জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে অভিজ্ঞতাবাদ সমালোচনাসহ আলোচনা করুন।

জ্ঞান কিভাবে উৎপন্ন হয়? প্রকৃত জ্ঞানের উৎস কী? এ ব্যাপারে দার্শনিকগণ একমত হতে

পারেননি। ফলে আমরা ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেখতে পাই। এখানে আমরা অভিজ্ঞতাবাদ নিয়ে

আলোচনা করবো। অভিজ্ঞতাবাদের মতে, অভিজ্ঞতাই জ্ঞানের উৎস।

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হিসেবে আমরা প্রধানত লক, বার্কলি ও হিউমকে পাই। নি¤েœ তাঁদের

বক্তব্য সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অভিজ্ঞতাবাদ (ঊসঢ়রৎরপরংস)

অভিজ্ঞতাবাদের মতে, অভিজ্ঞতা তথা প্রত্যক্ষণই জাগতিক জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস। এই

প্রত্যক্ষণ দু'ভাবে হতে পারে : (১) সংবেদন ( ও (২) অন্তর্দর্শন

সংবেদনের মাধ্যমে আমরা বাইরের জগতের এবং অন্তর্দর্শনের মাধ্যমে নিজেদের মানসিক
অবস্থার জ্ঞান লাভ করি।

জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হলো নতুনত্ব

অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, যথার্থ জ্ঞানের অন্ততঃ জাগতিক বিষয়ের জ্ঞানের, লক্ষণ নতুনত্ব

(হড়াবষঃু)। জ্ঞান অবশ্যই কিছুনতুন সংবাদ দিবে। যা আগেই জানা আছে তা ভাষান্তরে

বললে বা তার পুনরুক্তি করলে তাকে যথার্থ জ্ঞান বলা যায় না। সেজন্য তাঁদের মতে,

বিশ্লেষক বাক্য অর্থাৎ যে বাক্যে উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিধেয় নতুন কিছুবলে না তা থেকে জ্ঞান
পাওয়া যায় না।

সংশ্লেষক বাক্য থেকেই জ্ঞান পাওয়া যায়

যে বাক্য নতুন কিছু বলে অর্থাৎ সংশ্লেষক বাক্যের মাধ্যমে জ্ঞানলাভ করা যায়। কারণ

সংশ্লেষক বাক্যে উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিধেয় নতুন কিছু ঘোষণা করে। এই বাক্য ইন্দ্রিয়জ

অভিজ্ঞতানির্ভর। অর্থাৎ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই যথার্থ জ্ঞান লাভের উপায়।

বুদ্ধিবাদীরা যাকে আবশ্যিক জ্ঞান বলে তা আসলে কতগুলি ধারণার সম্পর্ক

এখন প্রশ্ন হলো, গণিত শাস্ত্রে বা অবরোহী যুক্তিবিদ্যায় আমরা যে আবশ্যিক জ্ঞান

(ঘবপবংংধৎু কহড়ষিবফমব) পাই বলে মনে করি, তা কী করে সম্ভব? অভিজ্ঞতাবাদী হিউম

বলেন, এই সমস্ত ক্ষেত্রে কতগুলি ধারণার মধ্যে সম্বন্ধ প্রকাশ করা হয়

এবং এতে কোন নতুন সংবাদ থাকে না। আমরা যখন বলি, ২+২=৪ তখন ২ এর ধারণার

সাথে ২ এর ধারণার এবং তাদের যোগের ধারণার মধ্যে সম্বন্ধ প্রকাশ করা হয়। ‘২+২' বলাও

যা ‘৪' বলাও তা-ই। দার্শনিক এয়ারসহ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাবাদীরা বলেন, এখানে নতুন

কোন সংবাদ দেয়া হয়নি। মিল বলেন, এখানে আবশ্যিক জ্ঞান নেই, এ জ্ঞানও সম্ভাব্য। তবে

সাধারণ জ্ঞানের থেকে অনেক বেশি সম্ভাব্য।

অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ সংশ্লেষক বাক্য হয় না

এয়ার ও অন্যান্য অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ সংশ্লেষক বাক্য হয় না। কান্ট

যাদের এমন বাক্য বলেছেন সেসব আসলে বিশ্লেষণাত্মক। অবরোহানুমানের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত

আশ্রয়বাক্যের পুনরুক্তি করে মাত্র এবং এক্ষেত্রে শুধুকতগুলি ধারণার মধ্যে সম্বন্ধ প্রকাশ করা

হয়। যেখানে আবশ্যিক জ্ঞান পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়, সেখানে এরূপ কতগুলি ধারণার

মধ্যে সম্বন্ধ প্রকাশ করা হয় এবং তাতে কোন নতুন সংবাদ থাকে না।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে যে আরোহানুমান করা হয়, তা পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণ এবং কার্যকারণ

সম্বন্ধের ভিত্তিতে করা হয়। প্রত্যক্ষবাদী হিউমের মতে, কার্যকারণ সম্বন্ধ কোন বিষয়গত

আবশ্যিক সম্বন্ধ নয়; অভ্যাসজনিত বিষয়ীগত প্রত্যাশা কার্যকারণ সম্বন্ধের তথাকথিত

আবশ্যিকতার ভিত্তি। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, আরোহানুমানের কোন তাত্তি¡ক বা বিষয়গত

নিশ্চয়তা নেই। একে একটি প্রকল্প বলা যায়।

ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুছাপ মনে পড়লেই জ্ঞান হয়

লকের মতে, মানুষ জন্মের সময় কোন ধারণা নিয়ে জন্মায় না। শিশুর মন একেবারে খালি

থাকে, যখন শিশুর ইন্দ্রিয়গুলি বাইরের বস্তুর সংস্পর্শে আসে, তখন ইন্দ্রিয় পথে মনের উপর

বাইরের জিনিসের ছাপ পড়ে। এই ছাপ থেকেই জ্ঞান হয়। এই ছাপকেই লক ধারণা নাম
দিয়েছেন।

ধারণার মধ্যে মিল বা অমিল অনুভব করার নামই জ্ঞান

ধারণা দু'ভাবে মনে আসে : (১) সংবেদন ও (২) অন্তর্দর্শন। ধারণা গ্রহণের ব্যাপারে মন

নিষ্ক্রিয় থাকে। তবে ধারণা পাওয়ার পর মন সক্রিয় হয়। লকের মতে, ধারণাগুলি জ্ঞান নয়।

ধারণার মধ্যে মিল বা অমিল অনুভব করার নামই জ্ঞান। ‘ফুল' এই ধারণা কোন জ্ঞান নয়,

কিন্তু‘ফুলটি লাল' এটি একটি জ্ঞান, কারণ এখানে ‘ফুল' ও ‘লাল' এই দুই ধারণার মধ্যে মিল

অনুভব করা যাচ্ছে। এই অনুভব নানা উপায়ে হতে পারে: (ক) স্বজ্ঞার সাহায্যে সরাসরি দুটি

বস্তুর তুলনা করে (খ) বুদ্ধি দিয়ে এক বা একাধিক ধারণার মাধ্যমে দুটি ধারণার মিল বা অমিল

দেখে ও (গ) সংবেদনের সাহায্যে কোন বস্তুর অস্তিত্ব উপলব্ধি করে।

সমালোচনা

(১) জ্ঞান শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষনির্ভর একথা মেনে নেয়া যায় না। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের মাধ্যমে

জ্ঞানের উপকরণ পাওয়া যায়, সেই উপকরণ যদি বুদ্ধি দিয়ে সংশ্লেষিত ও সুবিন্যস্ত না

হয় তাহলে জ্ঞান হতে পারে না।

(২) ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের মাধ্যমে পাওয়া জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই ভুল এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য

হয়, সকল ক্ষেত্রেই সুনিশ্চিত ও যথার্থ হয় না। কিন্তুবুদ্ধির মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান সুনিশ্চিত

ও যথার্থ হয়।

(৩) অভিজ্ঞতাবাদীরা জ্ঞানের ক্ষেত্রে বুদ্ধির অবদানকে অগ্রাহ্য করেন। কিন্তুইন্দ্রিয়লব্ধ কোন

কোন জ্ঞান ভুল তা আমরা বুদ্ধির সাহায্যেই জানতে পারি। অর্ধেক ডুবানো কাঠ যে

বাঁকা দেখায় তা যে প্রকৃতপক্ষে বাঁকা নয়, বুদ্ধির সাহায্যেই আমরা বুঝতে পারি।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে অভিজ্ঞতাবাদ সমালোচনাসহ আলোচনা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে প্রত্যক্ষণ কিভাবে হতে পারে?

২। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য কী?

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন।

১। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হলেনÑ

(অ) ডেকার্ট, স্পিনোজা ও কান্ট (আ) লক, বার্কলি ও হিউম

(ই) হোয়াইটহেড, রাসেল ও জেম্স (ঈ) কিয়ার্কেগার্ড, হাইডেগার ও সার্ত।

২। অভিজ্ঞতাবাদের মতে, জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎসÑ

(অ) প্রজ্ঞা (আ) বুদ্ধি

(ই) ঐশীবাণী (ঘ) প্রত্যক্ষণ

৩। কার্যকারণ সম্বন্ধ কোন বিষয়গত আবশ্যিক সম্বন্ধ নয়, কথাটি বলেনÑ

(অ) ডেভিড হিউম (আ) রেনে ডেকার্ট

(ই) ইমানুয়েল কান্ট (ঈ) বেনেডিক্ট স্পিনোজা।

৪। মানুষ জন্মের সময় কোন ধারণা নিয়ে জন্মায় না এ কথাটি বলেনÑ

(অ) বার্ট্রান্ড রাসেল (আ) ইমাম গাজ্জালী

(ই) প্লেটো (ঈ) জন লক।

সঠিক উত্তর ঃ (১) আ। (২) ঈ। (৩) অ। (৪) ঈ।