যান্ত্রিক ও উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ সংক্ষেপে আলোচনা করুন।

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ ও উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্তে¡র মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যান্ত্রিক

কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, প্রতিটি কার্য সব সময়ই তার পূর্ববর্তী কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, কার্যের উদ্দেশ্যই কার্যকে নিয়ন্ত্রিত করে। আমরা এখন

এই দুটি মতবাদ নিয়ে আলোচনা করবো।

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡)

প্রতিটি কার্য পূর্ববর্তী কারণ দ্বারা সংঘটিত হয়

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যন্ত্রই

যান্ত্রিক মতবাদের প্রকৃত উদাহরণ। যন্ত্রের প্রত্যেকটি অংশের কাজ পূর্ববর্তী অন্য আর একটি

অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। হাতল ঘোরালেই ইঞ্জিন চলতে থাকে, কিন্তুহাতল না ঘোরালে ইঞ্জিন
চলে না। শুধুতাই নয়। প্রতি মুহ‚র্তে যন্ত্রের প্রত্যেক আবর্তন পূর্ববর্তী আর এক আবর্তনের

পরই সংঘটিত হয়। যান্ত্রিক কার্যের মধ্যে একটা অন্ধ অনিবার্যতা আছে।

যান্ত্রিক কার্যের বেলায় কারণ থাকলেই অতি অবশ্য কার্য সংঘটিত হয়। যন্ত্র একবার চালুকরে

দিলে বন্ধ না করা পর্যন্ত চলবেই। যান্ত্রিক কার্যে কোন বুদ্ধি-বিচার-বিশ্লেষণ বা উদ্দেশ্যের স্থান
নেই। যান্ত্রিকভাবেই সব কিছুসংঘটিত হয়।

যান্ত্রিক কার্যকারণের বৈশিষ্ট্য

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্তে¡র আমরা দুটি বৈশিষ্ট্য পাই :

১। প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থাৎ কারণ হলো এমন একটি পূর্ববর্তী

ঘটনা, যা কার্য বা পরবর্তী ঘটনাকে নিয়ন্ত্রিত করে। যন্ত্র নিজের ইচ্ছায় কাজ করতে পারে না,
বাইরের শক্তি যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রিত করে।

২। যান্ত্রিক কাজের পেছনে উদ্দেশ্য বা বুদ্ধির কোন স্থান নেই। এই মতবাদ অনুসারে, কারণ

অন্ধভাবে কার্যকে নিয়ন্ত্রিত করে। যন্ত্রের কাজের মধ্যে উদ্দেশ্য বা বুদ্ধির পরিবর্তে অন্ধ

অনিবার্যতা রয়েছে।

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡

প্রতিটি কার্য উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, কোন কার্য কোন পূর্ববর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না,

ভবিষ্যতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ কোন ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্যই কার্যকে নিয়ন্ত্রিত করে। যখন

কোন মানুষ কঠিন পরিশ্রম করে তখন বিশেষ একটি উদ্দেশ্য তাকে এই পরিশ্রম করায়। এই

উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া -এটি পূর্ববর্তী ঘটনা নয়, এটি ভবিষ্যৎ ঘটনা,

যা তার বর্তমান কাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মানুষ অন্ধ যন্ত্রের মতো কাজ করে চলে না, তার

উদ্দেশ্যই তার কাজকে নিয়ন্ত্রিত করে। জড় বস্তুর পরিবর্তন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা চলে,

কোন প্রাণীর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। একটি পাথরকে না নাড়ালে সেটি স্থির হয়ে এক

জায়গায়ই থাকে, কিন্তুএকটি পোকাকে চলার পথে বাধা দিলে সেটি কোন পথে কিভাবে চলবে

তা বলা সহজ নয়। জড়বস্তুবাইরের শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তুপ্রাণী তার উদ্দেশ্য অর্জনের

জন্য অভ্যন্তরীণ শক্তি বা উদ্দীপনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণে

অন্ধতার কোন স্থান নেই।

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণের বৈশিষ্ট্য

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্তে¡র আমরা দুটি বৈশিষ্ট্য পাই :

১। প্রতিটি ঘটনা (কার্য) ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানে কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা
যায় না।

২। প্রতিটি কার্য প্রাণীর অভ্যন্তরীণ শক্তি বা উদ্দীপনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ ও জড়বাদ

উপরোক্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে জড়বাদী ও ভাববাদী দার্শনিকগণ বস্তুজগতের ভিন্ন ভিন্ন

ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জড়বাদীরা অর্থাৎ যারা যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্তে¡ বিশ্বাস করেন তাঁদের মতে,

জগতের সব কিছুই যান্ত্রিকভাবে ঘটে। এখানে উদ্দেশ্য বা আদর্শের কোন স্থান নেই। জড়

থেকেই যান্ত্রিকভাবে জীবনের উৎপত্তি হয়েছে; আর জীবন যান্ত্রিকভাবেই মনের সৃষ্টি করেছে।

জগতে যা কিছুঘটছে তা যান্ত্রিক নিয়মেই ঘটে চলেছে, তার মধ্যে এমন এক অনিবার্যতা

রয়েছে যে, অন্যরকম ঘটনা ঘটা কোন মতেই সম্ভব নয়। জগতে যে বিচিত্র ঘটনা ঘটছে তা

যান্ত্রিকভাবেই ঘটছে। বিশ্ব জুড়ে নির্বোধ জড়ের যান্ত্রিক খেলা চলছে। এখানে চৈতন্যের বিশেষ
কোন প্রভাব নেই।

উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ ও ভাববাদ

ভাববাদী দার্শনিকরা উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্তে¡ বিশ্বাসী। তাঁদের মতে, এ জগতের পেছনে

এক পরম চেতন সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে এবং এই বিশ্বজগৎ সেই পরম সত্তা থেকে উদ্ভূত। এই
বিশ্বজগৎ সেই সত্তারই প্রকাশমাত্র। জগতে সৃষ্টি, বৈচিত্র্য ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরম সত্তা

নিজেকে প্রকাশ করে চলেছেন। তিনি অসীম ও অনন্ত, কিন্তুসীমিত ও খন্ডের মধ্য দিয়েই তাঁর

প্রকাশ। জগতের ঐক্য, শৃ´খলা, সামঞ্জস্য ইত্যাদি প্রমাণ করে যে, জগতের মূলে এক বিরাট

উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য আছে। জীব পরম সত্তা বা এক অসীম অনন্ত চৈতন্য সত্তার প্রতিরূপ, সে
কারণে জীবের কার্য উদ্দেশ্যমূলক।

মূল্যায়ন

যান্ত্রিক নিয়মের দ্বারা জীবের কাজকে ব্যাখ্যা করা যায় না। জীবের এমন কতগুলি বৈশিষ্ট্য

আছে, যা যন্ত্রের নেই। সে কারণে জীবের কার্য যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ দ্বারা সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা

করা সম্ভব নয়। যেমন জীবের আত্মসংরক্ষণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিকাশের ক্ষমতা আছে।

বাইরের পরিবেশের সাথে কখনও সংগ্রাম করে, কখনও সামঞ্জস্য বিধান করে এবং প্রাকৃতিক

শক্তিকে প্রয়োজন মত ব্যবহার করে জীব আত্মরক্ষা করে। স্বাধীন গতি, স্বতঃস্ফ‚র্ত

ক্রিয়াশীলতা, প্রতিক্রিয়ার বৈচিত্র্য জীবের বৈশিষ্ট্য। জীবের আত্মসংস্কারের ক্ষমতা আছে। জীব

স্বনিয়ন্ত্রিত। এ সব কারণে যান্ত্রিক কার্যকারণ দিয়ে জীবের কার্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব

নয়। উদ্দেশ্যমূলক মতবাদ অনুসারে, জড়, প্রাণ ও মন হলো ভিন্ন ভিন্ন সত্তা এবং বিবর্তনের
এক একটি বিশেষ স্তরে এদের আবির্ভাব।

উপসংহার

বিভিন্ন সত্তার কোন এক স্তরে যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ উপযোগী হতে পারে, অন্য স্তরে আবার

নাও হতে পারে। যেমন জড়-জগতের যান্ত্রিক ব্যাখ্যা সম্ভব, কিন্তুপ্রাণী এবং মানুষের ক্ষেত্রে

সম্ভব নয়। উদ্দেশ্য বলতে আবার অনেক সময় অচেতন উদ্দেশ্য বুঝায়। যেমন কাপড়

উৎপাদনে যে যন্ত্র অর্থাৎ কাপড়ের কল, এর কাজ যান্ত্রিক; কিন্তুএই কাজেরও উদ্দেশ্য আছে

এবং তা হলো কাপড় উৎপাদন করা। তবে কাপড়ের কল এই উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন নয়

অর্থাৎ তার উদ্দেশ্য হলো অচেতন উদ্দেশ্য। এই দিক দিয়ে যান্ত্রিক কার্যকারণ ও উদ্দেশ্যমূলক

কার্যকারণের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। তাছাড়া বিশ্বজগতের ব্যাখ্যায় উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ

তত্ত¡ যেমন প্রয়োজন যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ও তেমনি প্রয়োজন। উভয়ের সহযোগিতায় জগতের
পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব।

সারাংশ

যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, জগতের প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী ঘটনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যান্ত্রিক

কাজের পেছনে কোন উদ্দেশ্য বা বুদ্ধির স্থান নেই, আছে অন্ধ অনিবার্যতা। উদ্দেশ্যমূলক

কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, কোন ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্যই কাজকে নিয়ন্ত্রিত করে। জড়বাদীরা যান্ত্রিক

কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে জগতের ব্যাখ্যা দেন আর ভাববাদীরা উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡
অনুসারে জগতের ব্যাখ্যা দেন।

জড়বাদীদের মতে, জগতের প্রতিটি ঘটনাই তার পূর্ববর্তী ঘটনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জগতের কোন

ঘটনাই স্বাধীনভাবে ঘটে না। এখানে উদ্দেশ্য বা আদর্শের কোন স্থান নেই, যান্ত্রিকভাবেই জড়

থেকে জীব, জীব থেকে মনের উৎপত্তি হয়। জগতের সব কিছুই যান্ত্রিক নিয়মেই ঘটে।

ভাববাদীদের মতে, জগতের পেছনে একজন পরম সত্তা আছেন, যার ইচ্ছায় জগতের কার্য পরিচালিত হয়। তিনি সর্বশক্তিমান। জীব পরম সত্তার প্রতিরূপ হওয়ায় জীবের কার্য
উদ্দেশ্যমূলক।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। যান্ত্রিক ও উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ সংক্ষেপে আলোচনা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। জড়বাদীরা কিভাবে জাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দেন? সংক্ষেপে তাদের মতবাদ ব্যাখ্যা

করুন।

২। উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণের দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করুন।

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন।

১। কার্যকারণের যান্ত্রিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করেন

(অ) জড়বাদীগণ (আ) ভাববাদীগণ

(ই) স্বজ্ঞাবাদীগণ (ঈ) উপরের সকলে

২। বিশ্বজগতের ঘটনাবলী ব্যাখ্যায় ভাববাদীরা

(অ) যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্তে¡ বিশ্বাসী (আ) উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্তে¡ বিশ্বাসী

(ই) স্বজ্ঞাবাদে বিশ্বাসী (ঈ) কোন মতবাদেই বিশ্বাসী নয়

৩। যান্ত্রিক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে

(অ) জগতের প্রতিটি ঘটনা পূর্ববর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

(আ) জগতের প্রতিটি ঘটনা পরবর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

(ই) জগতের প্রতিটি ঘটনা ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ।

(ঈ) জগতের প্রতিটি ঘটনা অতীত উদ্দেশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

৪। উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে জগতের পেছনে

(অ) এক পরমসত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। (আ) জড়বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে।

(ই) জড় ও প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। (ঈ) জড় ও পরমসত্তার অস্তিত্ব রয়েছে।

সত্য হলে ‘স', মিথ্যা হলে ‘মি' লিখুন।

১। যান্ত্রিক কাজের পিছনে বুদ্ধির পরিবর্তে রয়েছে অন্ধ অনিবার্যতা।

২। জীব বাইরের শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

৩। উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্ত¡ অনুসারে, জগতের প্রতিটি কার্য অতীত উদ্দেশ্য দ্বারা

নিয়ন্ত্রিত।

৪। জড়বাদীদের মতে, জগতের মূলে রয়েছে এক পরম সত্তার ইচ্ছা।

সঠিক উত্তর

১। (ই) স্বজ্ঞাবাদীগণ ২। (আ) উদ্দেশ্যমূলক কার্যকারণ তত্তে¡ বিশ্বাসী ৩। (অ) জগতের প্রতিটি ঘটনা

পূর্ববর্তী ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ৪। (অ) এক পরম সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে।