আর্তমানবতার সেবা অর্থাৎ রোগীর সেবার ক্ষেত্রে ইসলামের মহান নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও নির্দেশনা কী ছিলো?

সম্মানিত দর্শক-শ্রোতা! মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন গোটা পৃথিবীর সকল সৃষ্টজীবের প্রতি রহমতস্বরূপ। বিশেষ করে রোগীর প্রতি তাঁর আচার-আচরণ, মমত্ববোধ, ভালোবাসা ও অফুরন্ত রহমতের অনন্য ধারায় সিঞ্চিত ছিলো। তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য যে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন, তার প্রতিটি পরতে পরতে প্রবাহিত হয়েছে অনন্ত রহমতের ফল্গুধারা। তাই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য জীবনের পাশাপাশি আর্ত-মানবতার সেবার ক্ষেত্রেও তিনি অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন, অতুলনীয় ও অনুসরণীয়। মানব ইতিহাসে এমন ব্যক্তি বা নেতা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা যিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে পুরোপরি বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজে রোগীর সেবায় নিঃস্বার্থভাবে অত্যন্ত দরদ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন এবং তাঁর অনুসারীদেরকেও রোগী-সেবার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বলেছেন। আর্ত-পীড়িতের সেবা-শুশ্রূষার কাজ যে কতো মহৎ এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনামূলক বেশ কিছু বক্তব্য তিনি রেখেছেন। তিনি রোগী- সেবার অসংখ্য ফযীলতের কথাও বলেছেন এবং প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয়েও তিনি বিশেষ নজর রাখতেন । হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক্ব রয়েছে। (সেগুলো হলো) সালামের জবাব দেয়া, রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করা, জানাযায় অংশগ্রহণ করা, দাওয়াত কবূল করা ও হাঁচিদাতার হাঁচির জবাব দেয়া অর্থাৎ হাঁচিদাতা 'আলহামদু লিল্লাহ' বললে তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা ।” (সহীহ আল বুখারী ও ইবনে মাজাহ্) ৬৬

অন্যদিকে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত এ সংক্রান্ত হাদীসে ছয়টি হক বা সদ্ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। শেষোক্ত হকটি হচ্ছে, “নিজের জন্য যা পছন্দ করবে অন্যের জন্যও তাই পছন্দ করবে।" (আত তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ্) ৬৭

হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা ক্ষুধার্তকে আহার করাও, রোগীর সেবা করো এবং বন্দিকে মুক্ত করো ।" (সহীহ আল বুখারী) হযরত বারা ইবনে 'আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাতটি বিষয়ে আদেশ করেছেন আর সাতটি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদের রুগ্ন ব্যক্তির দেখাশুনা করা, জানাযার সাথে গমন করা, হাঁচিদাতার বক্তব্যের জবাব দেয়া, শপথ পূর্ণ করা বা কসমকারীর কসম পূর্ণ করা, অত্যাচারিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা, দাওয়াতকারীর দাওয়াত কবুল করা এবং সালাম কালামের প্রসার করার আদেশ দিয়েছেন। আর তিনি আমাদেরকে সোনার আংটি ব্যবহার করা, রূপার পাত্রে পান করা, মায়সির (এক প্রকার রেশমী কাপড়) ও কাস্সী (রেশম মিশানো এক প্রকার মিসরী কাপড়) পরিধান করা এবং মিহি, মোটা ও কারুকার্যখচিত রেশমি কাপড় ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।” (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম) ৬৯

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে “নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিন পর রোগীকে দেখতে যেতেন।" (ইবনে মাজাহ) ৭০

কেউ অসুস্থ হলে তার আপনজনদের সর্বপ্রথম কাজ হলো তাকে চিকিৎসকের নিকট নিয়ে যাওয়া। আর চিকিৎসকের প্রথম কর্তব্য হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জরুরী ভিত্তিতে ওষুধপত্র দিয়ে রোগ প্রশমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা, যাতে রোগী সংকটমুক্ত থাকে। এসময়ে চিকিৎসক বা নার্স ব্যতীত অন্য কারো উপস্থিতি সাধারণত কাম্য নয়। কারণ অসুস্থ ব্যক্তির নিকট চিকিৎসক বা সেবা শুশ্রূষাকারী ছাড়া আর কারো উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ নয় । সম্ববত এ কারণেই নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিন পর রোগী দেখতে যেতেন যখন রোগীর অবস্থা উন্নতি ঘটে বা স্থিতিশীল থাকে এবং দর্শনকারীদের সাক্ষাৎ রোগীর জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয় ।

নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-দরিদ্র, বন্ধু-শত্রু, আবাল বৃদ্ধ-বণিতা সর্বশ্রেণীর আর্তের সেবায় আন্তরিকভাবে এগিয়ে এসেছেন। তাঁর শত্রুর অসুস্থতাতেও তিনি তার শুশ্রূষা করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। আর এজন্যই তিনি 'রহমাতুল্লিল আলামীন' খেতাবের সার্থকতায় উদ্ভাসিত হতে পেরেছেন তৎকালীন সমাজে ।