রোদনরূপসী কবি: বুদ্ধদেব বসু

কে তুমি, সুন্দরী, যার বিন্দু-বিন্দু অশ্রু ঝ’রে ভেসে যায়

পদ্ম হ’য়ে নদীর সচ্ছল স্রোতে অবিরল ?

কোন প্লুত নীলিমায় লিপ্ত তুমি ? কোন পুণ্যজল

তোমার লাবণ্যসার আপনার তরঙ্গে মেশায় ?

রোদনরূপসী, তুমি কেন কাঁদো ? অশ্রু কেন পদ্ম হ’য়ে ফোটে ?

কেন তার হিরণ্ময়ী অভিমান দিগন্তেও হয় না বিলীন ?

কোন মন্ত্রে এই দিন অফুরান ? মহাকবি দেন নি উত্তর,

শুধু বলে গিয়েছেন দেবতারা তোমার অধীন ।



দুঃসাহস –-তবু বলি । মনে হয় কোনো -এক দূর জন্মান্তরে

তুমি ছিলে আমার একান্ত চেনা— অন্তরঙ্গ, অবিস্মরণীয় ।

সেদিন আমার কান্না তুমি কেঁদেছিলে ! আমিও জলের কলস্বরে

কান পেতে শুনেছি, কেমনে ধায় তোমার আজ্ঞায় মুগ্ধ পঞ্চভূত,

যুদ্ধ ভুলে , ছন্দের অঞ্জলি হটয়ে রূপ নেয় আকাশে আলোকে ।

অগাধ ঐশ্বর্য ছিল — তখন অমল এক বিশ্ব ছিল । সেদিন তোমার,



ছিল ঋতু, দ্যুলোক, সবিতা : তবু ছিল, আমাকে তোমার প্রয়োজন ।

মনে পড়ে সেই দূর স্বপ্নলোকে, আদিম ঊষার লগ্নে

আমি তা-ই তোমাকে দিয়েছিলাম, যা তোমার তখন ছিল না জানা —

যা ছিল না আলোর প্লাবনে কিংবা জলের হিল্লোলে —

অভাব-বিচ্ছেদবোধ-স্বপ্ন-স্মৃতি-হৃদয়স্পন্দন !

সেই থেকে নিখিলের রাজ্ঞী তুমি, ইন্দ্র হল অকস্মাৎ অসহায়,

স্বর্গের ছলনাপ্রান্তে সে-অশ্রুপুলক চলে অন্তহীন ;—

শুধু আমি মাঝে-মাঝে ভুলে যাই, খ’সে পড়ি যন্ত্রণার অন্ধকূপে,

শূলবিদ্ধ শূকরের মতো নড়ি, জীবনের অজ্ঞান চেষ্টায় ।