নৈতিক ক্রম-বিবর্তনে প্রথার স্তর ও বিবেকের স্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করুন।

নীতিবিদ্যা একটি। আমরা উল্লেখ করেছি, এর আওতায় নীতিবিদ্যাকে অনেক সময় বৈজ্ঞানিক

কিংবা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়। এখন আমরা পূর্বোক্ত বিষয়ের সূত্র ধরে

নৈতিকতার ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব। আমরা অবশ্য ইতোমধ্যে

বিবর্তনবাদ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করেছি। কিন্তু সেটি ছিল বৈজ্ঞানিক নীতিবিদ্যা সম্পর্কিত

একটি বিশেষ আলোচনা। আমাদের এখনকার লক্ষ্য হচ্ছে নৈতিকতার বিকাশ সম্পর্কিত একটি

সাধারণ আলোচনা। আমরা মূলত এখানে নৃতাত্তি¡ক তথা সমাজতাত্তি¡ক দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র

ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করব। এ ব্যাখ্যায় নৈতিকতার বিকাশে তিনটি স্তর নির্দেশ করা হয় : (১) প্রবৃত্তি বা

প্রবণতার স্তর (২) প্রথার স্তর ও (৩) বিবেকের স্তর।

প্রবৃত্তি কথাটি ইংরেজি এর বাংলা প্রতিশব্দ। আজকাল মনোবিজ্ঞানীরা এ কথাটি ব্যবহার

করতে চান না। তাই আমরা বিকল্প হিসেবে প্রবণতা কথাটি ব্যবহার করেছি। তৃতীয় স্তরটি নির্দেশ

করতে গিয়ে যে বিবেকের কথা বলা হয়েছে তাও এখন বিতর্কিত। একে তাই নৈতিক চেতনার স্তর

বলা যেতে পারে। এই তিনটি স্তর সম্পর্কে আরেকটি কথা যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে এদের মধ্যে যে

কালক্রম রয়েছে তা কোন নিরঙ্কুশ ব্যাপার নয়। অনেক লোক তাঁদের আচার-আচরণে এখনো

প্রবৃত্তির স্তরের উদাহরণ পেশ করে থাকেন। আবার যাঁদের নৈতিক চেতনা অত্যন্তউচ্চ মানের তাঁরাও

সামাজিক আচার-প্রথাকে অস্বীকার করতে পারেন না। এসব অসংগতি সত্তে¡ও নৈতিক অগ্রগতির
বিবরণ হিসেবে একটা মোটামুটি চিত্র আমরা এই ব্যাখ্যা থেকে পাই।

প্রবৃত্তি বা প্রবণতার স্তর

প্রবৃত্তির স্তরটিকে বুঝতে হলে মনুষ্যেতর প্রাণীদের ব্যবহারের কথা আমাদের সর্বাগ্রে মনে পড়ে,

কেননা তাদের মধ্যেই প্রবৃত্তিমূলক আচরণ একান্তভাবে দৃষ্ট হয়। কুকুরদের কথাই ধরা যাক। একটি

কুকুরের ৪/৫টি বাচ্চো হতে দেখা যায়। জন্মের পরই বাচ্চোগুলো উষ্ণতার জন্য মায়ের সঙ্গে এবং

ভাইবোনদের সঙ্গে এমনি গাদাগাদি করে থাকে যে এ থেকে বেশ কটি প্রবণতা তাদের মধ্যে

বিকশিত হয়, যেমন দলবদ্ধতা, পারস্পরিক মায়া-মমতা বা সমবেদনা ইত্যাদি। এইসব প্রবণতা

তাদের বেঁচে থাকার ব্যাপারে বেশ সহায়তা করে। আদিম মানুষেরও মূল সমস্যা ছিল বেঁচে থাকা।

এ কারণে তাদের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই উপরোক্ত পশু-প্রবণতাগুলোর প্রাধান্য কল্পনা করা যায়।

হয়ত এ বিষয়টি মনে রেখেই দার্শনিক ওæশো মনে করতেন যে, আদিম মানুষের জীবন ছিল শান্তি,

সদিচ্ছা আর সুখে পরিপূর্ণ। কিন্তু জীবনের জন্য এসব গুণ উত্তম বলে বিবেচিত হলেও জীবন রক্ষার

জন্য আক্রমণাত্মক মনোভাবও অপরিহার্য। প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু পরিমাণ রক্তপাত ছাড়া প্রাণী বা

মানুষ কারো পক্ষেই জীবন ধারণ করা সম্ভব ছিল না। ইংরেজ দার্শনিক হব্স এর মতে, আদিম

মানুষের মূল প্রবৃত্তি ছিল হানাহানি, মারামারি-“নিঃসঙ্গ, গরীব, নোংরা, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত”।

আদিম মানুষের এই চিত্রে, “রুশো মানুষের এমন কিছু প্রবণতাকে বাদ দিয়েছেন, আধুনিক

মনোবিজ্ঞানীরা যাকে মানুষের প্রকৃতিতে সনাক্ত করেছেন, যেমন, কলহপ্রিয়তা, আত্ম-জাহিরেচ্ছা,

দখলী-প্রবণতা; আর হব্সের বর্ণনায় যে কয়েকটি প্রবণতা বাদ পড়েছে তা হচ্ছে মানুষের দলবদ্ধ

থাকার ইচ্ছা, সন্তানের জনক-জননী হওয়ার ইচ্ছা (যা পরিণামে নিজ সন্তানকে ছাড়িয়ে অন্যান্য

সন্তানদের প্রতিও বিস্তৃত হয়) এবং অন্যদের প্রতি সহানুভ তি প্রদর্শনের, তাদেরকে অনুকরণের ও

তাদের উপদেশ গ্রহণের স্বাভাবিক প্রবণতা।”

এসব প্রবণতা মানুষকে সামাজিক জীবনের স্বাদ দিয়েছে এবং অস্পষ্টভাবে হলেও একটা নৈতিক

কাঠামোর মধ্যে জীবন যাপন করায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
প্রথার স্তর

মানুষের দলবদ্ধ থাকার প্রবণতাই সকল প্রথার ভিত্তি। দলে থাকতে হলে দলের স্বার্থ সকলকেই

দেখতে হয়, আর এর অর্থ হলো, দল যা অনুমোদন করে তা ব্যক্তি সদস্যকে মানতে হয় এবং যা

অনুমোদন করে না তা তাকে পরিহার করে চলতে হয়। এভাবেই সকল প্রথার উদ্ভব ঘটে।

নৈতিকতার ক্ষেত্রে এই প্রথার মূল্য কতখানি তা বুঝা যায় নৈতিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ (ঊঃযরপং)

এবং এর মূল অনুসন্ধান করলে। এ বিষয়ে আমরা আগেই আলোকপাত করেছি।

কোন একটি সমাজে বা দলে অকারণে কোন প্রথার উদ্ভব ঘটে না। যেসব প্রবণতার কথা আমরা

একটু আগে উল্লেখ করেছি, দলীয় বা সামাজিকভাবে এসবের উপকারিতা বা এগুলোর মধ্যে সমন্বয়

সাধনের প্রয়োজনীয়তা যখন সবাই উপলব্ধি করে তখন সে অনুযায়ী কাজ-কর্ম করা প্রথায় রূপ লাভ

করে। যেমন যৌনতা মানুষের মাঝে এক অতি শক্তিশালী জৈবিক প্রবণতা। এর ফলে বংশ রক্ষা হয়,

কিন্তু একই নারীতে একাধিক পুরুষের গমন এই বংশ রক্ষার ব্যাপারটিকে গোলমেলে করে ফেলে।

ফলে মানুষের যৌন জীবন নিয়ন্তণের জন্য কিছু প্রথা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেক সমাজই মেনে

নিয়েছে। অবশ্য এই ধরনের কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন ব্যবস্থার বাইরে ঘটনাচক্রে কিংবা নিত্যন্তকুসংস্কার

বশেও বহু প্রথার উদ্ভব ঘটেছে যা শেষপর্যন্তনৈতিক সম্মানে ভ‚ষিত হয়েছে। সুন্দর বনের কাঠুরেরা

বাঘকে বাঘ না বলে বড় মিঞা বলে। এ প্রথা তাদের মধ্যে প্রায় নৈতিকতার মর্যাদা অর্জন করেছে,

অথচ এর ভিত্তি যে কুসংস্কার তা আমাদের বুঝতে কোন কষ্ট হয় না।

প্রথাভিত্তিক নৈতিকতার সুবিধা অসুবিধা দুই-ই আছে। এর একটা বড় সুবিধা হলো এই যে, এ

ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে কিছু নিয়মনীতির অধীনে মানুষের জীবনকে নিয়ন্তণ করে। এর ফলে

ঐ নীতিগুলোর যথার্থতা বিষয়ে যত প্রশ্নই উত্থাপন করা হোক না কেন, নৈতিকতার জন্য যা

অপরিহার্য সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠে না। আর তাছাড়া এই সামাজিক আচার-প্রথার
মানুষের কিছু প্রবণতার
মধ্যে দলীয় উপকার
আবিষ্কার এবং তাদের
মধ্যে সমন্বয়ের
প্রয়োজনীয়তার ফলে
প্রথার উদ্ভব ঘটে।
সময়ে কুসংস্কার বশেও
এর উৎপত্তি ঘটে।
প্রথাভিত্তিক
নৈতিকতার সুবিধা
হলো, এ মানুষের
কাজে নিরপেক্ষতা
নিশ্চিত করে।


মধ্যে যুগ যুগ ধরে রক্ষিত সম্মিলিত অভিজ্ঞতার যে ছাপ থাকে তা সমাজের জন্য পরিণামে বহুক্ষেত্রে

শুভ ফলই বয়ে আনে।

অবশ্য এর বিপরীতও ঘটে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, কুসংস্কার সামাজিক প্রথার অন্যতম এক

উৎস। যখন এই সব প্রথাকে আঁকড়ে থাকা হয়, সমাজ তা থেকে বিন্দুমাত্র উপকৃত হতে পারে না।

তাছাড়া “সামগ্রিকভাবে দেখলে, প্রথাভিত্তিক নৈতিকতার মানদন্ড খুবই অনমনীয় হয় যা ব্যক্তিগত

পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে কোন ছাড়ই দেয় না এবং যে কাজ করে তার প্রেষণাকে হিসেবের মধ্যেই

আনে না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং এর সঙ্গে যুক্ত নতুন ও সৃষ্টিশীল ধরনের ভালত্বে সম্ভাবনার স্থান

এরা খুব কমই রাখে। এছাড়া মানদন্ডগুলোকে খুব অনমনীয়ভাবে চাপানোর মানেই হচ্ছে এদেরকে

খুব উচ্চে স্থাপন করা যায় না। এই স্বাধীনতার অভাব এবং স্বল্পসংখ্যক বেঁধে-দেয়া নিয়মের প্রতি

অনমনীয় আনুগত্য সর্বোচ্চ ধরনের চরিত্রের বিকাশের জন্য সর্বোত্তম শর্ত নয় এবং এই স্তরে ব্যক্তির

বিভিন্ন আকাক্ষার মধ্যে ঐক্যসাধনে উৎসাহ যোগাতে পারে তেমন সামান্য জিনিষই রয়েছে যা হচ্ছে

উন্নত নৈতিকতার বৈশিষ্ট্য।” (লিলি)

বিবেক ও নৈতিক-চেতনার স্তর

প্রথার স্তরে নৈতিক বিষয়ে ব্যক্তির মতামতের কোন স্থান ছিল না; তার দলের সিদ্ধান্তই তাকে মেনে

নিতে হতো। আমরা আগেই বলেছি, এ সিদ্ধান্তের পেছনে বহু যুগের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সমর্থন

ছিল। কিন্তু সময় বসে থাকে না এবং পরিবেশ-পরিস্থিতিও অপরিবর্তিত থাকে না। পরিবর্তিত অবস্থায়

তাই বহু ব্যক্তির কাছে তার সমাজের নিয়ম-নীতি-প্রথা অযৌক্তিক ঠেকেছে, আর তা থেকেই শুরু

হয়েছে বিবেকের স্তর। বিবেকের স্তর প্রথার স্তর থেকে তাই পরে এসেছে, কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক

সময়ের কথা বাদ দিলে আমাদের হাতে যেসব প্রমাণাদি রয়েছে তা থেকে বলা যায় যে, প্রথার স্তরেও

বিবেকের ব্যাপারটি বেশ সক্রিয় ছিল। এমন কোন ঐতিহাসিক সমাজ নেই যেখানে তার রীতিনীতি

প্রথা ব্যক্তি বিশেষের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়নি। ধর্ম ও নৈতিকতার কথা আমরা আগেই আলোচনা

করেছি। ধর্মীয় মহাপুরুষদের মাঝে প্রায় সকলেই তাঁদের সমাজের নৈতিক ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে

ওæখে দাঁড়িয়েছিলেন। বলা যেতে পারে, তারা আল্লাহর নির্দেশে তা করেছিলেন, কিন্তু সে নির্দেশ

তাঁদের বিবেকের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। ইসলামে নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর কথা এখানে

আমরা উল্লেখ করতে পারি। নিঃসন্দেহে তাঁর মূল কাজ ছিল আল্লাহর একত্ব প্রচার করা। কিন্তু তাঁর

শিক্ষায় তদানীন্তন আরব সমাজের আচার-প্রথার প্রকাশ্য সমালোচনা ছিল। তিনি অনাথ ও গরীবদের

প্রতি আরবদের ঔদাসীন্যের সমালোচনা করেছিলেন, তাদের ধন-লিপ্সার নিন্দা করেছিলেন, মেয়ে

সন্তানদের হত্যা করাকে অমার্জনীয় অপরাধ বলে প্রচার করেছিলেন এবং বংশ গৌরবের বিরোধিতা

করেছিলেন। আজকের দিনের ধর্ম-নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মনেও এসব কার্যক্রমের অযথোচিত্যের

বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে মানুষের নৈতিক চেতনা বা বিবেক এখন পূর্ণ স্বাধীনতা
পেয়েছে।

রচনামূলক প্রশ্ন

১. নৈতিকতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত আলোচনা করুন।

২. ঐতিহাসিক-নৃতাত্তি¡ক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিকতার কয়টি স্তর রয়েছে? প্রত্যেকটি স্তর

আলোচনা করুন।

৩. নৈতিক ক্রম-বিবর্তনে প্রথার স্তর ও বিবেকের স্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করুন।

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন

১. 'ওহংঃরহপঃ’ এর অর্থ

ক. প্রবৃত্তি খ. ঝোঁক

গ. প্রবণতা ঘ. প্রেষণা।

২. “আদিম মানুষের জীবন ছিল শান্তি, সদিচ্ছা আর সুখে পরিপূর্ণ”- উক্তিটি করেছেন

ক. রুশো খ. রাসেল

গ. হব্স ঘ. ভল্টেয়ার।

৩. আদিম মানুষের জীবন ছিল, “নিঃসঙ্গ, গরীব, নোংরা, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত”- উক্তিটি

করেছেন

ক. ম্যাকআইভার খ. ম্যাকিয়েভেলী

গ. কার্ল মার্কস ঘ. হব্স

৪. মানুষের কিছু প্রবণতার মধ্যে দলীয় উপকারিতা এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার

ফলে উদ্ভব ঘটে

ক. প্রথা খ. কৃষ্টি

গ. সংস্কৃতি ঘ. আচরণ।

৫. নৈতিক বিকাশের তিনটি স্তর হলো

ক. প্রথা-বিবেক-আত্মচেতনা খ. প্রথা-প্রবৃত্তি-সংযম

গ. প্রবৃত্তি-প্রথা-বিবেক ঘ. সংযম-আত্মসচেতনতা-বিবেক।

সত্য/মিথ্যা

১. ঐতিহাসিক-নৃতাত্তি¡ক দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিকতার তিনটি স্তর ছিল- সত্য/মিথ্যা।

২. আদিম মানুষের মাঝে শুধু পারস্পরিক মায়া-মমতা বিরাজ করত- সত্য/মিথ্যা।

৩. যৌনতা মানুষের মাঝে এক অতি শক্তিশালী জৈবিক প্রবণতা- সত্য/মিথ্যা।

৪. যৌন জীবন নিয়ন্ত্রণের জন্যও কিছু প্রথা অনুসরণ করা হয়- সত্য/মিথ্যা।

৫. প্রথাভিত্তিক নৈতিকতা মানুষের কাজের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে- সত্য/মিথ্যা।

সঠিক উত্তর

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন : ১। ক ২। ক ৩। ঘ ৪। ক ৫। গ

সত্য/মিথ্যা: ১। সত্য ২। মিথ্যা ৩। সত্য ৪।সত্য ৫। সত্য