গাযালী কিভাবে বিভিন্ন ধর্মতাত্তি¡ক মতবাদ সমালোচনা করে বর্জন করেন? আলোচনা করুন।

‘তাহফাত-উল-ফালাসিফাহ্’ নামক গ্রন্থে গাযালী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দার্শনিকদের মতবাদের তীব্র

সমালোচনা করেন এবং তাঁদের মতবাদের অসারতা তুলে ধরেন। তিনি এক সংশয়বাদী মন নিয়ে

দার্শনিক আলোচনা শুরু করেন। তিনি প্রথমে সংশয় করেন আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহকে, কারণ ইন্দ্রিয়

আমাদের প্রায়ই ভুল জ্ঞান প্রদান করে যা বুদ্ধির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি। এরপর তিনি বুদ্ধিকে

সংশয় করতে থাকেন এবং চিন্তা করেন, কিভাবে বা কি মাধ্যমে বুদ্ধির ভুলগুলি জানা যায়। এক্ষেত্রে

তিনি খুঁজে পান স্বয়ং আল্লাহ্কে। যার মাধ্যমে বুদ্ধির ভুলগুলি জানা সম্ভব।

গাযালী স্বাধীন চিন্তা ও বিবেকের সাহায্যে জগৎ ও জীবনকে জানতে চেয়েছেন। তাই তিনি সব কিছুই

যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। অবশেষে মরমী অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্যকে

জানতে পেরেছেন।

তিনি তাঁর পূর্ববর্তী ধর্মতাত্তি¡ক সম্প্রদায়গুলিকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং তাদের ত্রæটিগুলি

নির্দেশ করেন : (১) স্কলাস্টিক ধর্মতাত্তি¡ক সম্প্রদায় (২) তালেমী সম্প্রদায় (৩) দার্শনিক সম্প্রদায় ও

(৪) সুফী সম্প্রদায়।

(১) স্কলাস্টিক ধর্মতাত্তি¡ক সম্প্রদায় বলতে তিনি আশারিয়া সম্প্রদায়কে বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে এই

সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদগণ মুতাযিলাদের যুক্তি খন্ডন করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত সত্যকে জানার

জন্য নিজস্ব কোন মৌলিক যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি। তাই তিনি তাদের মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয় বলে

বাতিল করেন।

(২) তালেমী সম্প্রদায়ের মতবাদকে তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, তারা নির্বিচারে মনে করেন

যে যথার্থ ও অকাট্য শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে জানা যায়। অর্থাৎ এ সম্প্রদায়ের মতবাদ হল

বিচারবিযুক্ত মতবাদ যা কখনও প্রকৃত সত্যের সন্ধান দিতে পারে না।

(৩) দার্শনিক সম্প্রদায়কে তিনি তীব্রভাবে সমালোচনা করে বলেন, দার্শনিকগণ যুক্তি দিয়েই তাদের

মতবাদসমূহ প্রদান করেন এবং সত্যকে জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন যে,

শুধু বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা দিয়ে পরম সত্তার জ্ঞানলাভ করা যায় না। এছাড়া আস্তিক দার্শনিকরা জগৎ, আল্লাহ্র

জ্ঞান, দেহের পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়ে যে মতবাদ প্রদান করেন তিনি তার তীব্র সমালোচনা করে তাঁর
মতবাদ প্রদান করেন।

(৪) এরপর তিনি সুফী মতবাদ সম্বন্ধে জানার জন্য তাদের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি ভালোভাবে অধ্যয়ন

করেন। সুফীদের মতে, তন্ময়াবস্থায় প্রকৃত সত্যকে যথার্থভাবে জানা ও উপলব্ধি করা যায়। তাদের

এই মতবাদ তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় এবং তিনি এই পথেই প্রকৃত সত্যকে জানার জন্য

অগ্রসর হন। তিনি কঠোর শ্রমের মাধ্যমে সুফীবাদের ত্রæটিগুলি দূর করে সুফীবাদকে ইসলামের

অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি তাঁর সমকালীন দার্শনিকদের তিনটি দলে বিভক্ত করেন : (১) বস্তুবাদী (২)

প্রত্যাদেশ অবিশ্বাসী ও (৩) একত্ববাদে বিশ্বাসী। তাঁর মতে, দার্শনিকদের মূল সমস্যা হল তারা চিন্তার

মৌলিক নিয়মাবলী যথার্থভাবে অধ্যয়ন করে না। তাই তাদের মতবাদ যথার্থ জ্ঞান দিতে পারে না।
যেমন -

(র) বস্তুবাদীদের মতে, বস্তুর প্রত্যক্ষণ নিরপেক্ষ অস্তিত্ব আছে। তারা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে না।

তাদের মতে, বস্তুই চিরন্তন সত্য এবং বস্তু যান্ত্রিক নিয়মে পরিচালিত হয়। গাযালী তাদের

মতবাদের সমালোচনা করে বলেন, বস্তু নয় আত্মাই বাস্তব সত্য।

(রর) প্রত্যাদেশে অবিশ্বাসী আস্তিকরা আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, কিন্তু ঐশী বাণীর

সত্যতা স্বীকার করে না। তাই গাযালী তাদের মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয় বলে বর্জন করেন।

(ররর) একত্ববাদে বিশ্বাসীরা অ্যারিস্টটলের মতবাদ দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত বলে তিনি

তাদের মতবাদ বর্জন করেন। তবে প্রতিটি মতবাদ আলোচনার পূর্বে তিনি তাদের

মতবাদগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করেন। তারপর তিনি এগুলোর

অসারতা প্রমাণ করে তা বর্জন করেন।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। গাযালী কিভাবে বিভিন্ন ধর্মতাত্তি¡ক মতবাদ সমালোচনা করে বর্জন করেন? আলোচনা করুন।

সংক্ষিপ্ত উত্তরমূলক প্রশ্ন

১। প্রকৃত সত্যকে জানার জন্য গাযালী কিভাবে অগ্রসর হন?

২। গাযালী কিভাবে তাঁর সমকালীন দার্শনিকদের সমালোচনা করেন?

বহু নির্বাচনী প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন।

১। গাযালী প্রকৃত জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে প্রথমেই সংশয় করেন

ক) ইন্দ্রিয়সমূহকে খ) ধারণাকে

গ) সংবেদনকে ঘ) প্রজ্ঞাকে

২। গাযালী ধর্মতাত্তি¡ক সম্প্রদায়কে বিভক্ত করেন

ক) এক ভাগে খ) দু’ ভাগে

গ) তিন ভাগে ঘ) চার ভাগে

৩। গাযালী দার্শনিক সম্প্রদায়কে বিভক্ত করেন

ক) দু’ ভাগে খ) চার ভাগে

গ) তিন ভাগে ঘ) পাঁচ ভাগে

৪। বিভিন্ন মতবাদের আলোচনা-পর্যালোচনা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, প্রকৃত সত্যকে

জানা যায়

ক) সচেতন অবস্থায় খ) তন্ময় অবস্থায়

গ) রাগান্বিত অবস্থায় ঘ) অচেতন অবস্থায়

সঠিক উত্তর

১। ক ২। ঘ ৩। গ ৪। খ