দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করুন।
দর্শন একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানশাখা। এর রয়েছে স্বতন্ত্র পদ্ধতি। আমরা আগেই দেখেছি, এই
পদ্ধতি বিচার-বিশ্লেষণধর্মী। এই বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যুক্তিবিদ্যার নিয়ম-নীতি প্রয়োগ
করা হয়। অনুধ্যানী ও বিশ্লেষণী উভয় প্রকার দর্শনে যুক্তিবিদ্যার এসব নিয়ম-নীতি কম-
বেশি অনুসরণ করা হয়।
দর্শন বুঝতে ও চর্চা করতে হলে তাই, বিশ্লেষণ বলতে কি বুঝায়, বিশ্লেষণের নিয়ম বা
কৌশল কি, যুক্তি কিভাবে গড়ে ওঠে, যুক্তি বা যুক্তিবিন্যাস কত প্রকার, ভুল যুক্তি
(অনুপপত্তি) কিভাবে ও কতভাবে ঘটে এসব বিষয় ভালভাবে জানা দরকার। যুক্তিবিদ্যার
উপর একটি পৃথক কোর্স রয়েছে; এজন্য আমরা বর্তমান ইউনিটে যুক্তি সংক্রান্ত কিছু
প্রাথমিক ও উল্লেখযোগ্য বিষয় মাত্র উল্লেখ করবো। উল্লেখ্য, এই ইউনিটে মূলত কোনো
দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়নি, দার্শনিক বিষয় কিভাবে জানতে ও পড়তে হয়
এবং চর্চা করতে হয় সেসব নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।
দর্শন শুধু পড়া বা শেখার বিষয় নয়, বাস্তব জীবনে এর শিক্ষা ও কৌশল প্রয়োগ করা বা
অনুশীলন করাই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন অনুশীলনের জন্য দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আমরা ‘দর্শন ও অন্যান্য বিষয়’ শীর্ষক পূর্ববর্তী ইউনিট ৩ হতে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে
বৈজ্ঞানিক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সম্পর্কে জেনেছি। বর্তমান পাঠে আমরা
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যগুলো এবং তা অনুসরণ করে কিভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা যায়
তা জানার চেষ্টা করবো।
মুক্ত মনমানসিকতা
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান ও প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো মুক্ত মনমানসিকতা। মুক্ত মনমানসিকতার
প্রকাশ ঘটে তখনই যখন আমরা কোনো মত বা ধারণাকে সত্যিকারভাবে যাচাই-বাছাই করে
গ্রহণ বা বর্জন করি। প্রায়ই দেখা যায় যে, আমরা কোনো মত বা ধারণাকে এই কারণে
বাতিল করে দেই যে, উক্ত মত বা ধারণাটি আমাদের প্রচারিত বা পূর্বপোষিত ধারণার সাথে
মেলে না। কোনো ধারণা বা মত প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত ধারণার সাথে না মিললে অথবা তা
নতুন, আশ্চর্য, কিংবা বিমূর্ত হলেই তাকে বাতিল করে দেয়া যাবে না। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ
বিচার-বিশ্লেষণ করে কোনো মত বা ধারণার মূল্য নিরূপণ করতে হবে।
গভীর চিন্তাশক্তি
আমরা প্রায়ই অধিকাংশ বিষয়কে খুব সহজেই গ্রহণ করি এবং সে সম্বন্ধে সরল ও ভাসা-ভাসা
চিন্তা করি। অথচ চিন্তা-প্রক্রিয়া আদৌ সহজ নয়। যে কোনো বিষয় সম্বন্ধে সত্যিকার কোনো
জ্ঞান লাভ করতে হলে, ঐ বিষয়কে অবশ্যই গভীর ও বিশুদ্ধভাবে বিবেচনা করতে হবে। এই
গভীর ও বিশুদ্ধভাবে চিন্তার তাগিদে দার্শনিকরা যে কোনো মৌলিক বিষয় বা সমস্যা সম্পর্কে
বিভিন্নভাবে প্রশ্ন তোলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব-এর বিষয়টি গ্রহণ করা যাক।
দার্শনিকরা প্রশ্ন তোলেন, স্রষ্টা বলতে বস্তুত কী বুঝায়? স্রষ্টা কি নিছক একটি ধারণা? এ ধারণা
কি সহজাত না অভিজ্ঞতাজাত? অস্তিত্ব বলতে কি বুঝায়? অস্তিত্ব কথাটি আমরা যে অর্থে গ্রহণ
করি স্রষ্টার ক্ষেত্রে সে অর্থে প্রযোজ্য কিনা, প্রভৃতি। এই প্রশ্নের সাথে সাথে দার্শনিকরা স্রষ্টা,
অস্তিত্ব ও স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্বন্ধে মানবজাতির বিভিন্ন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে দেখেন।
বস্তুত যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিভিন্ন পটভ‚মি ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচিত হতে পারে।
কোনো আলোচ্য বিষয় কি পটভ‚মি ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচিত হবে তা নির্ধারণের জন্য
দার্শনিকরা বিষয়টিকে গভীর ও বিশদভাবে পর্যালোচনা করে দেখেন।
অন্যের মত বিবেচনা
মুক্তমন ও গভীর চিন্তাশক্তিই যথেষ্ট নয়। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে চাইলে আপনাকে
অবশ্যই অন্য মত বা ধারণাকে পরিপূর্ণ ও সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যরা তাদের
বিশ্বাস, মত বা অবস্থান কেন গ্রহণ করেছেন তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রয়োজন, ঐ সব মত,
পথ ও বিশ্বাসের ভিত্তি কি তা সর্বাগ্রে বুঝার চেষ্টা করা। এমনকি অন্য মত পুরোপুরি না বুঝা
পর্যন্ত নিজস্ব মত বা অবধারণ স্থগিত রাখা উচিত।
অন্যের মতের প্রতিটি আলোচনা বা পাঠ সহিষ্ণুতা ও বদান্যতার সাথে করা উচিত। অন্য
মতের যুক্তিসমূহের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে হলে যুক্তিসমূহকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অনুক‚ল
পটভ‚মি বা প্রসঙ্গে ফেলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অন্য কথায় বলা যায়, কেন দার্শনিক গাজ্জালি
বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার তুলনায় স্বজ্ঞার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা বুঝার জন্য ধরে
নিতে হবে গাজ্জালি একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ, তাঁর যুক্তিসমূহ গভীরভাবে বিবেচনার দাবি
রাখে। স্বজ্ঞার স্বপক্ষে তাঁর যুক্তিসমূহ যদি যথার্থ হয়, তাহলে তা থেকে আপনি আমি নতুন
কিছু শিখবো। অন্যথায়, যথার্থ না হলে আমরা অন্তত এমন একটি অবস্থানে এসে পৌঁছাবো
যেখান থেকে পক্ষপাতহীন বিচারের পর যুক্তিযুক্তভাবে তাঁর মতকে বাতিল করে দিতে
পারবো। তাছাড়া, অন্যমত যথার্থভাবে বিবেচনার একটি দাবি বা পরিণতি হলো, অন্য মতের
সবলতা ও দুর্বলতা পরিষ্কার হয়ে উঠার সাথে সাথে নিজস্ব মতের সবলতা-দুর্বলতা পূর্বের
তুলনায় অধিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
সংশয়ী মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি (ঝশবঢ়ঃরপধষ ঙঁঃষড়ড়শ)
আমরা পূর্বেই জেনেছি, কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে হলে তা গভীরভাবে
পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজন প্রশ্নের উত্থাপন। প্রশ্ন
উত্থাপনের অর্থ হলো, এমন কিছু সম্বন্ধে সন্দেহ প্রদর্শন করা, যার পক্ষে কোনো চ‚ড়ান্ত বা
সিদ্ধান্তমূলক সাক্ষ্য নেই।
মানুষিক সংশয়
অনেকেই বলেন, যেমন দার্শনিক হিউম, কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, আমাদের
সম্বল কেবল বিশ্বাস। কোনো কিছুকে জানতে হলে সব কিছুকে জানতে হবে। সব কিছু জানা
অসম্ভব। সুতরাং মানুষমাত্রই সংশয়ী হতে বাধ্য। এরূপ অবস্থান যে সঙ্গত বা স্বাভাবিক নয়,
তা সহজেই প্রদর্শন করা যায়। গান কোনোা আনন্দদায়ক কিনা তা বুঝার জন্য সমুদ্রের
তলদেশের অবস্থা কিংবা আলোর গতি জানার প্রয়োজন নেই। কোনো কিছুই যদি জানা সম্ভব
না-ই হয়, তাহলে এই যে ‘কোনো কিছু জানা যায় না’ তা জানা গেলো কিভাবে? বস্তুত
সামগ্রিক বা চ‚ড়ান্ত সংশয় অগ্রহণযোগ্য। এটি দার্শনিকভাবে ধ্বংসাÍক ও বাস্তবে আত্মবিনাশী।
কেউই এরূপ সংশয়বাদের উপর জীবন রচনা করতে পারেন না।
আংশিক ও সৃজনমূলক সংশয়
সবকিছু সম্বন্ধে নয়, কেবল বিবেচ্য বিষয় সম্বন্ধে আমরা সংশয় পোষণ করবো। এ সংশয়ের
উদ্দেশ্য হবে, যথার্থ জ্ঞানলাভ। আমরা প্রশ্ন তুলবো এ আশায় যে, অন্তত কিছু বিষয় সম্বন্ধে
আমরা জ্ঞানলাভ করতে পারি। আর এজন্য আমরা আবশ্যই বিশ্বাস করবো যে, কিছু জ্ঞান
লাভ করা সম্ভব। সৃজনমূলক সংশয়ের স্বার্থে আমরা নিজেদের মত বা তথ্যকে পরিত্যাগ না
করে বরং সাময়িকভাবে স্থগিত বা পাশে সরিয়ে রাখবো। সংশয় কেটে গেলেই আমরা গ্রহণ বা
বর্জন করব। এই মনোভাব অর্থাৎ সৃজনমূলক সংশয় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য
বৈশিষ্ট্য। আধুনিক দর্শনের জনক ডেকার্ট তাঁর সাময়িক সৃজনমূলক সংশয়ের মাধ্যমে কিভাবে
সত্যে উপনীত হয়েছিলেন, এ প্রসঙ্গে আমরা তা স্মরণ করতে পারি।
সবিচার বিশ্লেষণ (ঈৎরঃরপধষ অহধষুংরং)
চিন্তা ও অন্য মতের বিবেচনার সাথে সাথে আপনি আপনার কোনোা, পড়া বা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় বা বক্তব্যের উপর একটি বিচারশীল দৃষ্টি ও সৃজনমূলক সংশয়ী মনোভাব গড়ে তুলবেন।
ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ব্যবহার
আপনার উচিত প্রতিটি বক্তব্যকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে পরীক্ষা করা। ক্ষেত্রে, আপনি
আপনার পঞ্চেন্দ্রিয় ও অন্তরেন্দ্রিয় প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেন। তাছাড়া,
আপনার উচিত, নিজের সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে, বিশেষত মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধীয়, সকল
তত্ত¡ ও প্রকল্পকে পরীক্ষা করা। এ পরীক্ষা সম্পাদনের ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই বিবেকী,
সতর্ক ও যথাযথ হতে হবে।
যুক্তিচিন্তন ও যুক্তিবিদ্যার ব্যবহার
অধিকন্তু, আপনাকে অবশ্যই আপনার নিজস্ব যুক্তি ও বক্তব্যসহ সকল যুক্তি ও বক্তব্যকে
যুক্তিবিদ্যা ও যুক্তিচিন্তনের সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষা করতে হবে। আর যুক্তিচিন্তন ও
যুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ (পড়সসড়হ) যৌক্তিক অনুপপত্তিসমূহ সম্বন্ধে সতর্ক থাকতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দর্শন অনুশীলনের স্বার্থে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো : ১) মুক্ত মন ২) গভীর চিন্তাশক্তি ৩) অন্যমত
বিবেচনা ৪) সংশয়ী মনোভাব ও ৫। বিচারমূলক বিশ্লেষণ।
রচনামূলক প্রশ্ন
১। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। অন্যমত বিবেচনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করুন।
২। সামগ্রিক ও আংশিক সংশয়ের পার্থক্য প্রদর্শন করুন।
ক) বহু নির্বাচনী প্রশ্ন
সটিক উত্তর লিখুন।
১। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য হলো
র) মুক্ত মনমানসিকতা
রর) গভীর চিন্তাশক্তি
ররর) অন্যমত বিবেচনা
রা) উপরের সবগুলি
২। বক্তব্য বা বচন পরীক্ষা করতে হবে
র) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
রর) স্বজ্ঞার মাধ্যমে
ররর) যুক্তিচিন্তনের মাধ্যমে
রা) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও যুক্তি চিন্তনের
মাধ্যমে
৩। সৃজনমূলক সংশয়ের কারণে
র) নিজস্ব মতকে বর্জন করতে হয়
রর) নিজস্ব মতকে পরীক্ষা করতে হয়
ররর) নিজস্ব মতকে সংশোধন করতে হয়
রা) নিজস্ব মতকে স্থগিত রাখতে হয়
৪। সামগ্রিক সংশয়
র) সব কিছুতে সংশয় প্রকাশ করে
রর) কিছু বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে
ররর) বিশ্বাসের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে
রা) উপরের কোনোটিই নয়
খ) সত্য হলে ‘স’ এবং মিথ্যা হলে ‘মি’ লিখুন।
১। প্রচলিত ধারণার সাথে অমিল ঘটলেই যে কোনো ধারণা বাতিল হয়ে যাবে।
২। চিন্তা-প্রক্রিয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া ।
৩। অন্য মতের আলোচনা সহিষ্ণুতা ও বদান্যতার সাথে করা উচিত।
৪। দার্শনিক ডেকার্ট একজন সামগ্রিক সংশয়বাদী।
সঠিক উত্তর
ক)
১। রা) উপরের সবগুলি ২। রা) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও যুক্তি চিন্তনের মাধ্যমে
৩। রা) নিজস্ব মতকে স্থগিত রাখতে হয় ৪। র) সব কিছুতে সংশয় প্রকাশ করে
খ) ১। মি ২। স ৩। স ৪। মি
পদ্ধতি বিচার-বিশ্লেষণধর্মী। এই বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যুক্তিবিদ্যার নিয়ম-নীতি প্রয়োগ
করা হয়। অনুধ্যানী ও বিশ্লেষণী উভয় প্রকার দর্শনে যুক্তিবিদ্যার এসব নিয়ম-নীতি কম-
বেশি অনুসরণ করা হয়।
দর্শন বুঝতে ও চর্চা করতে হলে তাই, বিশ্লেষণ বলতে কি বুঝায়, বিশ্লেষণের নিয়ম বা
কৌশল কি, যুক্তি কিভাবে গড়ে ওঠে, যুক্তি বা যুক্তিবিন্যাস কত প্রকার, ভুল যুক্তি
(অনুপপত্তি) কিভাবে ও কতভাবে ঘটে এসব বিষয় ভালভাবে জানা দরকার। যুক্তিবিদ্যার
উপর একটি পৃথক কোর্স রয়েছে; এজন্য আমরা বর্তমান ইউনিটে যুক্তি সংক্রান্ত কিছু
প্রাথমিক ও উল্লেখযোগ্য বিষয় মাত্র উল্লেখ করবো। উল্লেখ্য, এই ইউনিটে মূলত কোনো
দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়নি, দার্শনিক বিষয় কিভাবে জানতে ও পড়তে হয়
এবং চর্চা করতে হয় সেসব নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে।
দর্শন শুধু পড়া বা শেখার বিষয় নয়, বাস্তব জীবনে এর শিক্ষা ও কৌশল প্রয়োগ করা বা
অনুশীলন করাই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন অনুশীলনের জন্য দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আমরা ‘দর্শন ও অন্যান্য বিষয়’ শীর্ষক পূর্ববর্তী ইউনিট ৩ হতে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে
বৈজ্ঞানিক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সম্পর্কে জেনেছি। বর্তমান পাঠে আমরা
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যগুলো এবং তা অনুসরণ করে কিভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা যায়
তা জানার চেষ্টা করবো।
মুক্ত মনমানসিকতা
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান ও প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো মুক্ত মনমানসিকতা। মুক্ত মনমানসিকতার
প্রকাশ ঘটে তখনই যখন আমরা কোনো মত বা ধারণাকে সত্যিকারভাবে যাচাই-বাছাই করে
গ্রহণ বা বর্জন করি। প্রায়ই দেখা যায় যে, আমরা কোনো মত বা ধারণাকে এই কারণে
বাতিল করে দেই যে, উক্ত মত বা ধারণাটি আমাদের প্রচারিত বা পূর্বপোষিত ধারণার সাথে
মেলে না। কোনো ধারণা বা মত প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত ধারণার সাথে না মিললে অথবা তা
নতুন, আশ্চর্য, কিংবা বিমূর্ত হলেই তাকে বাতিল করে দেয়া যাবে না। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ
বিচার-বিশ্লেষণ করে কোনো মত বা ধারণার মূল্য নিরূপণ করতে হবে।
গভীর চিন্তাশক্তি
আমরা প্রায়ই অধিকাংশ বিষয়কে খুব সহজেই গ্রহণ করি এবং সে সম্বন্ধে সরল ও ভাসা-ভাসা
চিন্তা করি। অথচ চিন্তা-প্রক্রিয়া আদৌ সহজ নয়। যে কোনো বিষয় সম্বন্ধে সত্যিকার কোনো
জ্ঞান লাভ করতে হলে, ঐ বিষয়কে অবশ্যই গভীর ও বিশুদ্ধভাবে বিবেচনা করতে হবে। এই
গভীর ও বিশুদ্ধভাবে চিন্তার তাগিদে দার্শনিকরা যে কোনো মৌলিক বিষয় বা সমস্যা সম্পর্কে
বিভিন্নভাবে প্রশ্ন তোলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব-এর বিষয়টি গ্রহণ করা যাক।
দার্শনিকরা প্রশ্ন তোলেন, স্রষ্টা বলতে বস্তুত কী বুঝায়? স্রষ্টা কি নিছক একটি ধারণা? এ ধারণা
কি সহজাত না অভিজ্ঞতাজাত? অস্তিত্ব বলতে কি বুঝায়? অস্তিত্ব কথাটি আমরা যে অর্থে গ্রহণ
করি স্রষ্টার ক্ষেত্রে সে অর্থে প্রযোজ্য কিনা, প্রভৃতি। এই প্রশ্নের সাথে সাথে দার্শনিকরা স্রষ্টা,
অস্তিত্ব ও স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্বন্ধে মানবজাতির বিভিন্ন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে দেখেন।
বস্তুত যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিভিন্ন পটভ‚মি ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচিত হতে পারে।
কোনো আলোচ্য বিষয় কি পটভ‚মি ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিবেচিত হবে তা নির্ধারণের জন্য
দার্শনিকরা বিষয়টিকে গভীর ও বিশদভাবে পর্যালোচনা করে দেখেন।
অন্যের মত বিবেচনা
মুক্তমন ও গভীর চিন্তাশক্তিই যথেষ্ট নয়। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে চাইলে আপনাকে
অবশ্যই অন্য মত বা ধারণাকে পরিপূর্ণ ও সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যরা তাদের
বিশ্বাস, মত বা অবস্থান কেন গ্রহণ করেছেন তা খতিয়ে দেখার জন্য প্রয়োজন, ঐ সব মত,
পথ ও বিশ্বাসের ভিত্তি কি তা সর্বাগ্রে বুঝার চেষ্টা করা। এমনকি অন্য মত পুরোপুরি না বুঝা
পর্যন্ত নিজস্ব মত বা অবধারণ স্থগিত রাখা উচিত।
অন্যের মতের প্রতিটি আলোচনা বা পাঠ সহিষ্ণুতা ও বদান্যতার সাথে করা উচিত। অন্য
মতের যুক্তিসমূহের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে হলে যুক্তিসমূহকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অনুক‚ল
পটভ‚মি বা প্রসঙ্গে ফেলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অন্য কথায় বলা যায়, কেন দার্শনিক গাজ্জালি
বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার তুলনায় স্বজ্ঞার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা বুঝার জন্য ধরে
নিতে হবে গাজ্জালি একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ, তাঁর যুক্তিসমূহ গভীরভাবে বিবেচনার দাবি
রাখে। স্বজ্ঞার স্বপক্ষে তাঁর যুক্তিসমূহ যদি যথার্থ হয়, তাহলে তা থেকে আপনি আমি নতুন
কিছু শিখবো। অন্যথায়, যথার্থ না হলে আমরা অন্তত এমন একটি অবস্থানে এসে পৌঁছাবো
যেখান থেকে পক্ষপাতহীন বিচারের পর যুক্তিযুক্তভাবে তাঁর মতকে বাতিল করে দিতে
পারবো। তাছাড়া, অন্যমত যথার্থভাবে বিবেচনার একটি দাবি বা পরিণতি হলো, অন্য মতের
সবলতা ও দুর্বলতা পরিষ্কার হয়ে উঠার সাথে সাথে নিজস্ব মতের সবলতা-দুর্বলতা পূর্বের
তুলনায় অধিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
সংশয়ী মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি (ঝশবঢ়ঃরপধষ ঙঁঃষড়ড়শ)
আমরা পূর্বেই জেনেছি, কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে হলে তা গভীরভাবে
পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজন প্রশ্নের উত্থাপন। প্রশ্ন
উত্থাপনের অর্থ হলো, এমন কিছু সম্বন্ধে সন্দেহ প্রদর্শন করা, যার পক্ষে কোনো চ‚ড়ান্ত বা
সিদ্ধান্তমূলক সাক্ষ্য নেই।
মানুষিক সংশয়
অনেকেই বলেন, যেমন দার্শনিক হিউম, কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, আমাদের
সম্বল কেবল বিশ্বাস। কোনো কিছুকে জানতে হলে সব কিছুকে জানতে হবে। সব কিছু জানা
অসম্ভব। সুতরাং মানুষমাত্রই সংশয়ী হতে বাধ্য। এরূপ অবস্থান যে সঙ্গত বা স্বাভাবিক নয়,
তা সহজেই প্রদর্শন করা যায়। গান কোনোা আনন্দদায়ক কিনা তা বুঝার জন্য সমুদ্রের
তলদেশের অবস্থা কিংবা আলোর গতি জানার প্রয়োজন নেই। কোনো কিছুই যদি জানা সম্ভব
না-ই হয়, তাহলে এই যে ‘কোনো কিছু জানা যায় না’ তা জানা গেলো কিভাবে? বস্তুত
সামগ্রিক বা চ‚ড়ান্ত সংশয় অগ্রহণযোগ্য। এটি দার্শনিকভাবে ধ্বংসাÍক ও বাস্তবে আত্মবিনাশী।
কেউই এরূপ সংশয়বাদের উপর জীবন রচনা করতে পারেন না।
আংশিক ও সৃজনমূলক সংশয়
সবকিছু সম্বন্ধে নয়, কেবল বিবেচ্য বিষয় সম্বন্ধে আমরা সংশয় পোষণ করবো। এ সংশয়ের
উদ্দেশ্য হবে, যথার্থ জ্ঞানলাভ। আমরা প্রশ্ন তুলবো এ আশায় যে, অন্তত কিছু বিষয় সম্বন্ধে
আমরা জ্ঞানলাভ করতে পারি। আর এজন্য আমরা আবশ্যই বিশ্বাস করবো যে, কিছু জ্ঞান
লাভ করা সম্ভব। সৃজনমূলক সংশয়ের স্বার্থে আমরা নিজেদের মত বা তথ্যকে পরিত্যাগ না
করে বরং সাময়িকভাবে স্থগিত বা পাশে সরিয়ে রাখবো। সংশয় কেটে গেলেই আমরা গ্রহণ বা
বর্জন করব। এই মনোভাব অর্থাৎ সৃজনমূলক সংশয় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য
বৈশিষ্ট্য। আধুনিক দর্শনের জনক ডেকার্ট তাঁর সাময়িক সৃজনমূলক সংশয়ের মাধ্যমে কিভাবে
সত্যে উপনীত হয়েছিলেন, এ প্রসঙ্গে আমরা তা স্মরণ করতে পারি।
সবিচার বিশ্লেষণ (ঈৎরঃরপধষ অহধষুংরং)
চিন্তা ও অন্য মতের বিবেচনার সাথে সাথে আপনি আপনার কোনোা, পড়া বা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় বা বক্তব্যের উপর একটি বিচারশীল দৃষ্টি ও সৃজনমূলক সংশয়ী মনোভাব গড়ে তুলবেন।
ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ব্যবহার
আপনার উচিত প্রতিটি বক্তব্যকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে পরীক্ষা করা। ক্ষেত্রে, আপনি
আপনার পঞ্চেন্দ্রিয় ও অন্তরেন্দ্রিয় প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারেন। তাছাড়া,
আপনার উচিত, নিজের সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে, বিশেষত মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধীয়, সকল
তত্ত¡ ও প্রকল্পকে পরীক্ষা করা। এ পরীক্ষা সম্পাদনের ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই বিবেকী,
সতর্ক ও যথাযথ হতে হবে।
যুক্তিচিন্তন ও যুক্তিবিদ্যার ব্যবহার
অধিকন্তু, আপনাকে অবশ্যই আপনার নিজস্ব যুক্তি ও বক্তব্যসহ সকল যুক্তি ও বক্তব্যকে
যুক্তিবিদ্যা ও যুক্তিচিন্তনের সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষা করতে হবে। আর যুক্তিচিন্তন ও
যুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ (পড়সসড়হ) যৌক্তিক অনুপপত্তিসমূহ সম্বন্ধে সতর্ক থাকতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দর্শন অনুশীলনের স্বার্থে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো : ১) মুক্ত মন ২) গভীর চিন্তাশক্তি ৩) অন্যমত
বিবেচনা ৪) সংশয়ী মনোভাব ও ৫। বিচারমূলক বিশ্লেষণ।
রচনামূলক প্রশ্ন
১। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন
১। অন্যমত বিবেচনার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করুন।
২। সামগ্রিক ও আংশিক সংশয়ের পার্থক্য প্রদর্শন করুন।
ক) বহু নির্বাচনী প্রশ্ন
সটিক উত্তর লিখুন।
১। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য হলো
র) মুক্ত মনমানসিকতা
রর) গভীর চিন্তাশক্তি
ররর) অন্যমত বিবেচনা
রা) উপরের সবগুলি
২। বক্তব্য বা বচন পরীক্ষা করতে হবে
র) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
রর) স্বজ্ঞার মাধ্যমে
ররর) যুক্তিচিন্তনের মাধ্যমে
রা) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও যুক্তি চিন্তনের
মাধ্যমে
৩। সৃজনমূলক সংশয়ের কারণে
র) নিজস্ব মতকে বর্জন করতে হয়
রর) নিজস্ব মতকে পরীক্ষা করতে হয়
ররর) নিজস্ব মতকে সংশোধন করতে হয়
রা) নিজস্ব মতকে স্থগিত রাখতে হয়
৪। সামগ্রিক সংশয়
র) সব কিছুতে সংশয় প্রকাশ করে
রর) কিছু বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে
ররর) বিশ্বাসের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে
রা) উপরের কোনোটিই নয়
খ) সত্য হলে ‘স’ এবং মিথ্যা হলে ‘মি’ লিখুন।
১। প্রচলিত ধারণার সাথে অমিল ঘটলেই যে কোনো ধারণা বাতিল হয়ে যাবে।
২। চিন্তা-প্রক্রিয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া ।
৩। অন্য মতের আলোচনা সহিষ্ণুতা ও বদান্যতার সাথে করা উচিত।
৪। দার্শনিক ডেকার্ট একজন সামগ্রিক সংশয়বাদী।
সঠিক উত্তর
ক)
১। রা) উপরের সবগুলি ২। রা) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও যুক্তি চিন্তনের মাধ্যমে
৩। রা) নিজস্ব মতকে স্থগিত রাখতে হয় ৪। র) সব কিছুতে সংশয় প্রকাশ করে
খ) ১। মি ২। স ৩। স ৪। মি