বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যাগুলো কি কি?<br> সুশাসনের সমস্যার সমাধান


দুর্নীতি, আমলাতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি, অকার্যকারিতা।
বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিচারে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পৃথিবীতে এক নম্বর
দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ছিলো। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বাংলাদেশে এখনও ব্যাপকহারে দুর্নীতি বিদ্যমান।
অনেকের মতে দুর্নীতিই বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায়। দুর্নীতি ছাড়াও আমলাতন্ত্রের প্রকোপ ও
আইনের শাসন চর্চায় নানাবিধ দুর্বলতা সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। নি¤েœ বাংলাদেশে সুশাসনের ক্ষেত্রে প্রধান
সমস্যাগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলঃ
(ক) দুর্নীতি: বাংলাদেশে দুর্নীতি এক সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। দুর্নীতির ব্যাধি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে শুরু করে
বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনকেও আক্রান্ত করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশের মধ্যেও দুর্নীতির সংস্কৃতি
ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অনেক গবেষক ও বিশ্লেষক। দুর্নীতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার কারণে মানবাধিকার সংরক্ষণ,
ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা, অসাম্যের মাত্রা কমানোর চ্যালেঞ্জগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় সুশাসন তথা গণতন্ত্র
কতদিনে অর্জিত হবে তা বড় এক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
(খ) আমলাতন্ত্র: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র এখনো অনেকটাই উপনিবেশিক আমলের ধাঁচে কাজ করে। উপনিবেশিক
সংস্কৃতির কারণে আমলাতন্ত্রের মধ্যে ‘জনগণের সেবক’ অপেক্ষা ‘জনগণের প্রভু’ সংস্কৃতি বেশি দেখা যায়।
জনপ্রতিনিধিদের অনেকের মধ্যে আবার অমনোযোগিতা অথবা অদক্ষতাজনিত কারণে আমলাদের উপরে পুরোপুরি
নির্ভরশীল হয়ে পড়ার মনোভাব দেখা যায়। এর ফলে জনগণের সাথে জনগণের প্রতিনিধির দূরত্ব তৈরি হয়, যা বাংলাদেশে
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বড় অন্তরায় হিসাবে বিরাজ করছে।
(গ) আইনের শাসনে দুর্বলতা: আইনের চোখে সকলে সমান এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। কিন্তু বাংলাদেশে
অনেক সময় আইনের শাসনের এই দুই শর্ত রক্ষিত হয় না। বাংলাদেশে আইন আছে, সংবিধান মৌলিক মানবাধিকারসমূহ
স্পষ্টভাবে লিখিত রয়েছে। কিন্তু এসব আইন ও মানবাধিকারসমূহের সুফল সকলের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়
নি। অনেক ক্ষেত্রেই আইনের সুফল ভোগ করার জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রয়োজন হয়। আইন ও
প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক সময় এখানে ব্যক্তি প্রধান হয়ে উঠে। অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি নিজের পছন্দমাফিক লোকজনের
জন্য আইনের সুবিধা বা উপকার বিতরণ করেন। আইনের শাসনের এহেন দুর্বলতা মানুষের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে
ভ্রান্ত ধারণা জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
উপরোক্ত কারণগুলো ছাড়াও প্রায়শ অকার্যকর সংসদ, রাজনৈতিক সহিংসতার মত বিষয়গুলোও সুশাসনের ক্ষেত্রে বড়
অন্তরায়।

সার-সংক্ষেপ
অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান সূচকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ লক্ষণীয় উন্নতি করে চলেছে। কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ন্ত্রিত
আমলাতন্ত্র, আইনের শাসনে দুর্বলতার মত সমস্যাগুলো বাংলাদেশের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বিশেষ অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে
আছে। এই সমস্যার সমাধান না হলে ‘সুশাসন’ অর্জন কোনভাবেই সম্ভব নয়।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.৪
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। সুশাসনের পথে অন্তরায় শাসন ক্ষমতার
(ক) কেন্দ্রীকরণ (খ) বিকেন্দ্রীকরণ
(গ) গণতন্ত্রায়ন (ঘ) উপরের কোনটিই না
২। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র কোন ধাঁচের?
(ক) গণতান্ত্রিক (খ) সমাজতান্ত্রিক
(গ) উপনিবেশিক (ঘ) উপরের কোনটিই না


বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যাগুলো কি কি?

পাঠ-২.৫ সুশাসনের সমস্যার সমাধান
(ঝড়ষঁঃরড়হং ঃড় চৎড়নষবসং ড়ভ এড়ড়ফ এড়াবৎহধহপব) )
প্রতিনিধিত্বমূলক, দুর্নীতিমুক্ত, বাস্তবমুখী, জবাবদিহিতা।
সুশাসনের সমস্যার সমাধান
একটি দেশে সুশাসনের সমস্যা সমাধানের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। নিচে উদ্যোগগুলো উল্লেখ
করা হল।
১। সুশাসন কী, কেন দরকার এবং কীভাবে তা প্রতিষ্ঠা করা যায় এ বিষয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে
তুলে ধরা দরকার। এ লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে সুশাসন বিষয়টি বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করে
উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এতে দেশের ভবিষ্যত শাসকগণ সুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হবে।
২। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা যেহেতু প্রতিনিধিত্বমূলক, তাই জনগণের ইচ্ছা, কল্যাণ ও অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত আইন
প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগের আরেক নাম সুশাসন। সুশাসনের এই শর্ত পূরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বই সর্বাধিক
ভূমিকা রাখতে পারে।
৩। সরকারের সকল কাজেরই জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতে হবে। সরকারের কাজকর্ম কতটা যুক্তিযুক্ত সে বিষয়ে জনগণের
মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে।
৪। কার্যকর পেশাদারী মনোভাবসম্পন্ন আমলাতন্ত্র ছাড়া সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন
আমলাতন্ত্রের জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে সুস্পষ্ট নীতি নির্দেশনা প্রণয়ন করতে হবে।
৫। সক্রিয় নাগরিক এবং শাসনকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রতিনিয়ত যোগাযোগের মাধ্যমে সুশাসনের সুযোগ অবারিত হয়।
এক্ষেত্রে নানান উপায়ে নাগরিকদের শাসন প্রক্রিয়ায় অংশীদার করে নেয়া অত্যন্ত ফলদায়ী হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬। তথ্যের ভাÐারে নাগরিকদের প্রবেশ না থাকলে সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে না। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ।
৭। কেন্দ্রীয় সরকার সব কাজ একা করতে পারে না, সেজন্য বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের
সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১ তে স্পষ্ট বলা আছে প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত
করতে হবে। এলক্ষ্যে উপজেলা, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করলে তা হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়
সহায়ক।
৮। সরকারের সার্বিক কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন নিশ্চিত হল কিনা তা মূল্যায়ন করার জন্য
সাংবিধানিক ব্যবস্থা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।


সুশাসন নিশ্চিতকরণে করণীয় কি কি?

সার-সংক্ষেপ
সুশাসন প্রত্যেক নাগরিকেরই কামনা। এর মাধ্যমের নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার
বিষয়টি অনেকগুলো শর্তের উপর নির্ভরশীল। সরকারের কাজ-কর্মে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন,
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণসহ তথ্যের আদান-প্রদান অবাধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করা যায়।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-২.৫
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। সুশাসনের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে, সরকারের কর্মকান্ডের-
(র) জবাবদিহিতা (রর) দায়হীনতা (ররর) স্বচছতা বৃদ্ধি
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) র খ) র ও রর
গ) র ও ররর ঘ) উপরের কোনটিই না
২। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক ভূমিকা রাখতে পারে?
(ক) আমলাগোষ্ঠী (খ) ব্যবসায়ী
(গ) রাজনৈতিক নেতৃত্ব (ঘ) দাতা সংস্থা