রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণগুলো আলোচনা করুন।
রাষ্ট্রীয় আইন, আদেশ ও নিষেধকে যথাযথভাবে পালন করার নাম রাজনৈতিক আনুগত্য। রাজনৈতিক আনুগত্য হল
রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং নাগরিকদের দায়-দায়িত্বের বন্ধন। আনুগত্যের ভিত্তির উপর রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সম্পর্ক নির্ভরশীল।
রাষ্ট্রের প্রতি জনসাধারণের আনুগত্যের যুক্তিস্বরূপ বলা হয় যে, রাষ্ট্র তাদের কল্যাণ সাধন করে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতি
আনুগত্য প্রদর্শন করে জনগণ লাভবান হয়ে থাকে। রাষ্ট্র কল্যাণকর এক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে ব্যক্তির সার্বিক কল্যাণ
সাধিত হয়। রাষ্ট্রের ইচ্ছা ও কার্যাবলী প্রকাশিত হয় নাগরিকদের কার্যাবলী ও ইচ্ছার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা
অনেক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার ভোগ করে থাকি। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করি।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ রাজনৈতিক আনুগত্যকে কর্তৃপক্ষের ও ব্যবস্থার প্রতি বিভিন্নভাবে সমর্থন প্রদান হিসেবে বর্ণনা
করতে আগ্রহী। এখন আমরা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আনুগত্যের কারণগুলো আলোচনা করব।
প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়টি আলোচনা করা হত। অতীতে
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল অনেকটা ধর্মের প্রতি আনুগত্য। তখন বলা হত রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। জনসাধারণ মনে
করত রাজার আদেশ অমান্য করা ঈশ্বরের আদেশ লংঘন করার সামিল। প্রাচীনকালে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ট সম্পর্ক
বিদ্যমান ছিল বলে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল অনেকটা ধর্মীয় অনুশাসন। টমাস একুইনাসের চিন্তাধারায় ঐশ্বরিক
মতবাদের সন্ধান পাওয়া যায়। অন্ধ বিশ্বাস ও আনুগত্য এই মতবাদের ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজারা
এই তত্তে¡র ভিত্তিতে প্রজাসাধারণের কাছ থেকে অবাধ আনুগত্য দাবী করত। বর্তমান যুগে ঐশ্বরিক মতবাদকে আর
স্বীকার করা হয়না। কারণ এটা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
সহজাত প্রবৃত্তি ও সামাজিক প্রবণতা
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একাকী বসবাস করতে পারে না। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাই মানুষের স্বভাব। সংঘবদ্ধ
জীবন-যাপনের এই প্রবণতা থেকেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিষ্টটল বলেন, ‘‘সহজাত প্রবৃত্তির কারণে
মানুষ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব মেনে নেয়। যেমন একটি শিশু মাতা-পিতার কর্তৃত্ব মেনে নেয়।’’ রাষ্ট্রের মাধ্যমে সমাজ জীবন
সুশৃঙ্খল ও সুন্দর হয়ে উঠে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের তাগিদ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। চিন্তাবিদ
গ্রাহাম ওয়ালাস বলেন, ‘‘ মানুষ আবেগ ও ভাবপ্রবণ হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড সম্পাদন করে থাকে।’’ অতএব আমরা
বলতে পারি, সহজাত প্রবৃত্তি ও সামাজিক কারণে মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল।
অভ্যাস
অভ্যাসবশতঃ মানুষ রাষ্ট্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম কানুন মেনে চলে। স্যার হেনরী মেইন বলেন, ‘‘রাষ্ট্র
মানুষের অভ্যাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’’ চিন্তাবিদ অস্টিনও এ মতবাদে বিশ্বাসী। অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিউম এই
মতবাদের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন যে, আনুগত্য ও দাসত্ব এতই স্বাভাবিক যে, অধিকাংশ মানুষ এর কারণ ও
উৎপত্তি সম্পর্কে চিন্তা করে না। মানুষ জন্মগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রশ্নকে স্বাভাবিক ও প্রথা ভিত্তিক হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রের উপকারিতা
রাষ্ট্রের উপকারিতার জন্য মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। রাষ্ট্রের সৃষ্টি মানুষের কল্যাণের জন্য। দার্শনিক
বেন্থাম ও মিলের মতে,“সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক কল্যাণের জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।” এই উপকারিতার জন্য মানুষ
রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল বলেন, “রাষ্ট্র খাঁটি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনের প্রকাশ।” তিনি
আরও উল্লেখ করেন যে, জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের আর্বিভাব ঘটেছিল এবং সুন্দর কল্যাণকর জীবনের জন্য রাষ্ট্র থাকবে।
নৈতিক দায়িত্ব
আদর্শবাদীদের মতে, রাষ্ট্র মানুষের মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে। টি, এইচ গ্রীন উল্লেখ করেন যে,
রাষ্ট্র উন্নততর জীবনের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিকট থেকে অধিকার লাভ করে। নাগরিক জীবনের বিকাশ
ও কল্যাণের পথে যেসব বাধা বিপত্তি থাকে রাষ্ট্র তা দূর করতে সচেষ্ট হয়। এসব কারণে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার
করা নৈতিক দায়িত্ব। অধ্যাপক লাস্কি বলেন যে, নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির কারণেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ন্যায় সঙ্গত।
হব্স, লক ও রুশোর আনুগত্য মতবাদ
হব্স, লক ও রুশোর লেখনীর মধ্যে চুক্তিবাদের সন্ধান পাওয়া যায়। সামাজিক চুক্তি মতবাদ অনুযায়ী জনগণ চুক্তির
মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করেছে। হবসের মতে, মানুষ শাস্তির ভয়ে রাষ্ট্রের অনুশাসন মেনে চলে। রাষ্ট্রের আইন না
মানলে নাগরিকদের শাস্তিভোগ করতে হয়। রাষ্ট্র যেহেতু জনসাধারণের শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা
দিয়ে থাকে সেহেতু জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা অবশ্য কর্তব্য। জন লক বলেন যে, জনগণের আনুগত্য
শর্ত সাপেক্ষ। রাষ্ট্রবা সরকার যতক্ষণ যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করবে ততক্ষণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ
করবে। তিনি উল্লেখ করেন, “নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতা - এই তিনটি অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা
বিধান করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার যদি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তা হলে তাদের সরকারের
বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার অধিকার থাকবে।” রুশোর মতে, “জনগণের সম্মতিই রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তি।”
জনসাধারণের সম্মতি লাভ করেই রাষ্ট্র অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়। রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব বিকাশের
পরিবেশ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র কল্যাণকর, উন্নততর ও মহৎ জীবন যাপনের সুব্যবস্থা করে।
সারকথা
নাগরিকদের আনুগত্যের ভিত্তি রাষ্ট্রের কার্যাবলীর মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্র যদি জনসাধারণের ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক দাবি পূরণ
করতে ব্যর্থ হয় তাহলে জনগণ রাষ্ট্রীয় আইনের বিরোধিতা করতে পারে। একথা সত্য যে, সরকারের বিরোধিতা করা
মানুষের একটি নৈতিক অধিকার, আইনগত অধিকার নয়। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা নাগরিকদের স¦াভাবিক ব্যাপার।
সঠিক উত্তর লিখুন।
১. রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সম্পর্ক কিসের উপর নির্ভরশীল ?
ক. ট্যাক্স দেয়ার উপর;
খ. দেশ প্রেমের উপর;
গ. বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করার উপর;
ঘ. আনুগত্যের উপর।
২. ঐশ্বরিক মতবাদের সন্ধান পাওয়া যায় কার চিন্তা ধারায় ?
ক. টমাস একুইনাস;
খ. হব্স;
গ. লক;
ঘ. রুশো।
৩. ‘‘সহজাত প্রবৃত্তির কারণে মানুষ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে স্বীকার করে ’’এই উক্তিটি কার ?
ক. প্লেটো;
খ. এরিস্টটল;
গ. সক্রেটিস;
ঘ. হিউম।
৪. মানুষের জীবন, সম্পত্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করার কথা কে বলেছেন ?
ক. জন লক;
খ. লাস্কি;
গ. হেনরী মেইন;
ঘ. মিল।
৫. “নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির কারণে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ন্যায় সঙ্গত” বক্তব্যটি কার?
ক. বেনথাম;
খ. মিল;
গ. লাস্কি;
ঘ. জন লক।
সঠিক উত্তর ঃ ১.ঘ, ২.ক, ৩.খ, ৪.ক, ৫.গ ।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. রাজনৈতিক আনুগত্য বলতে কি বুঝায় ?
রচনামূলক প্রশ্ন
১. রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণগুলো আলোচনা করুন।
রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং নাগরিকদের দায়-দায়িত্বের বন্ধন। আনুগত্যের ভিত্তির উপর রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সম্পর্ক নির্ভরশীল।
রাষ্ট্রের প্রতি জনসাধারণের আনুগত্যের যুক্তিস্বরূপ বলা হয় যে, রাষ্ট্র তাদের কল্যাণ সাধন করে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতি
আনুগত্য প্রদর্শন করে জনগণ লাভবান হয়ে থাকে। রাষ্ট্র কল্যাণকর এক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে ব্যক্তির সার্বিক কল্যাণ
সাধিত হয়। রাষ্ট্রের ইচ্ছা ও কার্যাবলী প্রকাশিত হয় নাগরিকদের কার্যাবলী ও ইচ্ছার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমরা
অনেক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার ভোগ করে থাকি। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করি।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ রাজনৈতিক আনুগত্যকে কর্তৃপক্ষের ও ব্যবস্থার প্রতি বিভিন্নভাবে সমর্থন প্রদান হিসেবে বর্ণনা
করতে আগ্রহী। এখন আমরা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আনুগত্যের কারণগুলো আলোচনা করব।
প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়টি আলোচনা করা হত। অতীতে
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল অনেকটা ধর্মের প্রতি আনুগত্য। তখন বলা হত রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। জনসাধারণ মনে
করত রাজার আদেশ অমান্য করা ঈশ্বরের আদেশ লংঘন করার সামিল। প্রাচীনকালে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ট সম্পর্ক
বিদ্যমান ছিল বলে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল অনেকটা ধর্মীয় অনুশাসন। টমাস একুইনাসের চিন্তাধারায় ঐশ্বরিক
মতবাদের সন্ধান পাওয়া যায়। অন্ধ বিশ্বাস ও আনুগত্য এই মতবাদের ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজারা
এই তত্তে¡র ভিত্তিতে প্রজাসাধারণের কাছ থেকে অবাধ আনুগত্য দাবী করত। বর্তমান যুগে ঐশ্বরিক মতবাদকে আর
স্বীকার করা হয়না। কারণ এটা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
সহজাত প্রবৃত্তি ও সামাজিক প্রবণতা
মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একাকী বসবাস করতে পারে না। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাই মানুষের স্বভাব। সংঘবদ্ধ
জীবন-যাপনের এই প্রবণতা থেকেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিষ্টটল বলেন, ‘‘সহজাত প্রবৃত্তির কারণে
মানুষ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব মেনে নেয়। যেমন একটি শিশু মাতা-পিতার কর্তৃত্ব মেনে নেয়।’’ রাষ্ট্রের মাধ্যমে সমাজ জীবন
সুশৃঙ্খল ও সুন্দর হয়ে উঠে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের তাগিদ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। চিন্তাবিদ
গ্রাহাম ওয়ালাস বলেন, ‘‘ মানুষ আবেগ ও ভাবপ্রবণ হয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড সম্পাদন করে থাকে।’’ অতএব আমরা
বলতে পারি, সহজাত প্রবৃত্তি ও সামাজিক কারণে মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল।
অভ্যাস
অভ্যাসবশতঃ মানুষ রাষ্ট্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম কানুন মেনে চলে। স্যার হেনরী মেইন বলেন, ‘‘রাষ্ট্র
মানুষের অভ্যাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’’ চিন্তাবিদ অস্টিনও এ মতবাদে বিশ্বাসী। অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিউম এই
মতবাদের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন যে, আনুগত্য ও দাসত্ব এতই স্বাভাবিক যে, অধিকাংশ মানুষ এর কারণ ও
উৎপত্তি সম্পর্কে চিন্তা করে না। মানুষ জন্মগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রশ্নকে স্বাভাবিক ও প্রথা ভিত্তিক হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রের উপকারিতা
রাষ্ট্রের উপকারিতার জন্য মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। রাষ্ট্রের সৃষ্টি মানুষের কল্যাণের জন্য। দার্শনিক
বেন্থাম ও মিলের মতে,“সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক কল্যাণের জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।” এই উপকারিতার জন্য মানুষ
রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল বলেন, “রাষ্ট্র খাঁটি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনের প্রকাশ।” তিনি
আরও উল্লেখ করেন যে, জীবনের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের আর্বিভাব ঘটেছিল এবং সুন্দর কল্যাণকর জীবনের জন্য রাষ্ট্র থাকবে।
নৈতিক দায়িত্ব
আদর্শবাদীদের মতে, রাষ্ট্র মানুষের মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে। টি, এইচ গ্রীন উল্লেখ করেন যে,
রাষ্ট্র উন্নততর জীবনের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিকট থেকে অধিকার লাভ করে। নাগরিক জীবনের বিকাশ
ও কল্যাণের পথে যেসব বাধা বিপত্তি থাকে রাষ্ট্র তা দূর করতে সচেষ্ট হয়। এসব কারণে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার
করা নৈতিক দায়িত্ব। অধ্যাপক লাস্কি বলেন যে, নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির কারণেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ন্যায় সঙ্গত।
হব্স, লক ও রুশোর আনুগত্য মতবাদ
হব্স, লক ও রুশোর লেখনীর মধ্যে চুক্তিবাদের সন্ধান পাওয়া যায়। সামাজিক চুক্তি মতবাদ অনুযায়ী জনগণ চুক্তির
মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করেছে। হবসের মতে, মানুষ শাস্তির ভয়ে রাষ্ট্রের অনুশাসন মেনে চলে। রাষ্ট্রের আইন না
মানলে নাগরিকদের শাস্তিভোগ করতে হয়। রাষ্ট্র যেহেতু জনসাধারণের শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা
দিয়ে থাকে সেহেতু জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা অবশ্য কর্তব্য। জন লক বলেন যে, জনগণের আনুগত্য
শর্ত সাপেক্ষ। রাষ্ট্রবা সরকার যতক্ষণ যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করবে ততক্ষণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ
করবে। তিনি উল্লেখ করেন, “নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতা - এই তিনটি অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা
বিধান করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সরকার যদি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তা হলে তাদের সরকারের
বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করার অধিকার থাকবে।” রুশোর মতে, “জনগণের সম্মতিই রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তি।”
জনসাধারণের সম্মতি লাভ করেই রাষ্ট্র অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়। রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব বিকাশের
পরিবেশ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র কল্যাণকর, উন্নততর ও মহৎ জীবন যাপনের সুব্যবস্থা করে।
সারকথা
নাগরিকদের আনুগত্যের ভিত্তি রাষ্ট্রের কার্যাবলীর মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্র যদি জনসাধারণের ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক দাবি পূরণ
করতে ব্যর্থ হয় তাহলে জনগণ রাষ্ট্রীয় আইনের বিরোধিতা করতে পারে। একথা সত্য যে, সরকারের বিরোধিতা করা
মানুষের একটি নৈতিক অধিকার, আইনগত অধিকার নয়। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা নাগরিকদের স¦াভাবিক ব্যাপার।
সঠিক উত্তর লিখুন।
১. রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সম্পর্ক কিসের উপর নির্ভরশীল ?
ক. ট্যাক্স দেয়ার উপর;
খ. দেশ প্রেমের উপর;
গ. বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করার উপর;
ঘ. আনুগত্যের উপর।
২. ঐশ্বরিক মতবাদের সন্ধান পাওয়া যায় কার চিন্তা ধারায় ?
ক. টমাস একুইনাস;
খ. হব্স;
গ. লক;
ঘ. রুশো।
৩. ‘‘সহজাত প্রবৃত্তির কারণে মানুষ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে স্বীকার করে ’’এই উক্তিটি কার ?
ক. প্লেটো;
খ. এরিস্টটল;
গ. সক্রেটিস;
ঘ. হিউম।
৪. মানুষের জীবন, সম্পত্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করার কথা কে বলেছেন ?
ক. জন লক;
খ. লাস্কি;
গ. হেনরী মেইন;
ঘ. মিল।
৫. “নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির কারণে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ন্যায় সঙ্গত” বক্তব্যটি কার?
ক. বেনথাম;
খ. মিল;
গ. লাস্কি;
ঘ. জন লক।
সঠিক উত্তর ঃ ১.ঘ, ২.ক, ৩.খ, ৪.ক, ৫.গ ।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১. রাজনৈতিক আনুগত্য বলতে কি বুঝায় ?
রচনামূলক প্রশ্ন
১. রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণগুলো আলোচনা করুন।