বাণিজ্যতন্ত্র বাদের মূল বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলে কোন বিষয়সমূহের উপর গুরুত্ব
অর্থনৈতিক উন্নয়ন
অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে কি বুঝায় - এর কোন একক সংজ্ঞা তৈরী করা সম্ভব নয়। কেননা বিভিন্ন
অর্থনীতিবিদ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ব্যাখ্যা করেছেন। এমন কি বিভিন্ন যুগে অর্থনৈতিক
উন্নয়নকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে বাণিজ্যতন্ত্রবাদ (গবৎপধহঃরষরংস)
দেশের অভ্যন্তরে সোনা,রূপা সহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব দ্রব্যাদির আমদানী এবং সঞ্চয় বাড়ানোকেই
উন্নয়ন মনে করা হতো। এ মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা ফিলিপ ভন হরনিক(১৬৩৮-১৭১২)তাঁর “সবার
উপরে অষ্ট্রিয়া, যদি শুধু সে ইচ্ছা করে” গ্রন্থে লিখেছেন দেশবাসীর উচিৎ যতবেশী সম্ভব দেশী জিনিষ
ব্যবহার করা। বিদেশী জিনিষ যদি আনতেই হয়, তবে তা সোনা, রূপার বিনিময়ে নয়, বরং কোন
দেশী জিনিষের বিনিময়ে আনতে হবে।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে ভ‚মিবাদ বা ফিজিওক্র্যাসী (চযুংরড়পৎধপু) মতবাদে, সকল সম্পদই
শেষ পর্যন্ত জমি থেকে আসে। একমাত্রই ভ‚মিই উদ্বৃত্ত তৈরী করতে পারে। এ জন্য ভ‚মিকে কেন্দ্র করে
যে সম্পদ বৃদ্ধি হয় এং মানব জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসে তাকেই উন্নয়ন মনে করা হয়।
বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদরাও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেন। জি.এ,.মেয়ার
এবং আর.ই. বল্ডউইন ’ গ্রন্থে
উলে খ করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন অর্থব্যবস্থায় -
দীর্ঘকালীন মেয়াদে প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। সে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে উন্নয়ন হার
বেশী হলে মাথাপিছু প্রকৃত আয়ও বৃদ্ধি পায়।
তাঁর গ্রন্থে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কতগুলো
প্রবণতা উল্লেখ করেন। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিজ্ঞানের ব্যবহার, নিত্য নতুন কলা
কৌশল উদ্ভাবন, উৎপাদনের কৌশল আবিষ্কার ও মূলধন গঠন।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে
দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। অবশ্য বর্তমান কালে প্রকৃত জাতীয় আয় এবং মাথাপিছু আয়
বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সে সাথে সমাজের
সকল স্তরের জনগনের জীবনযাত্রার মানের বাস্তব উর্ধ্বগতি বিচার করতে হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমাজের সকল স্তরের জনগণের জীবনযাত্রার মানের বাস্তব উর্ধ্বগতি
বিচার করতে হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল
নিæে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তিনটি মডেল আলোচনা করা হলো। এগুলো হচ্ছে,
ক্ল্যাসিক্যাল মডেল;
নিওক্ল্যাসিক্যাল মডেল;
স্যুম্পটার মডেল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে সমাজের সকল স্তরের জনগণের জীবন যাত্রার মানেরও ঊধ্বগতি দেখা যায়।
ক্ল্যাসিক্যাল মডেল
ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণের মতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো পুঁজি সংগঠন। এই
ধারার তাত্তি¡করা এমন ধরনের অর্থনৈতিক পরিমন্ডল কল্পনা করেন যাতে ক্রমশ: অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ঘটতে থাকবে। পূর্ণ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে। জনগণের প্রবৃত্তি, সামর্থ্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সব
কিছুই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে থাকে। ক্ল্যাসিক্যাল তত্তে¡ মনে করা হয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে
সরকারের হস্তক্ষেপ অকল্যাণকর এবং পরিস্থিতিকে প্রতিক‚ল করে তোলে। এ তত্তে¡, সরকারের
ভ‚মিকাকে অত্যন্ত গৌণ মনে করা হয়। বরং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের
ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অ্যাডাম স্মীথ (১৭২৩-৯০) মনে করেন উৎপাদন নিজে থেকেই খরিদ্দারের চাহিদার
সাথে খাপ খাওয়াবে, বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে দ্রব্য মূল্য সর্বনি¤œ পরিমাণে নেমে
উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে পারবে এবং সম্পদের সর্বাধিক দক্ষ ব্যবহার হবে। স্মীথ মনে করেন, এই
বাজার শক্তির অবাধ কার্যকারিতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারী হস্তক্ষেপ,
নির্দেশনা বা ব্যবস্থাপনা অপ্রয়োজনীয়।
ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩)’র মতে, মূলধনের প্রবৃদ্ধিই অর্থনৈতিক স¤প্রসারণের সর্বাপেক্ষা
বড় উৎস। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সর্বাপেক্ষা মুনাফা তৈরি করতে পারে।
প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেই সর্বাধিক মুনাফা প্রদানকারী বিনিয়োগ সৃষ্টি হয় এবং যে
কর্মপন্থা ব্যবসায়ের পক্ষে সহায়ক সেটাই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনয়ন করবে।
সমালোচনা: ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণ সম্পূর্ণ সরকারী হস্তক্ষেপ বিহীন যে স্বয়ংক্রিয় অর্থনীতির
কল্পনা করেন তা পুরোপুরি প্রয়োগযোগ্য নয়। যেমন, সরকারী সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাজার কোন হস্তক্ষেপ
করতে পারে না - এক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি কাজ করে না। আবার সব কিছু বাজার ব্যবস্থার উপর
ছেড়ে দিলে একচেটিয়া মুনাফা ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যা রাষ্ট্রের সকল জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে
না। কখনো কখনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারী ভ‚মিকা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। যেমন,
কোন কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পরিবেশ দূষণ ঘটাতে পারে, এক্ষেত্রে জনস্বার্থে সরকারকে ভ‚মিকা
রাখতে হয়। এ কারণেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন অসম্ভব।
নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেল
নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি ধীরস্থির ও অবিরাম প্রক্রিয়া।
এ তত্ত¡ অনুসারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিæোক্ত বিষয়গুলোতে গুরুত্ব প্রদান করতে হয়। যথারাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মুনাফা প্রবণতা, পর্যাপ্ত উৎপাদন, দক্ষ শ্রম ও ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন অঞ্চল এবং
দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ধারণার বিস্তার। নিউক্লাসিক্যাল তত্তে¡ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উৎপাদন
কৌশলের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া পুঁজি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনসংখ্যার পরিমাণগত
পরিবর্তনকে আবশ্যক ধরা হয়। মনে করা হয় যে ভ‚স্বামী, শ্রমিক, পুঁজিপতি অর্থাৎ সকল আয় শ্রেণীই
উন্নয়নের অবদান ভোগ করতে পারে এবং অধিক উন্নয়নের জন্য এরা যৌথভাবে চেষ্টা চালাতে পারে।
সমালোচনা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলকে বিভিন্ন ভাবে সমালোচনা করা হয়।
প্রথমত: অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া এবং সমাজের সকল স্তরের জনসাধারণের
জন্য উপকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির অবিরাম গতিকে প্রাধান্য দেয়া না হলে
উন্নয়নের ক্ষতিকারক দিকগুলো প্রকট হয়ে উঠে। নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এসব
দিক যথার্থ গুরুত্ব পায় নি।
দ্বিতীয়ত: নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিতে বর্ণিত সামঞ্জস্যপূর্ণ অবিরাম উন্নয়ন প্রক্রিয়া উন্নত অর্থনীতিতে
যতটা প্রযোজ্য অনুন্নত অর্থনীতিতে ততটা প্রযোজ্য নয়। কেননা, উন্নত অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন উদ্যোক্তার ভ‚মিকা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ
পরিমাণ নগন্য এবং ব্যবসায়ী মনোভাব শক্তিশালী থাকে, কিন্তু অনুন্নত অর্থনীতিতে বাস্তবতাগুলো এ
রকম হয় না।
স্যূম্পটার মডেল
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এদের মধ্যে জোসেফ স্যূম্পটার-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্যূম্পটার এর অর্থনৈতিক উন্নয়নের
ধারণায়, উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন উদ্যোক্তার ভ‚মিকাকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাঁর মতে
সৃজনশীল উদ্যোক্তার পক্ষেই বিভিন্ন উৎপাদনশীল উপাদানের নতুন সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে নিত্য
নতুন পণ্য উৎপাদন সম্ভব। স্যূম্পটার প্রচলিত উদ্যোক্তার চেয়ে পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্যোক্তার কল্পনা
করেছেন। যারা শুধুমাত্র ব্যবস্থাপক নয় একই সাথে নতুন উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতিশীল উদ্যোক্তার ভ‚মিকা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, গতিশীল
বিশ্বের উন্নয়ন একটি অনিয়মিত এবং অমসৃন প্রক্রিয়া। এতে অনেক অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির সম্ভাবনা
থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিভাবান এবং সুদক্ষ উদ্যোক্তার পক্ষেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান
রাখা সম্ভব হবে। এরা জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতির সৃষ্টি করে।
সমালোচনা
প্রথমত: স্যুম্পটার মডেলে, ভোক্তার সার্বভৌমত্ব প্রাধান্য পায় নি। বরং ভোক্তার রুচির পরিবর্তনে
উৎপাদকের আচরণকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: বর্তমান কালে সমষ্টিগত ভাবে গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় তা বিশেষ
কোন উদ্যেক্তার উপর নির্ভরশীল নয়।
সারকথা: বিভিন্ন যুগে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে
বাণিজ্যতন্ত্রবাদে সোনা, রূপাসহ মূল্যবান ধাতব দ্রব্য আমদানী এবং সঞ্চয় বাড়ানোকে উন্নয়ন মনে
করা হতো। ভ‚মিবাদ মনে করতো ভ‚মিকে কেন্দ্র করে যে সম্পদ সৃষ্টি হয় এবং মানব জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য
আসে তাই উন্নয়ন। বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদরাও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন অর্থব্যবস্থায় দীর্ঘকালীন মেয়াদে প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
সঠিক উত্তরটি লিখুন।
১. ভ‚মিবাদ অনুসারে সকল সম্পদের উৎস
ক. সরকার;
খ. খনি;
গ. সমুদ্র;
ঘ. ভ মি।
২. অ্যাডাম স্মীথ
ক. ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ;
খ. নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ;
গ. পোষ্ট মডার্ন অর্থনীতিবিদ;
ঘ. মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ।
৩. ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা মনে করেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্য-
ক. সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি করা;
খ. পুঁজি সংগঠন;
গ. সরকারী ব্যয় বাড়ানো;
ঘ. সামরিক শাসন।
৪. স্যুম্পটার মডেলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাহকক. বিদেশী পুঁজি;
খ. কলকারখানা;
গ. উর্বর ভ‚মি;
ঘ. সৃজনশীল উদ্যেক্তা।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. বাণিজ্যতন্ত্র বাদের মূল বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন।
২. অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলে কোন বিষয়সমূহের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
রচনামুলক প্রশ্ন
১. অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে কোন দুটি মডেল আলোচনা করুন।
উত্তরমালা: ১.ঘ, ২.ক, ৩.খ, ৪.ঘ।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে কি বুঝায় - এর কোন একক সংজ্ঞা তৈরী করা সম্ভব নয়। কেননা বিভিন্ন
অর্থনীতিবিদ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ব্যাখ্যা করেছেন। এমন কি বিভিন্ন যুগে অর্থনৈতিক
উন্নয়নকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে বাণিজ্যতন্ত্রবাদ (গবৎপধহঃরষরংস)
দেশের অভ্যন্তরে সোনা,রূপা সহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতব দ্রব্যাদির আমদানী এবং সঞ্চয় বাড়ানোকেই
উন্নয়ন মনে করা হতো। এ মতবাদের অন্যতম প্রবক্তা ফিলিপ ভন হরনিক(১৬৩৮-১৭১২)তাঁর “সবার
উপরে অষ্ট্রিয়া, যদি শুধু সে ইচ্ছা করে” গ্রন্থে লিখেছেন দেশবাসীর উচিৎ যতবেশী সম্ভব দেশী জিনিষ
ব্যবহার করা। বিদেশী জিনিষ যদি আনতেই হয়, তবে তা সোনা, রূপার বিনিময়ে নয়, বরং কোন
দেশী জিনিষের বিনিময়ে আনতে হবে।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে ভ‚মিবাদ বা ফিজিওক্র্যাসী (চযুংরড়পৎধপু) মতবাদে, সকল সম্পদই
শেষ পর্যন্ত জমি থেকে আসে। একমাত্রই ভ‚মিই উদ্বৃত্ত তৈরী করতে পারে। এ জন্য ভ‚মিকে কেন্দ্র করে
যে সম্পদ বৃদ্ধি হয় এং মানব জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসে তাকেই উন্নয়ন মনে করা হয়।
বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদরাও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেন। জি.এ,.মেয়ার
এবং আর.ই. বল্ডউইন ’ গ্রন্থে
উলে খ করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন অর্থব্যবস্থায় -
দীর্ঘকালীন মেয়াদে প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। সে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে উন্নয়ন হার
বেশী হলে মাথাপিছু প্রকৃত আয়ও বৃদ্ধি পায়।
তাঁর গ্রন্থে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কতগুলো
প্রবণতা উল্লেখ করেন। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বিজ্ঞানের ব্যবহার, নিত্য নতুন কলা
কৌশল উদ্ভাবন, উৎপাদনের কৌশল আবিষ্কার ও মূলধন গঠন।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে
দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। অবশ্য বর্তমান কালে প্রকৃত জাতীয় আয় এবং মাথাপিছু আয়
বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সে সাথে সমাজের
সকল স্তরের জনগনের জীবনযাত্রার মানের বাস্তব উর্ধ্বগতি বিচার করতে হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমাজের সকল স্তরের জনগণের জীবনযাত্রার মানের বাস্তব উর্ধ্বগতি
বিচার করতে হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল
নিæে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তিনটি মডেল আলোচনা করা হলো। এগুলো হচ্ছে,
ক্ল্যাসিক্যাল মডেল;
নিওক্ল্যাসিক্যাল মডেল;
স্যুম্পটার মডেল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে সমাজের সকল স্তরের জনগণের জীবন যাত্রার মানেরও ঊধ্বগতি দেখা যায়।
ক্ল্যাসিক্যাল মডেল
ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণের মতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো পুঁজি সংগঠন। এই
ধারার তাত্তি¡করা এমন ধরনের অর্থনৈতিক পরিমন্ডল কল্পনা করেন যাতে ক্রমশ: অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ঘটতে থাকবে। পূর্ণ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে। জনগণের প্রবৃত্তি, সামর্থ্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সব
কিছুই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে থাকে। ক্ল্যাসিক্যাল তত্তে¡ মনে করা হয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে
সরকারের হস্তক্ষেপ অকল্যাণকর এবং পরিস্থিতিকে প্রতিক‚ল করে তোলে। এ তত্তে¡, সরকারের
ভ‚মিকাকে অত্যন্ত গৌণ মনে করা হয়। বরং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের
ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অ্যাডাম স্মীথ (১৭২৩-৯০) মনে করেন উৎপাদন নিজে থেকেই খরিদ্দারের চাহিদার
সাথে খাপ খাওয়াবে, বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে দ্রব্য মূল্য সর্বনি¤œ পরিমাণে নেমে
উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে পারবে এবং সম্পদের সর্বাধিক দক্ষ ব্যবহার হবে। স্মীথ মনে করেন, এই
বাজার শক্তির অবাধ কার্যকারিতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারী হস্তক্ষেপ,
নির্দেশনা বা ব্যবস্থাপনা অপ্রয়োজনীয়।
ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩)’র মতে, মূলধনের প্রবৃদ্ধিই অর্থনৈতিক স¤প্রসারণের সর্বাপেক্ষা
বড় উৎস। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সর্বাপেক্ষা মুনাফা তৈরি করতে পারে।
প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেই সর্বাধিক মুনাফা প্রদানকারী বিনিয়োগ সৃষ্টি হয় এবং যে
কর্মপন্থা ব্যবসায়ের পক্ষে সহায়ক সেটাই সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনয়ন করবে।
সমালোচনা: ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদগণ সম্পূর্ণ সরকারী হস্তক্ষেপ বিহীন যে স্বয়ংক্রিয় অর্থনীতির
কল্পনা করেন তা পুরোপুরি প্রয়োগযোগ্য নয়। যেমন, সরকারী সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাজার কোন হস্তক্ষেপ
করতে পারে না - এক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি কাজ করে না। আবার সব কিছু বাজার ব্যবস্থার উপর
ছেড়ে দিলে একচেটিয়া মুনাফা ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যা রাষ্ট্রের সকল জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে
না। কখনো কখনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারী ভ‚মিকা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। যেমন,
কোন কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পরিবেশ দূষণ ঘটাতে পারে, এক্ষেত্রে জনস্বার্থে সরকারকে ভ‚মিকা
রাখতে হয়। এ কারণেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন অসম্ভব।
নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেল
নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি ধীরস্থির ও অবিরাম প্রক্রিয়া।
এ তত্ত¡ অনুসারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিæোক্ত বিষয়গুলোতে গুরুত্ব প্রদান করতে হয়। যথারাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মুনাফা প্রবণতা, পর্যাপ্ত উৎপাদন, দক্ষ শ্রম ও ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন অঞ্চল এবং
দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ধারণার বিস্তার। নিউক্লাসিক্যাল তত্তে¡ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উৎপাদন
কৌশলের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া পুঁজি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনসংখ্যার পরিমাণগত
পরিবর্তনকে আবশ্যক ধরা হয়। মনে করা হয় যে ভ‚স্বামী, শ্রমিক, পুঁজিপতি অর্থাৎ সকল আয় শ্রেণীই
উন্নয়নের অবদান ভোগ করতে পারে এবং অধিক উন্নয়নের জন্য এরা যৌথভাবে চেষ্টা চালাতে পারে।
সমালোচনা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলকে বিভিন্ন ভাবে সমালোচনা করা হয়।
প্রথমত: অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া এবং সমাজের সকল স্তরের জনসাধারণের
জন্য উপকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির অবিরাম গতিকে প্রাধান্য দেয়া না হলে
উন্নয়নের ক্ষতিকারক দিকগুলো প্রকট হয়ে উঠে। নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এসব
দিক যথার্থ গুরুত্ব পায় নি।
দ্বিতীয়ত: নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিতে বর্ণিত সামঞ্জস্যপূর্ণ অবিরাম উন্নয়ন প্রক্রিয়া উন্নত অর্থনীতিতে
যতটা প্রযোজ্য অনুন্নত অর্থনীতিতে ততটা প্রযোজ্য নয়। কেননা, উন্নত অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন উদ্যোক্তার ভ‚মিকা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ
পরিমাণ নগন্য এবং ব্যবসায়ী মনোভাব শক্তিশালী থাকে, কিন্তু অনুন্নত অর্থনীতিতে বাস্তবতাগুলো এ
রকম হয় না।
স্যূম্পটার মডেল
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন।
এদের মধ্যে জোসেফ স্যূম্পটার-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্যূম্পটার এর অর্থনৈতিক উন্নয়নের
ধারণায়, উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন উদ্যোক্তার ভ‚মিকাকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাঁর মতে
সৃজনশীল উদ্যোক্তার পক্ষেই বিভিন্ন উৎপাদনশীল উপাদানের নতুন সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে নিত্য
নতুন পণ্য উৎপাদন সম্ভব। স্যূম্পটার প্রচলিত উদ্যোক্তার চেয়ে পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্যোক্তার কল্পনা
করেছেন। যারা শুধুমাত্র ব্যবস্থাপক নয় একই সাথে নতুন উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতিশীল উদ্যোক্তার ভ‚মিকা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, গতিশীল
বিশ্বের উন্নয়ন একটি অনিয়মিত এবং অমসৃন প্রক্রিয়া। এতে অনেক অনিশ্চয়তা এবং ঝুঁকির সম্ভাবনা
থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিভাবান এবং সুদক্ষ উদ্যোক্তার পক্ষেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান
রাখা সম্ভব হবে। এরা জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতির সৃষ্টি করে।
সমালোচনা
প্রথমত: স্যুম্পটার মডেলে, ভোক্তার সার্বভৌমত্ব প্রাধান্য পায় নি। বরং ভোক্তার রুচির পরিবর্তনে
উৎপাদকের আচরণকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: বর্তমান কালে সমষ্টিগত ভাবে গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় তা বিশেষ
কোন উদ্যেক্তার উপর নির্ভরশীল নয়।
সারকথা: বিভিন্ন যুগে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে
বাণিজ্যতন্ত্রবাদে সোনা, রূপাসহ মূল্যবান ধাতব দ্রব্য আমদানী এবং সঞ্চয় বাড়ানোকে উন্নয়ন মনে
করা হতো। ভ‚মিবাদ মনে করতো ভ‚মিকে কেন্দ্র করে যে সম্পদ সৃষ্টি হয় এবং মানব জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য
আসে তাই উন্নয়ন। বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদরাও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন অর্থব্যবস্থায় দীর্ঘকালীন মেয়াদে প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়।
সঠিক উত্তরটি লিখুন।
১. ভ‚মিবাদ অনুসারে সকল সম্পদের উৎস
ক. সরকার;
খ. খনি;
গ. সমুদ্র;
ঘ. ভ মি।
২. অ্যাডাম স্মীথ
ক. ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ;
খ. নিউ ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ;
গ. পোষ্ট মডার্ন অর্থনীতিবিদ;
ঘ. মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ।
৩. ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা মনে করেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্য-
ক. সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি করা;
খ. পুঁজি সংগঠন;
গ. সরকারী ব্যয় বাড়ানো;
ঘ. সামরিক শাসন।
৪. স্যুম্পটার মডেলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাহকক. বিদেশী পুঁজি;
খ. কলকারখানা;
গ. উর্বর ভ‚মি;
ঘ. সৃজনশীল উদ্যেক্তা।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. বাণিজ্যতন্ত্র বাদের মূল বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন।
২. অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নিউ ক্ল্যাসিক্যাল মডেলে কোন বিষয়সমূহের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
রচনামুলক প্রশ্ন
১. অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে কোন দুটি মডেল আলোচনা করুন।
উত্তরমালা: ১.ঘ, ২.ক, ৩.খ, ৪.ঘ।