জড়বাদের যুক্তিগুলো উল্লেখ করুন এবং এর দোষ-ত্রæটি নির্দেশ করুন। সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে জড়বাদী মত সংক্ষেপে উল্লেখ করুন।

‘সত্তা' কথাটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় বলে এককথায় সত্তার সংজ্ঞা দেয়া সহজ নয়। তবে

সত্তা কথাটি সাধারণত দু'অর্থে বুঝা যায়। এক অর্থে, সাধারণ সত্তা বলতে বস্তুবা জিনিসের

মূল বা আদি উপাদানকে বুঝায়। এ অর্থে সত্তা বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। আরেক অর্থে, সৃষ্টির

মূল আধার বা উৎসকে বুঝানো হয়। এদিক থেকে অর্থাৎ দ্বিতীয় অর্থে, সত্তা পরম সত্তাকে
নির্দেশ করে।
পরম সত্তার প্রকৃতি

জগৎ ও জীবনের ব্যাখ্যা প্রদানই দর্শনের প্রধান কাজ। দর্শনের এ কাজের মধ্যেই এর স্বরূপ

নিহিত। দর্শন একটি সামগ্রিক বা সর্বাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। দর্শন যখনই কোন কিছুর

ব্যাখ্যা প্রদানে ব্রতী হয় তখন তার সে ব্যাখ্যা কোন না কোন তত্ত¡ বা সত্তার আলোকেই করা

হয়ে থাকে। পরম সত্তা হচ্ছে সেই সত্তা যা অন্য কোন সত্তা বা তত্তে¡র ওপর নির্ভর করে না।

সে নিজে নিজেই বিদ্যমান থাকে। সত্তার আলোচনায় আমরা সচরাচর দুটি প্রশ্নের সম্মুখীন হই।

একটি হচ্ছে, পরম সত্তা বা আদি উপাদানের প্রকৃতি সংক্রান্ত; আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তার সংখ্যা

সংক্রান্ত। পরম সত্তার প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ লক্ষ্য করা যায়। তবে মতবাদগুলোকে

প্রধানতঃ তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা- জড়বাদ, ভাববাদ ও অজ্ঞেয়তাবাদ। আর পরম

সত্তার সংখ্যা কত এ নিয়েও দর্শনের ইতিহাসে বিভিন্ন মতবাদের উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। এ

মতবাদগুলোকেও প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে; যথা- একত্ববাদ, দ্বৈতবাদ ও

বহুত্ববাদ। আমরা এ পাঠে সত্তার প্রকৃতি সম্পর্কীয় জড়বাদী মত আলোচনা করবো। পরবর্তী

পাঠসমূহে আমরা সত্তার প্রকৃতি সম্পর্কীয় ভাববাদী ও অজ্ঞেয়তাবাদী মত এবং সত্তার সংখ্যা
সম্পর্কীয় অন্যান্য মত আলোচনা করবো।

জড়বাদ

জড়বাদীরা জড় পদার্থকেই বিশ্বের আদি উপাদান বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, প্রাণ বা

মনসহ বিশ্বের সব কিছুই জড় পদার্থের সৃষ্টি। এ মতবাদের ইতিহাস খুবই পুরনো। পাশ্চাত্যের

ও গ্রিক দর্শনের জনক বলে খ্যাত দার্শনিক থেলিসকে জড়বাদের একজন সার্থক প্রবক্তা বলে

মনে করা হয়। তাছাড়া, গ্রিক দার্শনিক এনাক্সিম্যান্ডার, এনাক্সিমিনিস, হিরাক্লিটাস, এম্পিডক্লিস

ও এনাক্সাগোরাসের দর্শনে জড়বাদের পরিচয় পাওয়া যায়। মধ্যযুগীয় দর্শন ধর্মের প্রভাবে

প্রভাবিত ছিল বলে এ সময় জড়বাদের বিকাশ না ঘটলেও আধুনিক যুগের দর্শনে আবার এর

বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। থমাস হবস্, ল্যামেট্রি, হলব্যাক, জন টলান্ড, কট্ডোগার্ট ও আর্নেস্ট

প্রমুখ আধুনিক দার্শনিকদের দর্শনে জড়বাদের আলোচনা পরিলক্ষিত হয়। জড়বাদীদের মতে,

জড়ের দুটি পৃথক গুণ রয়েছে : যথা- বিস্তৃতি ও অভেদ্যতা। গতিই হচ্ছে জড় পদার্থের ধর্ম।

জড়বাদীরা জড় পদার্থ ও গতির সাহায্যে জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়াসহ জগতের সব

প্রক্রিয়াকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তাঁরা জগতের কোথাও কোন পরম শক্তি বা ঈশ্বরের

উদ্দেশ্য বা আদর্শের কথা স্বীকার করেন না। দার্শনিক হর্ণলি বলেন, জড়বাদ বিশ্বের সৃষ্টি-কর্মে

ঈশ্বরের হস্তক্ষেপকে পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে। এ মতবাদ জীবের আচরণে মন ও জীবনী

শক্তির অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। আর জড় পদার্থকে পরমাণুর যোগফল বলে মনে করে।

জড়বাদীদের যুক্তিসমূহ

ক. জড়বাদীরা প্রত্যক্ষণকেই জ্ঞানের একমাত্র উৎস মনে করেন। তাই যাকে বা যে

বিষয়কে প্রত্যক্ষ করা যায় না তার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। দ্রব্য, পরম সত্তা, ঈশ্বর,

আত্মা বা পরকাল এসবকে আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করতে পারি না। অতএব

একমাত্র জড় পদার্থ ছাড়া অন্য সব আধ্যাত্মিক বিষয়াদি সম্পূর্ণ অর্থহীন ও মারাত্মক

ভ্রান্তিকর।

খ. জড়বাদীরা জগতের বিভিন্ন ঘটনাকে কার্যকারণ নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা করেন। তাই তাঁরা

জড় ও গতির ক্রিয়াবলীকে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক বলে মনে করেন। আর এ অর্থে তাঁরা

জগতে কোন ঐশী উদ্দেশ্য বা আদর্শকে স্বীকার করেন না।

গ. জড়বাদীরা শক্তির অবিনশ্বরতা নীতি (খধি ড়ভ ঈড়হংবৎাধঃরড়হ ড়ভ ঊহবৎমু) তে

দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল। তাঁরা জগতের বিভিন্ন বস্তুবা ঘটনার মধ্যে কেবল আকারগত ও

পরিমাণগত পার্থক্যের কথা স্বীকার করেন। বিভিন্ন বস্তুবা ঘটনার মধ্যে যে গুণগত

পার্থক্য থাকতে পারে তা তাঁরা স্বীকার করেন না। এ অর্থে জড়বাদ বিদ্যুৎ, আলো,

বাতাস, চুম্বক, রাসায়নিক সম্বন্ধ ও যান্ত্রিক গতিকে একে অন্যের মধ্যে পরিবর্তনযোগ্য

বলে মনে করেন।

ঘ. জড়বাদীরা জড় পদার্থ ও প্রাণকে এক ও অভিন্ন বলে মনে করেন। এ দু'য়ের মধ্যে

গুণগত কোন পার্থক্য নেই। তবে গঠন-প্রক্রিয়ার দিক থেকে জড়ের সাথে প্রাণের

কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। জড় পদার্থের তুলনায় প্রাণ অপেক্ষাকৃত জটিল। সমকালীন

বিজ্ঞানীদের মতে, কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন গ্যাসের সমন¦য়ে

মানুষের জীবকোষ গঠিত। তাই প্রাণকে জড়ের অতিরিক্ত সত্তা
বলে অভিহিত করা যায় না।

ঙ. জড়বাদীদের মতে, আমরা যাকে চেতনা (পড়হংপরড়ঁংহবংং) বলে অভিহিত করি তা

আসলে জড় পদার্থ থেকেই উৎপত্তি লাভ করে। কেননা মস্তিষ্ক ক্রিয়ার অতিরিক্ত

স্বাধীন কোন চেতনা-প্রক্রিয়া নেই। আধুনিক জড়বাদীরা মনকে উপবস্তু, আর জড়কে

প্রকৃত বস্তুবলে মনে করেন। কেননা জড় ব্যতিত মনের কোন আলাদা সত্তা তাঁরা

স্বীকার করেন না।

চ. জড়বাদীরা যান্ত্রিক বিবর্তনবাদের একনিষ্ঠ সমর্থক। তাঁদের ধারণা, জড় থেকেই

বিশ্বজগৎ ও প্রাণের উদ্ভব বা সৃষ্টি। মানব দেহ হচ্ছে একটি যন্ত্রবিশেষ। প্রাণের শক্তি

বলে যা আছে তা আসলে জড় শক্তিরই এক জটিল রূপমাত্র।

ছ. জড়বাদীরা যেহেতুকার্যকারণ তত্তে¡র দ্বারা বিশ্বের ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াসী,

সেহেতুতাঁরা মনে করেন, বিশ্বের কোন ঘটনা প্রবাহই ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়।

জ. জড়বাদীরা যেহেতুসব ঘটনা বা বস্তুকেই যান্ত্রিক ও কার্যকারণ নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা

করতে চান, সেহেতুতাঁরা ধর্মীয় নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিধিবিধানকে অস্বীকার করেন।

তাঁরা ধর্মকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেন।

জড়বাদের সমালোচনা ও মূল্যায়ন

জড়বাদীদের উপর্যুক্ত বক্তব্য আপাতঃদৃষ্টিতে জোরালো ও আকর্ষণীয় মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে
তাঁদের এ ধরনের বক্তব্যে বিভিন্ন অসঙ্গতি লক্ষণীয় :

এক. জড়বাদে জাগতিক ঐক্য ও শৃ´খলার কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

জড়বাদীরা বিশ্বজগতে বুদ্ধি ও মননের ভ‚মিকাকে অস্বীকার করে গতি ও পরমাণুর

সাহায্যে জাগতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। তাঁরা জাগতিক ঐক্য, সংহতি

ও কলা-কৌশলকে পরমাণুর আকস্মিক সংযোগের ফল বলে অভিহিত করে জগৎ

সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন।

দুই. জড়বাদীদের সমর্থিত যান্ত্রিক বিবর্তনবাদের মধ্যেও নানা গড়মিল লক্ষ্য করা যায়।

জগতের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় জড়বাদ কোন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে অস্বীকার করে যান্ত্রিক

নিয়মে জগতের ব্যাখ্যা দিতে চায়। কিন্তুস্মরণ রাখা উচিত যে, মানুষ কোন যন্ত্র নয়।

তাই মানুষের ক্রিয়া-কলাপকে যান্ত্রিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না।

তিন. জড়বাদীরা প্রাণকে জড় থেকে সৃষ্ট এবং প্রাণশক্তি ও জড়শক্তিকে মূলত এক ও অভিন্ন

মনে করলেও আজ পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানী কৃত্রিম পদ্ধতিতে রাসায়নিক উপাদানের

সাহায্যে কোন সজীব জীবকোষ সৃষ্টি করতে পারেননি।

চার. জড়বাদ জীবকে জড়ের সমষ্টি বলে মনে করেন। আত্মবৃদ্ধি, আত্মসংস্কার, আত্মরক্ষাসহ

পরিবেশের সাথে অভিযোজনের মতো জীবের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করা যায়
কিভাবে? জড়বাদ এসবের কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।

পাঁচ. জড়বাদীরা মানসিক ক্রিয়ার ঐক্য ও ধারাবহিকতার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে

পারেননি। জড়বাদীরা মনকে মস্তিষ্কের উপবস্তু(বঢ়রঢ়যবহড়সবহড়হ) বলে মনে করেন।

কিন্তুমন যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তা দেহযন্ত্রকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করবে

কিভাবে? তার কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জড়বাদ দেননি।

ছয়. জড়বাদীরা জ্ঞানের উৎপত্তির ব্যাপারেও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পূর্ণ

জ্ঞানের উৎপত্তির জন্য জ্ঞাতা বা মনকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তুজড়বাদীরা মনের

স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকার করেন না বিধায় জ্ঞানের উৎপত্তির ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য সঠিক

নয়।

সাত. সমালোচকরা জড়বাদী মতকে চক্রক দোষে দোষী বলে মনে করেন। কেননা

জড়বাদীরা জড় পদার্থের সাহায্যে প্রথমে মনের ব্যাখ্যা দিয়ে তারপর মনের সাহায্যে

জড় পদার্থের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাই তাঁদের বক্তব্য চক্রক দোষে দুষ্ট।

আট. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথেও জড়বাদ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আধুনিক বিজ্ঞানীরা গতিহীন,

নিশ্চল, নিষ্ক্রিয় জড় পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, প্রতিটি পরমাণু

একটি শক্তিপুঞ্জ। এসব কারণে জড়বাদকে একটি সন্তোষজনক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ
করা যায় না।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। জড়বাদের যুক্তিগুলো উল্লেখ করুন এবং এর দোষ-ত্রæটি নির্দেশ করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে জড়বাদী মত সংক্ষেপে উল্লেখ করুন।

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন।

১। পরম সত্তা হলো সেই সত্তা যা

(অ) পরনির্ভর (আ) ভাগ করা যায় না

(ই) নিজে নিজেই বিদ্যমান (ঈ) মননির্ভর

২। সমকালীন বিজ্ঞানীদের মতে, জীবকোষ গঠিত হয়

(অ) কার্বন থেকে (আ) হাইড্রোজেন থেকে

(ই) অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন থেকে (ঈ) সবগুলোর সংমিশ্রণে

৩। জড়বাদীরা বিশ্বাস করেন

(অ) নৈতিকতায় (আ) ধর্মে

(ই) কার্যকারণ তত্তে¡ (ঈ) কোনটিতে নয়

৪। পরমসত্তার প্রকৃতি সংক্রান্ত মতবাদসমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যথা

(অ) একত্ববাদ, দ্বৈতবাদ ও বহুত্ববাদ (আ) জড়বাদ, ভাববাদ ও অজ্ঞেয়তাবাদ

(ই) আধ্যাত্মিক ভাববাদ, পরিদৃশ্যমান ভাববাদ ও বস্তুগত ভাববাদ

(ঈ) যন্ত্রবাদ, প্রাণবাদ ও উন্মেষবাদ

সত্য হলে ‘স', মিথ্যা হলে ‘মি' লিখুন।

১। জড়বাদীদের মতে, প্রাণ ও মনসহ বিশ্বের সব কিছুজড় পদার্থের সৃষ্টি।

২। জড়বাদীরা বিভিন্ন বস্তুর আকারগত ও পরিমাণগত পার্থক্যের কথা স্বীকার করেন না।

৩। জড়বাদীরা মনের আলাদা সত্তা স্বীকার করেন।

৪। আধুনিক বিজ্ঞানীরা গতিহীন, নিশ্চল ও নিষ্ক্রিয় জড় পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না।

সঠিক উত্তর

১। (ই) নিজে নিজেই বিদ্যমান ২। (ঈ) সবগুলোর সংমিশ্রণে ৩। (ই) কার্যকারণ তত্তে¡

৪। (আ) জড়বাদ, ভাববাদ ও অজ্ঞেয়তাবাদ

১। স ২। মি ৩। মি ৪। স