নকশী কাঁথার মাঠ - এক  - জসীমউদ্দীন

(এক)



বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,

উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি |

--- রাখালী গান





এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও --- মধ্যে ধু ধু মাঠ,

ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ |

এ-গাঁও যেন ফাঁকা ফাঁকা, হেথায় হোথায় গাছ ;

গেঁয়ো চাষীর ঘরগুলি সব দাঁড়ায় তারি পাছ |

ও-গাঁয় যেন জমাট বেঁধে বনের কাজল কায়া,

ঘরগুলিরে জড়িয়ে ধরে বাড়ায় বনের মায়া |



এ-গাঁও চেয়ে ও-গাঁর দিকে, ও-গাঁও এ-গাঁর পানে,

কতদিন যে কাটবে এমন, কেইবা তাহা জানে!

মাঝখানেতে জলীর বিলে জ্বলে কাজল-জল,

বক্ষে তাহার জল-কুমুদী মেলছে শতদল |

এ-গাঁর ও-গাঁর দুধার হতে পথ দুখানি এসে,

জলীর বিলের জলে তারা পদ্ম ভাসায় হেসে!

কেউবা বলে --- আদ্যিকালের এই গাঁর এক চাষী,

ওই গাঁর এক মেয়ের প্রেমে গলায় পরে ফাঁসি ;

এ-পথ দিয়ে একলা মনে চলছিল ওই গাঁয়ে,

ও-গাঁর মেয়ে আসছিল সে নূপুর-পরা পায়ে!



এইখানেতে এসে তারা পথ হারায়ে হায়,

জলীর বিলে ঘুমিয়ে আছে জল-কুমুদীর গায়ে |

কেইবা জানে হয়তো তাদের মাল্য হতেই খসি,

শাপলা-লতা মেলছে পরাগ জলের উপর বসি |

মাঠের মাঝের জলীর বিলের জোলো রঙের টিপ,

জ্বলছে যেন এ-গাঁর ও-গাঁর বিরহেরি দীপ !

বুকে তাহার এ-গাঁর ও-গাঁর হরেক রঙের পাখি,

মিলায় সেথা নতুন জগৎ নানান সুরে ডাকি |

সন্ধ্যা হলে এ-গাঁর পাখি ও-গাঁর পানে ধায়,

ও-গাঁর পাখি এ-গাঁয় আসে বনের কাজল ছায় |

এ-গাঁর লোকে নাইতে আসে, ও-গাঁর লোকেও আসে

জলীর বিলের জলে তারা জলের খেলায় ভাসে |



এ-গাঁও ও-গাঁও মধ্যে ত দূর --- শুধুই জলের ডাক,

তবু যেন এ-গাঁয় ও-গাঁয় নেইকো কোন ফাঁক |

ও-গাঁর বধু ঘট ভরিতে যে ঢেউ জলে জাগে,

কখন কখন দোলা তাহার এ-গাঁয় এসে লাগে |

এ-গাঁর চাষী নিঘুম রাতে বাঁশের বাঁশীর সুরে,

ওইনা গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন ব্যথায় ঝুরে!

এ-গাঁও হতে ভাটীর সুরে কাঁদে যখন গান,

ও-গাঁর মেয়ে বেড়ার ফাঁকে বাড়ায় তখন কান |

এ-গাঁও ও-গাঁও মেশামেশি কেবল সুরে সুরে ;

অনেক কাজে এরা ওরা অনেকখানি দূরে |



এ-গাঁর লোকে দল বাঁধিয়া ও-গাঁর লোকের সনে,

কাইজা ফ্যাসাদ্ করেছে যা জানেই জনে জনে |

এ-গাঁর লোকেও করতে পরখ্ ও-গাঁর লোকের বল,

অনেকবারই লাল করেছে জলীর বিলের জল |

তবুও ভাল, এ-গাঁও ও-গাঁও, আর যে সবুজ মাঠ,

মাঝখানে তার ধূলায় দোলে দুখান দীঘল বাট ;

দুই পাশে তার ধান-কাউনের অথই রঙের মেলা,

এ-গাঁর হাওয়ায় দোলে দেখি ও-গাঁয় যাওয়ার ভেলা |

(দুই)



এক কালা দতের কালি যা দ্যা কলম লেখি,

আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,





---ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে |

--- মুর্শিদা গান





এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,

কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!

কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,

তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া |

জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু,

গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু |

বাদল-ধোয়া মেঘে কে গো মাখিয়ে দেছে তেল,

বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল |

কচি ধানের তুলতে চারা হয়ত কোনো চাষী,

মুখে তাহার ছড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি |



কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,

কালো দতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি |

জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময় ;

চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয় |



সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার'

রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধণুকের হার |

কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,

তারি পদ-রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন |

সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ,

কালো-বরণ চাষীর ছেলে জুড়ায় যেন বুক |

যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তার গাঁও!

সেই কালোতে সিনান করি উজল তাহার গাও |



আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী,

খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি |

জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে,

'শাল-সুন্দী-বেত' যেন ও, সকল কাজেই লাগে |

বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও, পাগাল লোহা যেন,

রূপাই যেমন বাপের বেটা, কেউ দেখেছ হেন?

যদিও রূপা নয়কো রূপাই, রূপার চেয়ে দামী,

এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামী |