দর্শনের আভিধানিক অর্থ কী? দর্শনের উৎপত্তি বর্ণনা দর্শনের তিনটি বৈশিষ্ট্য দর্শনের পদ্ধতি আলোচনা করুন।

দর্শনের স্বরূপ জানতে হলে, আমাদের প্রথমে জানতে হবে দর্শন কী? এর উৎপত্তি কোথা

থেকে, এর বৈশিষ্ট্য কী, এর বিষয়বস্তু কী, লক্ষ্য কী? দর্শন শব্দটি মূলত সংস্কৃত শব্দ, এর

সাধারণ অর্থ দেখা। ‘দৃশ’ ধাতু থেকে দর্শন শব্দের উৎপত্তি। দর্শন বলতে সাধারণত চাক্ষুষ

প্রত্যক্ষণকে বুঝায়, তবে এখানে দর্শন মানে তত্ত¡-দর্শন, জগৎ ও জীবনের স্বরূপ উপলব্ধি।

আমরা আগেই জেনেছি, দর্শন শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ। এটি গ্রিক ভাষা

থেকে এসেছে। মানে হলো অনুরাগ এবং মানে হলো জ্ঞান

এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচেছ, জ্ঞানের প্রতি

অনুরাগ। আর জ্ঞানের প্রতি যার অনুরাগ আছে সে-ই দার্শনিক।

দর্শনের সংজ্ঞায় বলা যায়, এটি এমন একটি বিদ্যা যা অনুদার মতবাদ, ভাবাবেগ ও অন্ধবিশ্বাস

থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান বা সত্যের অনুসন্ধানে উদার দৃষ্টিভঙ্গি, অনুধ্যান, বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের

মাধ্যমে সত্তা, জগৎ ও জীবনের সাথে জড়িত চিরন্তন সমস্যাবলির সুষ্ঠু, যুক্তিসম্মত ও দৃঢ়
আলোচনা করার একটা প্রচেষ্টা।

দর্শনের কতিপয় বৈশিষ্ট্য

বিস্ময় থেকে জিজ্ঞাসা এবং জিজ্ঞাসা থেকেই দর্শনের উদ্ভব আক্সক্ষ

এই বিচিত্র জগতের দিকে মানুষ যখনই তাকিয়ে দেখে তখনই বিস্ময়ে তার মন ভরে ওঠে।

তার মনে কৌত‚হলের সৃষ্টি হয়। তার মনে নানা রকম প্রশ্ন জাগে, এই বিশ্বের উৎপত্তি কোথা

থেকে, কোথায় এর শেষ, এর কোনো স্রষ্টা আছে কিনা, থাকলে তিনি কেমন, তার স্বরূপ কী?

আমি কে, কোথা থেকে এলাম ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। বিস্ময় থেকে মানুষের মনে জেগে ওঠে

জানার আকাক্সক্ষা। বিচারবুদ্ধিস¤পন্ন মানুষ চায়, তার এই আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করতে। এভাবেই

উদ্ভব হয় দর্শনের। এজন্য প্লেটো বলেছেন, ‘বিস্ময়ই দর্শনের জনক’।

প্রকৃত সত্যের সন্ধান বা জ্ঞানের অন্বেষণ করাই দর্শনের মূল লক্ষ্য

প্রত্যেকেই জগৎ ও জীবন স¤পর্কে কিছু ধারণা করে। কিন্তু এই ধারণা সব সময় যথার্থ বা

সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। দর্শনের কাজ হলো, মানুষের এই সাধারণ ধারণাগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণের

মাধ্যমে পরীক্ষা করে জগৎ ও জীবন স¤পর্কে সুসংহত ও সঠিক জ্ঞান প্রদান করা।

তত্ত¡বিদ্যার প্রকৃতি অন্বেষণ করা

বস্তুর স্বরূপ বা যথাযথ রূপ স¤পর্কে জ্ঞানদান করাও দর্শনের কাজ। দর্শনের অন্তর্ভুক্ত তত্ত¡বিদ্যা

(ঙহঃড়ষড়মু) বস্তুর দুটি রূপ স¤পর্কে আলোচনা করে। একটি বস্তুর বাহ্যিক রূপ, অপরটি

বস্তুর প্রকৃত বা আন্তর রূপ। একটি বস্তুকে আমরা যেভাবে দেখতে পাই, তা হলো বস্তুটির

বাহ্যিক রূপ। বস্তুর এই রূপকে বলা হয় অবভাস ) এবং বস্তুটির প্রকৃত

রূপকে বলা হয় আন্তর সত্তা । বাহ্যরূপের অন্তরালে বস্তুর যে

প্রকৃত রূপ থাকে তা জানাই তত্ত¡বিদ্যার কাজ। আকাশ যে নীল তা আমরা প্রত্যক্ষ করি - এটা
হলো আকাশের বাহ্যিক রূপ। আর আমরা জানি, প্রকৃতপক্ষে আকাশের কোনো রং নেই

এটি হলো আকাশের প্রকৃত রূপ বা আন্তর সত্তা।

দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি সার্বিক ও সমন্বয়ধর্মী

দর্শন তার আলোচ্য বিষয়বস্তুকে বিচার করে এক অখন্ড দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বিভিন্ন বিজ্ঞান

প্রকৃতির বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে আলোচনা করে। তাই বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি খন্ড। কিন্তু দর্শনের

কাজ হলো, বিভিন্ন বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলোর সুষম সমন্বয় সাধন করে তারই প্রেক্ষিতে জগৎ ও

জীবনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা।

দর্শন ও বিজ্ঞানের পার্থক্য মাত্রাগত, স্বরূপগত নয়

বিশ্বজগতের বিভিন্ন বিভাগ সম্বন্ধে আলোচনা-পর্যালোচনা কালে, বিজ্ঞান কিছু ধারণা বা

সত্যকে বিচার না করে স্বীকার করে নেয়। দর্শন সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের

যৌক্তিকতা বিচার করে দেখে। সাধারণ জ্ঞানের তুলনায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সুসংহত ও সুসংবদ্ধ।

আবার বিজ্ঞানের তুলনায় দার্শনিক জ্ঞান আরও সুসংবদ্ধ, সুসংহত ও পূর্বাপর স¤পর্কযুক্ত।

দর্শন দেশ, কাল, কার্যকারণ স¤পর্ক, জড়, চেতনা, মন, বিবর্তন, স্রষ্টা, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি

বিষয় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো বিচার করে এগুলোর যৌক্তিকতা নির্ণয় করে এবং দার্শনিক

দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়।

দর্শন হলো জীবনের সমালোচনা

দর্শন জীবনের স্বরূপ, অর্থ ও উদ্দেশ্য নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করতে চায়। আমাদের জীবনের

মূল্যাবধারণ করা দর্শনের অন্যতম কাজ। দর্শন জীবনের পরম আদর্শ - সত্য, শুভ ও সুন্দর -

এর যৌক্তিকতা ও স্বরূপ বিচার করে। তাই দর্শনকে বলা হয়, জীবনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ।

দর্শনের অন্যতম কাজ হলো, জগতের সাথে মানব জীবনের স¤পর্ক নির্ধারণ এবং বিশ্বজগৎ

সম্বন্ধে এমন এক সুসংবদ্ধ ধারণা দেয়া যে ধারণার সাথে মানুষের বুদ্ধিগত, নৈতিক,

সৌন্দর্যগত ও ধর্মস¤পর্কীয় চেতনার সঙ্গতি থাকে। এজন্যই বলা হয়, দর্শন হলো জীবনের
সমালোচনা।

দর্শনের পদ্ধতি

দর্শন বিচারমূলক ও পদ্ধতিমূলক । দর্শন সত্তা, জগৎ ও জীবনের

সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রশ্নের সামগ্রিকভাবে আলোচনা ও মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। আর এ

করতে গিয়ে দর্শন একদিকে যেমন বিচারমূলক, অন্যদিকে তেমনি সংগঠনমূলক

। দর্শনে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি - স্বজ্ঞামূলক ), বিশ্লেষণী

বিচার-বিশ্লেষণী (, সংশ্লেষক ইত্যাদি পদ্ধতির

প্রয়োগ দেখা যায়।

দর্শনের আলোচ্য বিষয় ব্যাপক ও অনন্ত

জগৎ ও জীবনের স্বরূপ জানার জন্য দর্শন পরম সত্তা, মূল্য, জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি

নানা মৌলিক বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করে । আর এই আলোচনায় দর্শন

শুধু মৌলিক ধারণার পরিষ্করণ এবং মৌলিক বিশ্বাসের সমীক্ষণ করে না, বরং সংশ্লেষণের

মাধ্যমে জগৎ ও জীবনের একটি সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দেয়ার ও মূল্যায়নের চেষ্টা করে। দর্শন শুধু

তত্ত¡ালোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, দর্শন চায় জীবন-জগতের একটা সামগ্রিক ব্যাখ্যা দিতে। এ

কারণে যে কোনো গভীরতর বা মৌলিক জিজ্ঞাসা দর্শনের বিবেচ্য বিষয় হয়ে পড়ে।

উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দর্শনের স্বরূপ এককথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
বরং সমস্ত বিষয়ের সমন্বয়েই দর্শনের স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। দর্শনের স্বরূপ বর্ণনা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। দর্শনের আভিধানিক অর্থ কী? দর্শনের উৎপত্তি বর্ণনা করুন।

২। দর্শনের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন।

৩। দর্শনের পদ্ধতি আলোচনা করুন।

ক. বহু নির্বাচনী প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন

১। দর্শনের ইংরেজি প্রতিশব্দ

র) চযরষড়ংড়ঢ়যু

রর) চংুপযড়ষড়মু

ররর) চযুংরপং

রা) কোনোটি নয়

২। চযরষড়ংড়ঢ়যু এর আভিধানিক অর্থ

র) বই এর প্রতি অনুরাগ

রর) জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ

ররর) জ্ঞানীর প্রতি অনুরাগ

রা) মানুষের প্রতি অনুরাগ

৩। বস্তুর বাইরের রূপকে বলা হয়

র) অধ্যাস

রর) আভাস

ররর) অবভাস

রা) ইংগিত

৪। প্লেটো বলেন

র) আগ্রহই দর্শনের জননী

রর) কৌত‚হলই দর্শনের জননী

ররর) জিজ্ঞাসাই দর্শনের জননী

রা) বিস্ময়ই দর্শনের জনক

খ. সত্য হলে ‘স’ এবং মিথ্যা হলে ‘মি’ লিখুন।

১। চযরষড়ং শব্দের অর্থ জ্ঞান।

২। দর্শন কথাটির মানে তত্ত¡দর্শন।

৩। দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ ও খন্ড।

৪। দর্শনের আলোচ্য বিষয় ব্যাপক ও অনন্ত।

সঠিক উক্তর

ক.

১। র) চযরষড়ংড়ঢ়যু ২। রর) জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ ৩। ররর) অবভাস

৪। রা) বিস্ময়ই দর্শনের জনক

খ.

১। মি ২। স ৩। মি ৪। স