প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনার বর্ণনা দিন। বর্তমান কালে তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনা কি প্রয়োগযোগ্য?
প্লেটোর শিক্ষা তত্ত¡তাঁর ‘দি রিপাবলিক' পুস্তকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণআলোচ্য বিষয়। প্লেটো
তাঁর কল্পিত আদর্শরাষ্ট্রের কর্মসূচীর মধ্যে শিক্ষা ও সাম্যবাদকে অধিকতর গুরুত্বদিয়েছিলেন।
রিপাবলিক এর মধ্যে শিক্ষার বিস্তৃত আলোচনা অবলোকন করে অনেকে ‘রিপাবলিক’ কে মূলত:
শিক্ষা সম্পর্কিত আলোচনার পুস্তক বলে মনে করতে চান। ফরাসী দার্শনিক রুশোর মতে
‘প্লেটোর রিপাবলিক কোন রাজনৈতিক গ্রন্থনয়, বরং শিক্ষা সম্পর্কেএ যাবৎ যত গ্রন্থলিখিত
হয়েছে তার মধ্যে এটি হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ।' প্লেটো খুব সঙ্গত কারণেই শিক্ষার উপর এতো
গুরুত্বারোপ করেছিলেন। প্লেটো শিক্ষাকে তৎকালীন প্রচলিত ধারণা তথা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত
উৎকর্ষতার মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষাকে তিনি সেই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের উপযুক্ত
মাধ্যম হিসাবেও মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানবাত্মার পূর্ণবিকাশ ঘটায়,
শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি সত্যকে বেছে নেয় এবং সামাজিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে খাপ খাওয়ায়।
তিনি আরও মনে করতেন, রাষ্ট্রপ্রধানত একটি শিক্ষামূলক সংগঠন। শিক্ষার সাহায্যেই
জনগণের চরিত্র ও প্রকৃতি গঠন করা যায়। শিক্ষা ব্যতীত একটি সুসামঞ্জস্য রাষ্ট্রগঠন সম্ভব
নয়। প্লেটোর এ বিশ্বাসের মূলে ছিল সম্ভবত সক্রেটিসের সেই অমর বানী,“সদগুণই জ্ঞান।”
প্লেটো বিশ্বাস করতেন শিক্ষার মাধ্যমে এ সদগুণ অর্জন করা যায়। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে
বার্কার মন্তব্য করেছেন, ‘প্লেটোর কাছে শিক্ষা মানসিক ওষুধ প্রদানের মাধ্যমে মানসিক রোগ
আরোগ্য করার এক প্রচেষ্টা বিশেষ।' তদুপরী তাঁর আদর্শরাষ্ট্রেশ্রেণী বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।
উপরোক্ত বিষয় বিবেচনার রেখে প্লেটো প্রথমত: সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন এথেন্সের
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে এসেছেন। তখন সেখানে না ছিল সার্বজনীন শিক্ষা না
ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা। প্লেটো ভাবতেন, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত না হলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য
ব্যহত হয়। এক্ষেত্রে সম্ভবত: তিনি স্পার্টার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত
হয়েছিলেন। প্লেটোই সর্বপ্রথম শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ব্যবধান না থাকার কথা
বলেছেন। তাঁর মতে রাষ্ট্রেভ‚মিকা রাখার বেলায় নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।
তাই শিক্ষা হবে উভয়ের জন্য উন্মুক্ত ও অভিন্ন। বলাবাহুল্য, প্লেটোর এ বক্তব্য ছিল তৎকালীন
সমাজের জন্য অভিনব ও বৈপ্লবিক।
প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনা: স্তর বিন্ন্যাস
শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্লেটো প্রধানত: দুভাগে ভাগ করেছেন, যথা:
(ক) প্রাথমিক শিক্ষা ও (খ) উচ্চতর শিক্ষা।
বয়স ভেদে এই স্তর দু’টিতে শিক্ষনীয় বিষয়গুলোও ভিন্নতর।
রাষ্ট্র মূলত: একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান প্লেটোই সর্বপ্রথম শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ব্যবধান না থাকার কথা > বলেছেন
(ক) প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষার সীমা হবে ২০ বৎসর বয়স পর্যন্ত। এ স্তর হবে
বাধ্যতামূলক। শৈশব থেকে এ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে এবং ১৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত
শিক্ষার্থীদেরকে কোন গুরুতর জ্ঞান দান করা হবে না, শুধুতাদের মানসিক বিকাশের সহায়ক
উপকরণ দেওয়া হবে। নৈতিকতা, উত্তম আচার আচরণ ইত্যাদির সাথে সাহিত্য, সঙ্গীত ও
সহজ গণিত শিক্ষাদান করা হবে। বলিষ্ঠ মন-মানসিকতা গঠনে সংগীত খুবই কার্যকর বলে
তিনি মনে করতেন। সঙ্গীত শব্দটি প্রচলিত অর্থেব্যবহৃত হতো না। কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত,
বাদ্য, নৃত্য এ সব কিছুই ছিল সঙ্গীতের অর্ন্তভুক্ত। তবে প্লেটো অবাধ সঙ্গীত শিক্ষার বিরোধী
ছিলেন। অর্থাৎ তিনি এক ধরনের ‘সেন্সরসীপ' এর কথা বলেছেন। যে সব কাব্যাংশে
দেবতাদের তুচ্ছ করা হয়েছে সে সব কাব্য পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিতে হবে। উপরন্তুআবেগ,
উল্লাস ও অসংযত মাত্রার সাহিত্য ও সংগীত যা শিক্ষার মননকে কলুষিত করতে পারে, তাও
বাদ দেওয়ার কথা প্লেটো অত্যন্তজোরের সাথে বলেছেন।
শিক্ষার্থীদের ১৮ বৎসর থেকে ২০ বৎসর পর্যন্তÑঅর্থাৎ দুই বৎসর শরীরচর্চা (এুসহধংঃরপং)
ও সামরিক কৌশল শিক্ষার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহকে সুস্থও সবল
করে গড়ে তোলা। ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার অপরিহার্যতা
সম্পর্কেপ্লেটো ছিলেন নিশ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তি লগ্নেএকটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
কৃতকার্যরা উচ্চতর শিক্ষার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন, আর যারা ব্যর্থহবেন, তারা
উৎপাদক শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবেন। সুতরাং প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষা সকলের জন্য
উন্মুক্ত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত।
(খ) উচ্চতর শিক্ষা: উচ্চ শিক্ষা আবার তিনটি স্তরে বিভক্ত। যথা:
(১) ২০ বৎসর বয়স থেকে ৩০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
(২) ৩০ বৎসর বয়স থেকে ৩৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
(৩) ৩৫ বৎসর বয়স থেকে ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
উচ্চ শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে পাঠ্য বিষয় হবে উচ্চতর গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতিষ শাস্ত্রও সঙ্গীত।
এই স্তরে বিষয়গুলো যতœসহকারে অনুশীলিত হবে।
উচ্চশিক্ষার দ্বিতীয় স্তরের মূল পাঠ্য বিষয় হবে উচ্চতর দর্শন। এ পর্যায়ে দর্শন শিক্ষার মাধ্যমে
শিক্ষার্থীগণ উত্তম সম্পর্কেজানার সুযোগ পাবেন এবং সে সাথে বিভিন্নজ্ঞানের মধ্যকার
ঐক্যসূত্র উপলব্ধি করতে পারবেন। উচ্চ শিক্ষার চূড়ান্তবা তৃতীয় পর্যায়ে বাস্তব অবস্থার সংগে
জ্ঞানের সংযোগ স্থাপন করা হবে। সে অর্থেদ্বিতীয় পর্যায়েই শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ
হয়ে যাবে। এ পর্যায়ের বাছাই প্রক্রিয়ায় যারা বাদ পড়বেন তারা অপেক্ষাকৃত নি¤œমানের রাষ্ট্রীয়
পদে দায়িত্বপাবেন। যারা কৃতকার্যহবেন তাদের শিক্ষা প্রক্রিয়া চলবে ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
এ সময় তারা বাস্তব জ্ঞান লাভের সুযোগ পাবেন। শেষ পর্যায় পর্যন্তযাঁরা টিকে যাবেন তাঁরা
সর্বোত্তম বলে গণ্য হবেন এবং তাঁরা উত্তম জ্ঞান লাভ করেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে। আর
এ উত্তম জ্ঞানই হলো শাসক তথা ‘দার্শনিক রাজা' হওয়ার চূড়ান্তও একমাত্র যোগ্যতা। এদের
হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার অর্পিত হবে।
প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা নানা দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে:- ● স্যাবাইন, ওয়েপার প্রমুখ লেখকগণ মনে করেন প্লেটো তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের শ্রেণী পক্ষপাত দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল দার্শনিক শাসক তৈরী করা। রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার যদি কোন পরিকল্পনা তাঁর থাকতো তবে,
উৎপাদক শ্রেণী-তথা কৃষক, ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পীদের জন্য পাঠ্যবিষয় নির্ধারিত হতো। বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার জন্য প্লেটো সমালোচিত হয়েছেন। প্রাথমিক স্তর হবে বাধ্যতামূলক। সাহিত্য, সংগীত পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হবে উচ্চতর গণিত এবং উচ্চতর দর্শন উচ্চশিক্ষাস্তরে পাঠ্যক্রমভুক্ত হবে।
● অনেক সমালোচক প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনাকে সর্বাত্মকবাদী (ঞড়ঃধষরঃধৎরধহ) বলতে
চান। তাঁরা বলতে চান, প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনায় স্বতস্ফুর্ততার অভাব আছে।
উদ্দেশ্যবাদী শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে মুক্ত জ্ঞান চর্চার উপর বাঁধা স্বরূপ। শিক্ষা পরিকল্পনার
মাধ্যমে প্লেটো মানুষকে বিশেষ উদ্দেশ্যে যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করার প্রয়াস
দেখিয়েছেন। এটি সর্বাত্মকবাদের নামান্তর।
● নারী-পুরুষের জন্য অভিন্নশিক্ষা কার্যক্রমের পক্ষে বলার জন্য রক্ষণশীলরা প্লেটোকে
সমালোচনা করতে চান।
উপরোক্ত সমালোচনা সত্তে¡ও রাষ্ট্রেশিক্ষার গুরুত্বঅনুধাবন, বাধ্যতামূলক ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা
ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, পাঠ্যক্রমের মধ্যে বাস্তব শিক্ষার সুযোগ দান ইত্যাদির জন্য এবং
সর্বোপরি নারী শিক্ষার স্বীকৃতির জন্য প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনা আজও সমাদৃত।
সারকথা
রাষ্ট্রের জন্য উৎকৃষ্ট শাসক ও দায়িত্বশীল নাগরিক এবং উপাদক শ্রেণী গড়ে তোলার জন্য
প্লেটো তাঁর কল্পিত আদর্শরাষ্ট্রের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার অবতারনা করেছিলেন। তিনি
তার শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত ও নারী শিক্ষায় সমান
সুযোগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এ পরিকল্পনার জন্য অনেকে ‘দি রিপাবলিক'কে একটি
শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থবলতে চান। সমালোচকেরা তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনাকে শ্রেণীপক্ষপাত
দোষে দুষ্ট এবং সর্বাত্মকবাদী বলে অভিহিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। প্লেটোর সময়ে এথেন্সের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য কোনটি ছিল?
(ক) নারী শিক্ষার স্বীকৃতি;
(খ) শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক;
(গ) শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত;
(ঘ) ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে শুধুপুরুষদের শিক্ষা গ্রহণ করার রীতি ছিল।
২। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ এবং শেষ স্তরের সময়কাল (বয়স ভিত্তিক) ছিল:-
(ক) ৪০ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর;
(খ) ৪৫ বৎসর থেকে ৫৫ বৎসর;
(গ) ৩০ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর;
(ঘ) ৩৫ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর।
সঠিক উত্তর : ১। ঘ ২। ঘ।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেফরাসী দার্শনিক রুশের মন্তব্য কি ছিল?
২। প্লেটো শিক্ষাকে কয়টি স্তরে ভাগ করেছেন?
৩। প্লেটোর মতে ব্যায়াম ও সঙ্গীত শিক্ষা কোন স্তরে অনুশীলীত হবে?
৪। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় নারীদের জন্য শিক্ষার দ্বার উম্মুক্ত ছিল কি?
৫। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা কি?
৬। কেন এবং কোন পর্যায়ে প্লেটো পাঠ্যবিষয়ে সেন্সরশীপের প্রস্তাব করেছেন?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনার বর্ণনা দিন। বর্তমান কালে তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনা কি
প্রয়োগযোগ্য?
২। সমালোচনাসহ প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার বর্ণনা দিন।
তাঁর কল্পিত আদর্শরাষ্ট্রের কর্মসূচীর মধ্যে শিক্ষা ও সাম্যবাদকে অধিকতর গুরুত্বদিয়েছিলেন।
রিপাবলিক এর মধ্যে শিক্ষার বিস্তৃত আলোচনা অবলোকন করে অনেকে ‘রিপাবলিক’ কে মূলত:
শিক্ষা সম্পর্কিত আলোচনার পুস্তক বলে মনে করতে চান। ফরাসী দার্শনিক রুশোর মতে
‘প্লেটোর রিপাবলিক কোন রাজনৈতিক গ্রন্থনয়, বরং শিক্ষা সম্পর্কেএ যাবৎ যত গ্রন্থলিখিত
হয়েছে তার মধ্যে এটি হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ।' প্লেটো খুব সঙ্গত কারণেই শিক্ষার উপর এতো
গুরুত্বারোপ করেছিলেন। প্লেটো শিক্ষাকে তৎকালীন প্রচলিত ধারণা তথা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত
উৎকর্ষতার মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষাকে তিনি সেই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের উপযুক্ত
মাধ্যম হিসাবেও মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানবাত্মার পূর্ণবিকাশ ঘটায়,
শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি সত্যকে বেছে নেয় এবং সামাজিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে খাপ খাওয়ায়।
তিনি আরও মনে করতেন, রাষ্ট্রপ্রধানত একটি শিক্ষামূলক সংগঠন। শিক্ষার সাহায্যেই
জনগণের চরিত্র ও প্রকৃতি গঠন করা যায়। শিক্ষা ব্যতীত একটি সুসামঞ্জস্য রাষ্ট্রগঠন সম্ভব
নয়। প্লেটোর এ বিশ্বাসের মূলে ছিল সম্ভবত সক্রেটিসের সেই অমর বানী,“সদগুণই জ্ঞান।”
প্লেটো বিশ্বাস করতেন শিক্ষার মাধ্যমে এ সদগুণ অর্জন করা যায়। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে
বার্কার মন্তব্য করেছেন, ‘প্লেটোর কাছে শিক্ষা মানসিক ওষুধ প্রদানের মাধ্যমে মানসিক রোগ
আরোগ্য করার এক প্রচেষ্টা বিশেষ।' তদুপরী তাঁর আদর্শরাষ্ট্রেশ্রেণী বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।
উপরোক্ত বিষয় বিবেচনার রেখে প্লেটো প্রথমত: সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন এথেন্সের
প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে এসেছেন। তখন সেখানে না ছিল সার্বজনীন শিক্ষা না
ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা। প্লেটো ভাবতেন, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত না হলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য
ব্যহত হয়। এক্ষেত্রে সম্ভবত: তিনি স্পার্টার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত
হয়েছিলেন। প্লেটোই সর্বপ্রথম শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ব্যবধান না থাকার কথা
বলেছেন। তাঁর মতে রাষ্ট্রেভ‚মিকা রাখার বেলায় নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।
তাই শিক্ষা হবে উভয়ের জন্য উন্মুক্ত ও অভিন্ন। বলাবাহুল্য, প্লেটোর এ বক্তব্য ছিল তৎকালীন
সমাজের জন্য অভিনব ও বৈপ্লবিক।
প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনা: স্তর বিন্ন্যাস
শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্লেটো প্রধানত: দুভাগে ভাগ করেছেন, যথা:
(ক) প্রাথমিক শিক্ষা ও (খ) উচ্চতর শিক্ষা।
বয়স ভেদে এই স্তর দু’টিতে শিক্ষনীয় বিষয়গুলোও ভিন্নতর।
রাষ্ট্র মূলত: একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান প্লেটোই সর্বপ্রথম শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ব্যবধান না থাকার কথা > বলেছেন
(ক) প্রাথমিক শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষার সীমা হবে ২০ বৎসর বয়স পর্যন্ত। এ স্তর হবে
বাধ্যতামূলক। শৈশব থেকে এ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে এবং ১৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত
শিক্ষার্থীদেরকে কোন গুরুতর জ্ঞান দান করা হবে না, শুধুতাদের মানসিক বিকাশের সহায়ক
উপকরণ দেওয়া হবে। নৈতিকতা, উত্তম আচার আচরণ ইত্যাদির সাথে সাহিত্য, সঙ্গীত ও
সহজ গণিত শিক্ষাদান করা হবে। বলিষ্ঠ মন-মানসিকতা গঠনে সংগীত খুবই কার্যকর বলে
তিনি মনে করতেন। সঙ্গীত শব্দটি প্রচলিত অর্থেব্যবহৃত হতো না। কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত,
বাদ্য, নৃত্য এ সব কিছুই ছিল সঙ্গীতের অর্ন্তভুক্ত। তবে প্লেটো অবাধ সঙ্গীত শিক্ষার বিরোধী
ছিলেন। অর্থাৎ তিনি এক ধরনের ‘সেন্সরসীপ' এর কথা বলেছেন। যে সব কাব্যাংশে
দেবতাদের তুচ্ছ করা হয়েছে সে সব কাব্য পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিতে হবে। উপরন্তুআবেগ,
উল্লাস ও অসংযত মাত্রার সাহিত্য ও সংগীত যা শিক্ষার মননকে কলুষিত করতে পারে, তাও
বাদ দেওয়ার কথা প্লেটো অত্যন্তজোরের সাথে বলেছেন।
শিক্ষার্থীদের ১৮ বৎসর থেকে ২০ বৎসর পর্যন্তÑঅর্থাৎ দুই বৎসর শরীরচর্চা (এুসহধংঃরপং)
ও সামরিক কৌশল শিক্ষার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দেহকে সুস্থও সবল
করে গড়ে তোলা। ব্যক্তিত্বের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার অপরিহার্যতা
সম্পর্কেপ্লেটো ছিলেন নিশ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তি লগ্নেএকটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
কৃতকার্যরা উচ্চতর শিক্ষার জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন, আর যারা ব্যর্থহবেন, তারা
উৎপাদক শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবেন। সুতরাং প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষা সকলের জন্য
উন্মুক্ত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত।
(খ) উচ্চতর শিক্ষা: উচ্চ শিক্ষা আবার তিনটি স্তরে বিভক্ত। যথা:
(১) ২০ বৎসর বয়স থেকে ৩০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
(২) ৩০ বৎসর বয়স থেকে ৩৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
(৩) ৩৫ বৎসর বয়স থেকে ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
উচ্চ শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে পাঠ্য বিষয় হবে উচ্চতর গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতিষ শাস্ত্রও সঙ্গীত।
এই স্তরে বিষয়গুলো যতœসহকারে অনুশীলিত হবে।
উচ্চশিক্ষার দ্বিতীয় স্তরের মূল পাঠ্য বিষয় হবে উচ্চতর দর্শন। এ পর্যায়ে দর্শন শিক্ষার মাধ্যমে
শিক্ষার্থীগণ উত্তম সম্পর্কেজানার সুযোগ পাবেন এবং সে সাথে বিভিন্নজ্ঞানের মধ্যকার
ঐক্যসূত্র উপলব্ধি করতে পারবেন। উচ্চ শিক্ষার চূড়ান্তবা তৃতীয় পর্যায়ে বাস্তব অবস্থার সংগে
জ্ঞানের সংযোগ স্থাপন করা হবে। সে অর্থেদ্বিতীয় পর্যায়েই শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ
হয়ে যাবে। এ পর্যায়ের বাছাই প্রক্রিয়ায় যারা বাদ পড়বেন তারা অপেক্ষাকৃত নি¤œমানের রাষ্ট্রীয়
পদে দায়িত্বপাবেন। যারা কৃতকার্যহবেন তাদের শিক্ষা প্রক্রিয়া চলবে ৫০ বৎসর বয়স পর্যন্ত।
এ সময় তারা বাস্তব জ্ঞান লাভের সুযোগ পাবেন। শেষ পর্যায় পর্যন্তযাঁরা টিকে যাবেন তাঁরা
সর্বোত্তম বলে গণ্য হবেন এবং তাঁরা উত্তম জ্ঞান লাভ করেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে। আর
এ উত্তম জ্ঞানই হলো শাসক তথা ‘দার্শনিক রাজা' হওয়ার চূড়ান্তও একমাত্র যোগ্যতা। এদের
হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার অর্পিত হবে।
প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা নানা দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে:- ● স্যাবাইন, ওয়েপার প্রমুখ লেখকগণ মনে করেন প্লেটো তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের শ্রেণী পক্ষপাত দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল দার্শনিক শাসক তৈরী করা। রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার যদি কোন পরিকল্পনা তাঁর থাকতো তবে,
উৎপাদক শ্রেণী-তথা কৃষক, ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পীদের জন্য পাঠ্যবিষয় নির্ধারিত হতো। বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার জন্য প্লেটো সমালোচিত হয়েছেন। প্রাথমিক স্তর হবে বাধ্যতামূলক। সাহিত্য, সংগীত পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হবে উচ্চতর গণিত এবং উচ্চতর দর্শন উচ্চশিক্ষাস্তরে পাঠ্যক্রমভুক্ত হবে।
● অনেক সমালোচক প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনাকে সর্বাত্মকবাদী (ঞড়ঃধষরঃধৎরধহ) বলতে
চান। তাঁরা বলতে চান, প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনায় স্বতস্ফুর্ততার অভাব আছে।
উদ্দেশ্যবাদী শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে মুক্ত জ্ঞান চর্চার উপর বাঁধা স্বরূপ। শিক্ষা পরিকল্পনার
মাধ্যমে প্লেটো মানুষকে বিশেষ উদ্দেশ্যে যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করার প্রয়াস
দেখিয়েছেন। এটি সর্বাত্মকবাদের নামান্তর।
● নারী-পুরুষের জন্য অভিন্নশিক্ষা কার্যক্রমের পক্ষে বলার জন্য রক্ষণশীলরা প্লেটোকে
সমালোচনা করতে চান।
উপরোক্ত সমালোচনা সত্তে¡ও রাষ্ট্রেশিক্ষার গুরুত্বঅনুধাবন, বাধ্যতামূলক ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা
ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, পাঠ্যক্রমের মধ্যে বাস্তব শিক্ষার সুযোগ দান ইত্যাদির জন্য এবং
সর্বোপরি নারী শিক্ষার স্বীকৃতির জন্য প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনা আজও সমাদৃত।
সারকথা
রাষ্ট্রের জন্য উৎকৃষ্ট শাসক ও দায়িত্বশীল নাগরিক এবং উপাদক শ্রেণী গড়ে তোলার জন্য
প্লেটো তাঁর কল্পিত আদর্শরাষ্ট্রের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার অবতারনা করেছিলেন। তিনি
তার শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণযুক্ত ও নারী শিক্ষায় সমান
সুযোগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার এ পরিকল্পনার জন্য অনেকে ‘দি রিপাবলিক'কে একটি
শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থবলতে চান। সমালোচকেরা তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনাকে শ্রেণীপক্ষপাত
দোষে দুষ্ট এবং সর্বাত্মকবাদী বলে অভিহিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন।
সঠিক উত্তরের পাশে টিক () চিহ্ন দিন।
১। প্লেটোর সময়ে এথেন্সের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য কোনটি ছিল?
(ক) নারী শিক্ষার স্বীকৃতি;
(খ) শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক;
(গ) শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত;
(ঘ) ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে শুধুপুরুষদের শিক্ষা গ্রহণ করার রীতি ছিল।
২। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ এবং শেষ স্তরের সময়কাল (বয়স ভিত্তিক) ছিল:-
(ক) ৪০ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর;
(খ) ৪৫ বৎসর থেকে ৫৫ বৎসর;
(গ) ৩০ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর;
(ঘ) ৩৫ বৎসর থেকে ৫০ বৎসর।
সঠিক উত্তর : ১। ঘ ২। ঘ।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেফরাসী দার্শনিক রুশের মন্তব্য কি ছিল?
২। প্লেটো শিক্ষাকে কয়টি স্তরে ভাগ করেছেন?
৩। প্লেটোর মতে ব্যায়াম ও সঙ্গীত শিক্ষা কোন স্তরে অনুশীলীত হবে?
৪। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় নারীদের জন্য শিক্ষার দ্বার উম্মুক্ত ছিল কি?
৫। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা কি?
৬। কেন এবং কোন পর্যায়ে প্লেটো পাঠ্যবিষয়ে সেন্সরশীপের প্রস্তাব করেছেন?
রচনামূলক প্রশ্ন
১। প্লেটোর শিক্ষা পরিকল্পনার বর্ণনা দিন। বর্তমান কালে তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনা কি
প্রয়োগযোগ্য?
২। সমালোচনাসহ প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার বর্ণনা দিন।