উন্নয়ন সমস্যা দূরীকরণের উপায়সমূহ আলোচনা করুন।
উন্নয়ন কি?
উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারণার প্রথম দিকে জাতীয় আয় (বা মাথা পিছু আয়) এর ক্রমাগত প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়ন
বলে মনে করা হতো। কিন্তু দেখা যায়, জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেই সমাজের সকল মানুষের কল্যাণ
সাধিত হয় না, কেননা, বন্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যায়। বন্টন জনিত সমস্যার কারণে, পরবর্তীতে
‘প্রবৃদ্ধিসহ সমতা‘কে উন্নয়ন হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়।‘প্রবৃদ্ধিসহ সমতার’ ধারণাও উন্নয়ন বিতর্ক শেষ
করতে পারে নি। কারণ প্রবৃদ্ধি ও সমতা যদি অগণতান্ত্রিকভাবে অর্জিত হয়, তবে তাকে উন্নয়ন বলা
যায় না। এই সীমাবদ্ধতা থেকে উন্নয়নকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নতুন ধারণা অনুসারে,
উৎপাদন শক্তির বিকাশ এবং ন্যায় বিচার অন্তর্ভুক্ত হলেও উন্নয়নের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ হয় না যদি না সে
সাথে জনগণের অংশগ্রহণ ও তৃনমূল পর্যায়ে সরাসরি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
তাহলে উন্নয়ন ধারণার বির্বতনকে আমরা নি¤েœাক্তভাবে চিহ্নিত করতে পারি।
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা + জনগণের অংশগ্রহণ।
বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন
(১৯৮৪) গ্রন্থে উন্নয়নের কয়েকটি প্রাথমিক ও সার্বজনীন লক্ষ্য চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হচ্ছে -
ক্ষুধা মুক্তি;
দীর্ঘায়ু প্রত্যাশা;
চিকিৎসা ও হাসপাতাল সেবা লাভের অধিকার; ন্যূনতম শিক্ষা তৃতীয় বিশ্বে উন্নয়নের সমস্যা
তৃতীয় বিশ্বে প্রতিটি দেশেই গণদারিদ্র্য বিরাজ করছে। রাষ্ট্রের অধিকাংশ লোক বাস করে দারিদ্র্যসীমার
নীচে। দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর জনসাধারণ দারিদ্র, আয় বন্টনের ক্ষেত্রে অসমতা এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক
অভাবের মধ্যে বসবাস করছে। এই বাস্তবতার নিরিখে “উন্নয়ন” ধারণা বাস্তবায়নের জন্য
সরকারগুলো বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। তথাপি উন্নয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় সরকারী বেসরকারী
প্রচেষ্টার সফলতা অর্জনের পথে অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হয়। নীচে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন সংক্রান্ত
সমস্যাবলীর কয়েকটি আলোচনা করা হলো।
পুঁজির অভাব
উন্নয়নের পুরাতন মডেল, অর্থাৎ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের আধুনিকীকরণ (গড়ফবৎহরুধঃরড়হ) মডেল
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন ধারণায় প্রভাব ফেলে। এ তত্তে¡র মূল কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সে
সাথে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং পুঁজিঘন প্রযুক্তি ব্যবহার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উন্নয়নশীল দেশে এ
মডেল প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন। কেননা, ইউরোপের দেশগুলোর শিল্পায়নে ঔপনিবেশিক শাসন
প্রয়োজনীয় পুঁজির যোগান দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এরকম
কোন সুযোগ ভোগ করছে না। তাই পুঁজি ও সম্পদের অপ্রতুলতা এ ধারার উন্নয়নে সমস্যা তৈরি করছে।
মানব সম্পদের অপ্রতুলতা
দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নে মানব সম্পদের অভাব একটি গুরুতর সমস্যা। এ সমস্ত রাষ্ট্রের যে পরিমাণ
জনসংখ্যা থাকে, তা সম্পদের পরিবর্তে সমস্যা হিসাবে আবিভ‚র্ত হয়েছে। শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন
প্রভৃতি সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন অর্জনের অন্যতম শর্ত। এগুলোর মাধ্যমে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘর্টে।
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি থাকায় উন্নয়নের জন্য
আবশ্যকীয় মানব সম্পদ তৈরি হয় না।
ঔপনিবেশিক শাসন
তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই দীর্ঘ সময় ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে থাকার ফলে সুগভীর আর্থ -
সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যা নিয়েই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পুঁজি
ঘাটতি, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে আমলাতন্ত্রের দৌরাÍ্য, রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব
তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি ও কারিগরী জ্ঞানের অভাব
উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং কারিগরী জ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো উভয়
ক্ষেত্রেই উন্নত রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় পুঁজির বড় অংশ বিদেশী প্রযুক্তি
এবং কারিগরী জ্ঞান সংগ্রহে ব্যয় করতে হয়। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে প্রযুক্তি এবং কারিগরী জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোও সম্ভব হয় না।
অংশগ্রহণের সমস্যা
সা¤প্রতিক ধারণা মোতাবেক যে কোন উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ
একান্ত প্রয়োজন। অংশ গ্রহণের সুযোগ না থাকলে বিচ্ছিন্নতা তৈরী হয় এবং যে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে
কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত হয়, তারা যথার্থ সুফল লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে উন্নয়নে যে
পরিমাণ অর্থ ব্যয়ই করা হোক না কেন প্রকৃত উন্নয়ন সঠিক হয় না। উন্নয়ন কার্যক্রমে অধিকহারে
জনগনের অংশগ্রহণ না থাকায় তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে কাঙ্খিত সফলতা লাভ করা যাচ্ছে না।
এছাড়া দক্ষ জনশক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার অভাব, প্রতিকুল সামাজিক ধর্মীয় অনুশাসন, রাজনৈতিক
নেতৃত্বের ব্যর্থতা ইত্যাদি উন্নয়নের পথে সমস্যা সৃষ্টি করে।
উন্নয়ন সমস্যা দূরীকরণ
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূরীকরণে নি¤œলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম
শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ছাড়া প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমেই
মানব উন্নয়ন সম্ভবপর। দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষাখাতে ব্যয় অত্যন্ত কম থাকে। সে কারণে
প্রয়োজনীয় শিক্ষা বিস্তার ঘটছে না। গ্যারী এস বেকার শীর্ষক প্রবন্ধে গবেষণার মাধ্যমে উল্লেখ করেন কলেজ শিক্ষায় যে
কোন ব্যক্তির বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে পরবর্তিতে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ সঞ্চয়ী ব্যাংকে খাটানো
সমপরিমাণ অর্থের মুনাফার হারের চেয়ে অনেক বেশী।
মানব সম্পদ উন্নয়ন
মানব সম্পদের সার্বিক উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী ও প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। তৃতীয় বিশ্বের
দেশগুলো মানব সম্পদ জনিত গুরুতর ঘাটতির সম্মুখীন। মানব সম্পদের দক্ষতা এবং সদ্বব্যবহারেই
দ্বারাই স্বনির্ভর -অব্যাহত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রকল্পে
বিনিয়োগ এবং কর্মপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন।
বৈষম্য হ্রাস
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড দারিদ্র্য বিমোচনে স্থায়ী কোন অবদান রাখতে পারছে
না। আবার সমাজে প্রচন্ড বৈষম্যমূলক সম্পত্তি মালিকানা কাঠামো তৈরি হচ্ছে। একই সাথে ক্ষমতা
এবং সুযোগের বন্টনও অসম। ফলশ্রুতিতে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র ব্যাপকতর হচ্ছে
এবং সমাজে অসমতা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন সমস্যা দূর করতে হলে আয়-বন্টন, সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে অসমতা হ্রাস করতে হবে।
মূলধন গঠন
সাধারণতঃ কোন দেশের উন্নয়নে মূলধনের অভাব প্রধান সমস্যা হিসাবে আবিভর্‚ত হয়। ঐতিহাসিক
কারণেই বাংলাদেশের মত অন্যান্য গরীব রাষ্ট্রগুলো মূলধন সমস্যায় জর্জরিত। উপযুক্ত উন্নয়ন
পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। জাতীয়
সঞ্চয়ের হার বাড়ানোর মাধ্যমে জাতীয় মূলধন গঠন করা যায়।
সৎ উদ্যোক্তা সৃষ্টি
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সৃষ্টিশীল ও দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি করা আবশ্যক।
দরিদ্র রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষে সর্বক্ষন প্রয়োজনীয় পুঁজি যোগান দেয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় উদ্যমী
উদ্যোক্তা শ্রেণী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। উন্নয়ন -কামী রাষ্ট্রের উদ্যোক্তা
শ্রেণীর মধ্যে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবর্তে স্বল্প পরিশ্রমে স্বল্প মেয়াদী শিক্ষাক্ষেত্রে যেকোন ব্যক্তির বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে পরবর্তিতে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ সঞ্চয়ী ব্যাংকে খাটানো সমপরিমাণ অর্থের মুনাফার হারের চেয়ে বেশী। উন্নয়নে বিরাজমান সস্যাবলী থেকে উত্তরণের জন্যে প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থসামাজিক বুনিয়াদ স্থাপন। জনসম্পদ সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগের দ্বারা অধিক মুনাফা অর্জনের আগ্রহ দেখা যায়। সৎ এবং সাহসী উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরির
মাধ্যমে উন্নয়নের সমস্যা অনেকাংশে নিরসন করা যাবে।
ঐকমত্য সৃস্টি
অধিকাংশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা দেয়। ঐকমত্যের
অভাব থেকে তৈরি হয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এই অস্থিতিশীলতা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে
বিঘিœত করে। তাই উন্নয়ন সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য রাজনৈতিক দলসমূহকে প্রয়োজনীয়
বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছুতে হবে। এছাড়াও উন্নয়নে বিরাজমান সমস্যাবলী থেকে উত্তরনের জন্য
প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্বব্যবহার, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক বুনিয়াদ স্থাপন, জনসম্পদ
সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সারকথা : বর্তমান সময়ে উন্নয়ন বলতে আমরা প্রবৃদ্ধি- আয় বন্টনে সমতা এবং জনগণের অংশগ্রহণএই তিনটি শর্তপূরণ বুঝি। শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধির নিরীখে উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তৃতীয় বিশ্বের
প্রতিটি দেশেই উন্নয়নের প্রানান্তকর চেষ্টা চলছে। পুঁজির অভাব, মানব সম্পদের উন্নয়ন,
ঔপনিবেশিক শোষণ, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি কারণে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে প্রয়োজনীয়
উন্নয়ন হচ্ছে না। সৎ ও সাহসী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন ঘটিয়ে বিদ্যমান দারিদ্র্যবস্থা দূর করা সম্ভব। উন্নয়নের জন্যে সর্বপ্রথম শিক্ষাবিস্তারে মনোনিবেশ করতে হবে।
সঠিক উত্তরটি লিখুন।
১। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন-
ক. শিক্ষা বিস্তার;
খ. সামরিক শাসন;
গ. ধর্মান্ধতা;
ঘ. সন্ত্রাস।
২। মূলধন সমস্যার কারণে- তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন-
ক. গতিশীল হয়;
খ. বিঘিœত হয়;
গ. মূলধন গুরুত্বপূর্ণ নয়;
ঘ. গতিশীল হয় না।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা + জনগণের অংশগ্রহণ - আলোচনা করুন।
২। উন্নয়নের জন্য ঐক্যমত্য সৃষ্টি কেন প্রয়োজন ?
৩। মানব সম্পদ বলতে কি বোঝায় ?
রচনামুলক প্রশ্ন
১. উন্নয়ন সমস্যা দূরীকরণের উপায়সমূহ আলোচনা করুন।
উত্তরমালা: ১.ক, ২.খ
উন্নয়ন সংক্রান্ত ধারণার প্রথম দিকে জাতীয় আয় (বা মাথা পিছু আয়) এর ক্রমাগত প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়ন
বলে মনে করা হতো। কিন্তু দেখা যায়, জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেই সমাজের সকল মানুষের কল্যাণ
সাধিত হয় না, কেননা, বন্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যায়। বন্টন জনিত সমস্যার কারণে, পরবর্তীতে
‘প্রবৃদ্ধিসহ সমতা‘কে উন্নয়ন হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়।‘প্রবৃদ্ধিসহ সমতার’ ধারণাও উন্নয়ন বিতর্ক শেষ
করতে পারে নি। কারণ প্রবৃদ্ধি ও সমতা যদি অগণতান্ত্রিকভাবে অর্জিত হয়, তবে তাকে উন্নয়ন বলা
যায় না। এই সীমাবদ্ধতা থেকে উন্নয়নকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নতুন ধারণা অনুসারে,
উৎপাদন শক্তির বিকাশ এবং ন্যায় বিচার অন্তর্ভুক্ত হলেও উন্নয়নের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ হয় না যদি না সে
সাথে জনগণের অংশগ্রহণ ও তৃনমূল পর্যায়ে সরাসরি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
তাহলে উন্নয়ন ধারণার বির্বতনকে আমরা নি¤েœাক্তভাবে চিহ্নিত করতে পারি।
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা
উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা + জনগণের অংশগ্রহণ।
বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন
(১৯৮৪) গ্রন্থে উন্নয়নের কয়েকটি প্রাথমিক ও সার্বজনীন লক্ষ্য চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হচ্ছে -
ক্ষুধা মুক্তি;
দীর্ঘায়ু প্রত্যাশা;
চিকিৎসা ও হাসপাতাল সেবা লাভের অধিকার; ন্যূনতম শিক্ষা তৃতীয় বিশ্বে উন্নয়নের সমস্যা
তৃতীয় বিশ্বে প্রতিটি দেশেই গণদারিদ্র্য বিরাজ করছে। রাষ্ট্রের অধিকাংশ লোক বাস করে দারিদ্র্যসীমার
নীচে। দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর জনসাধারণ দারিদ্র, আয় বন্টনের ক্ষেত্রে অসমতা এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক
অভাবের মধ্যে বসবাস করছে। এই বাস্তবতার নিরিখে “উন্নয়ন” ধারণা বাস্তবায়নের জন্য
সরকারগুলো বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। তথাপি উন্নয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় সরকারী বেসরকারী
প্রচেষ্টার সফলতা অর্জনের পথে অনেকগুলো সমস্যা তৈরি হয়। নীচে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন সংক্রান্ত
সমস্যাবলীর কয়েকটি আলোচনা করা হলো।
পুঁজির অভাব
উন্নয়নের পুরাতন মডেল, অর্থাৎ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের আধুনিকীকরণ (গড়ফবৎহরুধঃরড়হ) মডেল
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন ধারণায় প্রভাব ফেলে। এ তত্তে¡র মূল কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সে
সাথে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং পুঁজিঘন প্রযুক্তি ব্যবহার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উন্নয়নশীল দেশে এ
মডেল প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন। কেননা, ইউরোপের দেশগুলোর শিল্পায়নে ঔপনিবেশিক শাসন
প্রয়োজনীয় পুঁজির যোগান দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এরকম
কোন সুযোগ ভোগ করছে না। তাই পুঁজি ও সম্পদের অপ্রতুলতা এ ধারার উন্নয়নে সমস্যা তৈরি করছে।
মানব সম্পদের অপ্রতুলতা
দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নে মানব সম্পদের অভাব একটি গুরুতর সমস্যা। এ সমস্ত রাষ্ট্রের যে পরিমাণ
জনসংখ্যা থাকে, তা সম্পদের পরিবর্তে সমস্যা হিসাবে আবিভ‚র্ত হয়েছে। শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য উন্নয়ন
প্রভৃতি সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন অর্জনের অন্যতম শর্ত। এগুলোর মাধ্যমে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘর্টে।
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি থাকায় উন্নয়নের জন্য
আবশ্যকীয় মানব সম্পদ তৈরি হয় না।
ঔপনিবেশিক শাসন
তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই দীর্ঘ সময় ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে থাকার ফলে সুগভীর আর্থ -
সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যা নিয়েই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে পুঁজি
ঘাটতি, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে আমলাতন্ত্রের দৌরাÍ্য, রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব
তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি ও কারিগরী জ্ঞানের অভাব
উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং কারিগরী জ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো উভয়
ক্ষেত্রেই উন্নত রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় পুঁজির বড় অংশ বিদেশী প্রযুক্তি
এবং কারিগরী জ্ঞান সংগ্রহে ব্যয় করতে হয়। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে প্রযুক্তি এবং কারিগরী জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোও সম্ভব হয় না।
অংশগ্রহণের সমস্যা
সা¤প্রতিক ধারণা মোতাবেক যে কোন উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ
একান্ত প্রয়োজন। অংশ গ্রহণের সুযোগ না থাকলে বিচ্ছিন্নতা তৈরী হয় এবং যে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে
কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণীত হয়, তারা যথার্থ সুফল লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে উন্নয়নে যে
পরিমাণ অর্থ ব্যয়ই করা হোক না কেন প্রকৃত উন্নয়ন সঠিক হয় না। উন্নয়ন কার্যক্রমে অধিকহারে
জনগনের অংশগ্রহণ না থাকায় তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে কাঙ্খিত সফলতা লাভ করা যাচ্ছে না।
এছাড়া দক্ষ জনশক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার অভাব, প্রতিকুল সামাজিক ধর্মীয় অনুশাসন, রাজনৈতিক
নেতৃত্বের ব্যর্থতা ইত্যাদি উন্নয়নের পথে সমস্যা সৃষ্টি করে।
উন্নয়ন সমস্যা দূরীকরণ
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূরীকরণে নি¤œলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম
শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ছাড়া প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমেই
মানব উন্নয়ন সম্ভবপর। দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষাখাতে ব্যয় অত্যন্ত কম থাকে। সে কারণে
প্রয়োজনীয় শিক্ষা বিস্তার ঘটছে না। গ্যারী এস বেকার শীর্ষক প্রবন্ধে গবেষণার মাধ্যমে উল্লেখ করেন কলেজ শিক্ষায় যে
কোন ব্যক্তির বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে পরবর্তিতে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ সঞ্চয়ী ব্যাংকে খাটানো
সমপরিমাণ অর্থের মুনাফার হারের চেয়ে অনেক বেশী।
মানব সম্পদ উন্নয়ন
মানব সম্পদের সার্বিক উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী ও প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। তৃতীয় বিশ্বের
দেশগুলো মানব সম্পদ জনিত গুরুতর ঘাটতির সম্মুখীন। মানব সম্পদের দক্ষতা এবং সদ্বব্যবহারেই
দ্বারাই স্বনির্ভর -অব্যাহত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রকল্পে
বিনিয়োগ এবং কর্মপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন।
বৈষম্য হ্রাস
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড দারিদ্র্য বিমোচনে স্থায়ী কোন অবদান রাখতে পারছে
না। আবার সমাজে প্রচন্ড বৈষম্যমূলক সম্পত্তি মালিকানা কাঠামো তৈরি হচ্ছে। একই সাথে ক্ষমতা
এবং সুযোগের বন্টনও অসম। ফলশ্রুতিতে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র ব্যাপকতর হচ্ছে
এবং সমাজে অসমতা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন সমস্যা দূর করতে হলে আয়-বন্টন, সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে অসমতা হ্রাস করতে হবে।
মূলধন গঠন
সাধারণতঃ কোন দেশের উন্নয়নে মূলধনের অভাব প্রধান সমস্যা হিসাবে আবিভর্‚ত হয়। ঐতিহাসিক
কারণেই বাংলাদেশের মত অন্যান্য গরীব রাষ্ট্রগুলো মূলধন সমস্যায় জর্জরিত। উপযুক্ত উন্নয়ন
পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। জাতীয়
সঞ্চয়ের হার বাড়ানোর মাধ্যমে জাতীয় মূলধন গঠন করা যায়।
সৎ উদ্যোক্তা সৃষ্টি
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সৃষ্টিশীল ও দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি করা আবশ্যক।
দরিদ্র রাষ্ট্রে সরকারের পক্ষে সর্বক্ষন প্রয়োজনীয় পুঁজি যোগান দেয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় উদ্যমী
উদ্যোক্তা শ্রেণী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। উন্নয়ন -কামী রাষ্ট্রের উদ্যোক্তা
শ্রেণীর মধ্যে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবর্তে স্বল্প পরিশ্রমে স্বল্প মেয়াদী শিক্ষাক্ষেত্রে যেকোন ব্যক্তির বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে পরবর্তিতে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ সঞ্চয়ী ব্যাংকে খাটানো সমপরিমাণ অর্থের মুনাফার হারের চেয়ে বেশী। উন্নয়নে বিরাজমান সস্যাবলী থেকে উত্তরণের জন্যে প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থসামাজিক বুনিয়াদ স্থাপন। জনসম্পদ সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগের দ্বারা অধিক মুনাফা অর্জনের আগ্রহ দেখা যায়। সৎ এবং সাহসী উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরির
মাধ্যমে উন্নয়নের সমস্যা অনেকাংশে নিরসন করা যাবে।
ঐকমত্য সৃস্টি
অধিকাংশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা দেয়। ঐকমত্যের
অভাব থেকে তৈরি হয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এই অস্থিতিশীলতা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে
বিঘিœত করে। তাই উন্নয়ন সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য রাজনৈতিক দলসমূহকে প্রয়োজনীয়
বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছুতে হবে। এছাড়াও উন্নয়নে বিরাজমান সমস্যাবলী থেকে উত্তরনের জন্য
প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্বব্যবহার, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থ-সামাজিক বুনিয়াদ স্থাপন, জনসম্পদ
সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সারকথা : বর্তমান সময়ে উন্নয়ন বলতে আমরা প্রবৃদ্ধি- আয় বন্টনে সমতা এবং জনগণের অংশগ্রহণএই তিনটি শর্তপূরণ বুঝি। শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধির নিরীখে উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তৃতীয় বিশ্বের
প্রতিটি দেশেই উন্নয়নের প্রানান্তকর চেষ্টা চলছে। পুঁজির অভাব, মানব সম্পদের উন্নয়ন,
ঔপনিবেশিক শোষণ, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি কারণে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে প্রয়োজনীয়
উন্নয়ন হচ্ছে না। সৎ ও সাহসী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং মানব সম্পদ উন্নয়ন ঘটিয়ে বিদ্যমান দারিদ্র্যবস্থা দূর করা সম্ভব। উন্নয়নের জন্যে সর্বপ্রথম শিক্ষাবিস্তারে মনোনিবেশ করতে হবে।
সঠিক উত্তরটি লিখুন।
১। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন-
ক. শিক্ষা বিস্তার;
খ. সামরিক শাসন;
গ. ধর্মান্ধতা;
ঘ. সন্ত্রাস।
২। মূলধন সমস্যার কারণে- তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন-
ক. গতিশীল হয়;
খ. বিঘিœত হয়;
গ. মূলধন গুরুত্বপূর্ণ নয়;
ঘ. গতিশীল হয় না।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। উন্নয়ন = প্রবৃদ্ধি + সমতা + জনগণের অংশগ্রহণ - আলোচনা করুন।
২। উন্নয়নের জন্য ঐক্যমত্য সৃষ্টি কেন প্রয়োজন ?
৩। মানব সম্পদ বলতে কি বোঝায় ?
রচনামুলক প্রশ্ন
১. উন্নয়ন সমস্যা দূরীকরণের উপায়সমূহ আলোচনা করুন।
উত্তরমালা: ১.ক, ২.খ