লককে কেন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়? আলোচনা করুন।
পার্লামেন্টারী ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবক্তা জন লক (১৬৩২-১৭০৪) ইংল্যান্ডে এক গোঁড়া
পিউরিটান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৫৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়া সমাপ্ত
করেন। কিন্তুপরে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্রেপড়াশোনা করেন। চিকিৎসক হিসাবে
কার্যরত থাকার এক পর্যায়ে তিনি লর্ডএ্যাশলের বন্ধুত্ব লাভ করেন। এ্যাশলের আনুকুল্যে
তিনি গুরুত্বপূর্ণসরকারী পদে সমাসীন হন। কিন্তুতাঁর পৃষ্ঠপোষক লর্ডএ্যাশলের অবস্থান
সরকারী মহলে দুর্বল হয়ে পড়লে লক নিজেও সরকারের বিরাগভাজন হন এবং হল্যান্ড পলায়ন
করেন। ১৬৮৯ সালে-অর্থাৎ ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি স্বদেশে
প্রত্যাবর্তন করেন এবং ‘কমিশনার অব আপীল' পদে নিযুক্তি লাভ করেন। এ ভাবে তিনি বাস্তব
প্রশাসন ও নীতি নির্ধারণ বিষয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পান। ১৬৯০ সালে তাঁর
বিখ্যাত গ্রন্থ‘টুট্রীটিজেস’ প্রকাশিত হয়। এ পুস্তকে পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি
সমর্থনসহ তাঁর অন্যান্য রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটে।
তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাব লকের চিন্তাধারার উপর গভীর রেখাপাত করেছিল।
লকের জীবনের প্রায় প্রথম দুই তৃতীয়াংশ জুড়েই ছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধাবস্থা। রাজা ও
পার্লামেন্টের ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব জন লক পার্লামেন্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর
জীবদ্দশাতেই ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, ঘোষিত হয়েছিল
১৬৮৯ সালের ‘অধিকার সনদ’। ইংল্যান্ডের এ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লক উদারনীতিবাদকে
মনে প্রাণে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাই পার্লামেন্টারী ধরনের গণতন্ত্রএবং উদারনীতিবাদকে
সামনে রেখেই লক তাঁর লেখনী ধরেছিলেন। তাঁর পদ্ধতি ছিল অভিজ্ঞানবাদী। কল্পনা, ধর্ম,
আধ্যাতিকতা কোনটিই তাঁর লেখনী বা চিন্তায় স্থান পায় নি। অধ্যাপক স্যাবাইন লকের
চিন্তাধারার এ বিশেষ দিকের প্রশংসা করেছেন।
হব্স্ এর মত লকও মানব চরিত্রের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তুহব্স্ এর বিশ্লেষণ থেকে
তাঁর বিশ্লেষণ সম্পূর্ণআলাদা। লকের মতে মানুষ যুক্তিবাদী প্রাণী। মানুষের মধ্যে লোভ
লালসার প্রবৃত্তি থাকলেও চূড়ান্তভাবে যুক্তিবোধই কাজ করে থাকে। তাছাড়া মানুষের সাথে
মানুষের পার্থক্য যতটা না প্রকৃতিগত তার চেয়েও বেশী হল কৃত্রিম। পরিবেশই মানুষকে ভালো
বা মন্দ হতে শেখায় বলে লক মনে করতেন।
প্রকৃতির রাজ্য
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কেলক হব্স্রে মত সামাজিক চুক্তি মতবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি
প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কেতাঁর বইয়ে আলোচনা করেছেন। বলা বাহুল্য, হব্স্ও প্রকৃতির রাজ্যের
বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তুলকের বিবরণ হব্স্ এর বিবরণ থেকে সম্পূর্ণআলাদা। লকের মতে
প্রকৃতির রাজ্য ছিল “শান্তি, সহমর্মীতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষার রাজ্য। এখানে
শান্তি, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্ব বিরাজ করত, ছিল সাম্য ও স্বাধীনতা। কিন্তু এ স্বাধীনতা
স্বেচ্ছাচারিতার রূপ নিতো না । কারণ, অধিক স্বাধীনতাভোগ করা, অন্যকে পদানত করাইত্যাদি কুটবুদ্ধি মানুষের মধ্যে ছিল না। মানুষ বিবেচনা ও যুক্তিবোধ দিয়ে সব সময়ে কাজ মানুষের মধ্যে লোভ-লালসার প্রবৃত্তি থাকলেও চূড়ান্তভাবে যুক্তিবোধই কাজ করে থাকে।
করতো। হব্স্ এর বর্ণনার মত প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ঘৃণ্য, জঘন্য ও পাশাবিক ছিল
না বলে লক মনে করতেন। লকের প্রকৃতির রাজ্যের এই অবস্থাকে অধ্যাপক ডানিং মূল্যায়ন
করেছেন এ ভাবে যে, এখানে প্রাগ রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজমান ছিল না।
কিন্তুএটি প্রাগ সামাজিক ছিল। অর্থাৎ এটি হয়তো সামাজিক ছিল, কিন্তু
রাজনৈতিক ছিল না। আর লকের মতে এ কারণেই কালক্রমে মানুষের জীবনে নানা ধরনের
অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে মানুষ রাজনৈতিক ভাবে একটি সংগঠনের কথা চিন্তা করতে থাকে। প্রকৃতির আইন
লকের মতে প্রকৃতির আইনের বলেই মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে সুখে শান্তিতে থাকতে পারতো।
প্রকৃতির আইন ছিল মানুষের যুক্তিবোধের ফসল। সাম্য, স্বাধীনতা, ভাতৃত্ববোধ ইত্যাদি ছিল
এ আইনের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির আইন কার্যকর থাকার কারণেই তারা একে অপরের জীবন,
সম্পত্তি ও স্বাতন্ত্রের উপর হস্তক্ষেপ করতো না। তবে প্রকৃতির রাজ্যে আইনের ব্যাখ্যা দান
এবং তা বাস্তবায়নের কোন সাধারণ কর্তৃপক্ষ না থাকায় কেউ আইন ভংগ করলে শাস্তিদানের
ব্যবস্থা ছিল না। মূল অসুবিধা ছিল এখানেই। আর এ সমস্যার সমাধানের জন্য মানুষ চুক্তির
মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগঠন তথা রাষ্ট্রগঠনের দিকে এগিয়ে যায়।
সামাজিক চুক্তি
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, লকের মতে একটি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন বোধের
মধ্যেই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রতৈরীর কারণ নিহিত। তাহলে বলা যায়, চুক্তির মাধ্যমে গঠিত
সমাজ তৈরী হলো প্রকৃতির রাজ্যের মধ্যে চলমান সমস্যা ও অসুবিধাগুলো দূরীভ‚ত করার
জন্য। কিন্তুপ্রশ্নহলো, মানুষের ‘অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’কে অক্ষুন্নরাখা। কারণ কর্তৃপক্ষ সৃষ্টির
ফলে মানুষ যদি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে তাহলে সে কর্তৃপক্ষ নিরর্থক হয়ে যায়।
সুতরাং মানুষ চুক্তির মাধ্যমে এমন কোন স্বৈরাচারী শাসক তৈরী করলো না যে কর্তৃপক্ষ তাদের
স্বাধীনতাকে খর্বকরতে পারবে। প্রকৃতির রাজ্যের সবকিছুত্যাগ করার জন্য মানুষ চুক্তি করে
নাই। শুধুমাত্র প্রকৃতির রাজ্যের অবাধ ও ক্ষতিকর স্বাধীনতা ব্যতীত সকল কিছুই মানুষের
এখতিয়ারে থাকলো। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ছিল তার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। বলা
বাহুল্য, প্রকৃতির রাজ্যে এক পর্যায়ে তা রক্ষিত হতো না, ফলে চুক্তি সংগঠিত হলো প্রতিটি
মানুষের মধ্যে যে, তারা কেউই আর অন্যকে শাস্তিদেওয়ার ক্ষমতা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োগ
করতে পারবে না। এ ক্ষমতা একটি কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্তকরা হলো। এ কর্তৃপক্ষের সৃষ্টিকর্তা
হল জনগণ। কি কি নিয়মে কর্তৃপক্ষ কাজ করবে সেটাও জনগণ স্থির করে দেবে। তাই শাসক
অবাধ ক্ষমতার মালিক নয়। মূল ক্ষমতা জনগণের হাতেই থেকে গেল। এখানেই লকের চুক্তির
মূল বক্তব্য নিহিত। তাঁর পূর্ববর্তী দার্শনিক হব্স্ কিন্তুসে ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে নিয়ে
শাসকের হাতে সর্বোতভাবে তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাই লকের সামাজিক চুক্তি
সীমিত চুক্তি। এক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা চূড়ান্তনয়। সরকার একটি জিম্মাদারী প্রতিষ্ঠান মাত্র।
চুক্তি একতরফা নয়।
জনগণের সাথে শাসক চুক্তিবদ্ধ। জনগণের জীবন স্বাধীনতা রক্ষায় শাসক অংগীকারাবদ্ধ।
শাসক এ দায়িত্বপালনে ব্যর্থহলে জনগণের অধিকার থাকবে শাসক পরিবর্তন করার। সে
ক্ষমতা ও অধিকার জনগণের কাছেই সংরক্ষিত। সুতরাং শাসক সার্বভৌম নয়। সার্বভৌম হল
জনগণ। লকের চুক্তির অন্য একটি দিক আছে, তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। জনগণ বলতে
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকেই বুঝানো হয়েছে। লকের চিন্তার মূল সুর হলো জনগণের সম্মতি
(পড়হংবহঃ)। জনগণের সম্মতির উপর আইন, সরকার ও শাসন নির্ভরশীল। সরকার শুধু
নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। নীতি নির্ধারণ করবে জনগণ। এভাবে লক তার সামাজিক চুক্তি
মতবাদের মাধ্যমে ‘গণসার্বভৌমত্ব’ এবং পার্লমেন্টারী ধরনের
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুরোধা হিসাবে রাজনীতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ছিল তার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। লকের চিন্তার মূল সুর হলো জনগণের সম্মতি (পড়হংবহঃ)। জনগণের সম্মতির উপর আইন, সরকার ও শাসন নির্ভরশীল।
লকের সম্পত্তি তত্ত¡
লকের রাজনৈতিক দর্শনে সম্পত্তি তত্ত¡ গুরুত্বপূর্ণস্থান দখল করে আছে। তিনি ব্যক্তিগত
সম্পত্তির অধিকারকে যুক্তিসংগত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সম্পত্তি তত্ত¡বিচ্ছিন্নকোন তত্ত¡
নয়। এটি লকের রাষ্ট্রদর্শনের কাঠামোর সংগে সংযুক্ত। লক বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির রাজ্যে
মানুষের সম্পত্তির সুষ্ঠুনিশ্চয়তা ছিল না বলেই মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
সুতরাং জনগণের সম্পত্তি রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। লক মনে করতেন যে, শ্রমই
সম্পত্তির মালিকানার বৈধ উৎস। সম্পত্তির প্রাথমিক উৎস হলো প্রকৃতি। তবে প্রকৃতিদত্ত
জিনিসের উপর শ্রম যুক্ত হয়েই সম্পত্তি সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ শ্রম ছাড়া সম্পত্তি সৃষ্টি হতে পারে
না। সম্পত্তি সৃষ্টির সাথে শ্রম ঐ সম্পত্তির মূল্যও সৃষ্টি করে। কোন জিনিসের জন্য যতবেশি
শ্রম লাগবে ঐ জিনিসের মূল্য ততবেশি সংযোজিত হবে। তাঁর এ তত্ত¡পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক
তত্ত¡গঠনে ভ‚মিকা রেখেছে। কার্লমার্কস উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত¡গঠনে লকের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত
হয়েছিলেন বলে মনে করা যায় (পাঠ-৫ দ্রষ্টব্য)।
লক ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎস হিসাবে শ্রমকেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি সম্পত্তির সীমা সম্পর্কে
খুব স্পষ্ট করে কিছুনা বললেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত সম্পত্তির মালিকানার সমালোচনা
করেছেন। তিনি বলেছেন উদ্বৃত্ত সম্পদের দাবীদার হওয়ার কোন যৌক্তিকতা নাই। এ উদ্বৃত্তের
মালিক হবে অন্যান্যরা। কিন্তুমুদ্রা ব্যবস্থা চালুহওয়ার পর ধণতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ নির্মানে
উদ্বৃত্ত পুন:বিনিয়োগের সুযোগ এনে দেয় এবং লকের তত্ত¡অসহায় অবস্থার মধ্যে পতিত হয়।
সুতরাং লকের সম্পত্তি তত্তে¡সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের বক্তব্য থাকলেও প্রকারান্তরে তা ধণতান্ত্রিক
সমাজ নির্মানের দিকে ধাবিত হয়। তবে তার সম্পত্তি তত্তে¡র ভেতর দিয়ে তিনি একজন ব্যক্তি
স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তাবিদের আসন দখল করে নিয়েছেন।
লকের রাষ্ট্রদর্শনের মূল্যায়ন
লকের অবদান বিশ্লেষণ করলে আমরা নি¤œলিখিত দিকগুলো দেখতে পাই:
প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষার তত্ত¡প্রদান করে লক মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে
গেছেন। তিনি ভাবতেন জীবনকে পরিপূর্ণকরতে হলে অধিকার থাকা অপরিহার্য। লক
সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধরনের সরকার ব্যবস্থার জনক হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে
গিয়েছেন। সরকারের ভিত্তি এবং বৈধতা হচ্ছে জনগণের সম্মতি-একথা তিনি অত্যন্তস্পষ্ট
ভাষায় উচ্চারণ করেছেন। তাঁর এ সংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিকতাবাদ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার
মূলমন্ত্রহিসেবে স্বীকৃত। জনগণই সার্বভৌম। সরকার অফুরন্তক্ষমতার আঁধার নয়। কতকগুলো
সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকারকে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ
সরকারকে তিনি সীমাবদ্ধ করেছেন এবং সরকারকে গণসার্বভৌমত্বের অধীনস্থকরে স্বৈরাচার
প্রতিরোধের ভিত্তি রচনা করে গেছেন। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে তার তত্তে¡র
প্রতিফলন দেখা যায়। জন লক গণতন্ত্রও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন পদ্ধতির মূল প্রবক্তা। ক্ষমতা পৃথকিকরণের ইংগিত তাঁর চিন্তায় ফুটে উঠেছে।
উদারনীতিবাদ, সহনশীলতার বানী প্রচার করে পাশ্চাত্য সভ্যতার নবযুগের দ্বার উম্মোচিত
করেছেন জন লক। সম্পত্তি তত্তে¡র মাধ্যমে লক তৎকালীন সনাতনী চিন্তাভাবনার মূলে
কুঠারাঘাত করে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের জয়গান উচ্চারণ করেছেন। প্রকৃতিদত্ত জিনিসের উপর শ্রম যুক্ত হয়েই সম্পত্তি সৃষ্টি হয়। লক সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধরনের সরকার ব্যবস্থার জনক হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন।
সারকথা
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে জন লক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি গণতন্ত্র, উদারনীতিবাদ,
সাংবিধানিক সরকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সীমিত সরকারের ধারণা ইত্যাদির জন্য
বিখ্যাত হয়ে আছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশেষ করে পার্লামেন্টারী ধরনের
সরকার ব্যবস্থা জন লকের কাছে পুরোপুরিভাবে ঋণী।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। রাজা এবং পার্লামেন্টেপন্থীদের দ্বন্দে¡জন লকের ভ‚মিকা ছিল।
ক) রাজার পক্ষে; খ) পার্লামেন্টপন্থীদের পক্ষে;
গ) সেনাবাহিনীর পক্ষে; ঘ) কারও পক্ষেই নয়।
২। লকের মতে প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল?
ক) স্বার্থের হানাহানিতে লিপ্ত এবং বিভীষিকাময়;
খ) জবরদস্তিমূলক;
গ) শান্তিসৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্তে¡পরিপূর্ণ;
ঘ) রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুশাসিত।
৩। লকের মতে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কে?
ক) জনগণ; খ) রাজা;
গ) জন প্রতিনিধি; ঘ) কতিপয় জ্ঞানীগুণী ও প্রজ্ঞাশালী ব্যক্তি।
সঠিক উত্তর - ১। খ, ২। গ, ৩। ক।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। লক কেন ইংল্যান্ড ত্যাগ করেছিলেন?
২। লকের মতে প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল?
৩। লকের মতে মানুষ কেন চুক্তিবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রতৈরী করেছিল?
৪। লকের মতে কয়টি চুক্তি হয়েছিল?
৫। লকের মতে স্বার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কে এবং কেন?
৬। লকের মতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছিল?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। লককে কেন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়? আলোচনা করুন।
পিউরিটান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৬৫৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়া সমাপ্ত
করেন। কিন্তুপরে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্রেপড়াশোনা করেন। চিকিৎসক হিসাবে
কার্যরত থাকার এক পর্যায়ে তিনি লর্ডএ্যাশলের বন্ধুত্ব লাভ করেন। এ্যাশলের আনুকুল্যে
তিনি গুরুত্বপূর্ণসরকারী পদে সমাসীন হন। কিন্তুতাঁর পৃষ্ঠপোষক লর্ডএ্যাশলের অবস্থান
সরকারী মহলে দুর্বল হয়ে পড়লে লক নিজেও সরকারের বিরাগভাজন হন এবং হল্যান্ড পলায়ন
করেন। ১৬৮৯ সালে-অর্থাৎ ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি স্বদেশে
প্রত্যাবর্তন করেন এবং ‘কমিশনার অব আপীল' পদে নিযুক্তি লাভ করেন। এ ভাবে তিনি বাস্তব
প্রশাসন ও নীতি নির্ধারণ বিষয়ে প্রচুর অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পান। ১৬৯০ সালে তাঁর
বিখ্যাত গ্রন্থ‘টুট্রীটিজেস’ প্রকাশিত হয়। এ পুস্তকে পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি
সমর্থনসহ তাঁর অন্যান্য রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটে।
তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাব লকের চিন্তাধারার উপর গভীর রেখাপাত করেছিল।
লকের জীবনের প্রায় প্রথম দুই তৃতীয়াংশ জুড়েই ছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধাবস্থা। রাজা ও
পার্লামেন্টের ক্ষমতার দ্ব›েদ্ব জন লক পার্লামেন্টের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর
জীবদ্দশাতেই ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, ঘোষিত হয়েছিল
১৬৮৯ সালের ‘অধিকার সনদ’। ইংল্যান্ডের এ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে লক উদারনীতিবাদকে
মনে প্রাণে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাই পার্লামেন্টারী ধরনের গণতন্ত্রএবং উদারনীতিবাদকে
সামনে রেখেই লক তাঁর লেখনী ধরেছিলেন। তাঁর পদ্ধতি ছিল অভিজ্ঞানবাদী। কল্পনা, ধর্ম,
আধ্যাতিকতা কোনটিই তাঁর লেখনী বা চিন্তায় স্থান পায় নি। অধ্যাপক স্যাবাইন লকের
চিন্তাধারার এ বিশেষ দিকের প্রশংসা করেছেন।
হব্স্ এর মত লকও মানব চরিত্রের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তুহব্স্ এর বিশ্লেষণ থেকে
তাঁর বিশ্লেষণ সম্পূর্ণআলাদা। লকের মতে মানুষ যুক্তিবাদী প্রাণী। মানুষের মধ্যে লোভ
লালসার প্রবৃত্তি থাকলেও চূড়ান্তভাবে যুক্তিবোধই কাজ করে থাকে। তাছাড়া মানুষের সাথে
মানুষের পার্থক্য যতটা না প্রকৃতিগত তার চেয়েও বেশী হল কৃত্রিম। পরিবেশই মানুষকে ভালো
বা মন্দ হতে শেখায় বলে লক মনে করতেন।
প্রকৃতির রাজ্য
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কেলক হব্স্রে মত সামাজিক চুক্তি মতবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি
প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কেতাঁর বইয়ে আলোচনা করেছেন। বলা বাহুল্য, হব্স্ও প্রকৃতির রাজ্যের
বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তুলকের বিবরণ হব্স্ এর বিবরণ থেকে সম্পূর্ণআলাদা। লকের মতে
প্রকৃতির রাজ্য ছিল “শান্তি, সহমর্মীতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষার রাজ্য। এখানে
শান্তি, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্ব বিরাজ করত, ছিল সাম্য ও স্বাধীনতা। কিন্তু এ স্বাধীনতা
স্বেচ্ছাচারিতার রূপ নিতো না । কারণ, অধিক স্বাধীনতাভোগ করা, অন্যকে পদানত করাইত্যাদি কুটবুদ্ধি মানুষের মধ্যে ছিল না। মানুষ বিবেচনা ও যুক্তিবোধ দিয়ে সব সময়ে কাজ মানুষের মধ্যে লোভ-লালসার প্রবৃত্তি থাকলেও চূড়ান্তভাবে যুক্তিবোধই কাজ করে থাকে।
করতো। হব্স্ এর বর্ণনার মত প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ঘৃণ্য, জঘন্য ও পাশাবিক ছিল
না বলে লক মনে করতেন। লকের প্রকৃতির রাজ্যের এই অবস্থাকে অধ্যাপক ডানিং মূল্যায়ন
করেছেন এ ভাবে যে, এখানে প্রাগ রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজমান ছিল না।
কিন্তুএটি প্রাগ সামাজিক ছিল। অর্থাৎ এটি হয়তো সামাজিক ছিল, কিন্তু
রাজনৈতিক ছিল না। আর লকের মতে এ কারণেই কালক্রমে মানুষের জীবনে নানা ধরনের
অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে মানুষ রাজনৈতিক ভাবে একটি সংগঠনের কথা চিন্তা করতে থাকে। প্রকৃতির আইন
লকের মতে প্রকৃতির আইনের বলেই মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে সুখে শান্তিতে থাকতে পারতো।
প্রকৃতির আইন ছিল মানুষের যুক্তিবোধের ফসল। সাম্য, স্বাধীনতা, ভাতৃত্ববোধ ইত্যাদি ছিল
এ আইনের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির আইন কার্যকর থাকার কারণেই তারা একে অপরের জীবন,
সম্পত্তি ও স্বাতন্ত্রের উপর হস্তক্ষেপ করতো না। তবে প্রকৃতির রাজ্যে আইনের ব্যাখ্যা দান
এবং তা বাস্তবায়নের কোন সাধারণ কর্তৃপক্ষ না থাকায় কেউ আইন ভংগ করলে শাস্তিদানের
ব্যবস্থা ছিল না। মূল অসুবিধা ছিল এখানেই। আর এ সমস্যার সমাধানের জন্য মানুষ চুক্তির
মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগঠন তথা রাষ্ট্রগঠনের দিকে এগিয়ে যায়।
সামাজিক চুক্তি
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, লকের মতে একটি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন বোধের
মধ্যেই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রতৈরীর কারণ নিহিত। তাহলে বলা যায়, চুক্তির মাধ্যমে গঠিত
সমাজ তৈরী হলো প্রকৃতির রাজ্যের মধ্যে চলমান সমস্যা ও অসুবিধাগুলো দূরীভ‚ত করার
জন্য। কিন্তুপ্রশ্নহলো, মানুষের ‘অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’কে অক্ষুন্নরাখা। কারণ কর্তৃপক্ষ সৃষ্টির
ফলে মানুষ যদি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে তাহলে সে কর্তৃপক্ষ নিরর্থক হয়ে যায়।
সুতরাং মানুষ চুক্তির মাধ্যমে এমন কোন স্বৈরাচারী শাসক তৈরী করলো না যে কর্তৃপক্ষ তাদের
স্বাধীনতাকে খর্বকরতে পারবে। প্রকৃতির রাজ্যের সবকিছুত্যাগ করার জন্য মানুষ চুক্তি করে
নাই। শুধুমাত্র প্রকৃতির রাজ্যের অবাধ ও ক্ষতিকর স্বাধীনতা ব্যতীত সকল কিছুই মানুষের
এখতিয়ারে থাকলো। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ছিল তার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। বলা
বাহুল্য, প্রকৃতির রাজ্যে এক পর্যায়ে তা রক্ষিত হতো না, ফলে চুক্তি সংগঠিত হলো প্রতিটি
মানুষের মধ্যে যে, তারা কেউই আর অন্যকে শাস্তিদেওয়ার ক্ষমতা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োগ
করতে পারবে না। এ ক্ষমতা একটি কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্তকরা হলো। এ কর্তৃপক্ষের সৃষ্টিকর্তা
হল জনগণ। কি কি নিয়মে কর্তৃপক্ষ কাজ করবে সেটাও জনগণ স্থির করে দেবে। তাই শাসক
অবাধ ক্ষমতার মালিক নয়। মূল ক্ষমতা জনগণের হাতেই থেকে গেল। এখানেই লকের চুক্তির
মূল বক্তব্য নিহিত। তাঁর পূর্ববর্তী দার্শনিক হব্স্ কিন্তুসে ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে নিয়ে
শাসকের হাতে সর্বোতভাবে তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাই লকের সামাজিক চুক্তি
সীমিত চুক্তি। এক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা চূড়ান্তনয়। সরকার একটি জিম্মাদারী প্রতিষ্ঠান মাত্র।
চুক্তি একতরফা নয়।
জনগণের সাথে শাসক চুক্তিবদ্ধ। জনগণের জীবন স্বাধীনতা রক্ষায় শাসক অংগীকারাবদ্ধ।
শাসক এ দায়িত্বপালনে ব্যর্থহলে জনগণের অধিকার থাকবে শাসক পরিবর্তন করার। সে
ক্ষমতা ও অধিকার জনগণের কাছেই সংরক্ষিত। সুতরাং শাসক সার্বভৌম নয়। সার্বভৌম হল
জনগণ। লকের চুক্তির অন্য একটি দিক আছে, তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। জনগণ বলতে
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকেই বুঝানো হয়েছে। লকের চিন্তার মূল সুর হলো জনগণের সম্মতি
(পড়হংবহঃ)। জনগণের সম্মতির উপর আইন, সরকার ও শাসন নির্ভরশীল। সরকার শুধু
নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। নীতি নির্ধারণ করবে জনগণ। এভাবে লক তার সামাজিক চুক্তি
মতবাদের মাধ্যমে ‘গণসার্বভৌমত্ব’ এবং পার্লমেন্টারী ধরনের
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুরোধা হিসাবে রাজনীতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন ছিল তার জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা। লকের চিন্তার মূল সুর হলো জনগণের সম্মতি (পড়হংবহঃ)। জনগণের সম্মতির উপর আইন, সরকার ও শাসন নির্ভরশীল।
লকের সম্পত্তি তত্ত¡
লকের রাজনৈতিক দর্শনে সম্পত্তি তত্ত¡ গুরুত্বপূর্ণস্থান দখল করে আছে। তিনি ব্যক্তিগত
সম্পত্তির অধিকারকে যুক্তিসংগত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সম্পত্তি তত্ত¡বিচ্ছিন্নকোন তত্ত¡
নয়। এটি লকের রাষ্ট্রদর্শনের কাঠামোর সংগে সংযুক্ত। লক বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির রাজ্যে
মানুষের সম্পত্তির সুষ্ঠুনিশ্চয়তা ছিল না বলেই মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
সুতরাং জনগণের সম্পত্তি রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। লক মনে করতেন যে, শ্রমই
সম্পত্তির মালিকানার বৈধ উৎস। সম্পত্তির প্রাথমিক উৎস হলো প্রকৃতি। তবে প্রকৃতিদত্ত
জিনিসের উপর শ্রম যুক্ত হয়েই সম্পত্তি সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ শ্রম ছাড়া সম্পত্তি সৃষ্টি হতে পারে
না। সম্পত্তি সৃষ্টির সাথে শ্রম ঐ সম্পত্তির মূল্যও সৃষ্টি করে। কোন জিনিসের জন্য যতবেশি
শ্রম লাগবে ঐ জিনিসের মূল্য ততবেশি সংযোজিত হবে। তাঁর এ তত্ত¡পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক
তত্ত¡গঠনে ভ‚মিকা রেখেছে। কার্লমার্কস উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত¡গঠনে লকের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত
হয়েছিলেন বলে মনে করা যায় (পাঠ-৫ দ্রষ্টব্য)।
লক ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎস হিসাবে শ্রমকেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি সম্পত্তির সীমা সম্পর্কে
খুব স্পষ্ট করে কিছুনা বললেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত সম্পত্তির মালিকানার সমালোচনা
করেছেন। তিনি বলেছেন উদ্বৃত্ত সম্পদের দাবীদার হওয়ার কোন যৌক্তিকতা নাই। এ উদ্বৃত্তের
মালিক হবে অন্যান্যরা। কিন্তুমুদ্রা ব্যবস্থা চালুহওয়ার পর ধণতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ নির্মানে
উদ্বৃত্ত পুন:বিনিয়োগের সুযোগ এনে দেয় এবং লকের তত্ত¡অসহায় অবস্থার মধ্যে পতিত হয়।
সুতরাং লকের সম্পত্তি তত্তে¡সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের বক্তব্য থাকলেও প্রকারান্তরে তা ধণতান্ত্রিক
সমাজ নির্মানের দিকে ধাবিত হয়। তবে তার সম্পত্তি তত্তে¡র ভেতর দিয়ে তিনি একজন ব্যক্তি
স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তাবিদের আসন দখল করে নিয়েছেন।
লকের রাষ্ট্রদর্শনের মূল্যায়ন
লকের অবদান বিশ্লেষণ করলে আমরা নি¤œলিখিত দিকগুলো দেখতে পাই:
প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষার তত্ত¡প্রদান করে লক মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে
গেছেন। তিনি ভাবতেন জীবনকে পরিপূর্ণকরতে হলে অধিকার থাকা অপরিহার্য। লক
সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধরনের সরকার ব্যবস্থার জনক হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে
গিয়েছেন। সরকারের ভিত্তি এবং বৈধতা হচ্ছে জনগণের সম্মতি-একথা তিনি অত্যন্তস্পষ্ট
ভাষায় উচ্চারণ করেছেন। তাঁর এ সংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিকতাবাদ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার
মূলমন্ত্রহিসেবে স্বীকৃত। জনগণই সার্বভৌম। সরকার অফুরন্তক্ষমতার আঁধার নয়। কতকগুলো
সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকারকে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ
সরকারকে তিনি সীমাবদ্ধ করেছেন এবং সরকারকে গণসার্বভৌমত্বের অধীনস্থকরে স্বৈরাচার
প্রতিরোধের ভিত্তি রচনা করে গেছেন। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে তার তত্তে¡র
প্রতিফলন দেখা যায়। জন লক গণতন্ত্রও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন পদ্ধতির মূল প্রবক্তা। ক্ষমতা পৃথকিকরণের ইংগিত তাঁর চিন্তায় ফুটে উঠেছে।
উদারনীতিবাদ, সহনশীলতার বানী প্রচার করে পাশ্চাত্য সভ্যতার নবযুগের দ্বার উম্মোচিত
করেছেন জন লক। সম্পত্তি তত্তে¡র মাধ্যমে লক তৎকালীন সনাতনী চিন্তাভাবনার মূলে
কুঠারাঘাত করে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের জয়গান উচ্চারণ করেছেন। প্রকৃতিদত্ত জিনিসের উপর শ্রম যুক্ত হয়েই সম্পত্তি সৃষ্টি হয়। লক সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধরনের সরকার ব্যবস্থার জনক হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন।
সারকথা
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে জন লক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি গণতন্ত্র, উদারনীতিবাদ,
সাংবিধানিক সরকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সীমিত সরকারের ধারণা ইত্যাদির জন্য
বিখ্যাত হয়ে আছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশেষ করে পার্লামেন্টারী ধরনের
সরকার ব্যবস্থা জন লকের কাছে পুরোপুরিভাবে ঋণী।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। রাজা এবং পার্লামেন্টেপন্থীদের দ্বন্দে¡জন লকের ভ‚মিকা ছিল।
ক) রাজার পক্ষে; খ) পার্লামেন্টপন্থীদের পক্ষে;
গ) সেনাবাহিনীর পক্ষে; ঘ) কারও পক্ষেই নয়।
২। লকের মতে প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল?
ক) স্বার্থের হানাহানিতে লিপ্ত এবং বিভীষিকাময়;
খ) জবরদস্তিমূলক;
গ) শান্তিসৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্তে¡পরিপূর্ণ;
ঘ) রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুশাসিত।
৩। লকের মতে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কে?
ক) জনগণ; খ) রাজা;
গ) জন প্রতিনিধি; ঘ) কতিপয় জ্ঞানীগুণী ও প্রজ্ঞাশালী ব্যক্তি।
সঠিক উত্তর - ১। খ, ২। গ, ৩। ক।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। লক কেন ইংল্যান্ড ত্যাগ করেছিলেন?
২। লকের মতে প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল?
৩। লকের মতে মানুষ কেন চুক্তিবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রতৈরী করেছিল?
৪। লকের মতে কয়টি চুক্তি হয়েছিল?
৫। লকের মতে স্বার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কে এবং কেন?
৬। লকের মতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছিল?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। লককে কেন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়? আলোচনা করুন।