: সুগন্ধি বা সৌরভ আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় বস্তুগুলোর অন্যতম।

: আপনি ঠিকই বলেছেন যে সুগন্ধি বা perfume নবী করীম সল্লাল্লাহু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় ছিলো। তিনি শুধু সুগন্ধির প্রতি আকৃষ্টই ছিলেন না, বরং তিনি নিজেই ছিলেন সুগন্ধির উৎস। বস্তুত সুগন্ধি না লাগালেও নবী করীম সল্লাল্লাহু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র শরীর থেকে সর্বদা সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়তো। বাস্তবিকপক্ষে সুগন্ধিকে 'আত্মার রোগ নিরাময়ে' যথাযথ ও সহায়ক ঔষুধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত রয়েছে। প্রথম হাদীসটি বর্ণনা করেন হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু । তিনি বর্ণনা করেন,

“তিনি কখনোও খুশবু প্রত্যাখ্যান করতেননা এবং তার জানামতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও খুশবু ফিরিয়ে দিতেননা।” (সহীহ আল বুখারী) ৩৭০

দ্বিতীয় হাদীসটি সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত রয়েছে। হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “কাউকে কোনো ফুল হাদিয়া (উপহার) দিলে সে যেনো তা প্রত্যাখান না করে । কেননা ঐ বস্তুটি ক্ষুদ্র ও হালকা হলেও তার সুঘ্রাণ উত্তম।” (সহীহ মুসলিম) ৩৭১ রায়হানের বাংলা নাম বাবুই তুলসী, আর ইউনানি নাম হচ্ছে ফারাজ মুশক । সুগন্ধি সম্পর্কে রায়হানের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'য়ালা সূরা আর-রাহমানে (৫৫:১২) উল্লেখ করেছেন,

وَالْحَبُّ ذُو الْعَصْفِ وَالرَّيْحَانُ )

এখানে রায়হানকে মিষ্টি সুগন্ধিযুক্ত গাছ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

রায়হান গাছ ও পাতা (Sweet basil )



তৃতীয় হাদীসটি বর্ণনা করেন হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু, যার ভাষা উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ। তিনি বলেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কাউকে যদি কিছু সুগন্ধি প্রদান করা হয় তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। কারণ সুগন্ধি দ্রব্য ওজনে অত্যন্ত হালকা এবং এতে উত্তম সৌরভ থাকে।” (আবূ দাউদ ও আন-নাসাঈ) ৩৭২

মনে করুন, কেউ আপনাকে আতর উপহার দিলেন, আপনি গ্রহণ করুন। আতরের ওজন তো বেশি নয়, এটি হালকা, পকেটে রাখা যায়।

চতুর্থ হাদীসটি বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি বলেন,

“আমি বিদায় হজ্জে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে নিজ হাতে ইহরাম বাঁধা ও খোলার সময় জারিরাহ নামক সুগন্ধি লাগিয়েছি।” (সহীহ আল বুখারী) ৩৭৩

হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমু'আর দিন গোসল করে এবং যতদূর সম্ভব পবিত্রতা হাসিল করে, আর তার নিজের তেল থেকে তেল ব্যবহার করে অথবা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে, এরপর (নামাযের) জন্য বের হয় এবং দুজন লোককে ফাঁক না করে, অতঃপর তার তকদীরে লিখিত পরিমাণ মোতাবেক নামায আদায় করে, আর ইমামের খুতবা দেয়ার সময় চুপ থাকে, তার সেই জুমু'আ হতে অন্য জুমু'আ পর্যন্ত সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” (সহীহ আল বুখারী) ৩৭৪

আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জুমু'আর দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির গোসল, মিসওয়াক এবং সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করা ওয়াজিব।" (সহীহ আল বুখারী) ৩৭৫

এ হাদীস আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে কোন কারণে যদি সপ্তাহের অন্যান্য দিনে গোসল করা সম্ভব নাও হয় এবং শরীরে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, তাহলে অন্তত প্রতি শুক্রবারে আমাদেরকে গোসল করতেই হবে। যেহেতু তদানীন্তন আরবরা মেষ চরিয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে জুমুআর নামাযে আসত এবং তাদের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হতো। এতে অন্য মুসল্লীদের কষ্ট হতো। তাই রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে গোসল করতে জরুরী তাগিদ দিয়েছিলেন।

কারো শরীরে দুর্গন্ধ হলে জুমু'আর দিন গোসল করা জরুরী হবে, অন্যথায় তা সুন্নাত। গোসল দেহকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং সতেজতা ও পবিত্রতার অনুভূতি সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়। ইবনে আবি শায়বা রহমাতুল্লাহ আলাইহি বর্ণনা করেন, “আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি সুগন্ধিদানি ছিলো, যার ভেতর কস্তুরি এবং কামিক নামক কালো রং-এর সুগন্ধিদ্রব্য মিশ্রিত ছিলো এবং তিনি এর দ্বারা নিজেকে সুগন্ধিযুক্ত করতেন।” (আবূ দাউদ ও শামায়েলে তিরমিযী) ৩৭৬

নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “এ পৃথিবীতে স্ত্রীলোক ও সুগন্ধি আমার নিকট অত্যন্ত প্রিয়, আর নামাযই হচ্ছে আমার চোখের প্রশান্তি বা শীতলতা।” (মুসনাদে আহমাদ ও আন-নাসাঈ) ৩৭৭



তিনি আরো বলেন, “সুঘ্রাণ হচ্ছে আত্মার খোরাক বা খাদ্য, আর আত্মা বা রূহ হচ্ছে সমাবেশকৃত সেনাবাহিনীসদৃশ।” (সহীহ আল বুখারী, ইবনুল কাইয়িম ও আস-সুয়ূতী) ৩৭৮