ক্যালভিন মতবাদ Calvinism পুঁজিবাদ বিকাশে ক্যালভিনবাদের অবদান Contribution of Calvinism to Growth of Capitalism
কালভিন মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জোন ক্যালভিন (John Kalvin)। তিনি সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের অধিবাসী। তিনি ১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে পিকাভির নয়নে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার মা মারা যান, তাঁর পিতা ছোট ছেলে মেয়েদেরকে পছন্দ করতেন না। কাজেই ক্যালভিনের লালন পালনের ভার অর্পিত হয়েছিল তার পিতার এক অভিজাত বন্ধুর উপর। উচ্চ শিক্ষার জন্য ক্যালভিনকে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তার রুক্ষ মেজাজ ও অস্বাভাবিক আচরণের ফলে তিনি সেখান থেকে বহিষ্কার হন। পরে তিনি তাঁর পিতার ইচ্ছায় অর্লিনে গেলেন আইন বিদ্যা শিক্ষার জন্য। এখানে তিনি লুথারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন এবং প্রচলিত ধর্মের প্রতি বিরাগ ভাজন হলেন। ১৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্য তিনি সরকার কর্তৃক আক্রমণের সম্মুখীন হন এবং পরিশেষে তিনি সুইজারল্যাণ্ডে চলে যান। কিন্তু তিনি কিছু কালের জন্য বেসেলস এ অবস্থান করেন এবং পরে জেনেভায় ফিরে আসেন। তথায় ঐ মুহূর্তে চলছিল বেদনাদায়ক রাজনৈতিক বিপ্লব। তিনি ১৫৪১ খ্রিঃ সরকার ও ধর্মের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য প্রচার শুরু করেন এবং প্রভাব বিস্তার করে ফেলেন। ক্যালভিনের মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর রচিত 'Institutes of the christian religion' গ্রন্থে যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই গ্রন্থটি বহুবার পরিশোধিত এবং পরিবর্ধন হয়েছিল। সেন্ট অগাস্টিনের অনুরূপ ছিল তার ধারণা। তিনি চিন্তা করতেন সমগ্র বিশ্ব পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর, তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রশংসার জন্য। কারণ আদমের পদস্খলনে সকল মানুষই প্রকৃতিগতভাবে পাপী। অসৎ প্ররোচনার দ্বারা মানুষের হাত পা বাঁধা কাজেই তার উদ্ধারের কোনো উপায় নেই। ক্যালভিনের মতে এসব স্বত্ত্বেও ঈশ্বর তাঁর নিজের ইচ্ছায় পূর্ব থেকেই কিছু মানুষের জন্য শাশ্বত মুক্তির ব্যবস্থা এবং অবশিষ্ট্যের জন্য দোযখের নির্মম শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। মানব জাতি কোনোভাবেই তার ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না, জন্মের পূর্ব থেকেই মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে। কেউবা ঈশ্বরের আর্শিবাদ পুষ্ট আবার কেউবা অভিশপ্ত। ক্যালভিনের মতাদর্শ এক বিশেষ ধরনের ব্যক্তিত্ব এবং দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করে তাদের Worldly asceticism বা পার্থিব ও পশ্চাত্য এক এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ক্যালভিন তার অনুগামীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, পার্থিব জীবনে ভালো কাজ করলেই যে মুক্তি লাভ করবে এমন নয় কারণ তা পূর্ব নির্ধারিত। সুতরাং মানুষকে কঠোর পরিশ্রম নীতিকেই ধর্মীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মুক্তি পাওয়ার আশায় নয়। এ ধরনের মতবাদ ক্যালভিনের অনুগামীদের মধ্যে অধিক পরিশ্রম করে অধিক আয় করার নীতিকে গ্রহণ করে। বস্তুত যেহেতু যে নীতিমালা জাগতিক কাজকেই যথেষ্ট মূল্যবান মনে করে এবং দৈনন্দিন কাজকে পবিত্র কাজ মনে করে। সেজন্য পার্থিব কাজেই তাদের মঙ্গল নিহিত। এ মূল্যবোধের গ্রহণকারী হয়ে তারা অর্থ উপার্জনে অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠে। প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের ক্যালভিনমতবাদ বিভাগ হতে ক্যাথলিক ধর্মের চরম আধ্যাত্মিক জীবনের পরিবর্তে ইহজাগতিক জীবনের স্পর্শ দেয়। ক্যালভিনবাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো এর Doctrine of Predestination এবং asceticism। প্রথমটির বিষয়বস্তু হলো ক. মানুষ ঈশ্বরের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সৃষ্টি, খ. কতটুকু তিনি ব্যক্ত করেন ততটুকু ছাড়া ঈশ্বরের মনোভঙ্গি জানা দুস্কর, গ. ভাগ্য পূর্ব নির্ধারিত বিধায় সামান্য সংখ্যক মানুষই পরিত্রাণ পেতে পারে। এসব ধারণা মানুষের অন্তরে গভীর এক শূন্যতার সৃষ্টি করে এবং এই বোধ থেকেই তার মনে পুঁজিবাদী স্পিরিট বা উদ্দীপনার জন্ম দেয়। মানুষের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক হয়ে পরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। চার্চের মাধ্যমে ঈশ্বর প্রাপ্তির ইচ্ছা বিদূরীত হয় যা কিনা ক্যালভিনবাদের একটি মৌলিক বিষয় । মানুষ ভাবতে শেখে যে, অতিরিক্ত পার্থিব কর্মকাণ্ড পরিত্রাণ প্রাপ্তির জন্য নির্ধারিত হবার লক্ষণ। তবে এটি পরিত্রাণের উপায় নয় বরং পরিত্রাণ সংক্রান্ত সন্দেহকে বিদূরীত করে। মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিষ্ট জগতের দ্বিধাবিভক্তির মূলে ছিল ক্যাথলিক চার্চের অত্যাচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে লর্ড ক্যালভিন ( Lord Calvin) এবং মার্টিন লুথারের (Martin Luther) নেতৃত্বে সংঘটিত অগণিত খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহীরাই ইতিহাসে প্রটেস্ট্যান্ট নামে পরিচিত। প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্ট ধর্মের এতদিনকার পুরানো ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা অনেক নতুন জীবন ধারণা ও মূল্যবোধ প্রচার করে যা চিরাচরিত ক্যাথলিক ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে পৃথক। এই নতুন মূল্যবোধ এবং জীবন ধারণা প্রটেস্ট্যান্ট নীতিবোধ বা নীতিমালা নামে পরিচিত। এই নীতিমালা ধর্মকেন্দ্রীক এবং জীবন বিমুখ নয়, বরঞ্চ সেগুলো মানব কল্যাণমুখী। প্রটেস্ট্যান্ট নীতিমালার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে পার্থিব কৃচ্ছতা সাধন (Worldly asceticism ) । পার্থিব সম্পদ এবং ভোগের ব্যাপারে সংযমী হওয়া পার্থিব কৃচ্ছতা সাধন নীতির মূল কথা ।
পুঁজিবাদ বিকাশে ক্যালভিনবাদের অবদান
ক্যালভিনবাদ ইউরোপে/ পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদী অণুপ্রেরণা সৃষ্টি ও পুঁজিবাদী বিকাশে অনস্বীকার্য অবদান রেখে গেছে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে। প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মের চারটি শাখার কথা উল্লেখ করেছেন Maxweber । শাখাগুলো হলো-
ক. ক্যালভিনবাদ
খ. ক্যাপিটিজম
গ. পিটিজম এবং
ঘ. ম্যাথোডিজম।
এ শাখাগুলোর মধ্য থেকে আদর্শ নমুনা হিসেবে ক্যালভিনবাদ গ্রহণ করে তিনি দেখিয়েছেন ক্যালভিনবাদ আর পুঁজিবাদ গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ ।
ক্যালভিনবাদ থেকে যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকেই জন্ম হয় যৌক্তিক পুঁজিবাদের। মোটকথা ক্যালভিনবাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা পুঁজিবাদ বিকাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ক্যালভিনবাদের নিচের দুটি বৈশিষ্ট্য পুঁজিবাদ বিকাশে বিশেষভাবে লক্ষণীয়—
ক. প্রিডেস্টিনিশন : এটির মতে, ঈশ্বর নিগুঢ়, অজ্ঞেয়, অসীম ও ক্ষমতাশালী। তিনি মানুষের নিয়তি পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মৃত্যুর পর কোথায় তার স্থান হবে মানুষের কোনোভাবেই জানার উপায় নেই। ঈশ্বর মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য তার জগৎ সৃষ্টি করেছেন। ক্যাথলিক ধর্মে কেউ পাপ করলে পাপ মোচনের জন্য পাদ্রির কাছে মাফ চেয়ে কিছু অনুষ্ঠান পালন করলেই পাপ মোচন হয়ে যায়। কারণ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ইশ্বর। তাই ঈশ্বরের কাছে মানুষ একা, অসহায় ও শক্তিহীন ।
খ. কলিং : এটির মতে ঈশ্বরের দয়া আশা করতে পারে প্রত্যেক ব্যক্তিই। একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকটি মানুষের উচিত ঈশ্বর প্রদত্ত নির্দিষ্ট কাজের প্রতি অনুরক্ত হওয়া এবং অনুগত থাকা। এর ফলেই পেশার উন্নতি সাধন করতে পারে। পেশাভেদে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যিনি যে পেশায় নিয়োজিত সে পেশার মাধ্যমে ঈশ্বরের সাহায্য লাভ করা সম্ভব।
ক্যালভিন মতবাদকে নিম্নোক্ত উপায়ে ব্যক্ত করা হয়েছে—
১. একজন চূড়ান্ত ও সর্বময় বিধাতা অস্তিত্বমান আছেন যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন, মানুষের সীমাবদ্ধ মন
দিয়ে তাকে উপলব্ধি করা বা তাঁর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব নয়।
২. এই রহস্যাবৃত ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, পরিত্রাণ, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিকে পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন। সুতরাং মানুষ তার
কাজের বদৌলতে তার পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যলিপি খণ্ডাতে পারবে না।
৩. ঈশ্বর, পার্থিব বস্তু, মানব আচরণ ও মানব শরীর পাপ ও মৃত্যু তাড়িত অবস্থায় আছে যেখানে পরিত্রাণ প্রাপ্তি এক মাত্র
স্বৰ্গীয় সদিচ্ছাতেই সম্ভব।
৪. ঈশ্বর তাঁর মহিমার জন্য পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তার বিধিলিপি পরিবর্তনের জন্য নয় বরং ঈশ্বরের মহিমার জন্য ও
ধরায় ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে বাধ্য।
বর্ণিত আলোচনার প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদ বিকাশে ক্যালভিনবাদের অবদান নিচে আলোচনা করা হলো-
১. নিরলসভাবে কর্ম সম্পাদন : ধর্ম নিষ্ঠ হওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা প্রয়োজন মর্মে ক্যালভিন প্রচার করেন। মানুষ স্বর্গীয় ইচ্ছায় অনুবর্তী হতে পারে একমাত্র নিজের পেশায় নিরলসভাবে নিয়োজিত থেকে। ফলে মানুষের মনকেন্দ্রিক কষ্ট স্বীকার, সংযম ও ঈশ্বর প্রেমের আদর্শে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক জীবনের সফলতা অর্জন হয়।
২. পার্থিব আকর্ষণ থেকে মুক্তি : ক্যালভিনবাদে ঈশ্বরকে জানার জন্য কোনো অতিন্দ্রীয় যাদুভিত্তিক পন্থা না থাকায় ক্যালভিনবাদীদের জীবন থেকে অতিন্দ্রীয় মোহ অপসারিত হয়ে জীবন ও অলৌকিক শক্তির প্রতি গভীর আনুগত্যের সৃষ্টি হয়। যা মানুষকে অর্থনৈতিক সফলতা এনে দেয় ।
৩. ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও জাগতিকতার সৃষ্টি : প্রতিটি মানুষের মধ্যে ক্যালভিনবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও জাগতিকতার সৃষ্টি করে। ফলে যুক্তি নির্ভর হয়ে ওঠে ব্যক্তি জীবন ও সমাজজীবন। তাই বলা যায়, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য্য ও জাগতিকতা পুঁজিবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ।
৪. সর্বজনীন সম্প্রদায় গঠন : ক্যালভিনবাদ সকলের জন্যই সুখ, শান্তি, সাম্য, মৈত্রী সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সর্বজনীন সম্প্রদায় গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরা একই চিন্তা ও চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৎপর হয় এবং পুঁজিবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৫. প্রয়োজন পূরণে সম্পদ : পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য সবচেয়ে সহায়তা করে সম্পদ সম্পর্কে ক্যালভিনবাদের প্রচারিত বাণী। পূত ও পবিত্র জীবন ধারণের কথা ক্যালভিনবাদে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যার যা প্রয়োজন তাই ভোগ কর। ভোগের জন্য বা তৃষ্ণা নিবারণের জন্য কেউ যাতে সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট না হয় সে জন্যই এই বাণী প্রচার করা হতো। কেননা এতে ধর্মের পথ থেকে মানুষের বিচ্যুতি ঘটে। তাই এটি মহাপাপ ।
পরিশেষে বলা যায় যে, নতুন জীবন ধারণা ও মূল্যবোধের প্রচার করা হয় ক্যালভিনবাদের মধ্য দিয়েই, যা চিরাচরিত ক্যাথলিক ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে পৃথক। এই নতুন মূল্যবোধ ও জীবন ধারণা ধর্মকেন্দ্রিক ও মানবকল্যাণমুখী ।
পুঁজিবাদ বিকাশে ক্যালভিনবাদের অবদান
Contribution of Calvinism to Growth of Capitalism
ক্যালভিনবাদ ইউরোপে/ পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদী অণুপ্রেরণা সৃষ্টি ও পুঁজিবাদী বিকাশে অনস্বীকার্য অবদান রেখে গেছে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে। প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মের চারটি শাখার কথা উল্লেখ করেছেন Maxweber । শাখাগুলো হলো-ক. ক্যালভিনবাদ
খ. ক্যাপিটিজম
গ. পিটিজম এবং
ঘ. ম্যাথোডিজম।
এ শাখাগুলোর মধ্য থেকে আদর্শ নমুনা হিসেবে ক্যালভিনবাদ গ্রহণ করে তিনি দেখিয়েছেন ক্যালভিনবাদ আর পুঁজিবাদ গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ ।
ক্যালভিনবাদ থেকে যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকেই জন্ম হয় যৌক্তিক পুঁজিবাদের। মোটকথা ক্যালভিনবাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও নীতিমালা পুঁজিবাদ বিকাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ক্যালভিনবাদের নিচের দুটি বৈশিষ্ট্য পুঁজিবাদ বিকাশে বিশেষভাবে লক্ষণীয়—
ক. প্রিডেস্টিনিশন : এটির মতে, ঈশ্বর নিগুঢ়, অজ্ঞেয়, অসীম ও ক্ষমতাশালী। তিনি মানুষের নিয়তি পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মৃত্যুর পর কোথায় তার স্থান হবে মানুষের কোনোভাবেই জানার উপায় নেই। ঈশ্বর মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য তার জগৎ সৃষ্টি করেছেন। ক্যাথলিক ধর্মে কেউ পাপ করলে পাপ মোচনের জন্য পাদ্রির কাছে মাফ চেয়ে কিছু অনুষ্ঠান পালন করলেই পাপ মোচন হয়ে যায়। কারণ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ইশ্বর। তাই ঈশ্বরের কাছে মানুষ একা, অসহায় ও শক্তিহীন ।
খ. কলিং : এটির মতে ঈশ্বরের দয়া আশা করতে পারে প্রত্যেক ব্যক্তিই। একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকটি মানুষের উচিত ঈশ্বর প্রদত্ত নির্দিষ্ট কাজের প্রতি অনুরক্ত হওয়া এবং অনুগত থাকা। এর ফলেই পেশার উন্নতি সাধন করতে পারে। পেশাভেদে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যিনি যে পেশায় নিয়োজিত সে পেশার মাধ্যমে ঈশ্বরের সাহায্য লাভ করা সম্ভব।
ক্যালভিন মতবাদকে নিম্নোক্ত উপায়ে ব্যক্ত করা হয়েছে—
১. একজন চূড়ান্ত ও সর্বময় বিধাতা অস্তিত্বমান আছেন যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন, মানুষের সীমাবদ্ধ মন
দিয়ে তাকে উপলব্ধি করা বা তাঁর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব নয়।
২. এই রহস্যাবৃত ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, পরিত্রাণ, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিকে পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন। সুতরাং মানুষ তার
কাজের বদৌলতে তার পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যলিপি খণ্ডাতে পারবে না।
৩. ঈশ্বর, পার্থিব বস্তু, মানব আচরণ ও মানব শরীর পাপ ও মৃত্যু তাড়িত অবস্থায় আছে যেখানে পরিত্রাণ প্রাপ্তি এক মাত্র
স্বৰ্গীয় সদিচ্ছাতেই সম্ভব।
৪. ঈশ্বর তাঁর মহিমার জন্য পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তার বিধিলিপি পরিবর্তনের জন্য নয় বরং ঈশ্বরের মহিমার জন্য ও
ধরায় ঈশ্বরের রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে বাধ্য।
বর্ণিত আলোচনার প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদ বিকাশে ক্যালভিনবাদের অবদান নিচে আলোচনা করা হলো-
১. নিরলসভাবে কর্ম সম্পাদন : ধর্ম নিষ্ঠ হওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা প্রয়োজন মর্মে ক্যালভিন প্রচার করেন। মানুষ স্বর্গীয় ইচ্ছায় অনুবর্তী হতে পারে একমাত্র নিজের পেশায় নিরলসভাবে নিয়োজিত থেকে। ফলে মানুষের মনকেন্দ্রিক কষ্ট স্বীকার, সংযম ও ঈশ্বর প্রেমের আদর্শে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক জীবনের সফলতা অর্জন হয়।
২. পার্থিব আকর্ষণ থেকে মুক্তি : ক্যালভিনবাদে ঈশ্বরকে জানার জন্য কোনো অতিন্দ্রীয় যাদুভিত্তিক পন্থা না থাকায় ক্যালভিনবাদীদের জীবন থেকে অতিন্দ্রীয় মোহ অপসারিত হয়ে জীবন ও অলৌকিক শক্তির প্রতি গভীর আনুগত্যের সৃষ্টি হয়। যা মানুষকে অর্থনৈতিক সফলতা এনে দেয় ।
৩. ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও জাগতিকতার সৃষ্টি : প্রতিটি মানুষের মধ্যে ক্যালভিনবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও জাগতিকতার সৃষ্টি করে। ফলে যুক্তি নির্ভর হয়ে ওঠে ব্যক্তি জীবন ও সমাজজীবন। তাই বলা যায়, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য্য ও জাগতিকতা পুঁজিবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ।
৪. সর্বজনীন সম্প্রদায় গঠন : ক্যালভিনবাদ সকলের জন্যই সুখ, শান্তি, সাম্য, মৈত্রী সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সর্বজনীন সম্প্রদায় গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরা একই চিন্তা ও চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে তৎপর হয় এবং পুঁজিবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৫. প্রয়োজন পূরণে সম্পদ : পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য সবচেয়ে সহায়তা করে সম্পদ সম্পর্কে ক্যালভিনবাদের প্রচারিত বাণী। পূত ও পবিত্র জীবন ধারণের কথা ক্যালভিনবাদে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যার যা প্রয়োজন তাই ভোগ কর। ভোগের জন্য বা তৃষ্ণা নিবারণের জন্য কেউ যাতে সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট না হয় সে জন্যই এই বাণী প্রচার করা হতো। কেননা এতে ধর্মের পথ থেকে মানুষের বিচ্যুতি ঘটে। তাই এটি মহাপাপ ।
পরিশেষে বলা যায় যে, নতুন জীবন ধারণা ও মূল্যবোধের প্রচার করা হয় ক্যালভিনবাদের মধ্য দিয়েই, যা চিরাচরিত ক্যাথলিক ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে পৃথক। এই নতুন মূল্যবোধ ও জীবন ধারণা ধর্মকেন্দ্রিক ও মানবকল্যাণমুখী ।