মর্মপীড়া, দুঃখ-বেদনা, বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতার চিকিৎসার ব্যাপারে আল্লাহর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী উপদেশ দিয়েছেন?

উত্তর : নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুঃখ-বেদনা, মনোকষ্ট, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচবার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। উদ্বেগ বা উদ্বিগ্নতা হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যা চলে যায়, আবার আসে। যেমন, অমুক ঘটনায় আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। প্রতিকার হলে উদ্বেগ তখন আর থাকেনা। কিন্তু দুঃখ-বেদনা, মনোকষ্ট এমন একটা অবস্থা যা প্রতিনিয়ত মানুষকে দংশন করে । কোনো ঘটনা যা অতীতে ঘটে গেছে বা ঘটনাটি অতীত হয়ে গেছে যার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা। যেমন কোনো শিশু আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে তার জন্য পিতা-মাতার যে অবস্থা হয়। কেউ যদি গুম হয়ে যায়? তখন তার স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের কী অবস্থা হয়? অনেকে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মানসিক পীড়া ও পেরেশানীতে প্রতিনিয়ত ভুগতে থাকে। যাহোক, নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কেউ যদি অত্যধিক পেরেশানীতে ভোগে, তাহলে তার শরীর পীড়িত হয়ে পড়বে।” (আবূ নুয়াইম) ৮৩৭ নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব মানসিক অসুস্থতা বা mental sickness থেকে দূরে থাকার জন্য সর্বদা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং আল্লাহর সাহায্য চেয়েছেন আরোগ্য লাভের জন্য ।

প্রশ্ন-৩০০ : দুঃখ-কষ্ট, বিষণ্ণতা, মনোবেদনা, দুশ্চিন্তা থেকে আরোগ্য লাভের জন্য নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কী করতেন? তিনি কি এ ব্যাপারে কোনো দু'য়া বর্ণনা করেছেন যা আমরা নিয়মিত পাঠ করতে পারি?


উত্তর : দুঃখ-কষ্ট, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিস্তা মানুষের বর্তমান অবস্থার উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি সর্বদা এসবে ভোগে, তাকে এমন কাজে নিয়োজিত থাকতে হবে, যাতে সে ঐসব চিন্তা ভুলে যায় বা ভুলে থাকতে পারে। ইমাম আস-সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যদি দুঃখ-কষ্ট তোমাদের কাউকে পেয়ে বসে, তখন তার উচিত তীর-ধনুক নিয়ে বের হয়ে যাওয়া।” (আস-সুয়ূতী) ৮৩৮



অর্থাৎ শিকারে যাওয়া। হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন দুঃখ- কষ্ট ও দুশ্চিন্তা নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আক্রমণ করতো অথবা কোনো জটিল সমস্যায় পড়তেন, তখন তিনি মাথা আকাশের দিকে উত্তোলন করে বলতেন, “সমস্ত গৌরব ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, যিনি মহান ও অতীব পবিত্র।” (আত-তিরমিযী) ৮৩৯



আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি



ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কোনো বান্দা যখন প্রচণ্ড দুঃখ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আক্রান্ত হয়ে বলে, “হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা আপনার বান্দা ও বান্দীর ছেলে। আমার যা কিছু আছে তা আপনারই হাতে। আপনার হুকুম আমার ব্যাপারে অবধারিত এবং আপনার ফয়সালার বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত যে আমি আপনার নিকট সেসব নামের উসীলায় প্রার্থনা করছি যার দ্বারা আপনি নিজের নামকরণ করেছেন অথবা তা আপনি আপনার কোনো বান্দাকে শিখিয়েছেন, অথবা আপনার কিতাবে নাযিল করেছেন, বা আপনি আপনার নিকট অদৃশ্যের জ্ঞান ভাণ্ডারে গোপন রেখেছেন। আপনি কুরআনকে আমার হৃদয়ের ঝরণা বানিয়ে দিন, একে আমার বুকের আলো করে দিন, আর একে আমার দুঃখ বিনাশকারী এবং আমার মর্মপীড়া, দুঃখ-কষ্ট নিবারণের উসীলা বানিয়ে দিন।" ৮৪০



হাদীসটি আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মুসনাদে এবং ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ-এ উদ্ধৃত করেছেন ।



এ দু'য়াটি যদি কেউ নিয়মিত পাঠ করেন তাহলে ইনশা'আল্লাহ তিনি সর্বপ্রকার মর্মপীড়া, মনোকষ্ট, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দুঃখ-বেদনা থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারবেন এবং আনন্দ লাভ করবেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “কেউ যদি এসব রোগে তথা দুঃখ-কষ্ট, বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতায় ভোগে, তাহলে তাকে নিয়মিত এ দু'য়া পাঠ করতে হবে।" (ইবনুল কাইয়িম) ৮৪১ “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজীম।”- “কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নেই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া, যিনি মহান ও সর্বশক্তিমান।”



ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেন যে এ দু'য়া জান্নাতের অলংকার বা ভাণ্ডার বিশেষ । ৮৪২



হযরত কায়েস ইবনে সা'দ ইবনে উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাঁকে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত করার জন্য পাঠান। তিনি (কায়েস) বলেন, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন আমি নামায পড়ে নিয়েছি। তিনি তাঁর পা দিয়ে আমাকে খোঁচা দিয়ে বললেন “আমি কি তোমাকে জান্নাতের দরজাসমূহ হতে একটি দরজার সন্ধান দিব না? আমি বললাম, অবশ্যই! রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম বললেন, “দরজাটি হলো, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” (আত-তিরমিযী) ৮৪৩



আসমা বিনতে উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন যে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি কি তোমাকে কিছু কালেমা বা এমন কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেবোনা যখন তুমি দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ও মর্মপীড়ায় পতিত হবে, তখন তা পাঠ করবে, “আল্লাহু, আল্লাহু রাব্বী, লা উশরিকু বিহি শাঈয়ান।”- “আল্লাহ, আল্লাহই আমার প্রভু, যাঁর সাথে আমি কাউকে বা কোনো কিছুকে শরীক করিনা।” (মুসনাদে আহমাদ, আবূ দাউদ ও আত-তিরমিযী) ৮৪৪



ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মুসনাদে উল্লেখ করেছেন, "যখন কোনো ভয়ানক বা গুরুতর বিষয় নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুঃখ-কষ্ট বা পেরেশানিতে



ফেলতো, তখন তিনি নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাইতেন।” (মুসনাদে আহমাদ) ৮৪৫



আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেছেন,



وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوة



“ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো।” (আল বাকারাহ ২:৪৫ )



আবূ দাউদ শরীফে উদ্ধৃত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন, "নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখন নামাযে মশগুল হয়ে যেতেন।” (আবূ দাউদ) ৮৪৬



বস্তুত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রার্থনার শব্দগুলো ছিলো, “হে চিরস্থায়ী, হে চিরঞ্জীব! সর্বসত্তার ধারক! আমি আপনার করুণা ও রহমত থেকে সাহায্য কামনা করছি।” (আত-তিরমিযী) ৮৪৭



এই কথাগুলো মানুষের দুঃখ-কষ্ট, মর্মপীড়া দূর করতে অত্যন্ত উপকারী ।