প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রকি? আদর্শরাষ্ট্রবাস্তবায়ন করা সম্ভব কি? আলোচনা

ক্রম:ক্ষয়িষ্ণুগ্রীক নগর রাষ্ট্রেন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে শাস্তিফিরিয়ে আনাই ছিল
প্লেটোর দর্শনের মূল উদ্দেশ্য। তাঁর নিজস্বব্যাখ্যাত ন্যায়কে পুনপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তিনি
তাঁর বিখ্যাত ‘দি রিপাবলিক' পুস্তকে একটি আদর্শরাষ্ট্রের কল্পনা করেন। বলাবাহুল্য, এ আদর্শ
রাষ্ট্রসম্পর্কেবলতে গিয়ে প্লেটো মূলত: কোন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আশ্রয় নেন নি। তাঁর
এ আদর্শরাষ্ট্রছিল সম্পূর্ণকল্পনাপ্রসুত। তাই এটিকে অবাস্তব (ঁঃড়ঢ়রধ) বা কাল্পনিক রাষ্ট্রবলা
যায়। বাস্তবে ‘কেমন হয়' তা না ভেবে সংকট মুক্তি ও শান্তির জন্য ‘কেমন হওয়া উচিত' তাই
ছিল তাঁর মূল জিজ্ঞাসা। এ প্রসঙ্গে স্যাবাইনের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। স্যাবাইন বলেন,“
নীতিগতভাবে রাষ্ট্রকেমন হওয়া উচিত প্লেটো সেটিই দেখাতে চেয়েছেন। রাষ্ট্রের বাস্তব অবস্থা
যদি নীতিভিত্তিক না হয় তবে তা বাস্তব অবস্থার ত্রæটি।”
ন্যায়বিচার তত্ত¡ উপস্থাপন করতে গিয়ে প্লেটো দেখিয়েছেন যে, মানব ব্যক্তিত্বের তিনটি
উপাদান রয়েছে। এগুলো হলো যুক্তি, সাহস ও কামনা। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদীতা,
সাহস ও কামনা-বাসনা পরিদৃষ্ট হয়। তবে সকলেই একভাবে পরিচালিত হন না। কেউ যুক্তির
দ্বারা, কেউ সাহসের দ্বারা, আবার কেউ কামনার দ্বারা চালিত হন। এ ভাবে রাষ্ট্রেতিনটি
শ্রেণীর প্রকাশ ঘটে। যারা কামনার দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা রাষ্ট্রের কৃষি, হস্তশিল্প তথা
উৎপাদক শ্রেণীভুক্ত। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী সাহসের দ্বারা চালিত শ্রেণী
এবং শাসক শ্রেণী হবেন ধৈর্য, মেধা বা প্রজ্ঞা দ্বারা চালিত গোষ্ঠী। এ শাসক শ্রেণীকে প্লেটো
তার আদর্শরাষ্ট্রে‘অভিভাবক শ্রেণী' বলে অভিহিত করেছেন। তাঁরা আবার দার্শনিক। তাই
দেখা যায়, প্লেটোর কাল্পনিক রাষ্ট্রেঅভিভাবক শ্রেণী বা দার্শনিক রাজাদের কাজ দেশ শাসন
করা। প্রতিরক্ষার দায়িত্বদেয়া হয়েছে সাহসের দ্বারা চালিত সেনাবাহিনীর উপর। আর আদর্শ
রাষ্ট্রের নাগরিক ও জনসাধারণের বস্তুগত চাহিদা পূরণের দায়িত্ব বর্তাবে উৎপাদক শ্রেণীর
উপর।
দেখা যায়, প্লেটো মানবআত্মা এবং ব্যক্তিত্বের উৎসগুলোকে রাষ্ট্রের উপর ন্যস্তকরে রাষ্ট্রও
ব্যক্তির মধ্যে এক অভিন্নযোগসূত্র স্থাপন করেছেন। প্লেটো মনে করতেন, মানুষ সকলে সমান
নয়। সৃষ্টির মধ্যেই এ অসমতার বীজ নিহিত থাকে। বিধাতা বিভিন্নমানুষকে বিভিন্নগুণ দ্বারা
তৈরী করেছেন। কেউ সোনা দ্বারা তৈরী, কেউ রূপা দ্বারা তৈরী, কেউ আবার তামার তৈরী।
তাঁর মতে সোনা দ্বারা তৈরী নাগরিকেরা শাসন করার গুণ সম্পন্ন। রূপার তৈরী নাগরিকেরা
যোদ্ধা বা সৈনিক সুলভ গুণে গুণাম্বিত। আর তামার তৈরী নাগরিকেরা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট গুণভুক্ত
যারা উৎপাদন কাজের জন্য উপযুক্ত। এ ভাবে তিনি কর্মবিশেষীকরণ ও শ্রম বিভক্তির নীতির
অবতারণা করেছেন। তাঁর আদর্শরাষ্ট্রেউপরোক্ত নীতির প্রতিফলন ঘটবে। যোগ্য লোকেরা
যোগ্য স্থান পাবেন। রাষ্ট্রসংঘাতের হাত থেকে রেহাই পাবে। স্থায়ী ভাবে শান্তিও উন্নতি
প্রতিষ্ঠিত হবে। প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রের শাসন ভার থাকবে দার্শনিক রাজাদের উপর। এদের প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র ছিল কাল্পনিক মানুষের মধ্যে যুক্তি, সাহস ও কামনা এই তিন ধরনের উপাদান থাকে কর্মবিশেষীকরণ ও শ্রমবিভক্তির অবতাণা
প্রধান গুণ হল প্রজ্ঞা। ক্ষমতার প্রতি তাঁরা মোহাম্বিত হবেন না। পক্ষপাতিত্বতাদের কাছে
অজানা থাকবে । প্রজ্ঞা ও যুক্তিই হবে তাদের মূল চালিকা শক্তি। এমতাবস্থায় দার্শনিক রাজারা
স্ববিবেচনায় শাসন কার্য পরিচালনা করবেন। তাদের পেছনে কোন প্রকার আইনের
বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কারণ, প্লেটো মনে করতেন, শাসক যদি আইন না মেনে চলেন
তবে আইন থাকা অর্থহীন, আবার শাসক যদি নীতিহীন কিছুনা করেন, তবে আইন থাকা
অপ্রয়োজনীয়।
প্লেটো তারপরও অতি সাবধানীর মত দার্শনিক রাজা ও সৈনিক শ্রেণীর জন্য এক ধরনের
সাম্যবাদী জীবন ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এর অর্থহচ্ছে তাদের কোন প্রকার ব্যক্তিগত পরিবার
বা সম্পত্তি থাকবে না । তাঁরা ব্যারাকে থাকবেন এবং একত্রে খাবেন। তাদের যৌন মিলনের
জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। কোন নির্দিষ্ট এবং স্থায়ী স্ত্রী নয়, বরং সাময়িকভাবে মেয়ে এবং
পুরুষ মিলিত হবেন। ফলে মিলনের কারণে যে সন্তান জন্ম নিবে সে সন্তান চিহ্নিত করা
যাবেনা। প্লেটো ভেবেছিলেন এমতাবস্থায় শাসক শ্রেণী সম্পূর্নস্বার্থহীনভাবে দেশের জন্য কাজ
করবেন। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ থাকবে না।
আদর্শরাষ্ট্রের তিনটি শ্রেণীর মধ্যে কে কোন শ্রেণীভুক্ত হবেন তা স্থির করার জন্য প্লেটো তাঁর
কল্পিত আদর্শরাষ্ট্রেশিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাবিত এ শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে
গুণ সম্পন্নকরে তুলবে। এ শিক্ষা ব্যবস্থা হবে স্তর ভিত্তিক। প্রথম স্তরের অকৃতকার্যরা উৎপাদক
শ্রেণীভুক্ত হবেন। দ্বিতীয় স্তরের অকৃতকার্যরা হবেন সৈনিক শ্রেণীভুক্ত এবং সর্ব্বোচ্চ স্তরে যারা
সাফল্য লাভ করবেন তারা হবেন দার্শনিক শাসক। তাঁর আদর্শরাষ্ট্রেনারী পরুষের ভেদাভেদ
নাই। সুতরাং প্লোটোর আদর্শরাষ্ট্রএকটি অত্যন্তসুপরিকল্পিত রাষ্ট্রচিন্তার ফসল।
প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রের সমালোচনা:
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রনানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সমালোচনাগুলো নি¤েœ
আলোচিত হলো:
● বাস্তবের সাথে সঙ্গতিহীন: প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রবাস্তবের সাথে সমপূর্ণরূপে সম্পর্কহীন। তাঁর
এ ধরনের কল্পিত রাষ্ট্রবাস্তবে কোন দিনই ছিল না এবং বলা বাহুল্য, বাস্তবে এরূপ রাষ্ট্রের
রূপদান করাও সম্ভব নয়। এ ধরনের ইউটোপিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে কি কি সমস্যা
আসতে পারে সে বিষয়ে প্লেটো ছিলেন সম্পূর্ণউদাসীন। কিন্তুতাঁর আদর্শরাষ্ট্রের অবাস্তবতা
সম্পর্কেতিনি সচেতন ছিলেন। তারপরও তিনি ভেবেছিলেন বাস্তবে যে রাষ্ট্রতার কল্পিত
আদর্শরাষ্ট্রের যতবেশী নিকটবর্তী হবে সে রাষ্ট্রততবেশী মঙ্গলময় হবে।
● শ্রেণী ভিত্তিক রাষ্ট্র: প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রএকটি শ্রেণী ভিত্তিক রাষ্ট্র। অধ্যাপক স্যাবাইন মনে
করতেন যে, প্লেটোর শ্রেণী ভিত্তিক আদর্শরাষ্ট্রবর্ণপ্রথার মত নয়। কিন্তুতবুও এ ধরনের
সংগঠন শ্রেণী বিভক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে সার্বজনিনতার চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। জেলার
নামক একজন লেখকের মতে প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রমূলত: অভিজাততান্ত্রিক। এ আভিজাত্য
বুদ্ধি ও মেধার অভিজাত্য। উপরন্তুতিনি উৎপাদক শ্রেণীর আত্মিক ও মানসিক উন্নতির
প্রতি ঔদাসিন্য দেখিয়েছেন। ঐক্যের নামে তিনি বরং শ্রেণী বিভাজন ও শ্রেণীদ্বন্দে¡র বীজ
বপন করেছেন।
● আইনের প্রতি অবজ্ঞা: প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রের ‘দার্শনিক শাসক' আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ
না থেকে স্ববিবেচনায় শাসন করবেন-এমন নীতি প্রকারান্তরে আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা
স্বরূপ। এতে স্বৈরশাসনের পথ সুগম হতে পারে। পরবর্তীতে স্বয়ং এরিস্টটল বলেছেন,
ব্যক্তির শাসনের চেয়ে আইনের শাসন সব সময়ই উত্তম। এরিস্টটল বলেছেন, ব্যক্তির শাসনের চেয়ে আইনের শাসন সব সময়ই উত্তম
● অহেতুক ঐক্যের উপর জোর: সমাজের উন্নতির জন্য ঐক্যের প্রয়োজন থাকলেও
বৈচিত্রবিহীন ঐক্য অনৈক্যের সামিল। সমালোচকরা মনে করেন প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রে
তথাকথিত ঐক্যের উপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ এর বড় একটি দুর্বলতা। এরিস্টটল এ
সম্পর্কেমন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ঐক্যের উপর অহেতুক গুরুত্বদিলে এমন একটা
অবস্থা আসবে যখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ববলতে কিছুহয়ত থাকবে না।'
● সাম্যবাদী ধারণা অহেতুক ও উদ্ভট: প্লেটো আদর্শরাষ্ট্রেযে ধরনের সাম্যবাদী ব্যবস্থার কথা
বলেছেন তা মানব প্রকৃতি বিরোধী এবং অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। অভিভাবক শ্রেণীর
জন্য ব্যক্তিগত পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে তিনি তাদেরকে ‘যন্ত্র'
বানাতে চেয়েছেন। তাঁদের স্বাভাবিক আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথকে রুদ্ধ করতে
চেয়েছেন। উপরোক্ত সমালোচনার পরও প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্র, রাষ্ট্রদর্শনে একটি বড় মাপের
অবদান। তিনি আদর্শরাষ্ট্রের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সুসামঞ্জস্য ও সামগ্রিক রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার
প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।
সারকথা
প্লেটো তার ন্যায়বিচার তত্তে¡র আলোকে রাষ্ট্রের ঐক্য ও মঙ্গলের জন্য একটি আদর্শ
রাষ্ট্রের কল্পনা করেন। বিভিন্নমানুষের গুণাগুণ নির্ভর তিনটি শ্রেণী এতে থাকবে। বুদ্ধি
এবং মেধা সম্পন্নমানুষ হবেন শাসক বা দার্শনিক রাজা। সাহসী চরিত্রের মানুষ হবেন
সৈনিক এবং আবেগ দ্বারা তাড়িত মানুষ হবেন উৎপাদক শ্রেণীভুক্ত। দার্শনিক শাসকেরা
আইনের গন্ডির বাইরে থেকে স্ববিবেচনায় দেশ শাসন করবেন। তাঁদের কোন ব্যক্তিগত
সম্পত্তি বা স্ত্রী, পুত্র, পরিবার থাকতে পারবে না। প্লেটো মনে করতেন এমতাবস্থায় তাঁরা
সার্বিক ও নিস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন। প্লেটোর এই আদর্শরাষ্ট্র বাস্তবতা বিবর্জিত।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রের শাসকদের কি গুণের অধিকারী হতে হবে?
(ক) সাহস;
(খ) সংগীত;
(গ) প্রজ্ঞা ও সাহস;
(ঘ) আবেগ।
সঠিক উত্তর : গ.
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। আদর্শরাষ্ট্রেকয়টি শ্রেণী থাকবে ?
২। প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রকি কোথাও বাস্তবায়িত হয়েছিল?
৩। আদর্শরাষ্ট্রের শাসকদের কি গুণাবলী থাকা আবশ্যক?
৪। কেন প্লেটো আদর্শরাষ্ট্রের শাসকদের জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার প্রথা নিষিদ্ধ
করতে চেয়েছিলেন?
৫। প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রকি শ্রেণীহীন প্রতিষ্ঠান?
রচনামূল প্রশ্ন
১। সমালোচনাসহ প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রের বর্ণনা দিন।
২। প্লেটোর আদর্শরাষ্ট্রকি? আদর্শরাষ্ট্রবাস্তবায়ন করা সম্ভব কি? আলোচনা করুন।