জাতীয়তাবাদ কী? জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করুন।
জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ্আলোড়ন সৃষ্টিকারী আদর্শ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। আধুনিক কালে রাজনীতির
প্রধান চালিকা শক্তি হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই উদ্ভব হয়েছে জাতীয়-রাষ্ট্রের।
জাতীয়তাবাদ একটি চেতনা, এক ধরনের মানসিকতা এবং অনুভ‚তি। দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম হচ্ছে জাতীয়তাবাদের
প্রধান স্তম্ভ। অধ্যাপক হ্যারন্ড জে, লাস্কির মতে “জাতীয়তাবাদ সাধারণত এক প্রকার মানসিক ঐক্যবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমাজ
এবং এই ঐক্যবোধ উক্ত জনসমাজকে অন্য মানবসমাজ থেকে পৃথক করে’’। হ্যানস্ কোহ্ন বলেন, “জাতীয়তাবাদ হল
মূলত এক মানসিক অবস্থা, চেতনার এক কার্যক্রম।’’
অধ্যাপক ক্লাইডার বলেন, “জাতীয়তাবাদ হল ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও
ভাবপ্রবণতার ফল। একটি সুনির্দিষ্ট ভ‚খন্ডে বসবাসকারী জনসাধারণের মানসিকতা, অনুভ‚তি ও চেতনার ফল’’।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েস তার গ্রন্থে বলেন জাতীয়তা ও দেশপ্রেম এ দুটি প্রাচীন ভাবের আধুনিক
এক আবেগময় অনুভ‚তিপ্রবণ সংমিশ্রণ ও অতিরঞ্জন ”।
জাতীয়তাবাদ মূলত একত্রিত হবার এবং একত্রে বসবাস করার মানসিক প্রবণতা। জাতীয়তাবাদ জনগণের আশা
আকাক্সক্ষার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠে। জাতীয়-রাষ্ট্র গঠনই জাতীয়তাবাদের চরম সার্থকতা। জাতীয়তাবাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ
দিক রয়েছে। একটি সামাজিক অন্যটি রাজনৈতিক। সামাজিক দিক থেকে একটি জনসমাজ জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে
নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব খুঁজে পায় এবং রাজনৈতিক দিক থেকে ‘ড়হব ঘধঃরড়হ ড়হব ংঃধঃব’ -এর ভিত্তিতে সংগঠিত সমাজ
সৃষ্টির প্রয়াস পায়।
জাতীয়তাবাদের বিকাশ
মানব সমাজের ইতিহাস ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস। এই ক্রম বিবর্তনের পথ ধরে অনেক উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে
আমরা নগররাষ্ট্র থেকে উপনীত হয়েছি আধুনিক রাষ্ট্রে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো মূলত জাতীয় রাষ্ট্র। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে
সুস্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য আমরা এর বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করব।
প্রাচীন কালে কেবল মাত্র গ্রীক ও হিব্রæদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের সন্ধান লাভ করা যায়। কালের বিবর্তনে গ্রীসের নগর
রাষ্ট্রগুলোর অধঃপতন ঘটে এবং রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। জন্মলাভ করে বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যবাদের ধারণা। মধ্যযুগে
খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে। শাসন ব্যবস্থায় গীর্জার কর্তৃত্ব পরিলক্ষিত হয়। এ সময় বিভিন্ন দেশে
বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাজতন্ত্রের অধীনে সাধারণ মানুষ উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত হতে থাকে। অত্যাচারিত
ও নির্যাতিত মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। বিভিন্ন জাতি আপন স¦াতন্ত্র্য সম্পর্কে সজাগ
ও সচেতন হয়ে উঠে। পরবর্তীকালে গীর্জা এবং রাজার মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাজার
নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
ষোড়শ শতকের শুরুতে জাতীয়তাবাদের প্রথম বিকাশ ঘটে। ইতালির চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলী জাতীয়-রাষ্ট্রের নীতি
নির্ধারণের ফলে জাতীয়তাবাদ নতুনভাবে প্রাণ লাভ করে। তিনি আধুনিক অর্থে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার
করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। জাতীয়তাবাদের ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও বিশেষ অর্থে
জাতীয়তাবাদ বলতে যা বুঝায় তা আধুনিক যুগের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃত পক্ষে ১৭৭২ সালে অষ্ট্রিয়া, রাশিয়া
ও প্রæশিয়া কর্তৃক পোল্যান্ডের ভাগাভাগি এবং ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের ফলে জাতীয়তাবাদের চেতনা সমগ্র ইউরোপে
ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসী বিপ্লব শুধু সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শই প্রচার করে নি, এর আরেকটি মহান আদর্শ হচ্ছে
দেশপ্রেম। এই দেশাত্মবোধই কালক্রমে জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হয়।
ফরাসী বিপ্লব যে সব আদর্শকে কেন্দ্র করে সংঘঠিত হয়েছিল তার মধ্যে জাতীয়তাবাদ অন্যতম। চিন্তাবিদ হ্যান্স কোহ্ন
যথার্থই বলেছেন যে, ফরাসী বিপ্লবের অনুপ্রেরণার ফলে জাতীয়তাবাদের চেতনা সুসংহত রূপ লাভ করে। ফরাসী বিপ্লবের
ফলেই জাতীয়তাবাদের চিন্তা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং একটি রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে আতœপ্রকাশ করে। জাতীয়তাবাদী
আদর্শ ক্রমে ক্রমে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর মানচিত্রে সূচিত হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ইউরোপবাসীরা ফরাসী বিপ্লব থেকে এই শিক্ষা লাভ করে যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রহচ্ছে
অপরিহার্য মূলনীতি।
নেপোলিয়ন সমগ্র ইউরোপকে ফ্রান্সের অধীনে এনে জাতীয় অনুভ‚তি বিকাশের পথ প্রশস্তকরেন। তিনি প্রতিবেশী
দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার ফলে ঐ সব দেশের জনসাধারণ জাতীয় ঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে
উঠে। তাঁর আক্রমণের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ এসব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে এবং গণঅভ্যুত্থানের সূচনা
হয়। ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে একের পর এক বিপ্লব সংঘটিত হতে থাকে। ১৮১৫ সালে ভিয়েনা কংগ্রেস বেলজিয়ামকে
তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করায় বেলজিয়াম জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ১৮৩১ সালে হল্যান্ড থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাস রক্তাক্ত বিপ্লবের ইতিহাস। বিংশ শতাব্দী জাতীয়তাবাদের গৌরবোজ্জ্বল যুগ। জাতীয়তাবাদের
উপর ভিত্তি করে ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তি স¦াক্ষরিত হয়। চেক, পোল্যান্ড ও úাভ জাতিগুলো রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ লাভ
করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়া ও আফ্রিকায় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বহু রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। ভারত,
পাকিস্তান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে
১৯১৭ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র জাতিগত ধারণার নতুন সংযোজন ঘটাতে চায়। কিন্তু ১৯৯০ সালের ঘটনার পর গতানুগতিক
জাতি ভিত্তিক চেতনা আবার প্রবল হয় এবং সোভিয়েতের স্থলে একাধিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
সারকথা
জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একটি চেতনা বা অনুভ‚তি। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই উদ্ভব হয়েছে জাতীয় রাষ্ট্রের। জাতীয় রাষ্ট্র
গঠনই জাতীয়তাবাদের চরম স্বার্থকতা।
সঠিক উত্তর লিখুন।
১. “ঘধঃরড়হধষরংস রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ধ ংঃধঃব ড়ভ সরহফ ধহফ ধহ ধপঃ ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং.” এই বক্তব্যটি
কার?
ক. হ্যান্স কোহ্ন;
খ. হেগেল;
গ. হায়েস;
ঘ. রেনান।
২. ঊংধুং ড়হ ঘধঃরড়হধষরংস গ্রন্থের লেখক কে ?
ক. গার্ণার;
খ. লাস্কি;
গ. জেনিংস;
ঘ. হ্যান্স কোহ্ন।
৩. ফরাসী বিপ্লব কোন সালে সংঘটিত হয় ?
ক. ১৭৫৭;
খ. ১৭৮৯;
গ. ১৯০৫;
ঘ. ১৯১৯।
৪. ইউরোপকে ফ্রান্সের অধীনে কে আনেন ?
ক. নেপোলিয়ন;
খ. আলেকজান্ডার;
গ. চেঙ্গিস খান;
ঘ. রিচার্ড।
৫. কত সালে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ?
ক. ১৯১৯;
খ. ১৯২০;
গ. ১৯৩০;
ঘ. ১৯৩১।
সঠিক উত্তর : ১.ক; ২.ঘ; ৩.খ; ৪.ক; ৫.ক।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিন।
২. জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলো কি?
রচনামূলক প্রশ্ন
১. জাতীয়তাবাদ কী? জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করুন।
প্রধান চালিকা শক্তি হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই উদ্ভব হয়েছে জাতীয়-রাষ্ট্রের।
জাতীয়তাবাদ একটি চেতনা, এক ধরনের মানসিকতা এবং অনুভ‚তি। দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম হচ্ছে জাতীয়তাবাদের
প্রধান স্তম্ভ। অধ্যাপক হ্যারন্ড জে, লাস্কির মতে “জাতীয়তাবাদ সাধারণত এক প্রকার মানসিক ঐক্যবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমাজ
এবং এই ঐক্যবোধ উক্ত জনসমাজকে অন্য মানবসমাজ থেকে পৃথক করে’’। হ্যানস্ কোহ্ন বলেন, “জাতীয়তাবাদ হল
মূলত এক মানসিক অবস্থা, চেতনার এক কার্যক্রম।’’
অধ্যাপক ক্লাইডার বলেন, “জাতীয়তাবাদ হল ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও
ভাবপ্রবণতার ফল। একটি সুনির্দিষ্ট ভ‚খন্ডে বসবাসকারী জনসাধারণের মানসিকতা, অনুভ‚তি ও চেতনার ফল’’।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েস তার গ্রন্থে বলেন জাতীয়তা ও দেশপ্রেম এ দুটি প্রাচীন ভাবের আধুনিক
এক আবেগময় অনুভ‚তিপ্রবণ সংমিশ্রণ ও অতিরঞ্জন ”।
জাতীয়তাবাদ মূলত একত্রিত হবার এবং একত্রে বসবাস করার মানসিক প্রবণতা। জাতীয়তাবাদ জনগণের আশা
আকাক্সক্ষার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠে। জাতীয়-রাষ্ট্র গঠনই জাতীয়তাবাদের চরম সার্থকতা। জাতীয়তাবাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ
দিক রয়েছে। একটি সামাজিক অন্যটি রাজনৈতিক। সামাজিক দিক থেকে একটি জনসমাজ জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে
নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব খুঁজে পায় এবং রাজনৈতিক দিক থেকে ‘ড়হব ঘধঃরড়হ ড়হব ংঃধঃব’ -এর ভিত্তিতে সংগঠিত সমাজ
সৃষ্টির প্রয়াস পায়।
জাতীয়তাবাদের বিকাশ
মানব সমাজের ইতিহাস ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস। এই ক্রম বিবর্তনের পথ ধরে অনেক উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে
আমরা নগররাষ্ট্র থেকে উপনীত হয়েছি আধুনিক রাষ্ট্রে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো মূলত জাতীয় রাষ্ট্র। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে
সুস্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য আমরা এর বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করব।
প্রাচীন কালে কেবল মাত্র গ্রীক ও হিব্রæদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের সন্ধান লাভ করা যায়। কালের বিবর্তনে গ্রীসের নগর
রাষ্ট্রগুলোর অধঃপতন ঘটে এবং রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। জন্মলাভ করে বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যবাদের ধারণা। মধ্যযুগে
খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে। শাসন ব্যবস্থায় গীর্জার কর্তৃত্ব পরিলক্ষিত হয়। এ সময় বিভিন্ন দেশে
বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাজতন্ত্রের অধীনে সাধারণ মানুষ উৎপীড়িত ও লাঞ্ছিত হতে থাকে। অত্যাচারিত
ও নির্যাতিত মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। বিভিন্ন জাতি আপন স¦াতন্ত্র্য সম্পর্কে সজাগ
ও সচেতন হয়ে উঠে। পরবর্তীকালে গীর্জা এবং রাজার মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ে রাজার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাজার
নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
ষোড়শ শতকের শুরুতে জাতীয়তাবাদের প্রথম বিকাশ ঘটে। ইতালির চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলী জাতীয়-রাষ্ট্রের নীতি
নির্ধারণের ফলে জাতীয়তাবাদ নতুনভাবে প্রাণ লাভ করে। তিনি আধুনিক অর্থে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার
করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। জাতীয়তাবাদের ইতিহাস বেশ প্রাচীন হলেও বিশেষ অর্থে
জাতীয়তাবাদ বলতে যা বুঝায় তা আধুনিক যুগের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃত পক্ষে ১৭৭২ সালে অষ্ট্রিয়া, রাশিয়া
ও প্রæশিয়া কর্তৃক পোল্যান্ডের ভাগাভাগি এবং ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের ফলে জাতীয়তাবাদের চেতনা সমগ্র ইউরোপে
ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসী বিপ্লব শুধু সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শই প্রচার করে নি, এর আরেকটি মহান আদর্শ হচ্ছে
দেশপ্রেম। এই দেশাত্মবোধই কালক্রমে জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হয়।
ফরাসী বিপ্লব যে সব আদর্শকে কেন্দ্র করে সংঘঠিত হয়েছিল তার মধ্যে জাতীয়তাবাদ অন্যতম। চিন্তাবিদ হ্যান্স কোহ্ন
যথার্থই বলেছেন যে, ফরাসী বিপ্লবের অনুপ্রেরণার ফলে জাতীয়তাবাদের চেতনা সুসংহত রূপ লাভ করে। ফরাসী বিপ্লবের
ফলেই জাতীয়তাবাদের চিন্তা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং একটি রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে আতœপ্রকাশ করে। জাতীয়তাবাদী
আদর্শ ক্রমে ক্রমে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর মানচিত্রে সূচিত হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ইউরোপবাসীরা ফরাসী বিপ্লব থেকে এই শিক্ষা লাভ করে যে, সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রহচ্ছে
অপরিহার্য মূলনীতি।
নেপোলিয়ন সমগ্র ইউরোপকে ফ্রান্সের অধীনে এনে জাতীয় অনুভ‚তি বিকাশের পথ প্রশস্তকরেন। তিনি প্রতিবেশী
দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার ফলে ঐ সব দেশের জনসাধারণ জাতীয় ঐক্যের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে
উঠে। তাঁর আক্রমণের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ এসব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে এবং গণঅভ্যুত্থানের সূচনা
হয়। ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে একের পর এক বিপ্লব সংঘটিত হতে থাকে। ১৮১৫ সালে ভিয়েনা কংগ্রেস বেলজিয়ামকে
তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করায় বেলজিয়াম জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ১৮৩১ সালে হল্যান্ড থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাস রক্তাক্ত বিপ্লবের ইতিহাস। বিংশ শতাব্দী জাতীয়তাবাদের গৌরবোজ্জ্বল যুগ। জাতীয়তাবাদের
উপর ভিত্তি করে ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তি স¦াক্ষরিত হয়। চেক, পোল্যান্ড ও úাভ জাতিগুলো রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ লাভ
করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়া ও আফ্রিকায় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বহু রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। ভারত,
পাকিস্তান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে
১৯১৭ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র জাতিগত ধারণার নতুন সংযোজন ঘটাতে চায়। কিন্তু ১৯৯০ সালের ঘটনার পর গতানুগতিক
জাতি ভিত্তিক চেতনা আবার প্রবল হয় এবং সোভিয়েতের স্থলে একাধিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
সারকথা
জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একটি চেতনা বা অনুভ‚তি। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই উদ্ভব হয়েছে জাতীয় রাষ্ট্রের। জাতীয় রাষ্ট্র
গঠনই জাতীয়তাবাদের চরম স্বার্থকতা।
সঠিক উত্তর লিখুন।
১. “ঘধঃরড়হধষরংস রং ভরৎংঃ ধহফ ভড়ৎবসড়ংঃ ধ ংঃধঃব ড়ভ সরহফ ধহফ ধহ ধপঃ ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং.” এই বক্তব্যটি
কার?
ক. হ্যান্স কোহ্ন;
খ. হেগেল;
গ. হায়েস;
ঘ. রেনান।
২. ঊংধুং ড়হ ঘধঃরড়হধষরংস গ্রন্থের লেখক কে ?
ক. গার্ণার;
খ. লাস্কি;
গ. জেনিংস;
ঘ. হ্যান্স কোহ্ন।
৩. ফরাসী বিপ্লব কোন সালে সংঘটিত হয় ?
ক. ১৭৫৭;
খ. ১৭৮৯;
গ. ১৯০৫;
ঘ. ১৯১৯।
৪. ইউরোপকে ফ্রান্সের অধীনে কে আনেন ?
ক. নেপোলিয়ন;
খ. আলেকজান্ডার;
গ. চেঙ্গিস খান;
ঘ. রিচার্ড।
৫. কত সালে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ?
ক. ১৯১৯;
খ. ১৯২০;
গ. ১৯৩০;
ঘ. ১৯৩১।
সঠিক উত্তর : ১.ক; ২.ঘ; ৩.খ; ৪.ক; ৫.ক।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিন।
২. জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলো কি?
রচনামূলক প্রশ্ন
১. জাতীয়তাবাদ কী? জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করুন।