হেগেলের দ্বান্দি¡ক তত্তে¡র সাথে মার্কসের দ্বন্দ¡তত্তে¡র পার্থক্য কোথায় ? মার্কসকে কেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের জনক বলা হয় ? ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা কী ?

ভ‚মিকা: সমাজ, রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে কার্ল মার্কসকে সমাজতন্ত্রবাদের মূল প্রবক্তা
হিসেবে গণ্য করা হয়। পুঁজিবাদী শোষণ নির্ভর উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় সমাজ-ব্যবস্থার
বিপরীতে কার্ল মার্কস দ্বা›িদ্বক বস্তুবাদের ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র মতবাদ
উদ্ভাবন করেন। তাঁর এ মতাদর্শ মার্কসবাদ (গধৎীরংস) নাম খ্যাত। ধনতান্ত্রিক সমাজের
শোষণ, নির্যাতন উপলব্ধি করে কার্ল মার্কসের আগে রবার্ট ওয়েন, চার্লস ফুরিয়ে প্রমুখ
দার্শনিকগণ ধনতান্ত্রিক সমাজের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন শ্রমিক সমাজের কল্পনা
করেছিলেন। কিন্তু কোন্ পথে বাস্তবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তার কোন প্রকার সঠিক
রূপরেখা প্রদানে উক্ত দার্শনিকগণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ কারণে তাঁরা ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদী
(টঃড়ঢ়রধহ ঝড়পরধষরংঃ) হিসেবে খ্যাত। বস্তুত: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদীদের কল্পনা নির্ভর
সমাজতন্ত্র কার্ল মার্কসের হাতে বাস্তব ও প্রয়োগযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেয়েছিল। উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে, মার্কসের চিন্তার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রাশিয়ার ভøাদিমির ইলিচ লেনিন বিংশ শতাব্দীর
শুরুতে (১৯১৭) তৎকালীন জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক মেহনতী জনতার সমন্বয়ে গঠিত
বৈপ্লবিক শক্তির দ্বারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বিশেষত: দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৪৫) পূর্ব ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রিক
ধাঁচের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে মাওজেডং-এর নেতৃত্বে চীন দেশে বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান অধ্যায় উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। ভ‚মিকা: সমাজ, রাষ্ট্রএবং অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে কার্লমার্কসকে সমাজতন্ত্রবাদের মূল প্রবক্তা
হিসেবে গণ্য করা হয়। পুঁজিবাদী শোষণ নির্ভর উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় সমাজ-ব্যবস্থার
বিপরীতে কার্লমার্কস দ্বান্দি¡ক বস্তুবাদের ধারার উপর প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রমতবাদ
উদ্ভাবন করেন। তাঁর এ মতাদর্শমার্কসবাদ (গধৎীরংস) নামে খ্যাত।
ধনতান্ত্রিক সমাজের শোষণ, নির্যাতন উপলব্ধি করে কার্লমার্কসের আগে রবার্টওয়েন, চার্লস
ফুরিয়ে প্রমুখ দার্শনিকগণ ধনতান্ত্রিক সমাজের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন শ্রমিক রাজের কল্পনা
করেছিলেন। কিন্তুকোন্ পথে বাস্তবে সমাজতন্ত্রপ্রতিষ্ঠিত হবে তার কোন প্রকার সঠিক
রূপরেখা প্রদানে উক্ত দার্শনিকগণ ব্যর্থহয়েছিলেন। এ কারণে তাঁরা ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদী'
হিসেবে খ্যাত। বস্তুত: কাল্পনিক সামজতন্ত্রবাদীদের কল্পনা নির্ভর
সমাজতন্ত্রকার্লমার্কসের হাতে বাস্তব ও প্রয়োগযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পেয়েছিল। উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে, মার্কসের চিন্তার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রাশিয়ায় ভাদিমির ইলিস লেনিন বিংশ
শতাব্দীর শুরুতে (১৯১৭) তৎকালীন জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে শ্রমিক মেহনতী জনতার সমম্বয়ে
গঠিত বৈপ্লবিক শক্তির দ্বারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বিশেষত: দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৪৫) পূর্বইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্নদেশে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক
ধাঁচের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে মাও জেডং-এর নেতৃত্বেচীন দেশে বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র
প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ভাবে বিশ্বের এক বৃহৎ অংশ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরূপ নেয়। তবে এখানে
উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৯০ সালের পর থেকে রাশিয়াসহ পূর্বইউরোপের বিভিন্নদেশ
সমাজতান্ত্রিক আদর্শপরিত্যাগ করে এবং ধনতান্ত্রিক ধারার রাষ্ট্রনির্মাণের দিকে অগ্রসর হতে
থাকে। এমনকি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত চীনও কম্যুনিষ্ট আদর্শের ভেতর ব্যক্তি মালিকানা
ও বহুজাতিক যৌথ মালিকানার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। বর্তমান অধ্যায়ে উনবিংশ ও বিংশ
শতাব্দীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী দার্শনিক কার্লমার্কসের চিন্তাধারা উপস্থাপন করা হবে।
কার্লমার্কস: জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন
কার্লমার্কসের জন্ম জার্মানীতে এক ইহুদী পরিবারে। ছাত্রাবস্থায় তিনি হেগেলের দর্শনের দ্বারা
প্রভাবিত হলেও পরবর্তীতে হেগেলের চিন্তার শুধুপ্রগতিশীল অংশটুকুই গ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষা
গ্রহণের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাঁর চরম ও
বৈপ্লবিক তৎপরতা ও চিন্তা সেই কাংখিত পদের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। পরে তিনি প্রæশিয়ার একটি
চরমপন্থী সংবাদপত্রে যোগদান করেন এবং কৃষক অভ্যুত্থানে জড়িয়ে যান। এমতাবস্থায় তাঁকে
প্রæশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি প্রথমে প্যারিস ও পরে ইংল্যান্ড গমন করেন। ইংল্যাÐে
তিনি এক শিল্পপতির পুত্র ফ্রেডারিক এঙ্গেলস এর সাহচর্যলাভ করেন এবং তাঁরা একত্রে
সাম্যবাদী তৎপরতা ও পুস্তক রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১৮৪৮ সালে তাঁদের যৌথ কাজ
বিখ্যাত ‘কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টো’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। মার্কস তৎকালীন ইউরোপীয়
সমাজে ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক শোষণের উপর গবেষণা শুরু করেন এবং এঙ্গেলস-এর
সহায়তায় ১৮৬৭ সালে ‘ক্যাপিটাল’ নামক গ্রন্থরচনা করেন। পরবর্তীতে এই পুস্তকের আরও
দু'টি খন্ড প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও ‘দি ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি’,‘দি সিভিল ওয়ার
ইন ফ্রান্স’ প্রভৃতি পুস্তক রচনার মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর কালজয়ী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে
গিয়েছেন। ১৮৮৩ সালে লন্ডনে তিনি মারা যান।
কার্লমার্কসের দর্শন
এ যাবৎ কালের সকল প্রকার সমাজ ব্যবস্থা বিশেষ করে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার শোষণ, নির্যাতন
ও বঞ্চনার বিপরীতে শোষণহীন সাম্যবাদী আদর্শের বাস্তবসম্মত সমাজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
প্রদানের লক্ষ্যে মার্কস তাঁর চিন্তা ও দর্শনকে এগিয়ে নেন। তাঁর এই দর্শন মার্কসবাদ
(গধৎীরংস) নামে খ্যাত। বস্তুত মার্কসবাদ একটি ব্যাপক ও বিস্তৃত মতবাদ। তবে সংক্ষেপে
মার্কসবাদকে মোটামুটি পাঁচটি স্তরে বিভক্ত করা যায়, যথা:
● দ্বান্দি¡ক বস্তুবাদ ● ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ● শ্রেণী সংগ্রাম তত্ত¡●
উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত¡● সাম্যবাদ।
নিন্মে সংক্ষেপে এগুলো ব্যাখ্যা করা গেল:
● দ্বান্দি¡ক বস্তুবাদ: সমাজ পরিবর্তন এবং বিকাশের মূলে কোন্ শক্তি কাজ করে থাকে এটি
দার্শনিকদের কাছে একটি অনন্তজিজ্ঞাসা। সমাজ বিকাশের অন্তর্নিহিত প্রবণতা উদঘাটন করার
প্রশ্নেমার্কস তাঁর শিক্ষক হেগেলের দ্বান্দি¡ক সূত্রকে গ্রহণ করেন এবং নিজস্বভঙ্গিতে তা ব্যক্ত
করেন। হেগেলের মতে দ্বন্দ¡ই হলো মূল কথা। তাঁর মতে অগ্রগতি বা বিবর্তন প্রকৃতিস্থসহজাত
ধারার ফলশ্রæতিতে পরস্পরবিরোধী শক্তির সংঘাতের ফলে সূচিত হয়। তিনি বলেন, বিকাশের
প্রতিটি পর্যায়ের মধ্যে স্বভাবজাত একটি বিরোধাত্মক ধারা কাজ করে। আর এ দু'টি ধারার সংঘাতের ফলে সৃষ্টি হয় সংশ্লেষণ তবে
প্রকারান্তরে উক্ত সংশ্লেষণ নিজে পরক্ষণেই আবার প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ ঞযবংরং এ পরিণত হয়।
এ ভাবে চক্রাকারে সমাজ ও ইতিহাস এগিয়ে যায়। হেগেল বলেন এ সবই ঘটে ভাবের সাথে
ভাবের (ওফবধং) সংঘাতের ফলে। কিন্তুমার্কস হেগেলের নিকট দ্বান্দি¡ক সূত্রের জন্য ঋণী
থাকলেও দ্বন্দে¡র অভ্যন্তরস্থশক্তি-অর্থাৎ ভাবকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিজ্ঞানসম্মত
দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করে বলতে চান যে, ভাব নয় বস্তুই হলো মূল শক্তি। বস্তুগত
সংঘাতের ফলেই সমাজ-ইতিহাস এগিয়ে যায়। বলাবাহুল্য, মার্কসের এ ব্যাখ্যা ইতিহাসের
বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ নামে পরিচিত।
● দ্বান্দি¡ক বস্তুবাদ এবং ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা : মার্কস এবং এঙ্গেলসের মতে মানুষের
সমাজ ও ইতিহাসের মূল শক্তি হচ্ছে বস্তু। তাঁরা তাই বস্তুকে মানুষের জীবনধারনের জন্য
প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত করেছেন। তাঁদের মতে অর্থনৈতিক ও
উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতেই মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক,
সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় ইত্যাদি সম্পর্ক নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়।
মানুষের জীবনধারনের জন্য চাই উৎপাদন। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন উৎপাদনের উপরকরণ। আর এ সব কার্যক্রমই হলো উৎপাদনের শক্তি (ফোর্সেস অব প্রডাকশন)। উপরোক্ত প্রক্রিয়ায়
যে উৎপাদন সংঘটিত হয় তা বন্টনের প্রশ্নেমানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কসৃষ্টি হয়। মার্কস
এ সম্পর্ককে বলেছেন ‘উৎপাদন সম্পর্ক’ (প্রোডাকশন. রিলেশন)। প্রত্যেক সমাজেই
‘উৎপাদনের শক্তি’ এবং ‘উৎপাদন সম্পর্কের' মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। মার্কস মনে করেন যুগে
যুগে দেখা গিয়েছে সমাজের শক্তিমানেরা উক্ত বন্টন প্রক্রিয়ায় অন্যায়ভাবে প্রকৃত উৎপাদককে
(মেহনতি মানুষ) বঞ্চিত করে থাকে। এমতাবস্থায় বঞ্চিতরা মার্কসের ভাষায় ‘শোষিতরা
শোষকদের বিরুদ্ধে’ সংগঠিত হয়। ফলে সৃষ্টি হয় সংঘাত বা দ্বন্দ¡। এ অনিবার্যদ্বন্দে¡র ফলে বস্তুগত সংঘাতের ফলেই সমাজইতিহাস এগিয়ে যায়। প্রত্যেক সমাজেই ‘উৎপাদনের শক্তি' এবং ‘উৎপাদন সম্পর্কের' মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।
সৃষ্টি হয় নতুন সমাজ, আর নতুন উৎপাদন সস্পর্ক। মার্কস মনে করেন, এ ভাবে সমাজ
কাঠামোর মৌলিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটার সাথে সাথে উপরিকাঠামোয়
এ পরিবর্তন ঘটে। এ ভাবেই সমাজ ও ইতিহাস এগিয়ে যায়।
মার্কস আরও মনে করেন আদিকাল থেকে অদ্যাবধি দ্বান্দি¡ক প্রক্রিয়ায় পাঁচটি পর্যায়ে (স্তরে)
মানুষের সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটেছে। যথা:-
● আদি সাম্যবাদ (যখন মানুষের মধ্যে কোন প্রকার উদ্ভাবনী শক্তি ছিল না, ছিল না
ব্যক্তিগত সম্পত্তির বোধ।)
● দাস সমাজ (দাস Ñ দাস মালিক)
● সামন্তসমাজ (ভ‚মিহীন Ñ ভ‚স্বামী)
● ধনাতান্ত্রিক সমাজ (শ্রমিক Ñ পুঁজিপতি)
● সমাজতান্ত্রিক সমাজ (সর্বহারা শ্রমিক Ñ ক্ষয়িষ্ণুপুঁজিপতি শ্রেণী) যা চুড়ান্তভাবে সাম্যবাদী
বা শ্রেণীহীন সমাজে উন্নীত হবে।
শ্রেণী সংগ্রাম তত্ত¡: জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি আংগিকে না দেখে বরং ‘শ্রেণী' শব্দটিকে
মার্কস অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে সমাজ বিকাশের প্রতিটি
ধাপে ‘উৎপাদন সম্পর্কের' ভিত্তিতে শ্রেণী নির্ধারিত হয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন যে, শ্রেণী
যেখানে থাকবে সেখানে থাকবে শ্রেণী শোষণ। আর এজন্যই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে শ্রেণী
সচেতনতা, শ্রেণী সংগঠন ও শ্রেণী সংগ্রাম। মার্কস এবং এঙ্গেলস তাঁদের বিখ্যাত (১৮৪৮
সালে প্রকাশিত) কমিউনিষ্ট ইশতেহারে উল্লেখ করেন যে, ‘মানব জাতির জ্ঞাত ইতিহাস হচ্ছে
শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।’ কিভাবে শ্রেণীর সৃষ্টি হলো- এ প্রশ্নের উত্তরে মার্কস বলেন যে,
আদিতে সমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্বছিল না, তখন শ্রেণীরও অস্তিত্বছিল না। কিন্তু
পরবর্তীতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি উদ্ভবের ফলে সমাজ বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে থাকে সম্পত্তির
মালিক শ্রেণী অন্যদিকে থাকে মালিকানা বিহীন শ্রেণী। বলাবাহুল্য, পরবর্তীতে বিকাশের
প্রতিটি স্তরেই সম্পত্তির মালিকগণ (শোষক শ্রেণী) মালিকানা বিহীন (শোষিত) শ্রেণীকে শোষণ
করেছে। প্রতিটি স্তরেই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ প্রতিবাদী
সংঘাতই হলো শ্রেণীর দ্বন্দ¡বা সংগ্রাম। শ্রেণী সংগ্রামের ফলেই সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন
এসেছে বলে মার্কস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। মার্কস আরও মনে করতেন রাষ্ট্র, প্রশাসন,
আইন-কানুন এ সবই স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার স্বরূপ। তাই শ্রেণীর উত্থানের সাথে রাষ্ট্রের উত্থান
অনিবার্যহয়ে উঠেছিল। বিকাশের এক পর্যায়ে (সাম্যবাদী) যখন আর শ্রেণীর অস্তিত্বথাকবে
না তখন রাষ্ট্রনামক প্রতিষ্ঠানটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে এবং বিলুপ্ত হবে।
উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত¡: উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত¡মার্কসের এক উল্লেখযোগ্য তত্ত¡। এ তত্তে¡র মধ্য দিয়ে মার্কস
পুঁজিবাদী শোষণের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করতে চেয়েছেন। মার্কস মনে করেন শ্রমশক্তিই
(প্রকৃত পুঁজি) কোন কিছুর মূল্য (ঠধষঁব) সৃষ্টি করে থাকে। তিনি মেশিন বা অন্য কিছুকে
হিমায়িত পুঁজি বলে মনে করেন যা মূল্য সৃষ্টির জন্য মূখ্য নয়। পুঁজিপতিগণ শ্রমিকদেরকে
ইচ্ছামত উৎপাদন কাজে ব্যবহার করলেও তাদের প্রকৃত প্রাপ্য দেয় না। ফলে শ্রমিকদের
অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ হতে থাকে। শ্রমিক শ্রমদান করে যে মূল্য (ঠধষঁব) সৃষ্টি করে থাকে
তার অধিকাংশ পুঁজিপতিরা অন্যায়ভাবে নিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত মূল্য বলতে বোঝায়
সেইটুকুযে টুকুশ্রমিককে প্রদত্ত মুজুরীর অতিরিক্ত। উদাহরণ স্বরূপ, পুঁজিপতি শ্রমিককে দিয়ে
১৬ ঘন্টা খাটিয়ে যে মূল্য সৃষ্টি করে নেয় তার পরিমাণ ধরা যাক ২০০.০০ টাকা, কিন্তুমালিক
উক্ত শ্রমিককে উক্ত ১৬ ঘন্টার জন্য প্রদান করে মাত্র ৫০.০০ টাকা যা উক্ত শ্রমিকের ১৬
ঘন্টার শ্রমের সৃষ্ট মূল্য নয় বরং মাত্র ৪ ঘন্টার পরিশ্রমের মূল্য। এ ক্ষেত্রে বাঁকী ১২ ঘন্টা
সময়ের সৃষ্ট শ্রমের মূল্য নিয়ে নেয় পুঁজিপতি। এই হলো উদ্ধৃত্ত মূল্যতত্তে¡র সহজ ব্যাখ্যা। মানব জাতির জ্ঞাত ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। মানুষ তখন প্রত্যেকে নিজের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু অন্যের সাথে বিনা সংঘাতেই পেয়ে যাবে।
সাম্যবাদ: মার্কস মনে করতেন দ্বান্দি¡ক প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের চলমানতা অব্যাহত থাকবে
ততক্ষণ, যতক্ষণ না শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কস বিশ্বাস করতেন শ্রমিক
শ্রেণীর সচেতনার জন্য ধনতান্ত্রিক সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংগঠিত হবে। এ বিপ্লবের
ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রশ্রমিক শ্রেণীর হস্তগত হবে। উৎপাদনের উপকরণসমূহের সুপরিকল্পিত ব্যবহারের
মাধ্যমে শোষক শ্রেণীর উচ্ছেদ ঘটিয়ে শ্রমিক শ্রেণী সমাজতান্ত্রিক সমাজকে উত্তরোত্তর
পরিপক্কতার দিকে নিয়ে যাবে এবং এক পর্যায়ে সমাজ থেকে শোষণ চিরতরে নির্মূল হবে,
শ্রেণীর অস্তিত্বএবং রাষ্ট্রবিলুপ্ত হবে। উৎপাদনের পরিমাণ এতো বৃদ্ধি পাবে যে মানুষ তখন
প্রত্যেকে নিজের জন্য যতটুকুপ্রয়োজন ততটুকুঅন্যের সাথে বিনা সংঘাতেই পেয়ে যাবে।
আর এ চূড়ান্তপর্যায়ই হলো সাম্যবাদী পর্যায়।
মার্কসের বিরুদ্ধে সমালোচনা
প্রিয় শিক্ষার্থীগণ, এ পর্যায়ে আমরা অতি সংক্ষেপে মার্কসের তত্তে¡র বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলো
বর্ণনা করতে পারি। এ কথা সত্য কার্ল মার্কস উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যেভাগে যে সমাজ
কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে তত্ত¡ প্রদান করেছিলেন বর্তমান বিশ্বে সেই বাস্তবতার পরিবর্তন
ঘটেছে। মার্কসের তত্তে¡র দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেছিল। পূর্ব
ইউরোপ, চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্নদেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা
গিয়েছে। আবার সে সাথে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে উক্ত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর
অধিকাংশ স্থানে পুনরায় পুঁজিবাদী ধারায় ফিরে আসার প্রচেষ্টাও দেখা গিয়েছে। শ্রম ঘন্টা এখন
১৬ ঘন্টার পরিবর্তে৮ ঘন্টায় স্থির হয়েছে। সাধারণ শ্রমিক, নারী শ্রমিক ও শিশু শ্রমিকের জন্য
স্থানীয় এবং আর্ন্তজাতিকভাবে বিভিন্নঅধিকার সনদ তৈরী হয়েছে। শ্রমিকদের সামাজিক
নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার হয়েছে। শ্রমিকদের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্নপদক্ষেপ
ধনতন্ত্রের স্বার্থেই বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে। এ সবই বর্তমান বাস্তবতা। উপরি-উক্ত বাস্তবতার
পরিপ্রেক্ষিতে কার্লমার্কসকে মূল্যায়ন করা সহজ কাজ নয়। তবে প্রথাগতভাবে তার তত্তে¡র
বিরুদ্ধে কিছুসমালোচনা উত্থাপন করা যায়।
● মার্কস ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সম্পর্ককে মূল ভিত্তি হিসেবে
গ্রহণ করে একপেষে মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তার প্রদত্ত তত্তে¡মৌল কাঠামো ও
উপরিকাঠামোর ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। মানুষের সামগ্রীক আচরণে সব সময়ই এবং
সর্বত্র জ্ঞাতে অজ্ঞাতে শুধুমাত্র বস্তুই কাজ করে এমন কথা বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।
কারণ অ-বস্তুগত দিকও মানব আচরণকে প্রভাবিত করে থাকে।
● তিনি শ্রেণী সংগ্রামের উপর অত্যধিক গুরুত্বপ্রদান করে বাস্তবতার প্রতি কিছুটা অবজ্ঞা
প্রদর্শন করেছেন। সমাজের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর প্রক্রিয়ায় শ্রেণী চেতনা
হয়তো গুরুত্বপূর্ণভ‚মিকা পালন করতে পারে, কিন্তুসম্পূর্ণবা একচ্ছত্র ভ‚মিকা রাখে,
এমন কথা বলা যায় না। সামন্তসমাজ থেকে ধনতান্ত্রিক সমাজ উত্তরণে শ্রেণী সংগ্রামের
চেয়ে বরং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কারই বেশী অবদান রেখেছে বলে অনেকে মনে
করেন।
● মার্কস মানব চরিত্র বিশ্লেষণে হয়তো কিছুটা অতি-আশাবাদী ছিলেন। মানুষের লোভী ও
স্বার্থপরতার চরিত্রটি তিনি তেমন আমল দেন নি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এমনকি
সমাজতান্ত্রিক সমাজে সর্বহারার একনায়কত্বের নামে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী বিলাসী
শাসক শ্রেণীর একনায়কত্বের রূপ নিয়েছিল।
● বর্তমানে ধনতান্ত্রিক সমাজ যদিও চূড়ান্তবিকাশ লাভ করেছে, তবুও সেখানে দ্বন্দ¡ বা
সংঘাত তেমন ষ্পষ্ট নয়। উপরন্তুধনতান্ত্রিক সমাজ নিজেকে পরিবর্তিত অবস্থায় খাপ
খাইয়ে নেবার জন্য কাঠামো ও কার্যগত পরিবর্তন এনে টিকে থাকার মতো পাকাপোক্ত
অবস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা, বেকার ভাতা এর উদাহরণ।
● রাষ্ট্রসম্পর্কেমার্কসের বক্তব্য একপেশে মনে হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেরাষ্ট্রদুর্বল না
হয়ে বরং আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
তবে উপরোক্ত সমালোচনার পরও বলা যায় কার্লমার্কসের চিন্তাধারা বিশ্বেসবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মতবাদ। তার তত্ত¡ বাস্তবেও প্রয়োগ যোগ্যতা পেয়েছে। ধনতান্ত্রিক বিশ্বের নগ্ন শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর এ তত্ত¡ছিল এক জোরালো ও বিজ্ঞান সম্মত বিশ্লেষণ ও প্রতিবাদ।
সারকথা
কার্লমার্কস রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক তেজদীপ্ত নাম। উনবিংশ শতাব্দীর
অমানবিক ধনতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে তিনি শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থেশোষণ মুক্তির এক
বিজ্ঞানসম্মত তত্ত¡উপহার দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর একাডেমিক পান্ডিত্য সর্বজন স্বীকৃত।
সঠিক উত্তরের পার্শ্বে() টিক চিহ্ন দিন।
১। কাল মার্কস কোন দেশে জন্ম গ্রহণ করেন ?
(ক) ফ্রান্স; (খ) জার্মানী;
(গ) ইংল্যান্ড; (ঘ) রাশিয়া।
২। কম্যুনিষ্ট মেনিফেষ্টো রচনা করেছেন-
(ক) কার্লমার্কস; (খ) হেগেল;
(গ) কার্লমার্কস ও এঙ্গেলস; (ঘ) প্লেটো।
৩। মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক রচিত ক্যাপিটাল পুস্তকটি কত খন্ডে বিভক্ত ?
(ক) ২ খন্ডে বিভক্ত; (খ) ৩ খন্ডে বিভক্ত;
(গ) ৫ খন্ডে বিভক্ত; (ঘ) কোন খন্ডে বিভক্ত নয়।
সঠিক উত্তর মালা - ১। খ ২। গ ৩। খ
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন:
১। উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত¡কী ?
২। হেগেলের দ্বান্দি¡ক তত্তে¡র সাথে মার্কসের দ্বন্দ¡তত্তে¡র পার্থক্য কোথায় ?
৩। মার্কসকে কেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের জনক বলা হয় ?
৪। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা কী ?
৫। শ্রেণী সংগ্রাম কী ?
৬। রাষ্ট্রও শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ককী?
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। সমালোচনাসহ মার্কসের তত্তে¡র মূল বিষয়গুলোর বর্ণনা দিন।

FOR MORE CLICK HERE
এইচএসসি বাংলা নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
ENGLISH 1ST & SECOND PAPER
এইচএসসি আইসিটি নোট
এইচএসসি অর্থনীতি নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র
এইচএসসি পৌরনীতি নোট ২য় পত্র
এইচএসসি সমাজকর্ম নোট ১ম পত্র
এইচএসসি সমাজকর্ম নোট ২য় পত্র
এইচএসসি সমাজবিজ্ঞান নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ইতিহাস নোট ১ম পত্র
এইচএসসি ইতিহাস নোট ২য় পত্র
এইচএসসি ইসলামের ইতি. ও সংস্কৃতি নোট ১ম পত্র
এইচএসসি ইসলামের ইতি. ও সংস্কৃতি নোট ২য় পত্র
এইচএসসি যুক্তিবিদ্যা ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ভূগোল ও পরিবেশ নোট ১ম পত্র ও ২য় পত্র
এইচএসসি ইসলামিক স্টাডিজ ১ম ও ২য় পত্র

Copyright © Quality Can Do Soft.
Designed and developed by Sohel Rana, Assistant Professor, Kumudini Government College, Tangail. Email: [email protected]