান করেছেন।
বিপ্লব প্রতিকারের উপায়: এরিস্টটল বিপ্লবের কারণ অনুসন্ধান করেই খান্তছিলেন না, কিভাবে
বিপ্লব প্রতিরোধ করা যায়, সে সম্পর্কেতিনি কতিপয় মূল্যবান সুপারিশ করে গেছেন। যেমন:
● তিনি বলেছেন সরকার যেনো কোন ক্রমেই জনগণকে প্রতারণা না করে। জনগণের আস্থা
অর্জন করা হবে শাসক বা শাসকদের অন্যতম লক্ষ্য। কারণ প্রতারিত জনগণ প্রতারণাকারী
শাসককে কখনও ক্ষমা করে না।
● আইন লংঘন ও বিশৃঙ্খলাকে যথাসম্ভব মোকাবিলা করা উচিত। কারণ এ সব ছোট ছোট
বিষয় পুঞ্জীভুত হয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করে থাকে।
● শাসক ও শাসিতের মধ্যে সু-সম্পর্কবজায় রাখার জন্য শাসককে যতœবান হতে হবে।
শাসিত থেকে শাসকের বিচ্ছিন্নতাবোধ নানাভাবে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। উভয়ের
মধ্যে সু-সম্পর্কও সেতুবন্ধন বিপ্লব নিবারণের অন্যতম কার্যকর উপায়।
● শাসককে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তিরা সšুÍষ্ট থাকেন। কারণ,
প্রভাবশালীরা সহজে অন্যান্যদেরকে বিপ্লবের পথে সংগঠিত করতে পারেন। উপরোক্ত
শ্রেণীর উপর কড়া নজর রাখা দরকার।
● গণতন্ত্রীদের উচিত ধনীদের প্রতি সম্মান দেখানো, আবার ধনিকতন্ত্রীদের উচিত
সর্বসাধারণের অধিকারের প্রতি যত্মবান থাকা। রাষ্ট্রের সকল শ্রেণী ও অঞ্চলের সম
উন্নয়নের চেষ্টা করা দরকার। কারণ একটি রাষ্ট্রেঅভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বৈষম্য বিপ্লব ডেকে
আনে।
● বৈষম্যমূলক ভাবে কাউকে অধিক সম্মান না দেখিয়ে বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে সম্মান দিতে
হবে। ফলে সকলে মনস্তাত্তি¡কভাবে সরকারের প্রতি অনুগত থাকবে।
● সরকারী কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহণ থেকে বিরত রেখে বিপ্লব প্রতিরোধের কথা এরিস্টটল
বলেছেন। কারণ সরকারী কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহণ প্রবণতা জনগণের মধ্যে তীব্র
ক্ষোভের সঞ্চার করে থাকে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে,
এরিস্টটল আজ থেকে আড়াই হাজার বৎসর পূর্বেবিপ্লব সম্পর্কেযে তত্ত¡দিয়েছিলেন তার
অধিকাংশই বর্তমান কালের জন্যও প্রযোজ্য ও ক্রিয়াশীল।
সারকথা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল তাঁর বিপ্লব তত্তে¡র মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন তথা
সরকার বদল, সংবিধান বদলকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সাধারণ ও বিশেষ এ দুভাবে
বিপ্লবের কারণকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বিপ্লব দমনের জন্য কতিপয় সুপারিশও
উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এ ব্যাখ্যা বর্তমান কালের জন্য প্রযোজ্য বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। এরিস্টটল কতগুলো দেশের সংবিধান সংগ্রহ করেছিলেন?
(ক) ১৫০টি; (খ) ১৫৮টি; (গ) ১০০টি; (ঘ) ৫০টি।
২। এরিস্টটলের নিকট বিপ্লবের অর্থছিলÑ
(ক) সামজের আমূল পরিবর্তন;
(খ) দরিদ্রশ্রেণীর ক্ষমতায়ণ;
(গ) শোষিত মেহনতী জনতার বিজয়;
(ঘ) সরকার, সংবিধান বা শাসকদের যে কোন প্রকার পরিবর্তন।
সঠিক উত্তর ১। খ ২। ঘ
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন।
১। আধুনিক অর্থেবিপ্লব কি?
২। এরিস্টটল বিপ্লব বলতে কি বুঝিয়েছেন?
৩। এরিস্টটলের মতে বিপ্লবের কারণ কত প্রকার?
৪। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন্ শ্রেণী বিপ্লবী হয়ে ওঠে এবং কেন?
৫। বিপ্লব দমনের প্রধান তিনিটি উপায় কি?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। এরিস্টটলের মতে বিপ্লব কি? কেন বিপ্লবের উৎপত্তি হয়?
২। এরিস্টটলের মতে বিপ্লবের কারণ এবং তা দমন করার উপায় সম্পর্কেআলোচনা করুন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এরিস্টটলের অবদান

FOR MORE CLICK HERE
এইচএসসি বাংলা নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
ENGLISH 1ST & SECOND PAPER
এইচএসসি আইসিটি নোট
এইচএসসি অর্থনীতি নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র
এইচএসসি পৌরনীতি নোট ২য় পত্র
এইচএসসি সমাজকর্ম নোট ১ম পত্র
এইচএসসি সমাজকর্ম নোট ২য় পত্র
এইচএসসি সমাজবিজ্ঞান নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ইতিহাস নোট ১ম পত্র
এইচএসসি ইতিহাস নোট ২য় পত্র
এইচএসসি ইসলামের ইতি. ও সংস্কৃতি নোট ১ম পত্র
এইচএসসি ইসলামের ইতি. ও সংস্কৃতি নোট ২য় পত্র
এইচএসসি যুক্তিবিদ্যা ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ভূগোল ও পরিবেশ নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ইসলামিক স্টাডিজ ১ম ও ২য় পত্র

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]