কাঁচা পেঁপের উপকারিতা ও অপকারিতা শরীরে পুষ্টি বাড়াতে নিয়মিত খান পাকা পেঁপে | Eat ripe papaya regularly to increase nutrition in the body.

পেঁপে খান : পুষ্টি বাড়ান

কাজী কেয়া

পেঁপে সুস্বাদু ও রসালো ফল। আমরা পেঁপের তেমন কদর করি না কিন্তু এই ফলটি অত্যন্ত উপকারী ফল। সকল মওসুমেই পেঁপে পাওয়া যায়। এ ছাড়া এদেশীয় ফল- ফলাদির মধ্যে পেঁপে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। কাঁচা অবস্থায় এটি যেমন একটি উৎকৃষ্ট সবৃজি তেমনি পাকা পেঁপেও একটি সুস্বাদু ও উপাদেয় ফল। কাঁচা পেঁপের তরকারী যেমন সহজে হজম হয়, তেমনি প্রোটিন জাতীয় খাদ্য, যেমন গোশ্ত সহজে সুসিদ্ধ করতে কাঁচা পেঁপে বা পেঁপের আঠা সাহায্য করে। গোশ্ত যখন সহজে সিদ্ধ হতে চায় না তখন ঐ গোশতের মধ্যে কয়েক টুকরো কাঁচা পেঁপে বা কয়েক ফোটা পেঁপের কষ দিয়ে সেটি রান্না করলে তা সিদ্ধ হয় এবং সুস্বাদু হয়। এটা কেন হয় সেটা আমরা অনেকেই জানি না। কাঁচা পেঁপে বা পেঁপের গাছে বিভিন্ন অংশে এক ধরনের সাদা দুধের মতো রস বের হয়। ঐ রসের মধ্যে (পেপেইন) নামক এক প্রকার পদার্থ থাকে, ঐ পদার্থের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে গোস্ত সুসিদ্ধ হয়, একে জারক রসও বলে। এই পেপেইন প্রোটিন জাতীয় খাদ্যকে জীর্ণ করার কাজে সহায়তা করে। কাজেই কয়েক টুকরো পেঁপে বা পেঁপের কষ ঐ শক্ত গোশ্ত সহজে সিদ্ধ করে দেয় এবং গোশ্ত হজমেরও উপযোগী করে তোলে। তাই আমরা যদি কোনও প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন মাছ, ডাল, গোশত, সব্জি প্রভৃতি খেয়ে অসুবিধা বোধ করি বা পেট কামড়ানো শুরু হয় তখন হাতের কাছে কাঁচা পেঁপে থাকলে তার কষ বের করে চিনি দিয়ে মিশিয়ে খেয়ে নিলেই উপশম হবে। আরও বেশি উপকার পাওয়া যায় যদি এর সঙ্গে আদার রস মিশিয়ে নেয়া যায়। আমাদের প্রোটিন খাবার হজম করতে যে এনজাইমটি সাহায্য করে সেটি হচ্ছে পেপসিন। তাই পেপেইন এনজাইমটির কাজ করে থাকে। কাঁচা পেঁপের আরো কিছু গুণাগুণ বা উপকারিতার কথা বলবো। আমাদের দেশের কবিরাজরা বলেন, অজীর্ণ ও রক্তশূন্যতায় কাঁচা পেঁপে অত্যন্ত উপকারী ফল বা সব্জি। পেঁপের আঠা কৃমিনাশক ও রক্ত শোধনকারী। অন্যদিকে ফল হিসেবেও অত্যন্ত সুস্বাদু ফল এবং ঠাণ্ডা ফল। পেটের যে কোন অসুবিধা বা পাতলা পায়খানা, পেট গরম, লিভার কমপ্লেক্স প্রভৃতি রোগের উপশম ঘটায়।

তাই আমাদের প্রতিদিনের তরকারির কিছু অংশ পেঁপে বা বিকালের ও সকালের নাস্তার সঙ্গে কিছু পাকা পেঁপে রাখা উচিত।



পাকা পেঁপে আজকাল আর কমদামী ফল নয়। তবে আপেল বা আঙুরের তুলনায় এর দাম অনেক কম। আমরা বাড়ির আশেপাশে যদি কিছু খোলা জায়গাতে কয়েকটি পেঁপে গাছ রোপণ করি তাহলে এক বছরের মধ্যে প্রচুর ফল পাবো। আমাদের জলবায়ু পেঁপে চাষের জন্য অতি উপযোগী। তবে একটা কথা, যেখানে আলো-বাতাস লাগে ঠিক তেমন জায়গায় পেঁপে পাওয়া যাবে। পেঁপে গাছে তেমন পানির প্রয়োজন হয় না। যে মাটি উর্বর অর্থাৎ দো- আঁশ ও পলি মাটি সেখানেই পেঁপে গাছ রোপণ করার নিয়ম । তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনও অবস্থায় গোড়ায় পানি না জমে, তাহলে গাছের গোড়া পচে গাছ মরে যাওয়ায় সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেশে লম্বা ও খাটো দু'জাতের পেঁপের চাষ হয়। লম্বা জাতের পেঁপের গাছগুলো বেশ লম্বা হয় ও ৫/৭ বছর ফল দেয়। খাটো গাছে ২/৩ বছর ফল হয়ে মারা যায়।
চারা লাগাবার সময়

পেঁপের চারা সারা বছরই লাগানো যায়। তবে বর্ষার সময় লাগালে পানি দেয়ার প্রয়োজন হয় না। পেঁপে গাছে প্রচুর পরিমাণে জৈব সারের প্রয়োজন হয়। তাই চারা লাগানোর আগে গোবর, আবর্জনা পচা সার, খৈল, টিএসপি ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হয়। পেঁপে ধরা শুরু হলে প্রতি গাছে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ২৫০ গ্রাম টিএসপি সার দেবেন। এক বছরের গাছে ফল ধরা শুরু করে এবং তিন মাসের মধ্যে ফল পেকে যায়।

পেঁপে থেকে বিবিধ খাবার প্রস্তুত করা যায়। সবজি হিসেবে পেঁপে আমাদের প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে পারে। এ ছাড়া মোরব্বা, চাটনি, হালুয়া, মিষ্টি, সেমাই প্রভৃতি মুখরোচক খাবারও তৈরি করা যায়। এক কথায় খাদ্যপুষ্টির জন্য পেঁপে অতুলনীয়। এটি পুষ্টিহীনতা ও অন্ধত্ব রোধ করে। তাই সকলের উচিত পেঁপের তরকারি ও পেঁপে দ্বারা বিভিন্ন খাবার তৈরি করে পুষ্টি বাড়ানো।

পেঁপের সেমাই

পেঁপেকে কুরানী দ্বারা বা মেশিন দ্বারা সরু সরু সেমাইয়ের মতো কুচিয়ে নিন পরে ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরতে দিন। উনুনে কড়াই চাপিয়ে আন্দাজমত পানি দিয়ে চিনি ঢালুন এবং নাড়তে থাকুন, নাড়তে নাড়তে যখন চিনি রস রসগোল্লার রসের মতো হয়ে আসবে, তখন পেঁপে কোঁচানোটা ঢেলে দিন এবং আধা ঘন্টা সিদ্ধ করুন, পরে এলাচ ও গোলাপ জল দিয়ে নারিয়ে নিন। ঠাণ্ডা হলে তা পরিবেশন করুন।

পেঁপের চাটনি

পেঁপেকে সিদ্ধ করে নিন এবং তা ছিলে বেটে নিন। এরপর উনুনে কড়াই চাপিয়ে পরিমাণমতো তেল ঢালুন। কাঁচা পিঁয়াজ কুটা ও কাঁচা মরিচ দু'একটা, সামান্য জিরে বাটা, হলুদ ও আদা বাটা দিয়ে ভালো করে ভেজে নিন। পরে বাটা পেঁপে ঢেলে দিয়ে সামান্য পানি দিন। পরে ভালো করে ফুটে গেলে রসুন কুচা ও লবণ ছড়িয়ে দিন। তারপর নাড়তে নাড়তে ঘন হয়ে এলে নামিয়ে নিন ও ধনে গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। এটা খুবই মুখরোচক খাবার।