আবেগবাদের উৎস ও পটভ‚মি প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করুন।

উৎস ও পটভ‚মি

আবেগবাদের সঙ্গে আধুনিক ভাষা দর্শনের কারণিক (মনস্তাত্তি¡ক) তত্ত¡ ও যাচাইতত্তে¡র সম্পর্কের কথা

এ ইউনিটের পাঠ ১ এ আমরা উল্লেখ করেছি। এ শতাব্দীর প্রথম দিকে এ নিয়ে বেশ কয়েকজন

দার্শনিক করেছিলেন। ১৯২৩ সালে আই. এ. রিচার্ডস ও সি. কে. অগডেন লিখিত নামক পুস্তকে এ সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করা হয় বলে মনে করা হয়। লেখকদ্বয়

ভাষায় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং তাদের শুভ সম্পর্কিত আলোচনায়

দেখান যে, এর কোন প্রতীকী কর্ম নেই। তৎকালে ম্যূরের বহুল আলোচিত শুভ সম্পর্কিত ধারণার

কথা মনে রেখেই তাঁরা মত প্রকাশ করেন : ‘যুক্তি দেয়া হয় যে, শুভ একটি অনন্য, অবিশ্লেষণযোগ্য

ধারণার কথা বলে ... (যা) নীতিবিদ্যার বিষয়বস্তু। শুভের এই অদ্ভুত ব্যবহারটি আমাদের মতে

সম্পূর্ণভাবে একটি আবেগমূলক ব্যবহার। যখন এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন শব্দটি কোন

কিছুই নির্দেশ করে না এবং এর কোন প্রতীকী কর্মও থাকে না। যেমন যখন আমরা একে “এটা হয়

ভাল” এই বাক্যে ব্যবহার করি, আমরা শুধুমাত্র ‘এটা’ কথাটিই নির্দেশ করি এবং ‘হয় ভাল’ এর

সংযোজন আমাদের নির্দেশনায় কোন পার্থক্যই সৃষ্টি করে না। অপরপক্ষে যখন আমরা বলি, “এটা

হয় লাল”, তখন এটার সঙ্গে ‘হয় লাল’ এর সংযোজন আমাদের নির্দেশনায় একটি বুদ্ধির প্রতীকরূপে

কাজ করে যা হচ্ছে অন্য একটি লাল জিনিষ। কিন্তু ‘হয় ভাল’ এর অনুরূপ কোন প্রতীকী কর্ম নেই; এ

কেবল এর প্রতি আমাদের মনোভাব প্রকাশের আবেগমূলক সংকেত হিসেবে কাজ করে, হয়ত এ

অন্যের মধ্যে একই ধরনের মনোভাব সঞ্চার করে বা তাদেরকে কোন না কোন ধরনের কাজ করতে
উদ্দীপ্ত করে।”

লক্ষ্যযোগ্য, লেখকদ্বয় এখানে শুভ বিশ্লেষণযোগ্য নয় তা স্বীকার করেছেন এবং এর মাধ্যমে শুভ

সম্পর্কে অপ্রকৃতিবাদী তত্ত¡সমর্থন করেছেন। এই তত্ত¡ আবেগবাদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

রিচার্ড ও অগডেন ছাড়াও আরো যাঁদের লেখায় আবেগবাদের সূচনা লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের মধ্যে

ডবিøও. এইচ. এফ. বার্নেট অন্যতম। ১৯৩৪ সালে অহধষুংরং সাময়িকীতে এক সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তিনি

মত প্রকাশ করেছিলেন যে, মূল্যবোধক অবধারণগুলো উৎসের দিক থেকে প্রকৃতপক্ষে অবধারণ

বলতে যা বুঝায় মোটেও তা নয়। এরা হচ্ছে সমর্থন প্রকাশসূচক চিৎকারমাত্র। আরো যে কজন

দার্শনিক একই ধরনের অভিমত পোষণ করতেন তাঁদের মধ্যে ডানকান জোন্স, সুসান স্টেবিং ও

কার্ল ব্রিটন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভিটগেনস্টেইনও তাঁর কোন কোন লেখায় নৈতিকতার ক্ষেত্রে
আবেগবাদের উৎস

বার্নেটের আবেগবাদ

আবেগবাদী কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে ধারণা ব্যক্ত করেছেন বলে মনে হয়। তবে এ ব্যাপারে

যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদীদের অবদান সবচাইতে বেশি এবং তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ দার্শনিক এ. জে.

এয়ারকে আবেগবাদের মূল স্থপতি বলে মনে করা হয়।

এ. জে. এয়ারের আবেগবাদ

নৈতিকতার ভাষা বিষয়ে ম্যূর তথা স্বজ্ঞাবাদীদের মত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ত্রিশের দশকেও

বজায় ছিল। তবে স্বজ্ঞাবাদীদের দুটো সিদ্ধান্তইতোমধ্যেই স্বীকৃত হয়ে গিয়েছিল, যা হচ্ছে: (১)

নৈতিক অবধারণগুলোর কোন সংজ্ঞাগত সত্যতা নেই এবং (২) নৈতিক শব্দগুলো কোন দৃশ্যমান

ঘটনা নির্দেশ করে না। এয়ারও এ বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করেন। তবে স্বজ্ঞাবাদের দুটো বহুল

আলোচিত ত্রæটিও তিনি লক্ষ্য করেন, যা হচ্ছে: (১) এ নৈতিকতাকে একটা রহস্যজনক বিষয়ে

পরিণত করেছে; কেননা এ মত অনুযায়ী নৈতিক পদগুলো এমন কিছু অতীন্দ্রিয় বা অধিবিদ্যক বিষয়

নির্দেশ করে যাদেরকে স্বজ্ঞা নামক একই ধরনের এক অতীন্দ্রিয় বৃত্তি দ্বারা জানতে হয়। (২)

স্বজ্ঞাবাদী বিশ্লেষণে নৈতিক ভাষার একটি অত্যন্তপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে যা

হচ্ছে তার গতিবেগ সঞ্চারের ক্ষমতা (ফুহধসরংস)। শেষোক্ত বিষয়টির ওপর জোর প্রদান এবং

প্রথমোক্ত বিষয়টির অস্বীকৃতি এয়ারের বক্তব্যে অত্যন্তস্পষ্ট।

এয়ারের আবেগবাদের মূল বক্তব্য তাঁর গ্রন্থে পাওয়া যায়। উক্ত

গ্রন্থে তিনি মত প্রকাশ করেন যে, কোন একটি বাক্য তখনই কেবল অর্থপূর্ণ হতে পারে যখন, যে

বচনের আকারে একে তুলে ধরা হয় তা বিশ্লেষণাত্মক হয় অথবা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে একে পরখ

করা যায়। এই নীতির আওতায় এয়ার দর্শনের যেসব শাখাকে নস্যাৎ করেন তাদের মধ্যে নীতিবিদ্যা

একটি। তিনি প্রমাণ করেন যে, নৈতিক বচনগুলোর কোন বাস্তব আধেয় নেই আর তাই স্বভাবতই

এরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরখযোগ্য নয়। এই পরখযোগ্য না হওয়ার কারণেই এরা অবিশ্লেষণযোগ্য,

ম্যূর কথিত কারণে নয়। এয়ারের ভাষায়, “আমরা বলি যে, যে কারণে এরা অবিশ্লেষণযোগ্য তা

হচ্ছে এই যে এরা কেবলই ছদ্ম ধারণা (ঢ়ংবঁফড় পড়হপবঢ়ঃ)। একটি বচনে একটি নৈতিক চিহ্নের

উপস্থিতি এর তথ্যগত আধেয়ে কিছুই যোগ করে না। যেমন, আমি যদি কাউকে বলি “ঐ অর্থ চুরি

করে তুমি খারাপ কাজ করেছ” তাহলে “তুমি ঐ অর্থ চুরি করেছ” এই সোজাকথায় যা বুঝায় তার

চেয়ে বেশি কিছু আমি বর্ণনা করি না। এই কাজটি খারাপ এ কথা যোগ করে কাজটি সম্পর্কে আমি

কোন অতিরিক্ত বর্ণনা দিচ্ছি না। আমি শুধুই আমার নৈতিক অননুমোদন জ্ঞাপন করছি। এটা যেন

বিশেষ এক ধরনের সন্ত্রস্তস্বরে অথবা কোন বিশেষ আশ্চর্যবোধক চিহ্ন যোগ করে আমি লিখলাম,

“তুমি ঐ অর্থ চুরি করেছ!” স্বরটি অথবা আশ্চর্যবোধক চিহ্নটি বাক্যের শাব্দিক অর্থে কিছুই যোগ

করে না। এটা শুধুমাত্র এই দেখায় যে বক্তার মধ্যে এক ধরনের অনুভ‚তিসহ এর প্রকাশ ঘটে।”

যদি এখন আমি আমার পূর্ববর্তী বিবৃতিটি সাধারণভাবে প্রকাশ করি ও বলি, “অর্থ চুরি অন্যায়”

তাহলে আমি এমন একটি বাক্য তৈরি করি যার কোন তথ্যগত অর্থ নেই অর্থাৎ এ কোন বচন প্রকাশ

করে না যা সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। এটা হলো এমন, যেন আমি লিখলাম, “অর্থ চুরি”!, যেখানে

একটা মানানসই প্রথা বলে আশ্চর্যবোধক চিহ্নের আকৃতির কারণে বুঝা যায় যে, যে অনুভ‚তিটা

প্রকাশ করা হচ্ছে তা একটা বিশেষ ধরনের নৈতিক অননুমোদন। এটা পরিষ্কার যে, সত্য বা মিথ্যা

হতে পারে তেমন কিছুই এখানে বলা হয়নি। অন্য একজন মানুষ চুরির অন্যায়ত্বের বিষয়ে আমার

সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে এই অর্থে যে, চুরি সম্পর্কে আমার মত তার একই ধরনের অনুভ‚তি

নাও থাকতে পারে এবং আমার নৈতিক অনুভ‚তির কারণে সে আমার সঙ্গে ঝগড়াও করতে পারে।

কিন্তু সঠিকভাবে বলতে গেলে সে আমার বিরোধিতা করতে পারে না, কেননা একটি বিশেষ ধরনের
স্বজ্ঞাবাদের সমালোচনা
এয়ারের আবেগবাদের

মূলকথা

কাজ ন্যায় বা অন্যায় একথা বলে আমি কোন তথ্যগত বিবৃতি দিচ্ছি না, এমনকি আমার নিজস্ব

মনের অবস্থা সম্পর্কেও কিছু বলছি না; আমি শুধু একটা বিশেষ নৈতিক অনুভ‚তি প্রকাশ করছি এবং

যে লোকটি বাহ্যত আমার বিরোধিতা করতে চাচ্ছে সে শুধুই তার নৈতিক অনুভ‚তিই প্রকাশ করছে।

অতএব আমাদের মধ্যে কে সঠিক একথা জিজ্ঞেস করার মধ্যে স্পষ্টতই কোন অর্থ নেই, কেননা

আমাদের কেউই কোন খাঁটি বচন বর্ণনা করছি না।”

লক্ষ্যযোগ্য, ওপরোক্ত বক্তব্যে এয়ার অনুভ‚তির প্রকাশ এবং অনুভ‚তির বর্ণনার মধ্যে বেশ একটা স‚²

পার্থক্যের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মতে এ কারণেই একটি মনস্তাত্তি¡ক বিষয়কে নৈতিকতার সঙ্গে জড়িত

করা সত্তে¡ও তিনি একজন প্রকৃতিবাদী নন, যাঁরা নৈতিক পদের বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেন।

দ্বিতীয়ত আরো লক্ষযোগ্য যে, তাঁর বক্তব্যের আরেকটি দিক হচ্ছে এই যে, নৈতিকতা তথা মূল্যের

প্রশ্নে কোন প্রকৃত বাদানুবাদ নেই। কথাটা কি ঠিক? এ ব্যাপারে এয়ার বলেন “প্রথম দৃষ্টিতে একে

একটা স্ববিরোধী বক্তব্য বলে মনে হতে পারে। কেননা নিশ্চয়ই আমরা এমন বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হই

যাদেরকে সাধারণভাবে মূল্য সম্পর্কিত বাদানুবাদ বলে ধরা হয়। কিন্তু এই ধরনের সবক্ষেত্রেই

আমরা যদি বিষয়টিকে খুব মনোযোগের সঙ্গে দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, বাদানুবাদ প্রকৃতপক্ষে

মূল্যের প্রশ্নে নয়, বরং তথ্যের প্রশ্নে সংঘটিত হয়। যখন কোন বিশেষ বা বিশেষ ধরনের কাজের

নৈতিক মূল্য সম্পর্কে আমাদের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করে, আমরা স্বতঃই তাকে আমাদের

চিন্তাধারায় নিয়ে আসার জন্য যুক্তির আশ্রয় নেই। কিন্তু আমরা আমাদের যুক্তির দ্বারা কখনো এই

দেখাবার চেষ্টা করি না যে পরিস্থিতির প্রকৃতি সে সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে তার প্রতি তার একটা

ভুল নৈতিক অনুভ‚তি রয়েছে। আমরা তাকে দেখাবার চেষ্টা করি যে, সে অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের

ব্যাপারে ভুল করেছে।”

নৈতিক বাদানুবাদ মূলত তথ্যের ব্যাপারে সংঘটিত হয়, এয়ারের এই যুক্তিকে এ ব্যাপারে ম্যূরের

আরেকটি যুক্তির প্রত্যুত্তর হিসেবে নেয়া চলে যাতে ম্যূর বলেছিলেন, যদি নৈতিক বিবৃতিগুলো শুধু

বক্তার অনুভ‚তি সম্পর্কিত বিবৃতি হতো তাহলে মূল্যের প্রশ্নে যুক্তিতর্ক অসম্ভব হতো। আবেগবাদীরা

এ প্রশ্নটাকে কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন তা আমরা বুঝতে পারব যখন আমরা দেখতে পাব,

অপর আবেগবাদী দার্শনিক জে. এল. স্টিভেনশন তাঁর নৈতিক মতৈক্য ও মতানৈক্যকে নৈতিক
অবধারণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে বর্ণনা করেছেন।

রচনামূলক প্রশ্ন

১। আবেগবাদের উৎস ও পটভ‚মি প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করুন।

২। আবেগবাদ প্রসঙ্গে এয়ারের মতামত ব্যাখ্যা করুন।

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন

সঠিক উত্তর লিখুন

১। আই. এ. রিচার্ডস ও সি. কে. অগডেনের গ্রন্থের নাম

ক. ঞযব গবধহরহম ড়ভ গবধহরহম খ. গধহঁধষ ড়ভ ঊঃযরপং

গ. ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঊঃযরপং।

২। এ. জে. এয়ার হলেন

ক. ব্যবস্থাবাদী খ. আবেগবাদী

গ. বর্ণনাবাদী।

৩। এয়ারের দার্শনিক মতবাদ হলো

ক. বুদ্ধিবাদ খ. যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ

গ. স্বজ্ঞাবাদ।

৪। এয়ার বলেন বাদানুবাদ হয়

ক. মূল্যের প্রশ্নে খ. অর্থের প্রশ্নে

গ. তথ্যের প্রশ্নে।

৫। স্টিভেনসন মনে করেন নৈতিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো

ক. যুক্তি খ. মননশীলতা

গ. মতৈক্য ও মতানৈক্য।

সত্য/মিথ্যা

১। সি. কে. অগডেন ও আই. এ. রিচার্ডস আবেগবাদের আদি প্রবক্তা ছিলেন- সত্য/মিথ্যা।

২। এয়ার মনে করেন, ‘নৈতিক অবধারণের সংজ্ঞাগত সত্যতা আছে’- সত্য/মিথ্যা।

৩। এয়ারের মতে ‘কোন বাক্য অর্থপূর্ণ হবে বাক্যটি বিশ্লেষণাত্মক ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে

পরখযোগ্য হলে- সত্য/মিথ্যা।

৪। এয়ারের মতে মূল্যের প্রশ্নে বাদানুবাদ হয় -সত্য/মিথ্যা।

৫। এয়ার অনুভ‚তির প্রকাশ ও অনুভ‚তির বর্ণনার মাঝে পার্থক্য করেছেন- সত্য/মিথ্যা।

সঠিক উত্তর

নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন: ১। ক ২। খ ৩। খ ৪। গ ৫। গ।

সত্য/মিথ্যা: ১। সত্য ২। সত্য ৩। মিথ্যা ৪। মিথ্যা ৫। সত্য।