রোমীয়দের গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ

মাক্কাবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে উঠা নৈতিক ও দ্বীনি স্প্রীটও আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে। আবার বনী ইসরাঈলীদের ঘাড়ে দুনিয়ার পূজা ও প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতা সওয়ার হতে থাকে। এর ফলে ইহুদীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হলো। তারা নিজেরাই অগ্রগামী হয়ে রোমক বিজয়ী পোম্পিকে ফিলিস্তিনে আসার আহবান জানালো। তাদের আহবানে পোম্পি খৃষ্টপূর্ব ৬৩ সালে এ দেশের দিকে মনোযোগ দিলো। বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে ইহুদী বসতি ধ্বংস করে দিলো।
রোমীয় শাসকরা এ দেশকে সরাসরি শাসন না করে কারো দ্বারা পরোক্ষভাবে শাসন করার নীতি অবলম্বন করলো। আর এ নীতি অনুযায়ী তারা ফিলিস্তিনকে একটি করদ রাজ্যে পরিণত করে তা হিরোদ আযম নামে একজন বিচক্ষণ ইহুদী এজেন্টকে শাসক নিয়োগ করলো। তার শাসন কালে এ ইহুদী রিয়াসাত গোটা ফিলিস্তিন ও পূর্ব উর্দুন পর্যন্ত কায়েম ছিলো। তার সময় ইহুদী জাতির চরিত্র অবনতির শেষ সীমায় পৌছে যায় ৷
'হিরোদের' পরে এ সালতানাত তার তিন ছেলে 'আরখালাউস' ‘হিরোদান্টিপাস' এবং ফালপের মধ্যে বণ্টিত হয়। আরখালাউস খুব তাড়াতাড়ি তার রাজ্য হতে পদচ্যুত হয়। তার রাজ্য রোমকরা তাদের এ গভর্নর দ্বারা পরিচালনা করলো। হিরোদ ‘গালিল' ও পূর্ব উর্দুনেরও মালিক ছিলো। সে একজন নর্তকীর হুকুমে হযরত ইয়াহইয়ার মাথা কেটে তাকে নযরানা দিলো ।
তার তৃতীয় ছেলে ফালপ পিতা ও ভাইয়ের চেয়েও অধিক রোমক কৃষ্টি কালচারের প্রতি আকর্ষিত ছিলো। তার শাসনামলে কোনো নৈতিক ও ধর্মীয় কল্যাণের আশাই করা যেতো না। হিরোদে আযমের পুতিকে রোমকরা এসব এলাকার শাসন ক্ষমতা দান করে দিলো । শাসন ক্ষমতা লাভের বিনিময়ও সে রোমকদেরকে আদায় করে দিয়েছিলো। এ ব্যক্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের উপর চরম সীমার অত্যাচার চালিয়েছিলো। হযরত ঈসার ইসলামী আন্দোলন প্রতিহত করার কোনো চেষ্টা সে বাকী রাখেনি।

রোমকদের হাতে ইহুদী নির্যাতন

এর কিছুদিন পরই রোমক আর ইহুদীদের মধ্যে কঠিন দ্বন্দ্ব সংগ্রাম লেগে গেলো। ৬৪ খৃস্টাব্দ হতে ৬৬ খৃস্টাব্দের মধ্যে ইহুদীরা রোমকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে বসলো । তাদেরকে দমন করার জন্য রোমক বাদশাহ 'টিটাস' সামরিক কার্যক্রম শুরু করে ইয়ারদশালম জয় করে ফেললো। এ সময় সে ব্যাপকহারে হত্যার হুকুম দিয়ে দিলো। এ হত্যাকাণ্ডে ১ লাখ ৩৩ হাজার ইয়াহুদী নিহত হয়। ৬৭ হাজার লোককে বন্দী হয়ে গোলামী জীবন বরণ করতে হয় ৷ হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করে বাধ্যাতামূলক শ্রম শিবিরে পাঠিয়ে দেয়। হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেয়। হুকুম দিয়ে দেয় তাদেরকে যেনো ইম্পিথিয়েটারে বন্য জানোয়ারের সাথে রাখা হয়। সব সুন্দরী মেয়েদেরকে বিজয়ীরা তাদের জন্য রেখে দেয়। ইয়ারদশালম শহর হায়কেলে সোলায়মানিকে ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় । এভাবে ফিলিস্তিনে ইয়াহুদীদের প্রভাব প্রতিপত্তি মিসমার করে দিলো। এরপর দুই হাজার বছর পর্যন্ত তারা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। কায়সারে হেডরিয়ারের সময় এ শহরকে আবার আবাদ করা হলো। এ সময় এর নাম ছিলো ‘ইলিয়া’। এ শহরে অনেকদিন পর্যন্ত ইহুদীদের প্রবেশ অধিকার ছিলো না ।
এরপর এ আধুনিক যুগে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ ও রাষ্ট্র কায়েমের যে সুযোগ পেলো তা পরিপূর্ণভাবে বৃটিশ আমেরিকা ও রাশিয়ার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে সম্ভব হয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আবার ইসরাঈলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের সুদূর প্রসারী এক ষড়যন্ত্র ও
চক্রান্তের ফসল ৷
হযরত মূসা আলাইহিস সালামের পরে ইহুদীদের ইতিহাসে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার দিকে ইংগিত দিয়েই কুরআন বলছে ঃ
وَقَضَيْنَا إِلَى بَنِي إِسْرَاءِ يْلَ فِي الْكِتُبِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ وَلَتَعْلُنَّ عُلُوًّا كَبِيرًا فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ أُولَهُمَا بَعَثْنَا عَلَيْكُمْ عِبَادًا لَّنَا أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ فَجَاسُوا خِللَ الدِّيَارِ ، وَكَانَ وَعْدًا مَفْعُولاً ثُمَّ رَدَدْنَا لَكُمُ الْكَرَّةَ عَلَيْهِمْ وَامدَدْنَكُم بأموال وبنين وجَعَلْنَكُمْ أكثرَ نَفِيرًا إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنتُمْ لانْفُسِكُمْ قد وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا ، فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ الآخِرَةِ لِيَسُوءًا وُجُوهَكُمْ وَلِيَدْخُلُوا الْمَسْجِدِ كَمَا دَخَلُوهُ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَلِيُتَبَرُوا مَا عَلَوْا تَثْبِيرًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُرْحَمَكُمْ ، وَإِنْ عُدتُم عُدْنَا ، وَجَعَلْنَا جَهَنَّمَ لِلْكَفِرِينَ حَصِيرًا
“অতপর আমি আমার কিতাবে বনী ইসরাঈলকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, তোমরা দুই দুইবার এ দুনিয়ার বুকে বড় মহা বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। বড় বেশী বিদ্রোহী কাজ করবে। অবশেষে যখন প্রথম বিদ্রোহের সময় উপস্থিত হলো তখন হে বনী ইসরাঈলীরা! আমি তোমাদের মুকাবিলায় আমার এমন বান্দাদেরকে সংগঠিত করে পাঠিয়েছি যারা খুবই শক্তিশালী ছিলো। তারা তোমাদের দেশে প্রবেশ করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এটা ছিলো একটা ওয়াদা যা অবশ্যই পূর্ণ হতো। এরপর আমি তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয় লাভ করার সুযোগ করে দিয়েছি । এবং তোমাদেরকে ধন-সম্পদ সন্তান সন্ততি দিয়ে সাহায্য করেছি। তোমাদের সংখ্যা আগের চেয়েও বেশী বাড়িয়ে দিয়েছি । দেখো তোমরা যদি ভালো কাজ করে থাকো তাহলে তা ছিলো তোমাদের জন্যই কল্যাণকর। আর যদি খারাপ কাজ করে থাকো তা হলে তা তোমাদের জন্যই অনিষ্টকর প্রমাণিত হয়েছে। তারপর যখন দ্বিতীয়বারের ওয়াদার সময় এলো তখন অন্য দুশমনদেরকে তোমাদের উপর বিজয়ী করলাম । তারা যেনো তোমাদের স্বরূপই বিগড়িয়ে দেয়। এবং বায়তুল মোকাদ্দাসের মসজিদে এমনভাবে ঢুকে পড়ে যেভাবে প্রথমবার দুশমনরা ঢুকে পড়েছিলো। যে জিনিসের উপর তাদের হাত পড়বে তা ধ্বংস করে ছাড়বে। হতে পারে তোমাদের রব এখন তোমাদের উপর রহম করবেন। কিন্তু যদি তোমরা তোমাদের আগের আচার-আচরণ আবার শুরু করো তাহলে আমিও তোমাদের প্রতি আমার শাস্তির বিধান আবার শুরু করবো। আর কাফেরদের জন্য আমি জাহান্নামকে কয়েদখানা বানিয়ে রেখেছি।”-সূরা বনী ইসরাঈল : ৪-৮
এখানে প্রথম বিপদ বলতে সেই ভয়াবহ ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে যা আসুরিয়া ও ব্যবলনীয় কাওম এবং বনী ইসরাঈলীদের উপর আপতিত হয়েছিলো ।
দ্বিতীয় বিপদ বলতে রোমক জাতিকে বুঝানো হয়েছে। রোমকরা বায়তুল মোকাদ্দাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলো। বনী ইসরাঈলদেরকে মেরে মেরে বের করে দিয়েছিলো ফিলিস্তিন থেকে। যারপর থেকে আজ দু'হাজার বছর পর্যন্ত তারা সমগ্র দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিটিয়ে আছে।
মোটকথা কুরআনের এ দু'টি আগাম বাণী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দুই- বারের মহাবিপর্যয়ে ইহুদী জাতিকে যে প্রলয়ের ভিতর অতিবাহিত হতে হয়েছে তা উল্লেখ করে তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে। যদি আবারও এমন জঘন্য আচরণ করো তাহলে আমিও এমন টিটান পিটাইব যা দ্বারা বাপ দাদার নাম ভুলে যাবে। বস্তুত এ অভিশপ্ত জাতির উপর প্রথম পিটাই জার্মানীতে হয়েছে। আবার দ্বিতীয় পিটাই হয়েছে রাশিয়ায়। আর এ আয়াত অনুযায়ী এদের নতুন ফাসাদ সৃষ্টির অপরাধের শাস্তি হিসাবে আল্লাহর তরফ থেকে বড় মার অবশ্যই এদের উপর আপতিত হবে । তারা শেষ সুযোগও হারিয়ে বসেছে
হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে নবী করে পাঠাবার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ইহুদী জাতিকে সংশোধন করা ও হিদায়াত দেয়া। কিন্তু তারা জাতিগত স্বভাব অনুযায়ী তাদের বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড ছেড়ে দেয়নি। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে তারা অমানবিক আচরণ করেছে।
সর্বশেষ সুযোগ তারা পেয়েছিলো রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের সময়। এ সময়ে যদি তারা খাঁটি মন নিয়ে সত্যিকারভাবে অতীত দিনের দোষ-ত্রুটি মার্জনা চেয়ে নিতো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করতো। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা লাভের সৌভাগ্য তাদের হতো। যদি তারা তা না করে তাহলে মানুষ এবং আল্লাহ উভয়ের সামনে তাদের চেহারা কালিমা লিপ্ত হবে ।
কিন্তু সত্য পথে না চলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান না এনে বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে তারা শেষ সুযোগও হারিয়ে ফেলেছে।
কুরআন তাদের এ জঘন্য অপরাধের দীর্ঘ ইতহাসের উপর পর্যালোচনা করে তাদের শেষ এবং সর্বচেয়ে বড় অপরাধের স্বরূপ এ ভাষায় উদ্ঘাটন করেছে :
وَلَمَّا جَاءَ هُم كِتَبُ مَنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقَ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ ، جَاءَهُمْ ن يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا ، فَلَمَّا جَاءَ هُم مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ ، فَلَعْنَةُ الله عَلَى الْكَفِرِينَ ) البقرة : ٨٩
“এবং এখন যে কিতাবটি আল্লাহর কাছ থেকে তাদের কাছে এসেছে তার সাথে তারা কি ব্যবহার করেছে ? অথচ তারা তাদের কাছে যে কিতাব আগে থেকেই বিদ্যমান ছিলো তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে। এ কিতাব আসার আগে তারা নিজেরা কাফেরদের মুকাবিলায় বিজয় ও সাহায্য লাভের জন্য দোয়া করতো। কিন্তু যখন সেই জিনিস এসে গেলো, যা তারা চিনেও নিয়েছিলো। তখন তারা তা মানতে অস্বীকার করে বসলো । এসব অবিশ্বাসীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত ।”
-সূরা আল বাকারা : ৮৯ بِئْسَمَا اشْتَرَوا بِهِ أَنْفُسَهُمْ أَنْ يَكْفُرُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ بَغْيًا أَنْ يُنَزِّلَ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ، فَبَاهُ وَ بِغَضَبٍ عَلَى غَضَبٍ ، وَلِلْكَفِرِينَ
“তারা যে জিনিসের সাহায্যে মনের সান্ত্বনা লাভ করে তা কতই না খারাপ । আর তাহলো, আল্লাহ যে বিধান নযিল করেছেন, তা তারা শুধু এ জিদের বশবর্তী হয়েই মেনে নিতে অস্বীকার করছে যে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্য হতে নিজ মনোনীত একজনকে তার অনুগ্রহ (অহী ও নবুওয়াত) দান করেছেন তাই তারা আল্লাহর দ্বিগুণ গযবের উপযুক্ত হয়েছে। বস্তুত এসব কাফেরদের জন্য কঠিন ও অপমানকর শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে।”
-সূরা আল বাকারা : ৯০
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا
1.3.3.
قراء ة ت وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ ، قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ
:
“তাদেরকে যখন বলা হলো, আল্লাহ যাকিছু নাযিল করেছেন তার উপর ঈমান আনো। তারা তখন বললো, আমরা তো শুধু সে জিনিসের প্রতিই ঈমান এনে থাকি যা আমাদের (ইসরাঈল বংশের) প্রতি নাযিল হয়েছে। এর সীমার বাহিরে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তা মানতে তারা অস্বীকার করছে। অথচ যা মানতে তারা অস্বীকার করছে তা সত্য। তাদের নিকট পূর্ব হতে যে (আর্দশের) শিক্ষা বর্তমান ছিলো তা তার সত্যতা স্বীকার করে ও সমর্থনে করে । যাই হোক তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, তোমাদের উপর অবতীর্ণ আদর্শের প্রতি যদি তোমরা বিশ্বাসীই হয়ে থাকো তবে ইতিপূর্বে (বনী ইসরাঈল বংশে আগত) আল্লাহর সেই নবীদের কেনো হত্যা করেছিলে।”-সূরা আল বাকারা : ৯১