পরীক্ষণাÍক পদ্ধতি কত প্রকার ও কি কি? অন্বয়ী পদ্ধতির সংজ্ঞা দিন। ব্যতিরেকী পদ্ধতির মূলসূত্র কী?

কার্য ও কারণের স¤পর্ক আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য যুক্তিবিদ মিল পরীক্ষণাÍক পদ্ধতির উদ্ভাবন

করেন। মিল পাঁচটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পদ্ধতিগুলো হল ১. অন্বয়ী পদ্ধতি ২. ব্যতিরেকী পদ্ধতি ৩.

যৌথ অন্বয়ী-ব্যতিরেকী পদ্ধতি ৪. সহ-পরিবর্তন পদ্ধতি ও ৫. পরিশেষ পদ্ধতি। মিলের এই পদ্ধতিগুলো

অপনয়নের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা এখন অন্বয়ী ও ব্যতিরেকী পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

অন্বয়ী পদ্ধতি

অন্বয়ী পদ্ধতি কাকে বলে তা জানার আগে আমরা একটি উদাহরণ দিয়ে অন্বয়ী পদ্ধতি কী তা বুঝার

চেষ্টা করি। ধরা যাক, একটি পরিবারের ৫ জন লোক বৈশাখী মেলায় বেড়াতে গেল। বেড়াতে গিয়ে

তারা ঐ মেলার একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি ফিরল এবং পরের দিন তাদের চার জনের

তীব্র পেট ব্যথা হল। আমরা এক্ষেত্রে তাদের তীব্র পেট ব্যথার কারণ জানার উদ্দেশ্যে তাদের

প্রত্যেককেই জিজ্ঞেস করলাম, তারা আগের রাতে রেস্টুরেন্টে কী খেয়েছিল? প্রথমজন বলল, সে

খেয়েছিল ভাত, ডাল, রুই মাছ ও দই। দ্বিতীয় জন বলল, সে খেয়েছিল রুটি, মাংস, মিষ্টি ও দই।

তৃতীয় জন খেয়েছিল ভাত, ডাল, ইলিশ মাছ ও দই। চতুর্থ জন খেয়েছিল রুটি, মিষ্টি ও দই। তীব্র

পেট ব্যথায় আক্রান্তচার জনের কে কোন্ খাবার খেয়েছিল এবং কোন্ খাবার খায়নি তা এক নজরে

দেখার জন্য আমরা সংগৃহীত তথ্যগুলিকে ছকের আকারে সাজাতে পারি।

এখানে আলোচ্য ঘটনা হল তীব্র পেট ব্যথা, আর তার পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো হল আগের রাতের খাবার।

ভাত, ডাল, রুই মাছ, ইলিশ মাছ, দই, রুটি, মাংস, মিষ্টিকে যথাক্রমে ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর অ,

ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ ও ঐ এবং আলোচ্য ঘটনা ‘তীব্র পেট ব্যথা’কে ইংরেজি ছোট হাতের অক্ষর ধ

দিয়ে চিহ্নিত করবো। তীব্র পেট ব্যথায় আক্রান্তচার ব্যক্তি হল চারটি পর্যবেক্ষিত দৃষ্টান্ত। এবার আমরা
তথ্যগুলোকে নিচের ছকের মাধ্যমে সাজাতে পারি

দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী ঘটনাসমূহ আলোচ্য ঘটনা

১। অ, ই, ঈ, ঊ ধ

২। ঊ, ঋ, এ, ঐ ধ

৩। অ, ই, ঊ, উ ধ

৪। ঊ, ঋ, ঐ ধ

এই ছক থেকে আমরা স্বাভাবিকভাবে অনুমান করতে পারি যে, পূর্ববর্তী ঘটনা ঊ আলোচ্য ঘটনা ধ এর

কারণ হতে পারে। অর্থাৎ তীব্র পেটে ব্যথা সম্ভবত দই খাওয়ার জন্যই হয়েছিল। অন্যান্য আরোহী

যুক্তির সিদ্ধান্তকে যেমন সুনিশ্চিত বলা যায় না, তেমনি এক্ষেত্রেও আশ্রয়বাক্যগুলো সিদ্ধান্তকে প্রমাণ

করতে পারে না। আশ্রয়বাক্যগুলি শুধু অ, ই, ঈ, উ, ঋ, এ ও ঐ কে অবান্তর হিসেবে বর্জন করে ঊ

কে ধ এর কারণ হবার সম্ভাব্যতা প্রতিষ্ঠা করে। অ, ই, ঈ, উ, ঋ, এ ও ঐ এর অনুপস্থিতিতেও ধ এর

উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে এদের মধ্যে কোনটির ধ-এর কারণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং ধ এর

কারণ ঊ হবার সম্ভাবনা আছে।

অন্বয়ী পদ্ধতির সূত্র

যুক্তিবিদ মিল অন্বয়ী পদ্ধতির সূত্রটি এভাবে ব্যক্ত করেছেন ‘আলোচ্য ঘটনাটির দুই বা তার বেশি দৃষ্টান্তে

যদি একটিমাত্র ব্যাপার সাধারণভাবে উপস্থিত থাকে তাহলে যে ব্যাপারটিতে সকল দৃষ্টান্তের মিল থাকে

সেটিই হবে প্রদত্ত ঘটনাটির কারণ (বা কার্য)’। এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই মিল দাবি করেন যে, এই

পদ্ধতি প্রয়োগ করে কারণ থেকে কার্য ও কার্য থেকে কারণ প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণ করা যায়।

পূর্ববর্তী ঘটনাসমূহকে ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর এবং অনুবর্তী ঘটনাসমূহকে ছোট হাতের অক্ষরের

সাহায্যে চিহ্নিত করে মিলের অন্বয়ী পদ্ধতিকে এভাবে প্রতীকায়িত করা যায়

অ, ই, ঈ, ঊ ৃৃৃ ধ, ন, প, ব

ঊ, ঋ, এ, ঐ ৃৃৃ ব, ভ, ম, য

অ, ই, ঊ, উ ৃৃৃ ধ, ন, ব, ফ

ঊ, ঋ, ঐ ৃৃৃ ব, ভ, য

সুতরাং ঊ হল বএর কারণ, অথবা ব হল ঊ এর কার্য।

এই দৃষ্টান্তগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পূর্ববর্তী ঘটনাসমূহ ও অনুবর্তী ঘটনাসমূহের মধ্যে একটি মাত্র

বিষয়ে মিল আছে। প্রত্যেকটি দৃষ্টান্তেপূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে ঊ ঘটছে, আর অনুবর্তী ঘটনা হিসেবে ব

ঘটছে। অতএব সিদ্ধান্তকরা হয়েছে ঊ হল ব এর কারণ, অথবা ব হল ঊ এর কার্য।

কার্য থেকে আমরা অন্বয়ী পদ্ধতির মাধ্যমে যেমন কারণে আসতে পারি তেমনি কারণ থেকেও কার্য

অনুমান করতে পারি।

কারণ থেকে কার্য অনুমান

অতিরিক্ত কফি পানের ফলে কি হতে পারে তা জানার জন্য অন্বয়ী পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত কফি পান করে এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে দেখা গেল তাদের আচার, ব্যবহার,

খাদ্য-তালিকা ও অভ্যাস ভিন্ন এবং অনুবর্তী ঘটনাবলীর মধ্যে নানা বিষয়ে ভিন্নতা থাকা সত্তে¡ও একটি

বিষয়ে সাদৃশ্য আছে। পূর্ববর্তী ঘটনা হিসেবে উপস্থিত আছে অতিরিক্ত কফি পান, আর অনুবর্তী ঘটনা
হিসেবে রয়েছে রাতে অনিদ্রা।

অতএব, অনুমান করা যায় যে অতিরিক্ত কফি পানের ফল হল অনিদ্রা।

অন্বয়ী পদ্ধতির ব্যর্থতা

আলোচ্য ঘটনা দু’টিতে অন্বয়ী পদ্ধতি কার্যকারণ স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণের পদ্ধতি হিসেবে সার্থক

হলেও এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে একই ধরনের একাধিক ঘটনা সবগুলো দৃষ্টান্তেবর্তমান আবার

যেখানে কোন প‚র্ববর্তী ঘটনার মধ্যে মিল নেই কিন্তু কার্য একইরকম সেখানে এই পদ্ধতি ব্যর্থ। তবু

অন্বয়ী পদ্ধতি একেবারে মূল্যহীন নয়। এর সীমিত মূল্য আছে। নঞর্থক ভাষায় এর সীমিত মূল্যকে

এভাবে প্রকাশ করা যায় ‘আলোচ্য ঘটনার সব কয়টি দৃষ্টান্তেযে আনুষঙ্গিক বিষয় সমানভাবে উপস্থিত

নেই তা আলোচ্য ঘটনার কারণ হতে পারে না’ এ থেকে বোঝা যাচেছ অবান্তর বিষয়ের অপসারণের

পদ্ধতি হিসেবে অন্বয়ী পদ্ধতির মূল্য রয়েছে।

একাধিক ঘটনা একত্রে সবগুলো দৃষ্টান্তেবর্তমান থাকলে কোন্টিকে আমরা কারণ বলে সনাক্ত করবো

এক্ষেত্রে এই সমস্যা সমাধানের জন্য অন্য কোন আরোহ পদ্ধতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

যুক্তিবিদ মিল বর্ণিত দ্বিতীয় পরীক্ষণাÍক পদ্ধতিই হল এই আরোহ পদ্ধতি।

ব্যতিরেকী পদ্ধতি

অন্বয়ী পদ্ধতি আলোচনা করতে প্রথমেই যে উদাহরণটি দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে ব্যতিরেকী পদ্ধতিও

প্রয়োগ করা যায়। মেলায় যে ৫ জন খেয়েছিল তাদের মধ্যে একজন দই খায়নি, বাকি অন্যরা খাবার

খেয়েছিল, কিন্তু সে পেট ব্যথায় আক্রান্তহয়নি। তাহলে আমরা এই লোকটির সাথে আমাদের প্রথম

ছকের প্রথম লোকটির অবস্থাগুলির তুলনা করতে পারি। প্রথম ব্যক্তিকে ও নং দৃষ্টান্তএবং যে ব্যক্তি দই
খায়নি তাকে হ দৃষ্টান্তহিসেবে অভিহিত করে তথ্যগুলিকে নিæোক্ত ছকে সাজাতে পারি

দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী বিষয়সমূহ আলোচ্য ঘটনা

ও অ ই ঈ ঊ ধ

হ অ ই ঈ থ

এই নতুন তথ্য থেকে আমরা স্বাভাবিকভাবে অনুমান করতে পারি যে, ঊ হল ধ এর কারণ অর্থাৎ তীব্র

পেট ব্যথা সম্ভবত দই খাওয়ার জন্যই হয়েছে। আরোহমূলক অনুমান হওয়ায় এটি সুনিশ্চিত নয়,
সম্ভাব্যমাত্র।

ব্যতিরেকী পদ্ধতির সংজ্ঞা

মিল ব্যতিরেকী পদ্ধতির সংজ্ঞা প্রদান প্রসঙ্গে বলেছেন “আলোচ্য ঘটনাটি উপস্থিত আছে এমন একটি

দৃষ্টান্তএবং আলোচ্য ঘটনাটি উপস্থিত নেই এমন একটি দৃষ্টান্তএই দুই দৃষ্টান্তের মধ্যে যদি একটি

আনুষঙ্গিক বিষয় ছাড়া আর সব আনুষঙ্গিক বিষয়েই স¤পূর্ণমিল থাকে এবং যে আনুষঙ্গিক বিষয়ে মিল

নেই সেই আনুষঙ্গিক বিষয়টি কেবল প্রথম দৃষ্টান্তেউপস্থিত থাকে, তাহলে যে আনুষঙ্গিক বিষয়ে দৃষ্টান্ত

দুটির মধ্যে পাথর্ক্য সেই আনুষঙ্গিক বিষয়টি আলোচ্য ঘটনার কার্য বা কারণ বা কারণের অপরিহার্য অংশ
বলে গণ্য হবে”।

আনুষঙ্গিক বিষয়গুলিকে ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর এবং আলোচ্য ঘটনাকে ছোট হাতের অক্ষরে চিহ্নিত

করে ব্যতিরেকী পদ্ধতিকে এভাবে প্রতীকায়িত করা যায়

অ ই ঈ উ যাদের সঙ্গে ঘটে তারা হল ধ ন প ফ

ই ঈ উ যাদের সঙ্গে ঘটে তারা হল ন প ফ

অতএব, অ হল ধ এর কারণ অথবা কার্য অথবা ধ এর কারণের একটি অপরিহার্য অংশ

আমরা যে বাস্তব উদাহরণ দিয়েছি সেখানে দইকে পেট ব্যথার ‘কারণ’ হিসেবে অনুমান না করে যা

যথার্থভাবে অনুমান করা উচিত ছিল তা হল, দই খাওয়া পেট ব্যথার একটি অপরিহার্য অংশ।

ব্যতিরেকী পদ্ধতির সাফল্য

ব্যতিরেকী পদ্ধতি কার্যকারণ স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা ও তা প্রমাণের পদ্ধতি হলেও তেমন সার্থক নয়। তবে এর

একটা সীমিত মূল্য আছে। এই পদ্ধতির বক্তব্য হল : যে প্রস্তাবিত কারণটি ঘটলেও একটি ঘটনা ঘটে

না, তা ঐ ঘটনার প্রকৃত কারণ হতে পারে না। এই অর্থে ব্যতিরেকী পদ্ধতি নিতান্তই একটি অপনয়নের

পদ্ধতি। যে এক বা একাধিক প্রস্তাবিত কারণ যথার্থ কারণের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত নয়, সেগুলিকে এই

পদ্ধতি দ্বারা অপসারণ করা যায়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসমূহে বিভিন্ন প্রকল্পের যথার্থতা বিচারের জন্য

ব্যতিরেকী পদ্ধতি প্রযুক্ত হয়ে থাকে।

সারাংশ

অন্বয়ী পদ্ধতি ও ব্যতিরেকী পদ্ধতি কার্যকারণ স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা পদ্ধতি হলেও খুব বেশি সার্থক নয়।

পদ্ধতি দুটিই অপনয়নের সূত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একটি নিরীক্ষণাÍক পদ্ধতি, অপরটি পরীক্ষণাÍক
পদ্ধতি।

অন্বয়ী পদ্ধতির মূলসূত্র হল ‘যে পূর্বগকে বাদ দিলে অনুগ বা কার্যের কোন প্রকার অঙ্গহানি হয় না সে

পূর্বগ সেই কার্যের কারণ কিংবা কারণের অংশ হতে পারে না’

ব্যতিরেকী পদ্ধতির মূলসূত্রটি হল ‘পূর্বগের যে অংশ বাদ দিলে অনুগ বা কার্যের হানি ঘটে সেই পূর্বগ ও
অনুগের মধ্যে একটি কার্যকারণ স¤পর্ক বিদ্যমান’।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। অন্বয়ী পদ্ধতি ব্যাখ্যা করুন।

২। ব্যতিরেকী পদ্ধতি ব্যাখ্যা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। পরীক্ষণাÍক পদ্ধতি কত প্রকার ও কি কি?

২। অন্বয়ী পদ্ধতির সংজ্ঞা দিন।

৩। ব্যতিরেকী পদ্ধতির মূলসূত্র কী? এর একটি উদাহরণ দিন।

বহু নির্বাচনী প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন

১। পরীক্ষণাÍক পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য

ক) অনুমান করা খ) অনুমানের বৈধতা বিচার করা

গ) কারণ নির্ণয় করা ঘ) কার্য-কারণ স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণ করা।

২। অন্বয়ী পদ্ধতি কি পদ্ধতি

ক) পরীক্ষণাÍক পদ্ধতি খ) নিরীক্ষণাÍক পদ্ধতি

গ) অবরোহী পদ্ধতি ঘ) কোনটাই নয়।

৩। ব্যতিরেকী পদ্ধতির সিদ্ধান্ত

ক) নিশ্চয়তামূলক খ) সম্ভাবনামূলক

গ) উভয়টি ঘ) কোনটিই নয় ।

সঠিক উত্তর

১। ঘ) কার্য-কারণ স¤পর্ক প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণ করা। ২। খ) নিরীক্ষণাÍক পদ্ধতি

৩। খ) সম্ভাবনামূলক