শেষের রাত্রি কবি: বুদ্ধদেব বসু

পৃথিবীর শেষ সীমা যেইখানে, চারিদিকে খালি আকাশ ফাঁকা,

আকাশের মুখে ঘুরে-ঘুরে যায় হাজার-হাজার তারার চাকা,

যোজনের পর হাজার যোজন বিশাল আঁধারে পৃথিবী ঢাকা।

(তোমার চুলের মতো ঘন কালো অন্ধকার,

তোমারি আঁখির তারকার মতো অন্ধকার ;

তবু চ’লে এসো ; মোর হাতে হাত দাও তোমার—

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



বিশাল আকাশ বাসনার মতো পৃথিবীর মুখে এসেছে নেমে,

ক্লান্ত শিশুর মতন ঘুমায় ক্লান্ত সময় সগসা থেমে ;

দিগন্ত থেকে দূর দিগন্তে ধূসর পৃথিবী করিছে খাঁ-খাঁ।

(আমারি প্রেমের মতন গহন অন্ধকার,

প্রেমের অসীম বাসনার মতো অন্ধকার ;

তবু চ’লে এসো ; মোর হাতে হাত দাও তোমার—

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



নেমেছে হাজার আঁধার রজনী, তিমির-তোরণে চাঁদের চূড়া,

হাজার চাঁদের চূড়া ভেঙে-ভেঙে হয়েছে ধূসর স্মৃতির গুঁড়া।

চলো চিরকাল জ্বলে যেথা চাঁদ, চির-আঁধারের আড়ালে বাঁকা

(তোমারি চুলের বন্যার মতো অন্ধকার,

তোমারি চোখের বাসনার মতো অন্ধকার ;

তবু চ’লে এসো ; মোর হাতে হাত দাও তোমার—

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



এসেছিল যত রূপকথা-রাত ঝরেছে হলদে পাতার মতো,

পাতার মতন পীত স্মৃতিগুলি যেন এলোমেলো প্রেতের মতো।

—রাতের আঁধারে সাপের মতন আঁকাবাঁকা কত কুটিল শাখা

(এসো, চ’লে এসো ; সেখানে সময় সীমাহীন

হঠাৎ ব্যথায় নয় দ্বিখণ্ড রাত্রিদিন ;

সেখানে মোদের প্রেমের সময় সীমাহীন,

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



অনের ধূসর স্মপণের ভারে এখানে জীবন ধূসরতম,

ঢালো উজ্জ্বল বিশাল বন্যা তীব্র তোমার কেশের তম,

আদিম রাতের বেণীতে জড়ানো মরণের মতো এ-আঁকাবাঁকা।

(ঝড় তুলে দাও, জাগাও হাওয়ার ভরা জোয়ার,

পৃথিবী ছাড়ায়ে সময় মাড়ায়ে যাবো এবার,

তোমার চুলের ঝড়ের আমরা ঘোড়সাওয়ার—

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



যেখানে জ্বলিছে আঁধার-জোয়ারে জোনাকির মতো তারকা-কণা,

হাজার চাঁদের পরিক্রমণে দিগন্ত ভ’রে উন্মাদনা।

কোটি সূর্যের জ্যোতির নৃত্যে আহত সময় ঝাপটে মাথা।

(কোটি-কোটি মৃত সূর্যের মতো অন্ধকার

তোমার আমার সময়-ছিন্ন বিরহ-ভার ;

তবু চ’লে এসো ; মোর হাতে হাত দাও তোমার—

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )



তোমার চুলের মনোহীন তমো আকাশে-আকাশে চলেচে উড়ে

আদিম রাতের আঁধার-বেণীতে জড়ানো মরণ পঞ্জে ফুঁড়ে,—

সময় ছাড়ায়ে, মরণ মাড়ায়ে—বিদ্যুৎময় দীপ্ত ফাঁকা।

(এসো চলে এসো যেকানে সময় সীমানাহীন,

সময়-ছিন্ন বিরহে কাঁপে না রাত্রিদিন।

যেখানে মোদের প্রেমের সময় সময়হীন

কঙ্কা শঙ্কা কোরো না। )