জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে স্বজ্ঞাবাদ আলোচনা করুন।

ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসোঁ (ইবৎমংড়হ) স্বজ্ঞাবাদের প্রধান প্রবক্তা। স্বজ্ঞাবাদীদের মতে,

স্বজ্ঞার মাধ্যমেই কেবল যথার্থ জ্ঞানলাভ করা যায়। বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যথার্থ জ্ঞান

সম্ভব নয়। স্বজ্ঞা হলো কোন প্রকার বুদ্ধির সাহায্য না নিয়ে একটি বস্তুকে সোজাসুজি মন দিয়ে

প্রত্যক্ষ করা। এ হলো কোন বস্তুবা বিষয়ের সাক্ষাৎ প্রতীতি (ফরৎবপঃ বীঢ়বৎরবহপব)। অর্থাৎ

সাক্ষাৎ প্রতীতি হলো, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সাহায্য ছাড়াই মন দিয়ে বস্তুর যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি।

বর্তমান পাঠে আমরা বার্গসোঁর স্বজ্ঞাবাদ নিয়ে আলোচনা করবো।

স্বজ্ঞাবাদ

বুদ্ধি ও সত্তা

বার্গসোঁর মতে, বুদ্ধি যথার্থ জ্ঞান লাভের উপায় হতে পারে না। বুদ্ধি সত্তার জ্ঞান অনে¦ষণে

সত্তার স্বরূপকে বিকৃত করে তার একটি অযথার্থ রূপ উপস্থাপন করে। তাঁর মতে, কোন বস্তুকে

দুটি উপায়ে জানার চেষ্টা করা হয়: স্বজ্ঞার মাধ্যমে, কিংবা বুদ্ধির মাধ্যমে। বুদ্ধির সাহায্যে

বস্তুকে জানতে গেলে, বস্তুটির কেবল প্রকাশ্য রূপকে জানা যায়; তার স্বরূপকে নয়। বুদ্ধি বস্তুর

চারপাশে কেবল ঘুরে বেড়ায়, তার অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। বুদ্ধিলব্ধ জ্ঞান যেহেতু

প্রত্যয় বা ধারণাভিত্তিক জ্ঞান ) সেহেতুবস্তুর স্বরূপের বদলে তার

অবভাসের জ্ঞান দেয়।

স্বজ্ঞার মাধ্যমেই কেবল সত্তার সঙ্গে একাÍ হয়ে তার স্বরূপ জানা যায়। স্বজ্ঞার মাধ্যমেই কেবল

জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়, বিষয় ও বিষয়ীর ব্যবধানকে অতিক্রম করা যায়। স্বজ্ঞার ক্ষেত্রে জ্ঞাতাই

জ্ঞেয়তে রূপান্তরিত হয়, বুদ্ধি বা চিন্তার ক্ষেত্রে এ ব্যবধান রয়ে যায়।

স্বজ্ঞার স্বরূপ : বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি

বার্গসোঁ স্বজ্ঞার স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে একে ‘বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি'

বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, স্বজ্ঞা হলো সেই বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি, যার সাহায্যে কেউ

কোন বস্তুর অন্তরে প্রবেশ করে এ উদ্দেশ্যে যে, বস্তুর মধ্যে যা কিছুঅসাধারণ ও অনির্বচনীয়

তার সাথে একাত্মতা লাভ করবে। বার্গসোঁ বস্তুকে অনেকটা অনুভ‚তির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

একমাত্র অনুভ‚তির সাহায্যে আমরা অন্যের অন্তরে প্রবেশ করতে পারি। কারো সুখ-দুঃখে পূর্ণ

সহানুভ‚তি থাকলেই তার সুখ-দুঃখ অনুভব করা যায়। একইভাবে বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তির দ্বারা

যদি কোন বস্তুর অন্তরে প্রবেশ করা যায় তাহলে তার স্বরূপের যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়।
তিনি বলেন, স্বজ্ঞা হলো এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

সমালোচনা

স্বজ্ঞা নিছক ব্যক্তিগত অনুভ‚তির ব্যাপার। ব্যক্তিগত বিষয় সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে না। বিভিন্ন

ব্যক্তির স্বজ্ঞা বা অনুভ‚তি বিভিন্ন প্রকারের। দার্শনিক আলোচনা ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। দার্শনিক

সত্য সর্বজন স্বীকৃতির দাবি রাখে। তাছাড়া কেবল অনুভ‚তিতেই দার্শনিক জ্ঞানের সমাপ্তি ঘটে

না। অনুভ‚তি যদি বিচার বুদ্ধির দ্বারা ব্যাখ্যাত হয়ে দার্শনিক মতবাদে প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে

দর্শনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। অনুভ‚তির সত্যাসত্য নির্ধারণ বিচার বুদ্ধির দ্বারাই সম্ভব।

স্বজ্ঞাবাদীরা স্বজ্ঞাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বার্গসোঁ বলেন, স্বজ্ঞা হলো

বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি। কিন্তুবুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি কথাটি দুর্বোধ্য। তাছাড়া এ কথাটি স্বজ্ঞার

মধ্যে বুদ্ধিকে টেনে আনে। বস্তুত জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বুদ্ধিকে কখনো বাদ দেয়া যায় না।

বুদ্ধি যে স্বজ্ঞার তুলনায় শ্রেষ্ঠ তা সহজেই বুঝা যায়। স্বজ্ঞাবাদী বার্গসোঁও নিজের মতবাদকে

প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুদ্ধিরই সাহায্য নিয়েছেন। স্বজ্ঞার সাহায্যে সত্তার প্রকৃত স্বরূপ জানা

সম্ভব হলে স্বজ্ঞাবাদীদের মতের মধ্যে এত পার্থক্য পরিলক্ষিত হতো না।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। জ্ঞানের উৎপত্তি বিষয়ক মতবাদ হিসেবে স্বজ্ঞাবাদ আলোচনা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি কথাটি ব্যাখ্যা করুন।

২। স্বজ্ঞাবাদের সমালোচনা লিখুন।

৩। স্বজ্ঞাবাদ বুদ্ধির কি কি ত্রæটি উল্লেখ করে?

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন।

১। স্বজ্ঞাবাদের প্রধান প্রবক্তাÑ

(অ) কান্ট (আ) বার্গসোঁ

(ই) হিউম (ঈ) ডেকার্ট।

২। স্বজ্ঞা হলো বস্তুকে সোজাসুজিÑ

(অ) চোখ দিয়ে প্রত্যক্ষ করা (আ) মন দিয়ে প্রত্যক্ষ করা

(ই) পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করা (ঈ) কোনটি নয়।

৩। জ্ঞাতাই জ্ঞেয়তে রূপান্তরিত হয়Ñ

(অ) বুদ্ধিবাদ অনুসারে (আ) অভিজ্ঞতাবাদ অনুসারে

(ই) স্বজ্ঞাবাদ অনুসারে (ঈ) বিচারবাদ অনুসারে।

৪। বার্গসোঁর মতে স্বজ্ঞা হলোÑ

(অ) অনুভ‚তি (আ) সহানুভ‚তি

(ই) অভিজ্ঞতাসঞ্জাত অনুভ‚তি (ঈ) বুদ্ধিসঞ্জাত সহানুভ‚তি।

সঠিক উত্তর ঃ (১) আ। (২) আ। (৩) ই। (৪) ঈ।