চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ধারণা ও বৈশিষ্ট্য

চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী, চাপ প্রয়োগ, সমজাতীয় মনোভাব, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ধারণা
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সম্পর্কিত আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে যে কোন
রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী অত্যন্ত প্রভাবশালী অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক দলের মত সরকারি
ক্ষমতা দখল চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর লক্ষ্য নয়। কিন্তু সরকারি নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে এই গোষ্ঠীগুলো কার্যকরী প্রভাব
বিস্তার করে। প্রভাব বিস্তার বা চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো সরকারি সিদ্ধান্তকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে
আনার বিষয়ে সচেষ্ট থাকে। বিশেষ স্বার্থযুক্ত এই গোষ্ঠীসমূহ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশে রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের
উপরেও প্রভাব বিস্তার করে। সেজন্য দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জনসাধারণের বিভিন্ন রকম
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, বৃত্তিগত প্রভৃতি স্বার্থকে কেন্দ্র করে এই গোষ্ঠীসমূহের সৃষ্টি হয়।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর নামকরণ ও সংজ্ঞা সম্পর্কে কিছু সমস্যা আছে। অনেকে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী
স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী লবি নু), মনোভাব কেন্দ্রিক গোষ্ঠী (অঃঃরঃঁফব মৎড়ঁঢ়) এবং রাজনৈতিক
গোষ্ঠীকে সমার্থক শব্দরূপে গণ্য করেন। এর ফলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
অ্যালেন পটার চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তে ‘সংগঠিত গোষ্ঠী’ (ঙৎমধহরুবফ মৎড়ঁঢ়) শব্দ দু’টি ব্যবহারের পক্ষে। কারণ
এ ধারণার মাধ্যমে গোষ্ঠীর সংগঠনের ব্যাপকতাকে আরো যথার্থভাবে অনুধাবন করা সম্ভব।
অ্যালান বলের মতে, “চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হল এমন একটি গোষ্ঠী যার সদস্যগণ ‘অংশীদারী মনোভাবের’ দ্বারা আবদ্ধ।”
এইচ জিগলার এর মতে, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হচ্ছে এমন একটি সংগঠিত ব্যক্তি সমষ্টি যার সদস্যগণ সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগে অংশগ্রহণ করে না। বরং তাদের লক্ষ্য হল সরকারি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা।
অ্যালমন্ড গ্যাব্রিয়েল ও জি পাওয়েল বলেন, “স্বার্থগোষ্ঠী বলতে আমরা নির্দিষ্ট স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ অথবা সুযোগ-সুবিধা
দ্বারা সংযুক্ত এমন এক ব্যক্তিসমষ্টিকে বুঝি যারা এরূপ বন্ধন সম্পর্কে সচেতন।”
সংক্ষেপে বলতে গেলে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হল এমন এক দল ব্যক্তির সমষ্টি। যারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকে।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের স্বার্থগত ইস্যুগুলোতে একই রকম মনোভাব পোষণ করে। এই গোষ্ঠী নানাবিধ চাপ
প্রয়োগ ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া আদায় করে। নি¤েœ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলঃ
১। দলীয় সংগঠনবিহীন ঃ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এদের কোন দলীয় সংগঠন নেই। এদের
উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ নয়। সরকারের উপরে চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ বা দাবি আদায় করা হচ্ছে চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর লক্ষ্য।
২। দলীয় কর্মসূচিবিহীন ঃ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর কোন রাজনৈতিক দল নয় বিধায় এদের কোন দলীয় কর্মসূচিও নেই। এটি
নির্দলীয় সংগঠন। এরা শুধু গোষ্ঠীর স্বার্থ পূরণের জন্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে।
৩। নির্বাচনে প্রার্থী না দেওয়া ঃ চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী নির্বাচনে প্রার্থী দেয় না এবং নির্বাচনে কোন প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি
প্রচারণা চালায় না। তবে অনেক সময় তাদের পছন্দের প্রার্থীকে অর্থ কিংবা জনবল দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে।
এছাড়াও কোন কোন দেশে চাপসৃষ্টিকারী কোন কোন গোষ্ঠীকে পছন্দের দলের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিতে দেখা যায়।
৪। সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করা ঃ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সদস্যরা গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে সরকারের কোন পদে অধিষ্ঠিত
হতে চায় না। বরং নানাভাবে সরকারি নীতিকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য প্রচেষ্টা চালায়।
৫। সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয় ঃ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকে না। তবে পরোক্ষভাবে
রাজনীতিক নেতৃবৃন্দের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। আর এ যোগাযোগের ভিত্তিতে তারা প্রভাব বিস্তার
করে।
৬। সমজাতীয় মনোভাব ঃ চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সদস্যরা সাধারণত সমজাতীয় মনোভাব সম্পন্ন হয়ে থাকে। আর এ
সমজাতীয় মনোভাবের মূলে রয়েছে তাদের স্বার্থ। কেননা সমজাতীয় মনোভাব সম্পন্ন না হলে তাদের স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ হয়।
৭। বেসরকারি সংগঠন ঃ চাপসৃষ্টিকারী দলের সদস্যগণ বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি বিশেষ। চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর
আনুষ্ঠানিক সরকারি স্বীকৃতিও সাধারণত থাকে না।
পরিশেষে বলা যায়, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সরাসরি না থাকলেও, মূলত রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক
দলের সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই তারা দাবি বা স্বার্থ হাসিল করে থাকে। এভাবে দেখলে রাজনৈতিক দল না হলেও, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলো পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে।
সার-সংক্ষেপ
চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হল এমন এক জনসমষ্টি যারা সমজাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ার উপরে প্রভাব
বিস্তার করে। ক্ষমতা দখল চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য নয় বরং নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করাই এর উদ্দেশ্য।
সরকারি নীতি নির্ধারণে চাপ প্রয়োগ করে গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষা করাই চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রধান উদ্দেশ্য।
পাঠোত্তর মূল্যায়ন-৮.৪
সঠিক উত্তরের পাশে টিক (√) চিহ্ন দিন
১। চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর পরিবর্তে ‘সংগঠিত গোষ্ঠী’ শব্দ দু’টি ব্যবহারের পক্ষে কে?
(ক) এইচ জিগলার (খ) অ্যালেন পটার
(গ) আর্থার বেণ্টলে (ঘ) হ্যারি ট্রুম্যান
২। “চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হল এমন একটি গোষ্ঠী যার সদস্যগণ ‘অংশীদারী মনোভাবের’ দ্বারা আবদ্ধ।”− কার উক্তি?
(ক) অ্যালেন পটার (খ) হ্যারি ট্রুম্যান
(গ) অ্যালান বল (ঘ) জন পিয়ার্স
৩। “চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হল এমন একটি সংগঠিত ব্যক্তি সমষ্টি যার সদস্যগণ সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগে অংশ গ্রহণ করেন
না। তাদের লক্ষ্য হল সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা”− মন্তব্যটি কে করেছেন?
(ক) জন পিয়ার্স (খ) অ্যালেন পটার
(গ) স্যামুয়েল জি.হান্টিংটন (ঘ) এইচ জিগলার
৪। চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য নয়−
(র) সরকারি ক্ষমতা অর্জন
(রর) সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা
(ররর) নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া
নিচের কোনটি সঠিক?
(ক) র ও রর (খ) রর ও ররর
(গ) র ও ররর (ঘ) র, রর ও ররর