জি হ্যাঁ, আছে। নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হচ্ছে প্রস্রাব-পায়খানার পর প্রথমে ঢিলা ব্যবহার করা এবং অতঃপর পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্রতা অর্জন করা। কোনো স্বাস্থ্য সচেতন লোক নিজের মলমূত্র নিজহাতে স্পর্শ করেনা। এটি রুচি বিরোধী ও অত্যন্ত অপবিত্র কাজ। এটি স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। কারণ মলমূত্র থেকে অনেক জীবাণু হাতের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে সংক্রমিত হতে পারে। তাই নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সম্পর্কিত সুন্নাতগুলো পুরোপুরি আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানসম্মত। এ বিষয়ে আমি বেশ কয়েকটি হাদীস আলোচনায় আনবো যা থেকে পরিষ্কারভাবে জানা যাবে যে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কী কী কাজ নিষেধ করেছেন। আর কী কী অভ্যাস চালু রাখতে বলেছেন ।
নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র ইস্তিনজা বা শৌচকার্য সম্পাদনের জন্য বেশ কয়েকটি বক্তব্য রেখেছেন যা হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “ইস্তিনজা করার সময় ডানহাত ব্যবহার করবেনা এবং কোনো বরতন বা পাত্রে মলমূত্র ত্যাগ করবেনা।” (আবূ দাউদ ও আন-নাসাঈ) ১৯০
সহীহ আল বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হাদীস দুটো বর্ণনা করেছেন হযরত আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু । (সহীহ আল বুখারী) ১৯১
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবার লোকদের বললেন, আল্লাহ্ তোমাদের পবিত্রতার খুবই প্রশংসা করেছেন। তিনি কুবার লোকদের নিকট জানতে চাইলেন, এর রহস্য কী? তারা উত্তর দিলেন, আমরা ঢিলা ও পানি উভয়টি দ্বারাই পবিত্রতা অর্জন করি।” (মুসনাদে আহ্মাদ ও আবূ দাউদ ) ১৯২
১৯৩
দ্বিতীয় হাদীসটি হচ্ছে, “ইস্তিনজার পর পবিত্রতা লাভের জন্য বাম হাত ব্যবহার করবে।” (আবূ দাউদ) তৃতীয় হাদীসটি হচ্ছে, “পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের আগে ঢিলা ব্যবহার করবে।” (আবূ দাউদ ও আন-নাসাঈ) : ঢিলা বলতে মাটির টুকরাকে বোঝানো হয়েছে। বর্তমানে এর স্থান দখল করেছে টিস্যু পেপার। এ সম্পর্কিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীসমূহ প্রত্যেক হাদীস গ্রন্থের 'কিতাবুত
তহারাত' অধ্যায়ের ইস্তেনজা পরিচ্ছেদে বিশদভাবে উদ্ধৃত হয়েছে ।
প্রিয় দর্শকবৃন্দ! যে সকল লোক মলত্যাগের পর পানি দ্বারা শৌচকার্য করেনা বা শুধুমাত্র কাগজ ব্যবহার করে, তাদের বেশ কয়েক ধরনের রোগ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন, মলদ্বারের আশপাশে ফোঁড়া এবং গোদের মধ্যে পুঁজ, যা প্রস্রাবের সময় বের হয়ে আসে। তাই পানি দ্বারা মলমূত্র ত্যাগের স্থানসমূহ পরিষ্কার করার আগে কোনো ঢিলা বা টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে নেয়া উচিত। তবে গোবরের ঢিলা ব্যবহার করতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।
হযরত আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, “আপনাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি বিষয় আপনাদের শিক্ষা দিয়েছেন; এমনকি পায়খানা-পেশাবের শিষ্টাচার পর্যন্ত। সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হ্যাঁ, তিনি আমাদের কিবলামুখী হয়ে পায়খানা-পেশাব করতে, মল ত্যাগের পর ডানহাত দিয়ে ইস্তিনজা (মল ত্যাগের জায়গা পরিষ্কার করা ও পবিত্রতা অর্জন করা) করতে নিষেধ করেছেন। তিনি কাউকে তিনটি ঢিলার কম দিয়ে ইস্তিনজা করতে এবং শুকনো গোবর অথবা হাড় দিয়ে ইস্তিনজা করতে নিষেধ করেছেন।” (আত-তিরমিযী ও আন নাসাঈ) ১৯৪
আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেনো পানি পান করার সময় পাত্রে নিশ্বাস না ফেলে। আর পায়খানায় এসে কেউ যেনো ডানহাত দ্বারা পুরুষাঙ্গ স্পর্শ না করে এবং সে যেনো ডানহাত দ্বারা শৌচক্রিয়া না করে।” (সহীহ আল বুখারী) ১৯৫
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুও এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা শুকনো গোবর আর হাড় দিয়ে ইস্তিনজা করবেনা।” (আত-তিরমিযী ও আন-নাসাঈ) ১৯৬
এ বিষয়ে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডানহাত ছিলো খাদ্য গ্রহণ ও পবিত্রতা অর্জনের জন্যে, আর বামহাত ছিলো শৌচকর্ম ও এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজের জন্য।” (আবূ দাউদ) ১৯৭
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচ করার পর মাটিতে তাঁর হাত ঘষে পরিষ্কার করতেন এবং উযূ করতেন।” (আন-নাসাঈ) ১৯৮
হযরত জারীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। তিনি একদা পায়াখানায় গেলেন এবং প্রয়োজন সমাধা করে বলেন, “হে জারীর! পানি আনো। অতএব আমি তাঁকে পানি এনে দিলাম। তিনি পানি দিয়ে শৌচকার্য করেন এবং পরে পানি দিয়ে হাত মাটিতে ঘষেন।” (আন-নাসাঈ) ১৯৯
হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমি তোমাদের পিতৃতুল্য । আমি তোমাদের দ্বীনের বিষয়সমূহ শিক্ষা দেই। যখন কেউ টয়লেটে যায়,
সে যেনো কিছুতেই কিবলামুখী হয়ে বা কিবলাকে পেছনের দিকে রেখে না বসে। আর মলত্যাগের পর উক্ত স্থান যেনো ডানহাত দিয়ে পরিষ্কার না করে ।” (আবূ দাউদ ও আন-নাসাঈ) 200
ঠিক এমনি একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন হযরত আবূ আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা কেউই কিবলামুখী হয়ে বা কিবলা পেছনে রেখে মলমূত্র ত্যাগ করবেনা।” (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও আন-নাসাঈ) ২০১
আবূ আইয়ূব আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন, “আমরা যখন সিরিয়ায় এলাম তখন দেখতে পেলাম সেখানকার টয়লেটগুলো কিবলামুখী করে নির্মাণ করা হয়েছে। তখন আমরা আমাদের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিই এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।” (সহীহ মুসলিম ও আবূ দাউদ)
আব্দুল্লাহ ইবনে সারজিস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো গর্তে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন।” (আবূ দাউদ ও আন-নাসাঈ) ২০৩
এর সম্ভাব্য কারণ গর্তে সাপ বা বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ থাকতে পারে যা বের হয়ে কামড় দিতে পারে । অপরদিকে দুর্বল কীট-পতঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হাদীসগুলো সবই যৌক্তিক ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যশীল।